📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 শয়তানের ওয়াসওয়াসা

📄 শয়তানের ওয়াসওয়াসা


শয়তান মানুষকে যতভাবে প্রভাবিত করে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে অন্তরে ওয়াসওয়াসা প্রদানের মাধ্যমে চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতিকে প্রভাবিত করা। এই ওয়াসওয়াসার মাধ্যমেই আদম (আ.) কে দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করিয়েছিল শয়তান। আল্লাহ বলেছেন,
• 'অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রনা দিল, বলল, হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা?' (সূরাহ ত্বহা, ২০:১২০)
এখানে লক্ষ্য করা জরুরি, ওয়াসওয়াসা নফসের কুমন্ত্রণা থেকেও হতে পারে যদি নফস মন্দ কাজের দিকে ঝুঁকে থাকে। মন্দ মানুষরাও কুমন্ত্রণা দিতে পারে। তবে শয়তান মানুষকে দ্বিধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করে বিভিন্ন সন্দেহ-সংশয়, ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টির মাধ্যমে। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
• 'আমি আপনার পূর্বে যে সমস্ত রাসূল ও নবি প্রেরণ করেছি, তারা যখনই কিছু কল্পনা করেছে, তখনই শয়তান তাদের কল্পনায় কিছু মিশ্রণ করে দিয়েছে। অতঃপর আল্লাহ দূর করে দেন শয়তান যা মিশ্রণ করে। এরপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সু-প্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ জ্ঞানময়, প্রজ্ঞাময়। এ কারণে যে, শয়তান যা মিশ্রণ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করে দেন, তাদের জন্যে, যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং যারা পাষাণহৃদয়। গোনাহগাররা দূরবর্তী বিরোধিতায় লিপ্ত আছে। এবং এ কারণেও যে, যাদেরকে জ্ঞানদান করা হয়েছে; তারা যেন জানে যে এটা আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে সত্য; অতঃপর তারা যেন এতে বিশ্বাস স্তাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন এর প্রতি বিজয়ী হয়। আল্লাহই বিশ্বাস স্থাপনকারীকে সরল পথ প্রদর্শন করেন।' (সূরা হজ, ২২:৫২-৫৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনদেরকে এ ধরনের সন্দেহ থেকে সাবধান করে বলেছেন, 'শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলে, 'এটা কে সৃষ্টি করেছে, ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এভাবে এক সময় প্রশ্ন করে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন এই পর্যন্ত ঠেকবে, তখন তোমরা (এ ধরনের ভ্রান্ত প্রশ্ন করা হতে) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং থেমে যাবে।' (বুখারি ও মুসলিম)
একবার নবি (সা.)-এর কিছু সাহাবি তাঁর কাছে এসে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আমাদের অন্তরে এমন কিছু সন্দেহ অনুভব করি যা বর্ণনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা চাইনা যে, এ ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হোক এবং আমরা তা বর্ণনা করি। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের মধ্যে কি এরূপ সন্দেহের সৃষ্টি হয়? তারা বলেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বলেন, এ হলো স্পষ্ট ঈমানের নিদর্শন। (মুসলিম)
শেষোক্ত কথায় নবিজি বুঝিয়েছেন এ ধরনের চিন্তাচেতনা প্রত্যাখ্যান করা ও দমন করা সত্যিকারের ঈমানের নিদর্শন। আরেকটি হাদিসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলল, 'আমার মন আমাকে এমন কিছু বলে যা অন্য কারো কাছে পৌঁছে দেওয়া থেকে আমি নিজে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া অধিক পছন্দ করি।' রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি কুমন্ত্রণা দানকারীর কুমন্ত্রণাকে ফিরিয়ে দেন।' (বিশুদ্ধ হাদিস আবু দাউদ)
পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে, একজন ঈমানদার যখন দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেন এবং নিজের সালাত ও আল্লাহর স্মরণে ধারাবাহিক থাকেন তখন শয়তান এসে ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে তাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। সেই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.) শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরামর্শ প্রদান করেছেন এবং পানি নির্গত না করে বাম দিকে তিনবার থুতু নিক্ষেপ করতে বলেছেন।
শয়তানের এসব কুমন্ত্রণার জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেগুলোর উপর আমল করছে বা সেগুলো প্রচার করছে। শয়তান বা নিজের পক্ষ থেকে আসা এ ধরনের চিন্তা দমন করতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহতে নির্দেশিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। যদি এগুলো আমরা দমন না করি এবং সেসব কুমন্ত্রণার দিকে ঝুঁকে যাই তখনই কেবল আমরা শাস্তির উপযুক্ত হব。

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 জাদু

📄 জাদু


'সিহর' (জাদু) শব্দের ক্রিয়ারূপ এসেছে 'সাহারা' শব্দ হতে, যার অর্থ জাদুগ্রস্ত, মন্ত্রমুগ্ধ, কবজ, বিমুগ্ধ, সম্মোহিত করা。[৩] সাধারণত জাদুবিদ্যা প্রয়োগ করা হয় লিখিত বা মুখে উচ্চারিত শব্দ বা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে। কিংবা অন্যান্য ক্রিয়াকলাপের দ্বারা জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির দেহ, মন ও অন্তরকে প্রভাবিত করা হয় তার সংস্পর্শে না এসেই。[৪] সাধারণত সূক্ষ্ম গুপ্তশক্তি ব্যবহার করা হয়, যেমন- বাণ মারা, জিন-শয়তানের পূজা, ভবিষ্যৎ গণনা করা ইত্যাদি。[৫] 'সিহর' ও এই শব্দের বিশেষ্য 'সাহার' শব্দটির শব্দমূল একই।
এর অর্থ রাতের শেষ ভাগ ও দিবসের প্রথম ভাগের মধ্যবর্তী সময়। এই সময়টিতে রাতের অন্ধকারের কিছু আবছায়া থাকে, আবার দিনের আলোর কিছু রেখা থাকে। ফলে এই সময়টি দ্বৈত প্রকৃতির (double nature), জাদুবিদ্যাও ঠিক এমন。[৬] অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতামত হলো, জাদুবিদ্যা বাস্তব কেননা এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে।
অনেক সময় জাদুবিদ্যা চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করে এবং মনে হয় যেন কিছু একটা হচ্ছে, অথচ বাস্তবে সেটি হচ্ছে না। মূসা (আ.) এর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া ফেরাউনের জাদুকরদের প্রসঙ্গে কুরআনে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে,
• 'তিনি বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন লোকদের চোখগুলোকে ধাঁধিয়ে দিল, ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল এবং মহাজাদু প্রদর্শন করল।' (সূরাহ আরাফ, ৭:১১৬)
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র দৃষ্টিশক্তিকে ধোঁকা দেওয়া হয়, বিভ্রম সৃষ্টি করা হয় কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঘটে না। জাদুবিদ্যার মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তিকে বিভ্রান্ত করা সম্পর্কে অন্যত্র উল্লেখ করা হয়েছে,
• 'তারা বলল, হে মূসা, হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা বললেন, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। তাদের জাদুর প্রভাবে হঠাৎ তাঁর মনে হল, যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো ছুটাছুটি করছে।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:৬৫-৬৬)
এই দৃষ্টিবিভ্রম বিভিন্ন আকারে ঘটতে পারে। এটি নির্ভর করে জাদুকরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের উপর।
জাদুবিদ্যার অন্যতম উদ্দেশ্য দর্শকদের অন্তরে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যেন তারা জাদুকরের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে ও তার আদেশ পালন করে。[৭] পরের আয়াতে এই বিষয়টি এসেছে, মূসা (আ.) নিজেও কিছুটা ভীতি অনুভব করেছিলেন। আল্লাহ বলেছেন,
