📄 আল্লাহর নৈকট্য অর্জন
'তাওয়াসসুল' শব্দের অর্থ 'অনুসন্ধানকৃত ও কাঙ্খিত বিষয়ের নৈকট্য অর্জন'。[২] এই শব্দটি 'আল-ওয়াসিল' (যে কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে) এবং 'আল-ওয়াসিলা' (যার মাধ্যমে কোনো কিছুর নৈকট্য অর্জন করা যায়) শব্দের কাছাকাছি অর্থ প্রদান করে。[৩] আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে কুরআনে এই ধারণার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
• 'হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য অন্বেষন কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৩৫)
ওলামায়ে কেরাম ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমই হলো তাঁর আনুগত্য ও তাঁর পছন্দনীয় আমল করা। কোনো কাজকে তখনই নেক কাজ ও আল্লাহর নিকট সন্তোষজনক বলে গ্রহণ করা হবে, যদি সেখানে দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করা হয়:
১. নিয়ত হতে হবে বিশুদ্ধ ও আন্তরিকভাবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য।
২. সেটি অবশ্যই কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক হতে হবে。[৪] যদি কোনো আমলে এই দুটি শর্ত পূরণ করা না হয় তাহলে সেগুলো আল্লাহর নিকট সন্তোষজনক নয় এবং কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।
তাওয়াসসুল সম্পর্কে শায়খ আলবানি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, তিনটি বিশেষ মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে যা কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে।
১। আল্লাহর উত্তম গুণবাচক নাম ও বৈশিষ্ট্য সমূহের মাধ্যমে।
২। ব্যক্তিগত নেক আমলের মাধ্যমে, এবং
৩। (জীবিত) নেক ব্যক্তির দুআর মাধ্যমে, তিনি উল্লেখ করেছেন, এর বাইরে অন্যান্য পদ্ধতির তাওয়াসসুল জায়েজ নয়。[৫]
আল্লাহ তাআলা, তাঁর অসীম রহমত অনুসারে এমন সব ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে, লাভ করতে পারে আত্মার পরিশুদ্ধি এবং মানসিক সুস্থতা ও প্রশান্তি। একমাত্র আল্লাহর নির্ধারিত পথের মাধ্যমেই উল্লেখিত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা সম্ভব, দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এটিই একমাত্র রাস্তা। অন্য সকল পদ্ধতি মিথ্যা ও নিরর্থক। যদি কেউ দাবি করে সে নতুন কোনো অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে যার মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব; তবে সে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন,
• '... আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম....' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আমি এমন কোনো নির্দেশনা প্রদান করতে বাকি রাখিনি যা তোমাদেরকে জান্নাতের নিকটবর্তী করবে আর এমন কোনো সর্তকতা প্রদান করতে বাকি রাখিনি যা তোমাদেরকে জাহান্নামের নিকটবর্তী করবে।' (আল-হাদ্দাদ ও আল-হাকিম, সনদ নির্ভরযোগ্য)。
ইসলামের মাধ্যমে পূর্বে নাজিলকৃত বিষয়ের সত্যায়ন করা হয়েছে ও পূর্ববর্তী বিধানসমূহ রহিত হয়ে গেছে। কেননা, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদানকৃত চূড়ান্ত মনোনীত দ্বীন। অন্য কোনো সিস্টেম বা জীবনবিধান ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামকে পরিবর্তন বা অপসারণ করা যাবে না। এই দাবির দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সকল নব আবিষ্কৃত বিষয় (বিদআত) প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। মানুষ দ্বীনের মধ্যে যত নতুন বিষয়ে প্রচলনের চেষ্টা করবে, সব বাতিল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমি তোমাদের মহান আল্লাহকে ভয় করতে অসীয়াত করছি, আর আনুগত্য দেখাতে অসীয়াত করছি; যদি কোনো গোলামও তোমাদের শাসক হয় তবুও। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতবিরোধ দেখবে; সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের পদ্ধতি মেনে চল, তা দাঁত দিয়ে (অর্থাৎ খুব শক্তভাবে) ধরে রাখ; আর নব উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সাবধান থাক, কারণ প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত বিষয় হচ্ছে বিদআত, প্রত্যেক বিদআত হচ্ছে গোমরাহী এবং প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম হচ্ছে জাহান্নামের আগুন।” (আবু দাউদ ও তিরমিযি)
স্ট্রেস, উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি নিরসনের জন্য দুনিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনো নির্দিষ্ট প্র্যাকটিস বা পদ্ধতি অনুসরণ করলেই সেটা সবচেয়ে উপকারী প্রমাণ হয়ে যায় না। হোক সেটা কোনো ইবাদাত মূলক কর্মকান্ড কিংবা 'স্বস্তি' পাবার অন্য কোনো পদ্ধতি কিংবা কোনো 'স্পিরিচুয়ালিটি' (আধ্যাত্মিকতা) উন্নয়ন প্রক্রিয়া। অনুসারীদের সংখ্যাধিক্য দ্বারা কিছুতেই প্রমাণ হয় না যে এগুলো মানবতার জন্য সবচেয়ে উপকারী পদ্ধতি। তবে হ্যাঁ, সেগুলোর মধ্যে কিছু দৈহিক, মানসিক বা জ্ঞানগত (কগনিটিভ) উপকারিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলো সীমাবদ্ধ এবং নির্দিষ্ট সীমার বাইরে উপকার পৌঁছাতে পারেনা।
যেমন ধরুন, মানসিক ভারাক্রান্ত কোনো ব্যক্তি একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসে হাত পা ছড়িয়ে দেহের বিভিন্ন পেশি 'রিলাক্স' করতে পারে, (প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন) এরপর সে অবশ্যই কিছুটা আরাম অনুভব করবে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি বনে জঙ্গলে হাঁটতে যেতে পারে অথবা মনে মনে কল্পনা করতে পারে সে একটি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতেও সে কিছুটা প্রশান্তিদায়ক অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এই উপকারগুলো অস্বীকার করছি না, এগুলো আল্লাহ তাআলার সেই অসীম রহমতের অংশবিশেষ যা তিনি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল বান্দাদের জন্যই দিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না এসব পদ্ধতি কৃত্রিম এবং আমাদের রূহের