📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 রুকাইয়া

📄 রুকাইয়া


আমরা আগেই জেনেছি, রুকইয়া একটি ইসলামি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে যথাযথ ক্রমানুসারে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও দুআ পাঠের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাময়ের প্রচেষ্টা করা হয়। নিঃসন্দেহে আল্লাহই একমাত্র সুস্থতা দানকারী। রুকইয়া কার্যকর হবার জন্য শুরুতে সঠিক সমস্যা চিহ্নিত করা জরুরি। কেননা, সমস্যার ভিত্তিতে তিলাওয়াতকৃত আয়াত ও দুআর তারতম্য ঘটে। যেমন বলা যায়, জাদুটোনার চিকিৎসা বদনজর ও জিনে আছরের চিকিৎসা থেকে ভিন্ন। আধ্যাত্মিক বা গায়েবী সমস্যাসমূহ নিরাময়ের জন্য শুধুমাত্র রুকইয়াই যথেষ্ট। আর অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে মেডিকেল ট্রিটমেন্ট এর পাশাপাশি রুকইয়া ব্যবহার করা যায়। এই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (রাকী) প্রয়োজন, এবং তার তাকওয়া যত উন্নত পর্যায়ের হবে রুকইয়া কার্যকর হবার সম্ভাব্যতা তত বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবে যদি কোনো ব্যক্তি নিজেই নিজের রুকইয়া করতে পারেন সেটাই সর্বোত্তম; কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তির অসুস্থতা ও পরিস্থিতির তীব্রতা অনুসারে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে।
আল-ক্রেনাবী এবং গ্রাহাম (Al-Krenawi and Graham) মন্তব্য করেছেন যে, আরব ক্লায়েন্টরা প্রায়ই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পাশাপাশি প্রথাগত (ধর্মীয়) নিরাময় পদ্ধতি যুগপৎভাবে গ্রহণ করেন। সাধারণত প্রথাগত (ধর্মীয়) নিরাময় পদ্ধতিই গ্রহণ করা হয় আগে, এরপর আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেয়া হয়। এসব প্রক্রিয়াতে পরিবারের সদস্যরাও অন্তর্ভূক্ত থাকেন এবং তারা ক্লায়েন্টকে উপযুক্ত সেবা বেছে নিতে সাহায্য করেন। লেখকদ্বয় মন্তব্য করেছেন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনুসারে ক্লায়েন্টকে সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রথাগত (ধর্মীয়) নিরাময় পদ্ধতিকে যুক্ত করতে হবে。[২০]
সৌদি আরবে ধর্মীয় চিকিৎসকদের (রাকী) মধ্যে পরিচালিত একটি স্টাডিতে দেখা গেছে বদনজর, জাদুটোনা এবং জিনে আছরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে চিকিৎসা বাতলে দেওয়া হয়েছে সেটা হলো রুকইয়া। অন্যান্য বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি সমূহের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত সালাত আদায়ের নির্দেশনা প্রদান; জিন তাড়ানো, রূপক দৈহিক শাস্তি প্রদান ও শ্বাস আটকানোর ভান করা, দম দেয়া (জিনে আছরের ক্ষেত্রে), ভেষজ উপাদান মিশ্রিত পানি পান করানো, কুরআনের আয়াত লিখিত পানি পান করানো (বিশেষত জাদুটোনার ক্ষেত্রে) ইত্যাদি。[১১]
মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য হাদিসে বিভিন্ন দুআ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হে আল্লাহ! আমি তোমারই বান্দা এবং তোমারই এক বান্দার পুত্র আর তোমারই এক বান্দীর পুত্র। আমার ভাগ্য তোমার হাতে, আমার উপর তোমার নির্দেশ সর্বদা কার্যকর। আমার প্রতি তোমার ফয়সালা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি সেই সমস্ত নামের প্রত্যেকটির বদৌলতে চাইছি যে নাম তুমি নিজের জন্য নিজে রেখেছ অথবা যে নাম তুমি তোমার কিতাবে অবতীর্ণ করেছ অথবা তোমার সৃষ্ট জীবের মধ্যে কাউকে নাম শিখিয়েছ অথবা নিজের জন্য হিফাজত করে রেখেছ, আমি তোমার নিকট এই কাতর প্রার্থনা করি যে তুমি কুরআনকে বানিয়ে দাও আমার অন্তরের জন্যে। প্রশান্তি, বক্ষের আলো, আমার চিন্তা ভাবনা অপসারণকারী এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূরকারী। (আহমাদ, তাবারানি, উত্তম সনদে বর্ণিত)
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) কষ্টের সময় বলতেন,
لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মা'বুদ নেই, যিনি সুমহান ও সহিষ্ণু। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই, যিনি সুবৃহৎ আরশের প্রতিপালক। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই, যিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও সন্মানিত আরশের অধিপতি।' (বুখারি ও মুসলিম)
আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দুআ করতে শুনেছেন, 'ইয়া আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকদের প্রাধান্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি।' (বুখারি)
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান যুগে ঈমানি দুর্বলতার কারণে লোকেরা শরিয়ত সম্মত চিকিৎসাপদ্ধতি বর্জন করেছে এবং নানা ধরনের মেডিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতির উপরই কেবল নির্ভর করছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এসব পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশাও সৃষ্টি হয়। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু উপকার লাভ হলেও তাওহিদের দাবি হলো, সর্বদা এই বিশ্বাস অন্তরে রাখা যে নিরাময় একমাত্র আল্লাহই করে থাকেন, যে পদ্ধতি অনুসরণ করেই নিরাময় করা হোক না কেন। যদি বলা হয় অমুক ঔষধের মধ্যে নিরাময় আছে বা অমুক চিকিৎসক নিরাময় করেছেন, তাহলে এটা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্য ঈমান খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, অথচ বিষয়টি আমরা ভুলে গেছি! যখন ঈমান বিশুদ্ধ ও মজবুত হবে, তখন রুকইয়া করলে আল্লাহর রহমত ও ইচ্ছা অনুসারে নিরাময় লাভ হবে দ্রুত ও মজবুতভাবে。

টিকাঃ
[२०] al-Krenawi, A., & Graham, J. R., 2000, Culturally sensitive social work practice with Arab clients in mental health settings, Health & Social Work, 25(1), p. 18.
[১১] al-Habeeb, 2004.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00