• 'অতঃপর মূসা মনে মনে কিছুটা ভীতি অনুভব করলেন।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:৬৭)
এটি উল্লিখিত প্রথম আয়াতেও এসেছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসাকে স্বস্তি দিয়েছেন ও ভীতি দূর করে দিয়েছেন।
• 'তিনি বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন লোকদের চোখগুলোকে ধাঁধিয়ে দিল, ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল এবং মহাজাদু প্রদর্শন করল।' (সূরাহ আরাফ, ৭:১১৬)
মূসা (আ.) কে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের শয়তানী ধোঁকা ও প্রতারণার চেয়ে আল্লাহ-ই অধিক ক্ষমতাবান। আসলে জাদুবিদ্যার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে আমাদের, এটিই তার প্রধান শিক্ষা।
জাদুবিদ্যা সেইসব পদ্ধতির অন্যতম, যার দ্বারা শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করে ও মিথ্যা মাবুদের উপাসনার দিকে টেনে আনে। যে জাদু করে এবং যার অনুরোধে এটি প্রয়োগ করা হয়— উভয়েই শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়। লোকেরা বিভ্রান্ত হয়ে জাদুকরের মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা ও গুণাগুণ (যা কেবল আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট) আছে বলে ধরে নেয় এবং তাকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ স্থাপন করে। এ কারণেই জাদুবিদ্যাকে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ বিবেচনা করা হয়, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
জাদুবিদ্যা কার্যকর হয় জিনদের প্রভাবে। কেননা, কিছু বিষয়ে জিনদের এমন শক্তি ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যা মানুষের নেই। ফলে যে জিনের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করবে, সে অন্যদের তুলনায় কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা ও যোগ্যতা লাভ করবে। এ কারণে জাদুকররা এমন কিছু করতে পারে, যা সাধারণ মানুষ করতে পারে না。[৮] এর দ্বারা বোঝা যায় যে, জাদুবিদ্যা (শয়তানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়) এক প্রকার শিরক এবং অত্যন্ত জঘন্য গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেগুলো কী? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, (২) জাদুবিদ্যা, (৩) আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরিয়ত সম্মত ব্যতীরেকে তাকে হত্যা করা, (৪) সুদ খাওয়া, (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা, (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সতী নেক মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া। (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, 'যে ব্যক্তি গণক বা জ্যোতীষির কাছে গেল এবং তার কথা বিশ্বাস করল সে মুহম্মদ এর কাছে অবতীর্ণ বিষয়ের (কুরআন) প্রতি কুফরি করল।' (আহমদ, আল হাকিম, বিশুদ্ধ হাদিস)
জাদুবিদ্যার মধ্যে তিনভাবে শিরক অন্তর্ভুক্ত থাকে,
১। এখানে শয়তান জিনদের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। সাহায্যের জন্য তাদের উপর ভরসা করা হয় এবং সাহায্যের বিনিময়ে তাদেরকে খুশি করার জন্য অনেক কিছু করা হয়।
২। গায়েব বা অদৃশ্য জগতের খবর জানার দাবি করা হয়। যা কেবল আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত। এভাবে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ স্থাপন করা হয়। [১]
৩। এখানে অন্যান্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, যেমন তাদের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা ও জীবনের ঘটনাসমূহ ইত্যাদি। কিন্তু এসব বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা ও যোগ্যতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা র জন্যই নির্দিষ্ট।
বাস্তবে জাদুবিদ্যাও আল্লাহ তাআলারই একটি সৃষ্টি। মানুষকে পরীক্ষার জন্য এটি সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআনে এসেছে,