গভীরতম পর্যায়ে পৌঁছাতে অক্ষম। আর এসব পদ্ধতির মাধ্যমে কিছুতেই আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় না। বরং কিছু ক্ষেত্রে এগুলো ক্ষতিকর রূহের জন্য। কেউ 'প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন' বা নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্র পাঠ করে ধ্যান (মেডিটেশন) করার দ্বারা যদি মনে করে এসবের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করছে, তবে এ ধরনের আমল কিছুতেই আল্লাহ কবুল করবেন না। বরং এগুলো উক্ত ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আবার, কোনো ব্যক্তি যদি কবরের চারপাশে তাওয়াফ করে এবং মৃত ব্যক্তির কাছে দুআ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চায়, এ ধরনের কাজ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত, শিরকের পর্যায়ভুক্ত। যদি ঐ অবস্থায় উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়, তাহলে সে অনন্তকাল জাহান্নামী হবার ঝুঁকি নিল।
কোনো ব্যক্তির যে ধর্মেরই হোক না কেন, প্রার্থনার মাধ্যমে সে কিছু উপকারিতা লাভ করবে। নিঃসন্দেহে এই পদ্ধতির ব্যবহার মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই হয়ে আসছে।
আধ্যাত্মিক স্টাডির সাথে সম্পর্কিত হলেও, সুনির্দিষ্ট গবেষণার মাধ্যমে গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে প্রার্থনা একজন ব্যক্তিকে নানাভাবে উপকৃত করে। যারা নিয়মিত ইবাদাত-বন্দেগী করেন, তাদের জীবন অধিকতর নির্মল ও প্রশান্তিদায়ক। জীবনের বিভিন্ন ঘটনা তারা সহজে মেনে নিতে পারেন এবং তুলনামূলকভাবে কম বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপে ভোগেন। যারা বিভিন্ন রোগে কষ্টভোগ করছেন, তারা শুধুমাত্র রোগের সাথে মানিয়ে নেয়ার ব্যাপারেই না; বরং আরোগ্যেও ধর্মীয় প্রার্থনার উপকারিতা পেয়েছেন। কিন্তু এই প্রার্থনা আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতিতে করা না হলে উপকারিতা খুবই অল্প, আর যদি শিরকযুক্ত হয় তাহলে সেটা হয়ে যাবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।
যদি আধ্যাত্মিক ও আত্মিক চাহিদা পূরণ করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিই, তবে সেটা অর্জন করার একমাত্র উপায় হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত হিদায়াত অনুসরণ করা। জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সার্বিক ভাবে হিদায়াত অনুসরণের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি পরিপূর্ণ তৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করতে পারে। বাস্তবে দেখা যায়, প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিরা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় ইবাদাত বন্দেগীতে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেন না। এগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করেন, সিয়াম পালন করেন; কিন্তু একই সময়ে অন্যান্য গুনাহের কাজ করেন, যেমন- চুরি, প্রতারণা ইত্যাদি; তবে তার প্রশান্তি অর্জনের চেষ্টায় ঘাটতি ও ত্রুটি সৃষ্টি হবে। আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি কিছুতেই 'প্রশান্ত' হতে পারে না।
মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ইসলামি পদ্ধতি রয়েছে। যেমন- সালাত, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, সিয়াম, দান-সাদাকা, হজ্ব ও তাওবা ইস্তিগফার করা ইত্যাদি। এখানে স্মরণ রাখা জরুরি যে এসকল ইবাদাতের প্রধান উদ্দেশ্য বান্দার জীবনে সুখ অর্জন করা নয় বরং এটি গৌণ উদ্দেশ্য। প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা, তাঁর প্রশংসা ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করা।
সালাত (Ritual prayer)
মানসিক সুস্বাস্থ্য ও প্রশান্তি অর্জন ও লালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো সালাত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায় করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন নফল ও সুন্নাত নামাজ যেগুলো দিনের বিভিন্ন সময়ে পালনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলার সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগ আত্মায় পুষ্টি সরবরাহ করে। ফলে ক্রমেই এটি মানুষের চিন্তা-আবেগ-আচরণসহ অন্যান্য কার্যক্রমের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আল্লাহ বলেছেন,
• 'ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে.... (সূরাহ বাকারাহ ২,৪৫)
সালাতের মাধ্যমে বিভিন্ন গুনাহ ও শয়তানের কুপ্রভাব থেকেও সুরক্ষা লাভ করা যায়। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুজি দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।' (সূরাহ বাকারাহ, ২;৩-৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।' (সূরাহ আনকাবুত ২৯,৪৫)
সালাতের গুরুত্ব প্রদান করে কুরআনে বহু রেফারেন্স রয়েছে। কালিমার পরে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি সালাত। এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সালাত ত্যাগকারী ব্যক্তিকে কাফির গণ্য করা হয়, এটি অধিকাংশ আলিমদের মতামত। মানুষ তার জীবনে অসংখ্য বাধার মুখোমুখি হতে থাকবে, সেগুলোর মোকাবেলা করার একটি পদ্ধতি হিসেবে আল্লাহ তাআলা প্রদান করেছেন সালাত।
সালাত সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিইয়াহ লিখেছেন, 'সালাতের মাধ্যমে মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু এটা কেবল তাদের জন্য যারা সালাতকে উপযুক্ত হক সহকারে আদায় করে; পরিপূর্ণ বিনয়, খুশু-খুযু সহকারে মহামহিম আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হয়, নিজের অন্তরকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর অভিমুখে করে-এ ধরনের ব্যক্তিরা সালাত শেষে অন্তরে নূর লাভ করে। সে অনুভব করে যেন তার থেকে কোনো বোঝা নেমে গেছে। সালাতে এত সজীবতা, আরাম ও প্রশান্তি অনুভূত হয় যে, তার মনে হয় যদি এই সালাত কখনো শেষ না হতো! সালাত তার আনন্দের উৎস, বিনোদন, অন্তরের জান্নাত এবং দুনিয়াতে বিশ্রামের স্থান। তার কাছে মনে হয় সালাত শুরুর আগে যেন সে কোনো সংকীর্ণ কারাগারে বন্দি ছিল-এরপর সে সালাতের 'মধ্যে' প্রশান্তি লাভ করল, সালাত 'থেকে' নয়।'[৬]
