📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মানসিক অসুস্থতার সংজ্ঞায়ন

📄 মানসিক অসুস্থতার সংজ্ঞায়ন


বিষাদ মানুষের একটি সহজাত অভিজ্ঞতা। এটি সুখ ও আনন্দের বিপরীত অনুভূতি। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিষাদগ্রস্ততার আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে কাফিরদের কথা ভেবে বিষাদগ্রস্ত হতে নিষেধ করেছেন,
• 'আর যারা কুফরের দিকে ধাবিত হচ্ছে তারা যেন তোমাদিগকে চিন্তান্বিত করে না তোলে। তারা আল্লাহ তাআলার কোন কিছুই অনিষ্ট সাধন করতে পারবে না। আখেরাতে তাদেরকে কোন কল্যাণ দান না করাই আল্লাহর ইচ্ছা। বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৭৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তারা বিশ্বাস করে না বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্মঘাতী হবেন।' (সূরা শুয়ারা, ২৬:৩)
নবি ইয়াকুব (আ.) পুত্র ইউসুফ (আ.) এর বিরহে বিমর্ষ হয়েছিলেন; যদিও তিনি সবর করেছেন, আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন এবং চেষ্টা করেছেন নিজের দুঃখ লুকানোর।
• 'এবং তাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন, হায় আফসোস ইউসুফের জন্যে। এবং দুঃখে তাঁর চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেল। এবং অসহনীয় মনস্তাপে তিনি ছিলেন ক্লিষ্ট।' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৪)
তিনি নিজের দুঃখ বা অসন্তুষ্টি কারো কাছে প্রকাশ করেননি, অভিযোগ করেননি। যদিও তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে তার অন্যান্য পুত্ররা ইউসুফের অন্তর্ধান রহস্যের সাথে জড়িত।
যারা আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণ করে তারা কোনো ভীতি বা উদ্বিগ্নতা অনুভব করবে না। এটি আল্লাহর ওয়াদা। শেষ বিচারের দিনে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে,
• 'আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩৮)
জীবনে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির কারণে আমরা সকলেই কমবেশি দুঃখ-দুর্দশা অনুভব করি। তবে এগুলো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়না। অপরদিকে 'ডিপ্রেশন' সাধারণ দুঃখ- দুর্দশাবোধ থেকে ভিন্ন। এটি তীব্রতর এবং দীর্ঘস্থায়ী, এমনকি একপর্যায়ে এটি ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) হতে পারে। ডিপ্রেশনের আরবি শব্দ ইকতি'আব, এর শব্দমূল 'কা'ইবা' (كلبة); অর্থাৎ হতাশা, দুর্বলচিত্ত, নিরাশা বা দুঃখ。[১] এটি গভীর দুঃখ এবং শোক-কে বোঝায়। ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহের মধ্যে রয়েছে: হতাশাগ্রস্থ মেজাজ, আনন্দদায়ক কাজে অনাগ্রহ, নিজেকে অযোগ্য মনে করা, অপরাধবোধ, মনোযোগ হ্রাস, ক্ষুধামন্দা ও ওজনের পরিবর্তন (বৃদ্ধি বা হ্রাস), ঘুমের পরিবর্তন (অনিদ্রা অথবা অতিনিদ্রা) এবং আত্মহত্যার ভাবনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (WHO) অনুসারে সারাবিশ্বে অক্ষমতার (disability) প্রধান কারণ ডিপ্রেশন এবং পৃথিবীব্যাপী রোগব্যাধির প্রভাবক হিসেবে এর স্থান চতুর্থ। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে এটি বিশ্বব্যাপী রোগব্যাধির দ্বিতীয় প্রভাবকে পরিণত হবে। বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ১২১ মিলিয়ন মানুষ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন, শতকরা হিসেবে পৃথিবীর জনসংখ্যার ১০% নারী ও ৬% পুরুষ এতে আক্রান্ত। উদ্বেগজনিত অসুস্থতার (anxiety disorder) বৈশিষ্ট্যগুলো হলো দুর্দশাগ্রস্ত হওয়া, লাগাতার অস্থিরতা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা অথবা দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্বেগের হ্রাস ঘটানোর চেষ্টা ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি যেসব 'অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার' দেখা যায় সেগুলো হলো,
১। জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার: সবসময় দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগের মধ্যে থাকা, খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা করা, হাত পা কাঁপতে থাকা, পেশীতে টান টান ভাব, উৎকণ্ঠা ও অনিদ্রা।
২। প্যানিক ডিসঅর্ডার: প্যানিক অ্যাটাক (হঠাৎ ভীত হয়ে পড়া), হঠাৎ করে ঘাবড়ে যাওয়া, অল্প সময়ব্যাপী তীব্র আতঙ্কিত থাকা; এর লক্ষণ সমূহ মধ্যে রয়েছে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট অনুভব করা, শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম, হাত-পা কম্পন ও ঝিমুনি ভাব। এসব উপসর্গকে অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য দৈহিক রোগ বলে মনে হতে পারে।
৩। আতংক (ফোবিয়া): নির্দিষ্ট বস্তু, কাজ বা পরিস্থিতি কেন্দ্র করে অহেতুক আতঙ্ক অনুভব করা। যেমন- উচ্চতা, রক্ত, পশুপাখি, সুরঙ্গ বা উড়োজাহাজে আরোহন করার প্রতি ভীতি।
৪। শুচিবায়ুগ্রস্ততা (ওসিডি- অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার): কোনো বিষয়ে উদ্বেগ হ্রাস করার জন্য বারবার অর্থহীনভাবে কোনো আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটানো। সবচেয়ে বেশি যে 'ওসিডি' দেখা যায় সেটা হলো শুচিবায়ুগ্রস্ততা, অর্থাৎ রোগ-জীবানু ও ময়লা আবর্জনা থেকে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে বারবার হাত ধুতে থাকা, বার বার গোসল করা বা দাঁত ব্রাশ করা ইত্যাদি。[৩]
মানসিক চাপ বোঝাতে কুরআনে ব্যবহৃত আরেকটি শব্দ হলো 'দাকাত' (ضاقت)। এর অর্থ কোনো কিছু দ্বারা সংকীর্ণ, সরু, অপ্রশস্ত ও আবদ্ধ হওয়া। অন্যান্য অর্থের মধ্যে রয়েছে দুঃখিত, অস্থির, হতাশাগ্রস্ত, বা মনমরা হওয়া। উল্লেখিত শব্দের বিশেষ্য রুপ 'দীক' (ضيق) এর মাধ্যমে বোঝায় সংকীর্ণতা, কাঠিন্য বা আবদ্ধতা; অন্যান্য অর্থ হলো যন্ত্রণা, হতাশা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি。[৪]
যে ব্যক্তি বিষণ্ণ বা অবসাদগ্রস্ত তিনি সবকিছুতে সংকীর্ণতা ও আবদ্ধতা অনুভব করেন। তার মনে হয় যেন চতুর্দিক থেকে পৃথিবী গুটিয়ে আসছে। এই পরিভাষাটি কুরআনে সেই তিন সাহাবির ঘটনা বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) সাথে তাবুকের যুদ্ধে শরিক হতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই তিনজন হলেন কাব ইবনু মালিক, হিলাল ইবনু উমাইয়া এবং মুরারা ইবনু আর-রাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। সেই ঘটনা বিবৃত করে আল্লাহ বলেছেন,
• 'এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই-অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাশীল।' (সূরাহ তাওবা, ৯:১১৮)