• 'তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্ব কালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; শয়তানরাই কুফর করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত।তারা উভয়ই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফির হয়ো না। অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যদ্দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তদ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত না। যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার না করে, তারা তাই শিখে। তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্মবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১০২)
এই আয়াত হতে জানা যায়, জাদুবিদ্যা একটি ফিতনা (পরীক্ষা), যার চর্চা মানুষকে কুফরিতে ধাবিত করে। এটি উপকারের বদলে মানুষের ক্ষতি করে। এবং এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ, আর সেটা হলো আখিরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি। জাদু মানুষের দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা, বৈবাহিক ও অন্যান্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যত্র এ সম্পর্কে দলিল রয়েছে,
• 'এবং (আমি আশ্রয় চাই) গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে' (সূরাহ ফালাক, ১১৩:৪)
যখন কুরআন নাজিল হয়েছিল, তখনকার যুগে অন্যতম পদ্ধতি ছিল যে, গিঁট দিয়ে বা গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে দিয়ে মানুষের উপর জাদু প্রয়োগ করা হতো। এগুলো থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, জাদুবিদ্যা বাস্তব।
এমনকি আল্লাহর রাসূল (সা.) কে একজন ইহুদী জাদু দ্বারা আক্রান্ত করেছিল। 'আয়িশা রা. বললেন, নবি (সা.)-কে বনু যুরাইক গোত্রের ইহুদি লাবীদ ইবনু আসামের মাধ্যমে জাদু করা হয়। এমনকি জাদুর খেয়ালে তার মনে হতো যে, তিনি কোনো কাজ করে ফেলেছেন অথচ তিনি তা করেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি একদিন রোগ আরোগ্যের জন্য বারবার দুআ করলেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি কি জানো যে আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন, যাতে আমার রোগের আরোগ্য নিহিত আছে? আমার নিকট দুজন লোক এসেছিল। তাদের একজন মাথার কাছে বসল আর অপর জন আমার পায়ের কাছে বসল। এরপর একজন অপরজনকে জিজ্ঞাসা করল, 'এ ব্যক্তির রোগটা কি?' জিজ্ঞাসিত লোকটি জবাব দিল, 'তাকে জাদু করা হয়েছে।' প্রথম লোকটি বলল, 'তাকে জাদু কে করল?' সে বলল, 'লবীদ ইবনু আসাম।' প্রথম ব্যক্তি বলল, 'কিসের দ্বারা (জাদু করল)?' দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, 'তাকে জাদু করা হয়েছে, চিরুনি, সুতার তাগা এবং খেজুরের খোসায়।' প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'এগুলো কোথায় আছে?' দ্বিতীয় ব্যক্তি জবাব দিল, 'যী আরওয়ান কূপে।' তখন নবি (সা.) সেখানে গেলেন এবং ফিরে আসলেন। এরপর তিনি আইশা (রা.)-কে বললেন, 'আল্লাহর কসম, সেই কূপের পানি দেখতে মেহেদীর মতো লাল বর্ণের, আর এর কাছে খেজুর গাছগুলো যেন এক একটা শয়তানের মুন্ড।' তখন আমি (আইশা) জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি কি সেই জাদু করা জিনিসগুলো বের করতে পেরেছেন?' তিনি বললেন, 'না। তবে আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দিয়েছেন, আমি মানুষকে এমন ব্যাপারে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে।' এরপর সেই কূপটি বন্ধ করে দেয়া হলো। (বুখারি ও মুসলিম)

টিকাঃ
[e] Wehr, 1974, p. 400.
[৪] Philips, A.A.B., 1997, The Exorcist Tradition in Islaam, Sharjah, United Arab Emirates: Dar Al Fatah, p. 98.
[৫] Philips, 2005, p. 97.
[৬] al-Sha'rawi, 1995, p. 15.
[1] Ibid., p. 21.
[৮] lbid., 1995, p. 26.