দুআ হলো সেসব ব্যক্তিগত প্রার্থনা যা যেকোনো সময় করা যায়। দুআতে ব্যক্তি নিজের অভাব, অনুযোগ, চাহিদা ইত্যাদি আল্লাহর কাছে পেশ করেন। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের দুআয় উত্তর নেবেন। তিনি বলেছেন,
• 'আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৮৬)
সুরক্ষা ও নিরাময় লাভের জন্য দুআ খুবই উপকারী। বিভিন্ন ক্ষতিকারক বিষয় থেকে সুরক্ষার জন্য মুমিনদেরকে আল্লাহর অভিমুখী হতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। যেমন- দুঃখ, দুর্দশা, চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, পেরেশানি ও অন্যান্য নেতিবাচক অভিজ্ঞতাসমূহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে এই দুআ শিক্ষা প্রদান করেছেন, 'ইয়া আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকদের প্রাধান্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি।' (বুখারি)
তিনি আরো পড়তেন, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার দ্বীন ইসলাহ (পরিশুদ্ধ) করে দাও, যে দ্বীন আমার রক্ষাকবচ। তুমি সংশোধন করে দাও আমার দুনিয়াকে, যেথায় আমার জীবিকা রয়েছে। তুমি ইসলাহ (কল্যাণ কর) করে দাও আমার আখিরাতকে, যেখানে আমাকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তুমি আমার জীবনকে দীর্ঘায়িত করে দাও প্রত্যেকটি কল্যাণময় কাজের জন্য এবং তুমি আমার মৃত্যুকে আরামদায়ক বানিয়ে দাও সব কিছুর অনিষ্ট থেকে।' (মুসলিম)
তিনি প্রায়শই দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের ফিতনা থেকে পানাহ চাই, জাহান্নামের আজাব থেকে পানাহ চাই, কবরের ফিতনা, কবর আজাব ও ধন-সম্পদের ফিতনা এবং দারিদ্রের ফিতনার অনিষ্ট থেকে আপনার পানাহ চাই। আমি আপনার কাছে মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার অশুভ পরিণতি থেকে পানাহ চাই। হে আল্লাহ! আমার পাপরাশি বরফ ও ঠাণ্ডা পানি দারা ধুয়ে সাফ করে দিন। আমার ক্বলব পরিষ্কার করে দিন যেভাবে আপনি সাদা কাপড় ময়লা থেকে সাফ করে দেন। আমি ও আমার পাপরাশির মধ্যে ব্যবধান করে দিন যেমন আপনি পূর্ন ও পশ্চিমের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করেছেন। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অলসতা, বার্ধক্য, পাপ ও ধার-কর্জ থেকে পানাহ চাই।' (মুসলিম)
দুঃখ, উদ্বিগ্নতা, বিষণ্ণতা, পেরেশানি ও অন্যান্য সকল দুর্দশা থেকে মুক্তিলাভের কার্যকর পদ্ধতি হলো আল্লাহর কাছে দুআ করা। যদি সে দুআ অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত হয়, বিশুদ্ধ নিয়ত থাকে তবে দুআর বরকতে বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতা দূর হয়ে শান্তি ও আনন্দ লাভ হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হে আল্লাহ আমি তোমার বান্দা এবং তোমারই এক বান্দার পুত্র আর তোমারই এক বান্দীর পুত্র। আমার ভাগ্য তোমার হাতে, আমার উপর তোমার নির্দেশ সর্বদা কার্যকর। আমার প্রতি তোমার ফয়সালা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি সেই সমস্ত নামের প্রত্যেকটির বদৌলতে চাইছি যে নাম তুমি নিজের জন্য নিজে রেখেছ অথবা যে নাম তুমি তোমার কিতাবে অবতীর্ণ করেছ অথবা তোমার সৃষ্ট জীবের মধ্যে কাউকে শিখিয়েছ অথবা নিজের জন্য হিফাজত করে রেখেছ, তোমার নিকট এই কাতর প্রার্থনা করছি যে তুমি কুরআনকে বানিয়ে দাও আমার অন্তরের বসন্ত, আমার বক্ষের আলো, আমার চিন্তাভাবনা অপসারণকারী এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূরকারী।' (আহমাদ, তাবারানি, উত্তম সনদে বর্ণিত)
কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য জিকির
আল্লাহ্ বলেন,
• 'হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হিদায়াত ও রহমত মুসলমানদের জন্য।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:৫৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।' (সূরাহ আনফাল, ৮:২)
দেহ, মন ও আত্মায় আল্লাহর স্মরণ ও কুরআন তিলাওয়াতের একটি প্রশান্তিদায়ক প্রভাব রয়েছে। এই শান্তিদায়ক প্রভাবের মাধ্যমে মানসিক চাপ, উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা হ্রাস পায়। বিভিন্ন মানসিক ও আবেগিক যাতনা থেকে নিরাময় দিতে কুরআন তিলাওয়াতের নিজস্ব একটা শক্তি ও প্রভাব রয়েছে। অন্তরের অসুস্থতা সৃষ্টি হয় প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা (শাহওয়াত) ও সন্দেহ-সংশয় (শুবুহাত) থেকে। আর উভয়টির চিকিৎসা রয়েছে আল্লাহর স্মরণ ও কুরআন তিলাওয়াতের ভিতরে।
আল্লাহর স্মরণ (জিকির) সবচেয়ে সহজ ইবাদাত। এতে কোনো জটিলতা নেই কিন্তু এর উপকারিতা অত্যন্ত ব্যাপক। আল্লাহর স্মরণের মধ্যেই সর্বোত্তম প্রকার হলো কুরআন তিলাওয়াত। এ ছাড়াও স্মরণের নানান প্রকার রয়েছে। যেমন-আল্লাহর নাম ও গুণবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ স্মরণ করা, তাঁর প্রশংসা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করা। কেউ আল্লাহর অনুগ্রহগুলো স্মরণ করা ও বলার মাধ্যমেও তাঁকে স্মরণ করতে পারে। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।' (সূরাহ রাদ, ১৩:২৮)
সিয়াম
আল্লাহ বলেছেন,
• 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৮৩)
তাকওয়া অর্জনের অর্থ আল্লাহর ভয়, স্মরণ ও 'উপস্থিতি' সম্পর্কে সচেতন থাকা। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে—এ কথা স্মরণ রাখাও তাকওয়ার অন্তর্গত। তাকওয়াবান ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করতে অনিচ্ছুক, তিনি আল্লাহর অসন্তুষ্টি উদ্রেক করতে চান না। সিয়ামরত ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বৈধ খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, স্বামী/স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকেন। এভাবে অন্যান্য অবৈধ কাজ থেকেও বেঁচে থাকেন। সিয়াম গুনাহের ক্ষতি ও আল্লাহর সর্বব্যাপী উপস্থিতি সম্পর্কে ভাবায়। এই অনুভূতি গুনাহের সম্ভাব্যতা কমিয়ে দেয় এবং বাড়িয়ে দেয় তাকওয়া।