যারা তাবুকের যুদ্ধে যোগদান না করে পিছনে পড়েছিলেন, শুরুতে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের অজুহাত কবুল করেননি। সকল মুসলিমরা তাদেরকে পঞ্চাশ দিন ও পঞ্চাশ রাতের জন্য বয়কট করেন। কাব ইবনু মালিক (রা.) পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেছেন, 'আমি আমার ঘরের ছাদের উপর পঞ্চাশতম রাতের ফজরের সালাত আদায় করলাম। এরপর আমি ঐ অবস্থায় বসেছিলাম, যার ব্যাপারে আল্লাহ (কুরআনে) উল্লেখ করেছেন, আমার মন ক্ষুদ্র হয়ে গেছে এবং ধরিত্রী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্যে তা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। (বুখারি ও মুসলিম)
এরপর আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করেছেন এবং তারা অন্তরের সংকীর্ণ দশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল হুনাইনের যুদ্ধে। সেদিন মুসলিমরা গর্ব অনুভব করছিলেন তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে। তাদের সংখ্যাধিক্য কোনো কাজে আসেনি। তারা যুদ্ধের ময়দানে সংকীর্ণতা অনুভব করলেন ও পিছু হটলেন সেখান থেকে। আল্লাহ বলেছেন,
• 'আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৫)
আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর রাসূলের কাছে সাহায্য প্রেরণ করলেন, এরপর তারা বিজয়ী হতে পেরেছিলেন。[e]
সংকীর্ণতা অনুভবের বিষয়টি অন্তর ও বক্ষদেশের অবস্থা বর্ণনা করতেও কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
• 'অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন।' (সূরা আনয়াম, ৬:১২৫)
যারা আল্লাহর দ্বীন নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে তাদের সম্পর্কে তাঁর রাসূলের কাছে তিনি বলেছেন,
• 'আমি জানি যে আপনি তাদের কথাবর্তায় হতোদ্যম হয়ে পড়েন।' (সূরাহ হিজর, ১৫:৯৭)
যখন ফেরেশতারা জনপদ ধ্বংস করতে এসেছিলেন, তখন নবি লুত (আ.) অন্তরে সংকীর্ণতা অনুভব করেছিলেন, আল্লাহ বলেছেন,
• 'যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের কারণে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়লেন এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করবই আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংস প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে।' (সূরাহ আনকাবুত, ২৯:৩৩)

টিকাঃ
[১] Wehr, 1974, p. 807.
[২] Wehr, 1974, p. 807.
(c) Myers, 2007, pp. 649-652.
(*) Wehr, 1974, pp. 548-549.
[e] Ibn Kathir, 2000, Vol. 4, pp. 397-400.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আত্মহত্যতা

📄 আত্মহত্যতা


বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। এই সংখ্যার সাথে অতিরিক্ত তাদেরকেও বিবেচনা করতে হবে যাদের আত্মহত্যার প্রচেষ্টা সফল হয়নি, প্রত্যেকটি মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে থাকে অতিরিক্ত ১২ থেকে ২৫ টি আত্মহত্যার প্রচেষ্টা। আত্মহত্যার ঝুঁকি ও প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—বিষণ্ণতা ও অন্যান্য মানসিক অসুস্থতা, মাদকদ্রব্য সেবন, এ ধরণের অসুস্থতার পারিবারিক ইতিহাস, আত্মহত্যার পারিবারিক ইতিহাস, নিপীড়িত হওয়া বা মানসিক আঘাতের ইতিহাস ইত্যাদি। ৯০ শতাংশের বেশি আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে প্রথম দুইটি রিস্ক ফ্যাক্টর এর যেকোনো একটি দেখতে পাওয়া যায়। [৬]