[১] al-Fozan, 1997, p. 47-48.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 বদনজর ও হিংসা

📄 বদনজর ও হিংসা


জিন মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে যে সব প্রক্রিয়ায়, তার মধ্যে আরেকটি হলো বদ নজর। এই প্রক্রিয়ায় একজনের দৃষ্টি আরেকজনের ক্ষতির কারণ হয়, সাধারণত হিংসা থেকে এর উৎপত্তি। ক্ষতিটা দৃষ্টিশক্তি বা চোখের দ্বারা হয় না, বরং এটা কার্যকর হয় দুষ্ট জিনের মাধ্যমে। এছাড়া হিংসুক ব্যক্তি তার হিংসা চরিতার্থ করেও ক্ষতি করতে পারে। এই ঘটনার বাস্তবতা কুরআনে এসেছে,
• 'এবং (আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।' (সূরাহ ফালাক, ১১৩:৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'নাকি যা কিছু আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন সে বিষয়ের জন্য মানুষকে হিংসা করে। ...' (সূরাহ নিসা, ৪:৫৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'বদনজর সত্য। যদি কোনো কিছু তাকদিরকে পরাভূত করতে পারত, তবে বদনজরই তাকে পরাভূত করত।' (মুসলিম)
ইবনুল কাইয়িম হিংসা ও বদনজরের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'যার বদনজর অন্যকে আক্রান্ত করে, সে একজন হিংসুক ব্যক্তি; তবে উল্টোটা সবসময় সত্য নয়। সাধারণভাবে বদনজর হিংসারই অন্তর্ভুক্ত বিষয়। হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়ার মধ্যে বদনজরও অন্তর্ভুক্ত। বদনজরের মাধ্যমে হিংসার তীর নিক্ষেপ করা হয় হিংসুকের অন্তর থেকে অন্য ব্যক্তির প্রতি। কখনো এটা লক্ষ্যভেদ করে ক্ষতি করে, যদি হিংসার শিকার ব্যক্তি প্রতিরক্ষাহীন ও অপ্রস্তুত থাকে। আর যদি হিংসার শিকার ব্যক্তি প্রস্তুত ও রক্ষাবূহ্যে থাকে, তবে হিংসার তীর বদনজরকারীর দিকেই ফেরত আসে。[১০]
হিংসা দুই প্রকারের হতে পারে,
১। নিজের লাভ হোক না হোক অন্যের যেন ক্ষতি হয়: হিংসুক চায় অপর ব্যক্তি হতে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ামত হারিয়ে যাক, সেটা নিজে পাওয়ারও আশা করে না।
২। ওর কল্যাণ যেন ওর না থাকে, আমি যেন পাই: সে ইচ্ছা করে অপর ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো নিয়ামত উঠিয়ে নেয়া হোক এবং সেই নিয়ামত সে নিজে লাভ করুক।
অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কিংবা অন্যের নিয়ামত হারিয়ে যাক, ছিনিয়ে নেয়া হোক—এমন ইচ্ছা ব্যতিরেকে কোনো নিয়ামত লাভে আগ্রহী হওয়া ইসলামে বৈধ এবং এটি হিংসার অন্তর্ভুক্ত নয়। বিশেষত দুইটি ক্ষেত্রে এর অনুমতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'দুইজন লোক ছাড়া আর কারো প্রতি ঈর্ষা করা যায় না। (১) যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে তা নেকীর পথে খরচ করতে থাকে। (২) যাকে আল্লাহ এমন জ্ঞান (কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান) দান করেছেন যা সে নিজে আমল করে ও অন্যকে শিক্ষা দান করে।' (বুখারি, মুসলিম)
বদনজর মানুষ বা জিন যে কারো কাছ থেকে আসতে পারে। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বর্ণনা করেছেন, নবি (সা.) তাঁর ঘরে একটি মেয়েকে দেখলেন যার চেহারা কালো হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, 'তাকে রুকইয়া করাও, কেননা তার উপর (বদ) নজর লেগেছে।' (বুখারি)。 এই নজরটি জিনের প্রভাবে সংঘটিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন আলিম মতামত দিয়েছেন。[১১]
