📄 আল্লাহর উপর ভরসা করা
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা বিশুদ্ধ তাওহিদের নিদর্শন ও মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ মুমিনদেরকে উৎসাহিত করেছেন তার উপর ভরসা করতে। তিনি বলেছেন,
• '... যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।' (সূরাহ তালাক, ৬৫:৩)
• অন্যত্র বলেছেন, '... অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলা র উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
• অন্যত্র বলেছেন, '... এবং মুমিনদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:১১)
পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের অর্থ নিজের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাপনা গ্রহণের সাথে যুগপৎভাবে আল্লাহর রহমত ও দয়ার উপর ভরসা করা。 শরিয়াহর মূলনীতি অনুসারে, তাওহিদের উপর ঈমান পরিপূর্ণ করতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই সেইসব 'আসবাব' (উপায়-উপকরণ) ব্যবহার করতে হবে, যার মাধ্যমে সে নিজের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, এটাই তাকদীরের বিধান। আসবাব ব্যবহারে অবহেলা করলে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করা হয় না। আসবাব বর্জন করা আল্লাহর জ্ঞান, বিজ্ঞতা ও নির্দেশের পরিপন্থী; যদিওবা আসবাব পরিত্যাগকারী ব্যক্তি ভিন্নমত পোষণ করুক না কেন। উপায় উপকরণ ব্যবহার করা আল্লাহর উপর ভরসার শক্তিশালী নিদর্শন, সেগুলো উপেক্ষা করা অসহায়ত্বের নিদর্শন। একজন মুমিন বা উম্মতের বৈশিষ্ট্যের সাথে এটি মানানসই নয়。
📄 গভীর চিন্তা ও পর্যালোচনা
কোনো কিছু গভীরভাবে চিন্তা করা, বোঝা ও পর্যালোচনা করার ক্ষমতা মানুষকে দেয়া আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত সমূহের অন্যতম। এই গুণের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই খুঁজে পায় আল্লাহর একত্ব ও তুলনাহীনতার সত্যতা, যা তার মনে আল্লাহর ইবাদাতের ঐকান্তিক ইচ্ছা জাগায়। মানুষকে শয়তানের ফাঁদ ও নিরর্থক কাজের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করতে পারে এই বোধশক্তি। এর মাধ্যমে তারা আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হতে অনুপ্রাণিত হন। ফলে সম্ভব হয় আত্মিক শান্তি ও পরিতৃপ্তি অর্জন এবং 'ভালো থাকতে' পারা।
মৃত্যু, মৃত্যু পরবর্তী কবরের জীবন, বিচার দিবস ও আখিরাত সম্পর্কে নিয়মিত ভিত্তিতে গভীর চিন্তাভাবনা করতে মুমিনদের বারবার উৎসাহিত করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমরা (দুনিয়ার) স্বাদ-আহলাদ নিঃশেষকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। (বুখারি)。
এসব চিন্তার মাধ্যমে ব্যক্তির মনে পড়ে, এই দুনিয়াতে সে চিরকাল থাকবে না বরং তাকে অন্য জীবনে প্রবেশ করতে হবে। ফলে পরবর্তী জীবন ও বিচার দিবসের জন্য উত্তম আমল এবং গুনাহ পরিত্যাগে উৎসাহী হয়।
মৃত্যুচিন্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত আরেকটি উপলব্ধি হলো দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করা। এই দুনিয়া কেবল অল্প সময়ের জন্য। এর আনন্দ ক্ষণস্থায়ী ও এটি নানা ধরণের মনোযোগ হরণকারী উপাদানে পরিপূর্ণ। আল্লাহ বলেন,
• 'পার্থিব জীবন ক্রীড়া ও কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরকালের আবাস পরহেযগারদের জন্যে শ্রেষ্টতর। তোমরা কি বুঝ না?' (সূরাহ আনয়াম, ৬:৩২)
• 'তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাজিল করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে শ্যামল সবুজ ভূমিজ লতা-পাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা এমন শুস্ক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাসে উড়ে যায়। আল্লাহ এ সবকিছুর উপর শক্তিমান। ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদান প্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্যে উত্তম।' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:৪৫-৪৬)
গভীর চিন্তার মাধ্যমে মুমিন উপলব্ধি করতে পারে এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। তাই সে দুনিয়া থেকে সম্পর্ক ছেদ করে। কেবল যতটুকু প্রয়োজন, দুনিয়ার সাথে ততটুকুই সংযোগ রাখে। [১২] আরেকটি সুনির্দিষ্ট ধ্যান হলো আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করা। এটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে,
• 'নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যে। যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুম জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচাও।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯০-১৯১)
সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা ও ধ্যানের মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। তাঁর শক্তি ও কুদরতের প্রতি মুগ্ধ হয়ে নত হয়ে যায় ভক্তিতে। অসংখ্য নিয়ামতের পরিচয় আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা বাড়িয়ে দেয়। সবকিছুর জন্য আমরা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল—এটি বোঝা সহজ হয় এবং দমে যায় বড়াই-অহংকারের প্রবণতা।