আত্মহত্যা থেকে সুরক্ষাদায়ী প্রভাবকের মধ্যে রয়েছে মানসিক রোগ ও মাদকসেবনজনিত (substance abuse disorder) অসুস্থতার যথাযথ যত্ন নেয়া, মজবুত পারিবারিক সম্পর্ক; সামাজিক সহায়তা বা সমর্থন, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস যা আত্মহত্যাকে নিরুৎসাহিত করে এবং আত্ম-পরিচর্যাকে গুরুত্ব দেয়। [৭] আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষাদায়ী প্রভাবক হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ। গবেষকরা দেখেছেন, মুসলিম ভূমিগুলোতে আত্মহত্যার হার অনেক কম। [৮] মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্যই ধর্ম ও ধর্মীয় বিষয়ে সম্পৃক্ততা একটি সুরক্ষাদায়ী প্রভাবক। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে: ধর্মে রয়েছে বেঁচে থাকার মৌলিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান, যা আত্মহত্যার হার কমিয়ে দেয়। [৯] যেমন মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে (কুরআন ও হাদিস) আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কঠিন হুকুম এসেছে। এক্ষেত্রে আত্মহত্যাকারীদের প্রতি চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি ঘোষণা একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। [১০]
নবি (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ দুঃখ দৈন্যে নিপতিত হওয়ার কারনে যেন মৃত্যু কামনা না করে। যদি এমন একটা কিছু করতেই হয়, তা হলে সে যেন বলেঃ হে আল্লাহ! আমাকে জীবিত রাখ, যতদিন পর্যন্ত আমার জন্য জীবিত থাকা কল্যানকর হয় এবং আমাকে মৃত্যু দাও, যখন আমার জন্য মৃত্যু কল্যানকর হয়।' (বুখারি)
'আর তোমাদের মদ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা সে ভালো লোক হলে (বেশি বয়স পাওয়ার দরুন) তার নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে মন্দ লোক হলে সে লজ্জিত হয়ে তাওবা করার সুযোগ লাভ করতে পারবে।' (বুখারি)
নবি (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে, চিরদিন সে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে অনুরূপভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে ব্যক্তি লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের মধ্যে সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তার দ্বারা নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।' (বুখারি)
এই হাদিসের ব্যাখায় আল-খাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন, এই হাদিসে উল্লেখিত শাস্তি শুধুমাত্র তাদের জন্যই প্রযোজ্য হবে, যারা সুস্থ মন মানসিকতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মহত্যা করেছে। আর যারা মারাত্মকভাবে বিষাদগ্রস্থ বা অন্যান্য মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ছিল, তাদেরকে এর জন্য দায়ী নাও করা হতে পারে, বিষয়টি নির্ভর করবে তাদের অসুস্থতার মাত্রার ওপর। [১১] তাদের বিষয়ে বিচারের দিনে আল্লাহ তাআলাই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং তাদেরকে উপযুক্ত গন্তব্যে প্রেরণ করবেন। এ কারণে এমনটা বলা যায়না যে, সব আত্মহত্যাকারীই জাহান্নামী হবে。

টিকাঃ
[৬] Suicide Resource Prevention Center, Risk and Protective Factors for Suicide, retrieved February 2, 2010 from http://www.sprc.org/library/srisk.pdf.
[৭] Ibid.
[৮] Mohyuddin, F., 2008, Suicide in the Muslim world, International Journal of Child Health and Human Development, 1(3), pp. 273-279.
[৯] Dervic, K., Oquendo, M. A., Grunebaum, M. F., Ellis, S., Burke, A. K., & Mann, J. J., 2004, Religious affiliation and suicide attempt, American Journal of Psychiatry, 161(12), pp. 2303-2308.
[১০] Mohyuddin, 2008, pp. 273-279.