হিংসা থেকে আলাদা আরেকটি অনুভূতির নাম ঈর্ষা। যে ঈর্ষা অনুভব করে, সে নিজের অধিকারে থাকা বিষয় অন্যের সাথে শেয়ার করতে চায় না, ওদিকে হিংসুক ব্যক্তি যা নিজের কাছে নেই সেটা পেতে চায়। যেমন একজন নারী তার নিজের স্বামীকে নিয়ে এমন ঈর্ষা অনুভব করতে পারে, যেন সে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ না করে। ঈর্ষার কারণে নিজের স্বামীকে সে অন্যের সাথে ভাগাভাগি করতে চায় না। আর অন্যের স্বামীকে দেখে যদি তার মনে হয়: নিজ স্বামীর থেকে অন্যের স্বামীটি উত্তম, এমন একটা স্বামী পাওয়া দরকার ছিল—তবে এটা হিংসা।
হিংসা ক্ষতিকর। এ বিষয় থেকে সুরক্ষার জন্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন দুআ রয়েছে, আরো রয়েছে কুরআনের শেষের দুইটি সূরাহ (ফালাক, নাস) এবং আয়াতুল কুরসি। হিংসা দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য রুকইয়া করতে পারেন। রুকইয়ার মাধ্যমে নিরাময়ের জন্য কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও দুআ পাঠ করা হয় এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করা হয়। আইশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বদনজর এর জন্য রুকইয়াহ (শরীয়তসম্মত ঝাড়-ফুঁক) করার হুকুম করতেন।” (মুসলিম)。 তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি বদনজর দিল তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ওযু করতে আর যার প্রতি বদনজর দেয়া হলো সে যেন (ঐ) পানি দ্বারা নিজেকে ধৌত করে নেয়।' (বুখারি, মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা হিংসুকের হিংসা ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন,
• 'বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।' (সূরাহ ফালাক, ১১৩:১-৫)

টিকাঃ
[১০] al-Jawziyyah, I.Q., 2003, Healing with the Medicine of the Prophet, Riyadh, Saudi Arabia: Darussalam, p. 149.
[১১] Philips, 1997, p. 109.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 জিনের আছর

📄 জিনের আছর


ইবনু তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, মানুষের দেহে জিন প্রবেশ করার বিষয়টি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ইমামদের ঐকমত্যের মাধ্যমে সুনিশ্চিত। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
• 'যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আছর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।...' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৭৫)
বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'শয়তান আদম-সন্তানের শিরা-উপশিরায় রক্ত প্রবাহের মতো ধাবিত হয়।' (আবু দাউদ, সনদ উত্তম) [১২]
অন্যান্য হাদিসের মাধ্যমেও জানানো হয়েছে যে, জিন মানুষের দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। ইয়ালা ইবনু মুররা বলেছেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে এমন তিনটি জিনিস করতে দেখেছি যা আমার পূর্বে বা পরে কেউ দেখেনি। আমি এক সফরে তাঁর সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে আমরা রাস্তার পাশে এক মহিলাকে অতিক্রম করলাম যে তার শিশু বালককে সাথে নিয়ে বসেছিল। মহিলাটি ডাকল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! বালকটি ফিতনায় পড়েছে। তার থেকে আমরাও ফিতনায় আক্রান্ত হয়েছি। দিনে অনেকবার সে অজ্ঞান হয়ে যায়।' তিনি বললেন, 'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' কাজেই তাকে নবিজির দিকে উঠিয়ে ধরল। তখন তিনি বালকটিকে তার নিজের ও বাহনের বসার স্থানের মধ্যে রাখলেন। বালকটির মুখ উন্মুক্ত করলেন এবং সেখানে তিনবার ফুঁক দিয়ে বললেন, 'আল্লাহর নামে; আমি আল্লাহর বান্দা! হে আল্লাহর দুশমন, বের হয়ে যা!' এরপর তিনি মহিলার কাছে বালকটিকে ফেরত দিলেন এবং বললেন, 'ফিরতি পথে আবার আমাদের সাথে দেখা করবে এবং জানাবে তার অবস্থা কি হলো।' এরপর আমরা চলে গেলাম। ফিরতি পথে আমরা পূর্বের স্থানে সেই নারীকে পেলাম। তার সাথে তিনটি ভেড়া ছিল। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তোমার পুত্রের অবস্থা কি?' মহিলাটি বলল, 'যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর কসম করে বলছি, সেই ঘটনার পর থেকে আমরা তার আচরণে অস্বাভাবিক কিছুই দেখিনি।' (আহমাদ, আল হাকিম; বর্ণনা বিশুদ্ধ)。
জিন আছরের ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায় খিঁচুনি বা মূর্ছা যাবার লক্ষণ থাকে। (যেমন পূর্বের হাদিসের ঘটনা) কিন্তু অনেক মানসিক অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে জিনের আছর একটি প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। পাগল শব্দটির আরবি 'মাজনুন' যার অর্থ অমুক ব্যক্তি জিনে আছরগ্রস্ত। ইবনু তাইমিয়া (রহ.) উল্লেখ করেছেন,
'জিনের অস্তিত্ব একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। একইভাবে আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী আলিমদের ঐক্যমত অনুসারে মানব দেহে জিন প্রবেশের ঘটনাও প্রতিষ্ঠিত সত্য। এ ব্যাপারে শীর্ষস্থানীয় আহলে সুন্নাহর আলিমদের ঐক্যমত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্য থেকে জিনে আছরের সত্যতা পাওয়া যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মূর্ছা যাবার মাধ্যমে জিন মানবদেহে প্রবেশ করে এবং দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে থাকে। কী বলছে তা ব্যক্তি নিজেও জানে না; যদি মূর্ছাগ্রস্ত ব্যক্তিকে এত জোরে আঘাত করা হয়, যে আঘাত একটি উটকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট, তবুও সে কিছু টের পায় না।'[১৩]
জিন আহরের লক্ষণসমূহ
মুসলিম রাকীদের গবেষণা অনুসারে জিনে আছরগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্নের বৈশিষ্ট্যগুলো বেশি দেখা যায়,
১। ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন
ক. দ্রুত মেজাজ পরিবর্তন
খ. অনিয়ন্ত্রিত হাসি-কান্না
গ. বিষণ্ণতা
ঘ. নির্জনতা পছন্দ করা
২। দৈহিক পরিবর্তন
ক. অস্বাভাবিক শক্তি
খ. মৃগীরোগের খিঁচুনি
গ. catatonic লক্ষণসমূহ (হাত-পা অনিয়ন্ত্রিত কম্পন)
ঘ. ব্যথা অনুভব না হওয়া
৩। কগনিটিভ পরিবর্তন
ক. Glossolalia (অজানা ভাষায় কথা বলা, অনেক বেশি কথা বলা কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো অর্থহীন কথা)
খ. আচ্ছন্নতা
গ. অতিপ্রাকৃত খবর প্রদান
ঘ. ক্রমাগত দুঃস্বপ্ন
ঙ. অনিদ্রা
৪। আধ্যাত্মিক পরিবর্তন
ক. কুরআন তিলাওয়াত বা আজানের প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঙ. গলার স্বর পরিবর্তন
খ. যে তেল বা পানিতে কুরআন পাঠ করে ফুঁ দেয়া হয়েছে সেগুলোর প্রতি
5. Psychosomatic pains
তীব্র প্রতিক্রিয়া; যেমন- পান করলে,
(বিশেষত মাইগ্রেন জনিত মাথাব্যথা)
গোসল করলে বা স্পর্শ করলে。
গ. ধর্মীয় কার্যক্রম পরিত্যাগ করা
আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলিমদের কাছে নিয়ে আসা হলে অনেক সময় দেখা যায় সমস্যাগুলো জিনে আছরের কারণে হয়নি; কেননা এ ধরনের উপসর্গ মানসিক, দৈহিক, জৈবিক বা সামাজিক প্রভাবকের কারণেও হতে পারে। [১৪]
ইবনু তাইমিয়া (রহ.) উল্লেখ করেছেন, মানুষকে জিনে আছরের ঘটনা তিন কারণে হতে পারে;
১। জিনের পক্ষ থেকে যৌনকামনা, এমনকি ভালোবাসা;
২। খেল-তামাশা, জিনের পক্ষ থেকে ঠাট্টা, মজা করার ছলে;