সিয়াম প্রবৃত্তির নিচু কামনা-বাসনা থেকে পরিশুদ্ধ হতে সাহায্য করে, যেমন- লোভ, লালসা, অপব্যয়, অপচয় ইত্যাদি। পরিশুদ্ধি অর্জিত হয় মূলত দুটি অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে: (এক) পাকস্থলী ও (দুই) লজ্জাস্থান। এই দুটি অঙ্গই অধঃপতনের কারণ; কেননা, শয়তান মানুষকে আক্রমণ করে এই দুই পথেই। অধিকাংশ মানুষ এই দুটি অংগের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই অন্যের হক নষ্ট করে, আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে এবং নিজেদের ক্ষতি করে। যদি মানুষ এই দুটোর নিয়ন্ত্রণ শিখে যায়, তবে সহজ হয়ে যায় অন্যান্য মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকা।
এভাবে সিয়াম আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্ম-শৃঙ্খলাবোধ বাড়ায়; ধূমপান, অতিভোজনের মতো বদভ্যাস ও মন্দ আচরণ নির্মূল করে। রাগ ও অন্যান্য নিন্দনীয় অনুভূতি নিয়ন্ত্রণেও সিয়াম সাহায্যকারী। ভরপেট আহারকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় রাগান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, আর রাগ হলো শয়তানের একটি প্রবেশপথ। ক্ষুধার্ত থাকার কারণে সিয়ামরত ব্যক্তির দৈহিক শক্তি কমে আসে। ফলে তুচ্ছ বিষয়ে রাগান্বিত হওয়া কিংবা রাগের তীব্রতা হ্রাস পায়।
অন্তরে প্রশান্তিদায়ক অনুভূতি, পরিতৃপ্তি, ইতিবাচক আশাবাদী মানসিকতা বৃদ্ধি করে সিয়াম। সিয়ামরত অবস্থায় ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের বিষয়টি অনুভব করতে পারে। ফলে নিজের ভেতর সে অনুভব করে শান্তি ও পরিতৃপ্তি। এ বিষয়টি সরাসরি আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ, যা তিনি তার অনুগত বান্দাদেরকেই দান করেন। এর দ্বারা একজন ব্যক্তি তার স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি থেকে মুক্তি পায়।
যাকাত
যাকাত হলো এক বিশেষ ধরনের দান, যা সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক। প্রতিবছর দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদেরকে নিজের নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ হতে শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত প্রদান করতে হয়। কুরআনে যাকাতের নির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করা হয়েছে। যাকাতের লক্ষ্য সম্পদের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, যেন সবাই শান্তি ও পরিতৃপ্তির সাথে বসবাস করতে পারে।
যাকাতের মাধ্যমে শুধু সম্পদের পরিশুদ্ধি নয় বরং ব্যক্তির আত্মিক পরিশুদ্ধিও অর্জিত হয়। 'যাকাত' শব্দটি এসেছে আরবি 'তাজকিয়া' শব্দ থেকে যার অর্থ 'পরিশুদ্ধি'। এ কারণে যাকাতকে কুরআনের বহু আয়াতে সালাতের পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। সালাত ও যাকাতের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়, যেমন- আমরা দেখতে পাই মানুষের আধ্যাত্মিক ব্যাধিসমূহের অন্যতম প্রধান কারণ হলো আল্লাহর প্রতি ভয় ও আশার অনুপস্থিতি, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্পর্ক না থাকা। এ সকল ব্যাধির প্রধান চিকিৎসা হলো সালাত।
এসব অসুস্থতার আরেকটি কারণ হলো যখন মানুষ আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছেড়ে দুনিয়াবী বস্তুগত ধন-সম্পদের পেছনে পড়ে থাকে। এই ব্যাধির চিকিৎসা যাকাত। [৭] এটি আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধি প্রদান করে বস্তুগত সম্পদের প্রতি আসক্তি থেকে। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা, কৃপণতা, লোভ-লালসা ইত্যাদি থেকে মুক্তি ঘটে। আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কিছু দান করার মাধ্যমে মুমিন নিজের অন্তরে অর্জন করে অনাবিল প্রশান্তি। যা তাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে দেয়। ব্যক্তির জীবনে শান্তি ও পরিতৃপ্তি এনে দেয় এই অপার্থিব নৈকট্য।
হজ্ব
হজ্ব একটি বাধ্যতামূলক ইবাদাত, যা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর অন্তত জীবনে একবার পালন করা আবশ্যক। হজ্বের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ তথা কাবা ও মক্কা জিয়ারত করা, সেখানে নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান পালন করা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
• 'এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের 'কল্যাণের স্থান' পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়।...' (সূরাহ হাজ্জ, ২২:২৭-২৮)
এই আয়াতে যে কল্যাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা অনির্দিষ্ট ও ব্যাপকভাবে উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ হজ্ব পালনকারী ব্যক্তি নানাবিধ ও অগণিত উপকারিতা লাভ করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আত্মিক পরিশুদ্ধি, চারিত্রিক উৎকর্ষতা, গুনাহ থেকে মুক্তি, আল্লাহর নৈকট্য লাভ ইত্যাদি। [৮]
তাওবা
ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মানবিয় ভুলত্রুটিকে অপ্রত্যাশিত ধরা হয় না। ভুলত্রুটি হতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক, এটি আমাদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য। এ কারণে তাওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। যারা আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং গুনাহের পুনরাবৃত্তি থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেছেন,
• 'বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না; (সূরাহ যুমার, ৩৯:৫৩-৫৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর এবং (গুনাহর জন্যে) তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আমি নিজে প্রত্যহ একশো বার তাওবা করি।' (মুসলিম)