[১১] al-Khater, A., 2001, Grief and Depression from an Islamic Perspective, London: Al-Firdous Ltd, pp. 26-27.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মানসিক অসুস্থতার কারণসমূহ

📄 মানসিক অসুস্থতার কারণসমূহ


আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহে মানসিক অসুস্থতার বিভিন্ন কারণ প্রস্তাব করা হয়েছে, যেমন- দৈহিক সমস্যা (জেনেটিক বা মস্তিষ্কে নিউরো কেমিক্যাল ভারসাম্যহীনতা), শিক্ষণ অভিজ্ঞতার সমস্যা, জীবনের মানসিক চাপের নানা ঘটনা, বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা ইত্যাদি।
যেমন ধরুন, বিষণ্ণতার 'সোশাল-কগনিটিভ মডেল' এর অন্যতম উপাদানসমূহ হলো-
১। নেতিবাচক, মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনাসমূহ যা স্বাভাবিক জীবনে বিঘ্ন ঘটায়
২। একটি স্মৃতিরোমন্থনমূলক, হতাশাবাদী ব্যাখা দাঁড় করানো যার ফলে,
৩। একটি নৈরাশ্যবাদী, বিষাদগ্রস্ত অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং
৪। ব্যক্তির চিন্তা ও কাজকে বাধাগ্রস্ত করে, এরপর এগুলো অন্যান্য নেতিবাচক অভিজ্ঞতা উস্কে দেয় যেমন- 'নিজেকে গুটিয়ে নেয়া'। কিছু সমালোচক মন্তব্য করেছেন, বিষণ্ণতার সাথে এগুলো ঘটনাচক্রে মিলে যেতে পারে, তবে এগুলো থেকেই বিষণ্ণতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা নাও হতে পারে。[১২]
আলোচ্য বিষয়গুলোর প্রভাব ইসলামে স্বীকৃত। কিছু মানসিক অসুস্থতা পুরোপুরি দৈহিক সমস্যার কারণে হতে পারে। জীবনের বিভিন্ন ঘটনাও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতা ও আত্মিক মৃত্যুর উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বস্তুত বর্তমান যুগের অধিকাংশ মানসিক অসুস্থতার শেকড় এখানেই প্রোথিত। মানবাত্মা আধ্যাত্মিক প্রয়োজন পূরণের জন্য মরিয়া হয়ে আকুতি জানাচ্ছে, কিন্তু সেই ডাকে কোনো সাড়া প্রদান করা হচ্ছে না-এর অর্থ این নয় যে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের সবাই নৈতিকভাবে দেউলিয়া; বরং এই কথার অর্থ হলো আল্লাহ থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হলে মানসিক অসুস্থতার সম্ভাব্যতা অনেক বেড়ে যায়। যেমন, যে ব্যক্তির ঈমান দুর্বল, জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলোর তাৎপর্য-ব্যাখ্যা বুঝতে তাকে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়। সহজেই জিন শয়তানের কবলে পড়ার সম্ভাবনা তার বেশি। আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রভাব কুরআনে এভাবে এসেছে,
• 'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:১২৪)
যারা ঈমান আনতে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা দুর্দশাগ্রস্ত জীবন কাটাবে। এই আয়াতের সাথে মানব জীবনের অনেক কঠিন পরিস্থিতিকে সংযুক্ত করা যায়, যেমন- বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, দুঃখ-দুর্দশা ও জীবনের মানসিক ধকল। নফসের দুর্বলতা ও খেয়ালখুশির কাছে পরাস্ত হয়ে আরো বৃদ্ধি পায় তাদের দুর্দশা। অবিশ্বাসের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ছেড়ে দেন। এমনকি একপর্যায়ে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করার চিন্তা শুরু করে। শেষমেশ তাদের চূড়ান্ত ঠিকানা হয় জাহান্নাম।
ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'দুনিয়াতে তার জীবন কঠিন হয়ে যাবে। নিজের পথভ্রষ্টতার কারণে সে অন্তরে কোনো প্রশান্তি, প্রশস্ততা অনুভব করবে না। বরং অনুভব করবে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্য। যদিওবা বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাকে দেখে প্রশান্ত মনে হয়; সে উত্তম পোষাক পরিধান করে, উন্নত খাদ্য গ্রহণ করে, নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করে, তবুও কিছুতেই সুখ পায় না। কেননা, তার অন্তরে বিশুদ্ধ ইয়াকিন ও হিদায়াত নেই। সে সবসময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, পথভ্রষ্টতা ও সন্দেহ-সংশয়ে পতিত থাকে। সব সময় দ্বিধাগ্রস্থ ও অনিশ্চিত থাকে। এগুলোই (আয়াতে উল্লেখিত সংকীর্ণ জীবন ও) দুর্দশার অংশ。[১৩]
যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকে ও ভ্রান্ত জীবনাচরণ অনুসরণ করে, তাদের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। তাদের অন্তরে সীলমোহর করে দেয়া হয়। ফলে সেখানে একটি স্থায়ী শূন্যতা এবং আধ্যাত্মিক অপূর্ণতা বিরাজ করে। যারা আল্লাহর উপর ঈমান ব্যতীত জীবনযাপন করে, তারা নিজেদের প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলা কে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আত্ন বিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য।' (সূরাহ হাশর, ৫৯:১৯)
• অন্যত্র বলেছেন, তিনি আরও বলেছেন, 'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:১২৪)
ঈমানী দুর্বলতার এই বিষয়টিই প্রকাশ পেতে পারে মানসিক কোনো অসুস্থতা বা দুর্দশার মাধ্যমে। সামনের আয়াতে তাদের এই দুর্দশার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে,
• 'সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেনঃ এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:১২৫-১২৬)
ঈমানী দুর্বলতার আরেকটি দিক হলো, কোনো কিছুকে আল্লাহ তাআলার থেকেও বেশি ভালোবাসা। যারা কোনো কিছুকে আল্লাহর থেকেও বেশি ভালোবাসে তাদের পরিণতি সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম (রহ.) লিখেছেন:
'এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহর সুন্নাহ (রীতি) হলো, তিনি তাদের ভালোবাসার বস্তু ও সংশ্লিষ্ট বিষয়কে আক্ষেপ ও দুঃখের উৎসে পরিণত করে দেন। যারা নিজেদের খেয়ালখুশিকে আল্লাহর চেয়েও বেশি ভালোবাসে এবং মানুষের কাছ থেকে আল্লাহ তাআলার চেয়েও বেশি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কামনা করে। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাকদিরে নির্ধারণ করেছেন যদি কেউ কোনো কিছুকে আল্লাহর চেয়েও বেশি ভালোবাসে তবে সে ঐ বিষয়ের দ্বারাই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। যদি কেউ কোনো কিছুকে আল্লাহর চেয়েও বেশি ভয় করে, তবে সে ঐ বিষয়ের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে। যে আল্লাহকে বর্জন করে অন্যকিছুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ব সেটা তার আফসোস ও দুঃখের কারণ হবে। যে অন্যকে আল্লাহর থেকে প্রাধান্য দেবে, সেখানে কোনো বরকত থাকবে না। আর যে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কোনো সৃষ্টিকে খুশি করার চেষ্টা করবে সে নিঃসন্দেহে নিজের উপর আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও গযব ডেকে আনবে。[১৪]
ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে অদেখা ভুবন (গায়েব) এর বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত, যেমন জিনদের জগত। মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতার করলে জিন ও শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হয়। জাদুটোনা, হিংসা ও আছর করার মাধ্যমে জিন নানা ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন- দুঃখ-দুর্দশা, বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
• 'মানুষ উন্নতি কামনায় ক্লান্ত হয় না; যদি তাকে অমঙ্গল স্পর্শ করে, তবে সে সম্পূর্ণ রূপে নিরাশ হয়ে পড়ে।' (সূরাহ ফুসসিলাত, ৪১:৪৯)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। শয়তানরাই মানুষকে সৎপথে বাধা দান করে, আর মানুষ মনে করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে।' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৩৬-৩৭)
এই সহচর শয়তান যে আমাদের মানসিক সুস্থতার ক্ষতি করতে পারে, তা নিয়ে আমরা শয়তান ও জিনের অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। এই বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও। সৌদি আরবের ধর্মীয় চিকিৎসকরা (রাকী) জানিয়েছেন যে বদ নজর, জাদুটোনা বা জিন আছরের কারণে যেসব উপসর্গগুলো বেশি দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা রকম মানসিক সমস্যা; যেমন- উদ্বিগ্নতা, ঘোরাচ্ছন্ন অবস্থা (অবসেশন) এবং রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হবার আতংক। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে অনিদ্রা, হতাশাবাদী চিন্তা, বিদ্বেষ ও ঝগড়াঝাটি (প্রধানত স্বামী-স্ত্রী বা সতীনদের মধ্যে), বিবাহবিচ্ছেদ, অস্থিরতা, খিঁচুনি, মানসিক অশান্তি, বিভ্রম (altered consciousness), অস্বাভাবিক নড়াচড়া ও নানাবিধ দৈহিক সমস্যা。[১৫]

টিকাঃ
[১২] Myers, 2007, pp. 668-669.