আত্মার পরিশুদ্ধি ও প্রশান্তি অর্জনের অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে কৃতজ্ঞতাবোধ, নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, উপকারী ও বিশুদ্ধ ইলম অর্জন, মসজিদে সালাত আদায়, নেককার সঙ্গীসাথী ও জীবনসঙ্গী লাভ, ঈমান বিশুদ্ধ করা, নফল ইবাদাত বন্দেগী ও উত্তম আমল করা। [১৩] বাস্তবে ইসলামে কেবল আল্লাহর খাতিরে শরীয়াহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে করা সকল কাজের দ্বারা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হতে থাকে।
এই প্রসঙ্গে একটি চমকপ্রদ গবেষণার কথা উল্লেখ করছি। গবেষণায় দেখা গেছে যারা ধর্মের প্রতি অধিক নিবেদিতপ্রাণ, তারা অন্যদের তুলনায় দীর্ঘায়ু লাভ করেন। বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে পরিচালিত এক স্টাডিতে দেখা গেছে, ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণের কারণে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়। এই স্টাডি পরিচালনা করার সময় অংশগ্রহণকারীদের অবস্থা নিয়মিত বিরতিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। [১৪] ২১০০০ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে নিয়ে এই স্টাডি পরিচালিত হয়েছে দীর্ঘ ৯ বছর যাবত। গবেষকরা দেখেছেন, যারা সপ্তাহে একবারের বেশি ধর্মীয় উপাসনা করেন, তারা গড়ে অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিদের তুলনায় ৭ বছর অধিক আয়ু পেয়েছেন, আর আফ্রিকান-আমেরিকানরা ১৪ বছর অধিক আয়ু পেয়েছেন। যারা কখনো ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ করেননি, তারা অন্যান্যদের তুলনায় শতকরা ৫০ ভাগ অধিক মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন। এখানে ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রভাব সুস্পষ্ট; এগুলোকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য বা জীবনযাপনের সাথে যুক্ত করার অবকাশ নেই。[১৫]
মোট ১,২৬,০০০ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে পরিচালিত ৪২ টি স্টাডির বিশ্লেষণে (মেটা-এনালাইসিস) উঠে এসেছে, ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ফলে আয়ুষ্কাল ২৯% বৃদ্ধি পায়。[১৬] যদিও এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে অমুসলিম জনসাধারণের মধ্যে, তবুও আমরা বলতে পারি (তাদের আপেক্ষিক দ্বীনদারীতার কারণে) আল্লাহ তাআলা কিছু দুনিয়াবী উপকারিতা প্রদান করেছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কুরআনে একটি আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে। নুহ (আ.) তাঁর জাতির লোকেদেরকে আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণের দাওয়াত দিয়ে বলেছিলেন,
• 'সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সতর্ককারী। এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ তাআলা তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং *নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ* দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা র নির্দিষ্টকাল যখন হবে, তখন অবকাশ দেয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে! (সূরাহ নুহ, ৭১:২-৪)
'নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ' প্রদান করবেন এই অংশটি আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। ইবনে কাসির (রহ.) এই অংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'এর অর্থ তিনি তোমাদের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ আসতে পারত সেগুলো থেকে সুরক্ষা প্রদান করবেন। আর যদি তোমরা তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত না হতে তবে সেগুলো থেকে অবকাশ পেতে না।' আল্লাহর আনুগত্য ও দ্বীনদারীতার মাধ্যমে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়, এই মর্মে উক্ত আয়াতটি একটি উত্তম দলিল。[১৭]
টিকাঃ
[১২] Zarabozo, 2002, p. 338.
[১৩] Farid, 1993, pp. 99-104; Zarabozo, 2002, pp. 127-389.
[১৪] Larson, D. B., & Larson, S. S., 2003, Spirituality's potential relevance to physical and emotional health: A brief review of quantitative research, Journal of Psychology and Theology, 31(1), p. 38.
[১৫] Hummer, R. A., Rogers, R., Nam, C, & Ellison, C. G., 1999, Religious involvement and U.S. adult mortality, Demography, 36(2), pp. 277-283; Larson & Larson, 2003, p. 38.
[১৬] McCullough, M. E., Hoyt, W. T., Larson, D. B., Koenig, H. G., & Thoresen, C. E., 2000, Religious involvement and mortality: A meta-Analytic review, Health Psychology, 19(3), pp. 211-222; Larson & Larson, 2003, p. 38.
[১৭] Ibn Kathir, 2000 (Vol. 10), p. 179.