তাওবার মূল বিষয়বস্তু হলো গুনাহ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করা ও ভুলত্রুটি সংশোধন করে নিজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সচেষ্ট হওয়া। আরবি শব্দ 'তাওবা' এসেছে শব্দমূল 'তাবা' থেকে, যার অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। অর্থাৎ, আল্লাহর নিষেধকৃত কাজ থেকে আদেশকৃত কাজের দিকে ফিরে আসা。[১] মানুষের ফিতরাত (সহজাত ধর্ম) জন্মের সময় বিশুদ্ধ ও কলঙ্কমুক্ত থাকে। সেই অবস্থায় সবার অন্তর আল্লাহর প্রতিই সমর্পিত থাকে। কিন্তু গুনাহের কারণে মানুষ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তাওবা করার মাধ্যমে গুনাহ থেকে ফিরে এসে আবার সঠিক রাস্তায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।
আল্লাহ তাআলা তাকদীরে নির্ধারণ করেছেন যে, মানুষ তার সহজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে ভুলত্রুটি বা গুনাহ করে ফেলবে। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি থাকার এটি একটি সহজাত পরিণতি। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির কারণে ব্যক্তি তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য। ফলে সে দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি বা পুরস্কার লাভ করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে গুনাহের প্রতি আসক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। এভাবে তিনি তাঁর রহমত ও ক্ষমার মহান গুণটি আমাদের সামনে তুলে ধরেন。[১০] রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'সেই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের তুলে নিয়ে যেতেন এবং তোমাদের জায়গায় এমন এক জাতিকে আনতেন, যারা গুনাহ করত, এরপর আল্লাহর কাছে মাফ চাইত, অতঃপর আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতেন।' (মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম প্রজ্ঞা অনুসারে সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ যখন মাখলুক সৃষ্টি করলেন, তখন তা তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করলেন এবং আপন সত্তা সম্পর্কে লিখলেন, যা তাঁর কাছে আরশের উপর সংরক্ষিত আছে, 'আমার গজবের উপর আমার রহমতের প্রাধান্য রয়েছে।' (বুখারি ও মুসলিম)
ভুলত্রুটি হয়ে গেলে যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তার স্বীয় করুণার হস্ত রাতে সম্প্রসারিত করেন যেন দিবসের অপরাধী তার প্রতি ধাবিত হয়ে তাওবা করে। অনুরুপভাবে দিবসে তিনি তার স্বীয় হস্ত সম্প্রসারিত করেন যেন রাতের অপরাধী তার প্রতি ধাবিত হয় ও তার- নিকট তাওবা করে। এমনিভাবে প্রতিনিয়ত চলতে থাকবে পশ্চিম দিগন্ত থেকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত।' (মুসলিম)
গুনাহের পুনরাবৃত্তি, মাত্রা, সংখ্যা নির্বিশেষে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকবার বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন, যদি সে আন্তরিকভাবে তাওবা করে। এখানে মূল ধর্তব্য বিষয় হলো আন্তরিকতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, 'এক বান্দা গুনাহ করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দাও। তারপর আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে, তার একজন প্রতিপালক আছে যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং শুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। এ কথা বলার পর সে পূনরায় গুনাহ করল এবং বলল, হে আমার মনিব! আমার গুনাহ মাফ করে দাও। এরপর আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার এক বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে, তার একজন প্রতিপালক আছে যিনি গুনাহ মাফ করেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। তারপর সে আবারও গুনাহ করে বলল, হে আমার রব! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দাও। একথা শুনে আল্লাহ তাআলা আবারও বলেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জানে যে তার একজন মালিক আছে, যিনি বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, হে বান্দা! এখন যা ইচ্ছা তুমি আমল কর। আমি তোমার গুনাহ মাফে করে দিয়েছি।' (মুসলিম)
আনাস রা. বর্ণনা করেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমার কাছে দুআ করবে এবং আমার কাছে প্রত্যাশা করতে থাকবে, ততক্ষণ আমি তোমার গুনাহ-খাতাহ মাফ করতে থাকব। সেক্ষেত্রে তোমার গুনাহর পরিমাণ যত বেশি কিংবা যত বড়োই হোক না কেন। এ ব্যাপারে আমি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করবনা। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আকাশ পর্যন্ত ছুঁয়ে যায় আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, তবে আমি তোমায় ক্ষমা করে দেব; এ ব্যপারে আমি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি আমার কাছে পৃথিবী সমান গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হও আর আমার সঙ্গে কাউকে শরীক না করো, তাহলে আমিও ঠিক পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে যাব।' (তিরমিযি)
তাওবার বেশ কয়েকটি উপাদান রয়েছে। তাওবা গ্রহণযোগ্য ও বৈধ হওয়ার জন্য এই শর্তগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে:
১। অবিলম্বে গুনাহ পরিত্যাগ করা,
২। একমাত্র আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
৩। সংঘটিত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া,
৪। ভবিষ্যতে গুনাহ পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ,
৫। মানুষের হক নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করা (উপযুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে)。
তাওবা করার জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। যেকোনো ব্যক্তি সরাসরি একমাত্র আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। চাইলে সে তাওবার উদ্দেশ্যে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে পারে। এরপর সে আল্লাহর কাছে গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নেবে।