[১৩] Ibn Kathir, 2000, Vol. 6, p. 406.
[১৪] Al-Jawziyyah, 2000, p. 6.
[১৫] al-Habeeb, T. A., 2004, Pilot study of faith healers' views on the evil eye, jinn possession, and magic in Saudi Arabia, retrieved March 3, 2010 from http://www.daarussalaam.com/A-STRARAGIES/A15mass/09PilotStudy.pdf.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ধর্মপরায়ণতা ও মানসিক সুস্থতা

📄 ধর্মপরায়ণতা ও মানসিক সুস্থতা


ধার্মিকতা/আধ্যাত্মিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আগ্রহের এক মহাবিস্ফোরণ দেখা গেছে। অধিকাংশ গবেষণায় এসেছে যে, এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক গবেষণায় এসেছে, যারা অধিক ধর্মপ্রাণ ও আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন তারা অন্যদের তুলনায় ভালো মানসিক ও দৈহিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হন। পাঁচশোর বেশি স্টাডিতে ধর্ম/আধ্যাত্মিকতা এবং মানসিক সুস্বাস্থ্য ও 'ভালো থাকা'র মধ্যে লক্ষণীয় ইতিবাচক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, তুলনামূলক বিষণ্ণতায় কম আক্রান্ত হওয়া, দ্রুত বিষণ্ণতা থেকে সেরে উঠা, কম উদ্বিগ্নতা, কম আত্মহত্যার হার ও মাদকদ্রব্য ও ড্রাগস অপব্যবহারের কম হার, এগুলো রয়েছে। 'ভালো থাকা' বলতে অন্যদের তুলনায় অধিক আশাবাদী মানসিকতা, ইতিবাচক চিন্তা, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, সুখী ও স্থিতিশীল বৈবাহিক জীবন, উন্নত সামাজিক সমর্থন লাভ ইত্যাদি বিষয়কে বোঝায়। [১৬]
যদিও এসব গবেষণার অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন পশ্চিমা খ্রিষ্টান; তবে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন স্টাডির সাম্প্রতিক লিটারেচার রিভিউ হতে জানা যায় যে, ধার্মিকতা/আধ্যাত্মিকতা মুসলিমদেরও মানসিক স্বাস্থ্যের উপকার পৌঁছায়। [১৭] বেশ কিছু সূচকের (ভ্যারিয়েবল) মাধ্যমে এখানে উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়েছে; যেমন: অধিকতর সুখী জীবন, 'ভালো থাকা', জীবনে পরিতৃপ্তি, ইতিবাচক ও আশাবাদী মানসিকতা। নেতিবাচক বিষয়ের মধ্যে সূচক হিসেবে দেখা হয়েছে কম বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, মৃত্যুভয়, অসামাজিক ব্যবহার ও আত্মহত্যার হার। সারকথা হলো, যে সকল মুসলিমরা ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন এবং দীন পালন করেন তারা অন্যদের তুলনায় অধিকতর সুখী ও সুস্থ।
যেমন বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে, যারা আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন এবং একজন প্রেমময়, যত্নবান, সাহায্যকারী ও নির্ভরযোগ্য সত্তা হিসেবে আল্লাহকে অনুভব করেন; তারা অন্যদের তুলনায় কম নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ অনুভব করেন। তারা অন্যদের তুলনায় জীবনের বিভিন্ন ধকলপূর্ণ (স্ট্রেস) পরিস্থিতিতে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন, যেমন- সাধারণ অসুস্থতা থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যন্ত যেকোনো স্ট্রেস। তাদের মধ্যে ড্রাগসের অপব্যবহার কম।
