📄 ধর্মপরায়ণতা ও মানসিক সুস্থতা
ধার্মিকতা/আধ্যাত্মিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আগ্রহের এক মহাবিস্ফোরণ দেখা গেছে। অধিকাংশ গবেষণায় এসেছে যে, এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক গবেষণায় এসেছে, যারা অধিক ধর্মপ্রাণ ও আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন তারা অন্যদের তুলনায় ভালো মানসিক ও দৈহিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হন। পাঁচশোর বেশি স্টাডিতে ধর্ম/আধ্যাত্মিকতা এবং মানসিক সুস্বাস্থ্য ও 'ভালো থাকা'র মধ্যে লক্ষণীয় ইতিবাচক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, তুলনামূলক বিষণ্ণতায় কম আক্রান্ত হওয়া, দ্রুত বিষণ্ণতা থেকে সেরে উঠা, কম উদ্বিগ্নতা, কম আত্মহত্যার হার ও মাদকদ্রব্য ও ড্রাগস অপব্যবহারের কম হার, এগুলো রয়েছে। 'ভালো থাকা' বলতে অন্যদের তুলনায় অধিক আশাবাদী মানসিকতা, ইতিবাচক চিন্তা, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, সুখী ও স্থিতিশীল বৈবাহিক জীবন, উন্নত সামাজিক সমর্থন লাভ ইত্যাদি বিষয়কে বোঝায়। [১৬]
যদিও এসব গবেষণার অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন পশ্চিমা খ্রিষ্টান; তবে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন স্টাডির সাম্প্রতিক লিটারেচার রিভিউ হতে জানা যায় যে, ধার্মিকতা/আধ্যাত্মিকতা মুসলিমদেরও মানসিক স্বাস্থ্যের উপকার পৌঁছায়। [১৭] বেশ কিছু সূচকের (ভ্যারিয়েবল) মাধ্যমে এখানে উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়েছে; যেমন: অধিকতর সুখী জীবন, 'ভালো থাকা', জীবনে পরিতৃপ্তি, ইতিবাচক ও আশাবাদী মানসিকতা। নেতিবাচক বিষয়ের মধ্যে সূচক হিসেবে দেখা হয়েছে কম বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, মৃত্যুভয়, অসামাজিক ব্যবহার ও আত্মহত্যার হার। সারকথা হলো, যে সকল মুসলিমরা ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন এবং দীন পালন করেন তারা অন্যদের তুলনায় অধিকতর সুখী ও সুস্থ।
যেমন বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে, যারা আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন এবং একজন প্রেমময়, যত্নবান, সাহায্যকারী ও নির্ভরযোগ্য সত্তা হিসেবে আল্লাহকে অনুভব করেন; তারা অন্যদের তুলনায় কম নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ অনুভব করেন। তারা অন্যদের তুলনায় জীবনের বিভিন্ন ধকলপূর্ণ (স্ট্রেস) পরিস্থিতিতে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন, যেমন- সাধারণ অসুস্থতা থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যন্ত যেকোনো স্ট্রেস। তাদের মধ্যে ড্রাগসের অপব্যবহার কম।
যত বেশি ধর্ম ও মানসিক সুস্থতার মধ্যে সম্পৃক্ততা আবিষ্কৃত হচ্ছে ততো বেশি মানুষ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন; শুধুমাত্র রোগ নিরাময়ের জন্যেই নয় বরং মানসিক অসুস্থতা প্রতিরোধক হিসেবেও ধর্মকে দেখছেন তারা। ইসলামি দৃষ্টিকোণ মতে, এই বুঝটাই মানব স্বভাব এবং জীবনে সফলতার মৌলিক বিষয়। কেউ যত বেশি আল্লাহর নিকটবর্তী হবে, সে তত বেশি সৎকর্মশীল হবে, এবং নিজের অস্তিত্বকে মর্যাদার স্থানে নিয়ে যাবে।
যেসব সমাজে নানা ধরনের সামাজিক ব্যাধি ও আধ্যাত্মিকতার ঘাটতি দেখা যায় সেখানে এই দুটোর সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা কুরআনে এসব সমাজের 'শিফা' (নিরাময়) দিয়ে রেখেছেন, যা সকলের জন্যই সহজলভ্য। এমনকি যারা বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন, তারাও আল্লাহর রহমতের উপর সুধারণা পোষণ করে তওবার মাধ্যমে তাঁর দিকে ফিরে আসতে পারেন এবং নিরাময়ের জন্য তাঁর উপর ভরসা করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে হিদায়াতের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন কারণ হিদায়াতের মাধ্যমেই সত্যসন্ধানী ব্যক্তি সত্য ও রূহের প্রয়োজনীয় খোরাক লাভ করেন, তিনি বলেছেন,
• 'যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎ পথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথ ভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।' (সূরাহ ইসরা, ১৭:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমি আপনার প্রতি সত্য ধর্মসহ কিতাব নাজিল করেছি মানুষের কল্যাণকল্পে। অতঃপর যে সৎপথে আসে, সে নিজের কল্যাণের জন্যেই আসে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজেরই অনিষ্টের জন্যে পথভ্রষ্ট হয়। আপনি তাদের জন্যে দায়ী নন।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৪১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'বলে দাও, হে মানবকুল, সত্য তোমাদের কাছে পৌঁছে গেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে। এমন যে কেউ পথে আসে সেপথ প্রাপ্ত হয় স্বীয় মঙ্গলের জন্য। আর যে বিভ্রান্ত ঘুরতে থাকে, সে স্বীয় অমঙ্গলের জন্য বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকবে। অনন্তর আমি তোমাদের উপর অধিকারী নই।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:১০৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত আলোর মাঝে রয়েছে। (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়) যাদের অন্তর আল্লাহ স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্যে দূর্ভোগ। তারা সুস্পষ্ঠ গোমরাহীতে রয়েছে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:২২)
টিকাঃ
[১৬] Koenig, H. G., McCullough, M. E., & Larson, D. B., 2001, Handbook of Religion and Health, Oxford: Oxford University Press, pp. 97-203. Koenig, H. G., 2008, Medicine, Religion, and Health: Where Science and Spirituality Meet, West Conshohocken, PA: Templeton Foundation Press, pp. 68-81.
[১৭] Utz and Oman, forthcoming [2011].