তাওবা সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে অনেক দুআ বর্ণিত আছে। তবে সবচেয়ে উত্তম দুআটি সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, 'সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার' বা সর্বোত্তম ক্ষমা প্রার্থনা হলো, বান্দা বলবে, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার পরোয়ারদিগার। তুমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই; তুমি আমায় সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা। আমি সাধ্যমতো তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর। আমি যা কিছু করেছি তার মন্দ প্রভাব থেকে বাঁচার জন্যে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি যেসব নিয়ামত আমাদের দান করেছ তার স্বীকৃতি প্রদান করছি। আমি আমার সকল অন্যায় ও অপরাধ স্বীকার করছি। অতএব, তুমি আমায় মার্জনা করো। কেননা, তুমি ছাড়া অপরাধ মার্জনা করার ক্ষমতা আর কারো নেই।'
(এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন), 'কোনো ব্যক্তি পূর্ণ প্রত্যয় সহকারে দিনের বেলা এই দুআ পাঠ করে যদি সন্ধ্যার পূর্বেই মারা যায় তবে সে জান্নাতবাসী হবে। আর কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস সহকারে রাতের বেলা এই দু'আ পাঠ করে সকাল হওয়ার পূর্বেই মারা যায়, তবে সেও জান্নাতে যাবে।' (বুখারি)
• আল্লাহ বলেন, 'তারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৫)
জেনে বুঝে গুনাহ চালিয়ে যেতে থাকলে আন্তরিক তাওবা কার্যকর হয় না। একদিকে গুনাহে লিপ্ত থাকা, আরেক দিকে জিহ্বার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করা নিঃসন্দেহে আন্তরিকতা নয়। গুনাহ পরিত্যাগ করার সাথে অন্তরে অনুতপ্ত ও অনুশোচনাবোধ থাকতে হবে। যারা সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হয়, তাদের ভবিষ্যতে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি যখন গুনাহ করে তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর সে তাওবা করলে, পাপকাজ ত্যাগ করলে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার কলব পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে আরও গুনাহ করলে সেই কালো দাগ বেড়ে যায়। এই সেই মরিচা যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন, 'কক্ষনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে জং (মরিচা) ধরিয়েছে।' (সূরাহ আল-মুতাফফিফীন: ১৪)。 (তিরমিযি, আহমাদ)
তাওবা এমন একটি ইবাদাত, যার দ্বারা মানুষ শান্তি ও মুক্তি লাভ করে। ভুল বুঝতে পারা এবং এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে অর্জিত হয় আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরিশুদ্ধি। গুনাহ, নিজের কামনা-বাসনা ও শয়তানের উপর বিজয় অর্জন করার মাধ্যম হলো তাওবা। উল্লেখিত হাদিসে এসেছে, যারা তাওবা করে তাদের অন্তর পবিত্র হয়, দূষণমুক্ত হয়, মরিচা দূর হয়ে যায়। আত্মিক পরিশুদ্ধি তথা অন্তর এবং নফসের বিশুদ্ধতা অর্জনের অন্যতম প্রধান উপায় তাওবা করা। তাওবার ধাপগুলো অনুসরণের মাধ্যমে একদিকে যেভাবে গুনাহের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তেমনিভাবে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষণ্ণতা সৃষ্টিকারী উপাদান থেকেও কার্যকরভাবে মুক্তি ঘটে।
তাওবাকারী এমনভাবে পবিত্রতা অর্জন করে যেন সে কখনো গুনাহ করেইনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে গুনাহ থেকে তাওবা করল সে যেন কখনো গুনাহ করেনি।' (ইবনু মাজাহ, বিশুদ্ধ হাদিস)। এর দৃষ্টান্ত একটি বোর্ডে কিছু লেখার পর মুছে দেয়ার মতো। তখন আগের লেখার কোনো চিহ্ন বা ছাপ থাকে না। আর যারা তাওবা করেনা, তাদের অন্তর এমনভাবে মরিচাপূর্ণ হয় যেন বোর্ডটি নানা রকমের আঁকিবুকিতে হিজিবিজি হয়ে আছে।
প্রকৃত তাওবার মাধ্যমে পূর্বের গুনাহ মাফের সাথে সাথে আরেকটি বিরাট পুরস্কার দেয়া হয়। গুনাহের কাজগুলোকে নেকির কাজে বদলে দেওয়া হয়! আল্লাহ বলেছেন,
• 'কিন্তু যারা তাওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরাহ ফুরকান, ২৫:৭০)
আলেমদের মতে, গুনাহকে নেকিতে বদলে দেওয়ার অর্থ উক্ত ব্যক্তির নেতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যে বদলে দেওয়া অথবা বিচার দিবসে গুনাহকে নেকি দ্বারা প্রতিস্থাপন করে দেয়া।
তাওবার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পায়, কেননা সে আল্লাহর রহমত, ক্ষমা এবং বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। যখন মানুষ আল্লাহর দিকে বিনয় ও ভক্তি সহকারে ফিরে আসে, তখন পূর্বের তুলনায় অধিক তাকওয়াবান হয়。[১১] তাওবার মাধ্যমে বান্দার তাওহিদে বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটে। একমাত্র আল্লাহই গুনাহ মাফ করতে পারেন এটি জানা ও মানার মাধ্যমে বান্দা ফুটিয়ে তুলে আল্লাহর প্রতি একত্ববাদী ইবাদাতের সারনির্যাস। এটি একটি জরুরি বিষয়; কেননা সত্যিকারের তাওবা একমাত্র আল্লাহর জন্যই হতে হবে। অন্তরে এই খেয়াল রাখতে হবে যে, আল্লাহ বাদে কেউ তার গুনাহ মাফ করতে পারবে না। এই মৌলিক বিষয়ের উপস্থিতি ছাড়া তাওবা কবুল হবে না।
যারা তাঁর দিকে ফিরে আসে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। যে ব্যক্তি তাওবার ধাপগুলো অনুসরণ করল, সে মূলত নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করল। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদাত করা। এই ধরনের তাওবা আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দনীয়। তিনি বলেছেন。
• '... নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২২২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন, যার উট গভীর মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার পর আবার ফিরে পায়।' (বুখারি ও মুসলিম)。 তাওবার পর গুনাহের গ্লানি, বিবেকের দংশন ও লজ্জা থেকে মুক্তি মিললে বুঝতে হবে আল্লাহ তাওবা কবুল করেছেন。
টিকাঃ
[১] Ibn Taymiyyah, 1999, p. 121.