যত বেশি ধর্ম ও মানসিক সুস্থতার মধ্যে সম্পৃক্ততা আবিষ্কৃত হচ্ছে ততো বেশি মানুষ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন; শুধুমাত্র রোগ নিরাময়ের জন্যেই নয় বরং মানসিক অসুস্থতা প্রতিরোধক হিসেবেও ধর্মকে দেখছেন তারা। ইসলামি দৃষ্টিকোণ মতে, এই বুঝটাই মানব স্বভাব এবং জীবনে সফলতার মৌলিক বিষয়। কেউ যত বেশি আল্লাহর নিকটবর্তী হবে, সে তত বেশি সৎকর্মশীল হবে, এবং নিজের অস্তিত্বকে মর্যাদার স্থানে নিয়ে যাবে।
যেসব সমাজে নানা ধরনের সামাজিক ব্যাধি ও আধ্যাত্মিকতার ঘাটতি দেখা যায় সেখানে এই দুটোর সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা কুরআনে এসব সমাজের 'শিফা' (নিরাময়) দিয়ে রেখেছেন, যা সকলের জন্যই সহজলভ্য। এমনকি যারা বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন, তারাও আল্লাহর রহমতের উপর সুধারণা পোষণ করে তওবার মাধ্যমে তাঁর দিকে ফিরে আসতে পারেন এবং নিরাময়ের জন্য তাঁর উপর ভরসা করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে হিদায়াতের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন কারণ হিদায়াতের মাধ্যমেই সত্যসন্ধানী ব্যক্তি সত্য ও রূহের প্রয়োজনীয় খোরাক লাভ করেন, তিনি বলেছেন,
• 'যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎ পথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথ ভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।' (সূরাহ ইসরা, ১৭:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমি আপনার প্রতি সত্য ধর্মসহ কিতাব নাজিল করেছি মানুষের কল্যাণকল্পে। অতঃপর যে সৎপথে আসে, সে নিজের কল্যাণের জন্যেই আসে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজেরই অনিষ্টের জন্যে পথভ্রষ্ট হয়। আপনি তাদের জন্যে দায়ী নন।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৪১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'বলে দাও, হে মানবকুল, সত্য তোমাদের কাছে পৌঁছে গেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে। এমন যে কেউ পথে আসে সেপথ প্রাপ্ত হয় স্বীয় মঙ্গলের জন্য। আর যে বিভ্রান্ত ঘুরতে থাকে, সে স্বীয় অমঙ্গলের জন্য বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকবে। অনন্তর আমি তোমাদের উপর অধিকারী নই।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:১০৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত আলোর মাঝে রয়েছে। (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়) যাদের অন্তর আল্লাহ স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্যে দূর্ভোগ। তারা সুস্পষ্ঠ গোমরাহীতে রয়েছে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:২২)

টিকাঃ
[১৬] Koenig, H. G., McCullough, M. E., & Larson, D. B., 2001, Handbook of Religion and Health, Oxford: Oxford University Press, pp. 97-203. Koenig, H. G., 2008, Medicine, Religion, and Health: Where Science and Spirituality Meet, West Conshohocken, PA: Templeton Foundation Press, pp. 68-81.
[১৭] Utz and Oman, forthcoming [2011].

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00