[2] al-Albaanee, M. N., 1995, Tawassul - Seeking a Means of Nearness to Allah: Its Types and Its Rulings, Birmingham, U.K: Al-Hidaayah Publishing and Distribution, p. 2.
[৩] Ibid., p. 2.
[৪] Ibid., p. 7.
[e] lbid., p. 38.
[৬] al-Jawziyyah, 2000, p. 27.
[۹] Zarabozo, 2002, p. 224.
[৮] Ibid., p. 252.
[১] Philips, A.Α.Β., 1990, Salvation through Repentance (An Islamic View), Riyadh, Saudi Arabia: International Islamic Publishing House, p. 1.
[১০] Ibid., p. 3.
[১১] Ibid., p. 4.
📄 আল্লাহর উপর ভরসা করা
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা বিশুদ্ধ তাওহিদের নিদর্শন ও মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ মুমিনদেরকে উৎসাহিত করেছেন তার উপর ভরসা করতে। তিনি বলেছেন,
• '... যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন।' (সূরাহ তালাক, ৬৫:৩)
• অন্যত্র বলেছেন, '... অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তাআলা র উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
• অন্যত্র বলেছেন, '... এবং মুমিনদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:১১)
পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের অর্থ নিজের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাপনা গ্রহণের সাথে যুগপৎভাবে আল্লাহর রহমত ও দয়ার উপর ভরসা করা。 শরিয়াহর মূলনীতি অনুসারে, তাওহিদের উপর ঈমান পরিপূর্ণ করতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই সেইসব 'আসবাব' (উপায়-উপকরণ) ব্যবহার করতে হবে, যার মাধ্যমে সে নিজের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, এটাই তাকদীরের বিধান। আসবাব ব্যবহারে অবহেলা করলে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করা হয় না। আসবাব বর্জন করা আল্লাহর জ্ঞান, বিজ্ঞতা ও নির্দেশের পরিপন্থী; যদিওবা আসবাব পরিত্যাগকারী ব্যক্তি ভিন্নমত পোষণ করুক না কেন। উপায় উপকরণ ব্যবহার করা আল্লাহর উপর ভরসার শক্তিশালী নিদর্শন, সেগুলো উপেক্ষা করা অসহায়ত্বের নিদর্শন। একজন মুমিন বা উম্মতের বৈশিষ্ট্যের সাথে এটি মানানসই নয়。
📄 গভীর চিন্তা ও পর্যালোচনা
কোনো কিছু গভীরভাবে চিন্তা করা, বোঝা ও পর্যালোচনা করার ক্ষমতা মানুষকে দেয়া আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত সমূহের অন্যতম। এই গুণের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই খুঁজে পায় আল্লাহর একত্ব ও তুলনাহীনতার সত্যতা, যা তার মনে আল্লাহর ইবাদাতের ঐকান্তিক ইচ্ছা জাগায়। মানুষকে শয়তানের ফাঁদ ও নিরর্থক কাজের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করতে পারে এই বোধশক্তি। এর মাধ্যমে তারা আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হতে অনুপ্রাণিত হন। ফলে সম্ভব হয় আত্মিক শান্তি ও পরিতৃপ্তি অর্জন এবং 'ভালো থাকতে' পারা।
মৃত্যু, মৃত্যু পরবর্তী কবরের জীবন, বিচার দিবস ও আখিরাত সম্পর্কে নিয়মিত ভিত্তিতে গভীর চিন্তাভাবনা করতে মুমিনদের বারবার উৎসাহিত করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমরা (দুনিয়ার) স্বাদ-আহলাদ নিঃশেষকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। (বুখারি)。
এসব চিন্তার মাধ্যমে ব্যক্তির মনে পড়ে, এই দুনিয়াতে সে চিরকাল থাকবে না বরং তাকে অন্য জীবনে প্রবেশ করতে হবে। ফলে পরবর্তী জীবন ও বিচার দিবসের জন্য উত্তম আমল এবং গুনাহ পরিত্যাগে উৎসাহী হয়।
মৃত্যুচিন্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত আরেকটি উপলব্ধি হলো দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করা। এই দুনিয়া কেবল অল্প সময়ের জন্য। এর আনন্দ ক্ষণস্থায়ী ও এটি নানা ধরণের মনোযোগ হরণকারী উপাদানে পরিপূর্ণ। আল্লাহ বলেন,
• 'পার্থিব জীবন ক্রীড়া ও কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরকালের আবাস পরহেযগারদের জন্যে শ্রেষ্টতর। তোমরা কি বুঝ না?' (সূরাহ আনয়াম, ৬:৩২)
• 'তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা বর্ণনা করুন। তা পানির ন্যায়, যা আমি আকাশ থেকে নাজিল করি। অতঃপর এর সংমিশ্রণে শ্যামল সবুজ ভূমিজ লতা-পাতা নির্গত হয়; অতঃপর তা এমন শুস্ক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাসে উড়ে যায়। আল্লাহ এ সবকিছুর উপর শক্তিমান। ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ আপনার পালনকর্তার কাছে প্রতিদান প্রাপ্তি ও আশা লাভের জন্যে উত্তম।' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:৪৫-৪৬)
গভীর চিন্তার মাধ্যমে মুমিন উপলব্ধি করতে পারে এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। তাই সে দুনিয়া থেকে সম্পর্ক ছেদ করে। কেবল যতটুকু প্রয়োজন, দুনিয়ার সাথে ততটুকুই সংযোগ রাখে। [১২] আরেকটি সুনির্দিষ্ট ধ্যান হলো আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করা। এটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে,
• 'নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্যে। যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুম জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচাও।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯০-১৯১)
সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা ও ধ্যানের মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। তাঁর শক্তি ও কুদরতের প্রতি মুগ্ধ হয়ে নত হয়ে যায় ভক্তিতে। অসংখ্য নিয়ামতের পরিচয় আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা বাড়িয়ে দেয়। সবকিছুর জন্য আমরা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল—এটি বোঝা সহজ হয় এবং দমে যায় বড়াই-অহংকারের প্রবণতা।
আত্মার পরিশুদ্ধি ও প্রশান্তি অর্জনের অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে কৃতজ্ঞতাবোধ, নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, উপকারী ও বিশুদ্ধ ইলম অর্জন, মসজিদে সালাত আদায়, নেককার সঙ্গীসাথী ও জীবনসঙ্গী লাভ, ঈমান বিশুদ্ধ করা, নফল ইবাদাত বন্দেগী ও উত্তম আমল করা। [১৩] বাস্তবে ইসলামে কেবল আল্লাহর খাতিরে শরীয়াহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে করা সকল কাজের দ্বারা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হতে থাকে।
এই প্রসঙ্গে একটি চমকপ্রদ গবেষণার কথা উল্লেখ করছি। গবেষণায় দেখা গেছে যারা ধর্মের প্রতি অধিক নিবেদিতপ্রাণ, তারা অন্যদের তুলনায় দীর্ঘায়ু লাভ করেন। বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে পরিচালিত এক স্টাডিতে দেখা গেছে, ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণের কারণে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়। এই স্টাডি পরিচালনা করার সময় অংশগ্রহণকারীদের অবস্থা নিয়মিত বিরতিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। [১৪] ২১০০০ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে নিয়ে এই স্টাডি পরিচালিত হয়েছে দীর্ঘ ৯ বছর যাবত। গবেষকরা দেখেছেন, যারা সপ্তাহে একবারের বেশি ধর্মীয় উপাসনা করেন, তারা গড়ে অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিদের তুলনায় ৭ বছর অধিক আয়ু পেয়েছেন, আর আফ্রিকান-আমেরিকানরা ১৪ বছর অধিক আয়ু পেয়েছেন। যারা কখনো ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ করেননি, তারা অন্যান্যদের তুলনায় শতকরা ৫০ ভাগ অধিক মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন। এখানে ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রভাব সুস্পষ্ট; এগুলোকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য বা জীবনযাপনের সাথে যুক্ত করার অবকাশ নেই。[১৫]
মোট ১,২৬,০০০ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে পরিচালিত ৪২ টি স্টাডির বিশ্লেষণে (মেটা-এনালাইসিস) উঠে এসেছে, ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ফলে আয়ুষ্কাল ২৯% বৃদ্ধি পায়。[১৬] যদিও এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে অমুসলিম জনসাধারণের মধ্যে, তবুও আমরা বলতে পারি (তাদের আপেক্ষিক দ্বীনদারীতার কারণে) আল্লাহ তাআলা কিছু দুনিয়াবী উপকারিতা প্রদান করেছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কুরআনে একটি আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে। নুহ (আ.) তাঁর জাতির লোকেদেরকে আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণের দাওয়াত দিয়ে বলেছিলেন,
• 'সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সতর্ককারী। এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ তাআলা তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং *নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ* দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা র নির্দিষ্টকাল যখন হবে, তখন অবকাশ দেয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে! (সূরাহ নুহ, ৭১:২-৪)
'নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ' প্রদান করবেন এই অংশটি আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। ইবনে কাসির (রহ.) এই অংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'এর অর্থ তিনি তোমাদের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ আসতে পারত সেগুলো থেকে সুরক্ষা প্রদান করবেন। আর যদি তোমরা তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত না হতে তবে সেগুলো থেকে অবকাশ পেতে না।' আল্লাহর আনুগত্য ও দ্বীনদারীতার মাধ্যমে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়, এই মর্মে উক্ত আয়াতটি একটি উত্তম দলিল。[১৭]
টিকাঃ
[১২] Zarabozo, 2002, p. 338.
[১৩] Farid, 1993, pp. 99-104; Zarabozo, 2002, pp. 127-389.
[১৪] Larson, D. B., & Larson, S. S., 2003, Spirituality's potential relevance to physical and emotional health: A brief review of quantitative research, Journal of Psychology and Theology, 31(1), p. 38.
[১৫] Hummer, R. A., Rogers, R., Nam, C, & Ellison, C. G., 1999, Religious involvement and U.S. adult mortality, Demography, 36(2), pp. 277-283; Larson & Larson, 2003, p. 38.
[১৬] McCullough, M. E., Hoyt, W. T., Larson, D. B., Koenig, H. G., & Thoresen, C. E., 2000, Religious involvement and mortality: A meta-Analytic review, Health Psychology, 19(3), pp. 211-222; Larson & Larson, 2003, p. 38.
[১৭] Ibn Kathir, 2000 (Vol. 10), p. 179.