৩। জিন কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাগান্বিত হলে আছর করতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত যে ব্যক্তি ক্ষতি করে তাকে শাস্তি প্রদানের চেষ্টা করে। যেমন যদি দুর্ঘটনাবশত কোনো ব্যক্তি মূত্রত্যাগের মাধ্যমে কোনো জিনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে অথবা কারো উপর গরম পানি ঢেলে দেয়, সেক্ষেত্রে জিন এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবতে পারে। এরপর সে ঐ ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, নিজে যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার থেকে বেশি ক্ষতি করার মাধ্যমে বা যতোটুকু ব্যক্তির পাওনা তার থেকে বেশি প্রদানের মাধ্যমে। [১৫]
শয়তান যে সকল পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষকে মিথ্যা মাবুদের উপাসনার দিকে পরিচালিত করে, আছর করা তার মধ্যে অন্যতম। আছরগ্রস্ত ব্যক্তি বিভ্রান্ত লোকেদের সাহায্য তালাশ করে, যারা জিন তাড়ানোর জন্য নানারকম শিরক বা মূর্তিপূজার পদ্ধতি পর্যন্ত অনুসরণ করে থাকে। যেমন- বিভিন্ন বাতিল মাবুদের নাম ধরে ডাকা (ভন্ড ওঝারা ঝাড়ফুঁকের সময় যীশু, বুদ্ধ ইত্যাদির কাছে সাহায্য চায়)। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে এসকল ভুয়া পদ্ধতি প্রয়োগ করে মাঝে মাঝে নিরাময় হবার কারণ কী? এর উত্তর হচ্ছে, মানুষকে শিরক করিয়ে জিন যখন নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করে ফেলে, তখন স্বেচ্ছায় চলে যেতে পারে। শিরক করানোর পর উক্ত ব্যক্তির মধ্যে ভ্রান্ত বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে বসে। এরপর জিন যখন খুশি তখন সহজেই সেই ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করতে পারে। অতএব, এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ আরোগ্য হয় না। একমাত্র পরিপূর্ণ নিরাময় হয়ে থাকে কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে রুকইয়া করে এবং একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে। এই ক্ষেত্রে জিনকে বাধ্য করা হয় আক্রান্ত রোগীর দেহ ত্যাগ করতে।
সাধারণত যে সকল ব্যক্তির ঈমান ও দ্বীনদারিতা দুর্বলতা, তাদেরকে জিন আক্রান্ত করে। কেননা, তাদেরকে আক্রমণ করাও সহজ এবং সহজে পরাভূতও করা যায়। আর মুমিনরা দৈনন্দিন জীবনে সুন্নাত নির্দেশিত আমল, আজকার ও দুআ পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। ফলে তারা অবস্থান করে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সুরক্ষাবৃহ্যের ভিতর। আল্লাহ বলেন,
• 'তার আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার উপর ভরসা রাখে। তার আধিপত্য তো তাদের উপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯৯-১০০)
বাস্তবে দেখা যায়, মজবুত ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে জিন ভয় পায়। যেমন- উমর ইবনুল খাত্তাব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই জিন ও মানুষের মধ্যে যারা শয়তান তারা উমরকে দেখে পলায়ন করে।' (তিরমিযি, উত্তম সনদে বর্ণিত)
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। অস্বাভাবিক আচরণকারী বা মূর্ছা যাওয়া রোগীদের মধ্যে সবাই জিনে আছরগ্রস্ত নাও হতে পারে। এমনকি পূর্ববর্তী যুগের আলিমরাও শনাক্ত করেছেন যে, এধরনের লক্ষণ দৈহিক সমস্যায়ও পাওয়া যায়। এসব দৈহিক অসুখ যে দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে সেটাও তারা বুঝতে পেরেছিলেন। আধুনিক যুগে এ সকল রোগের বায়োলজিক্যাল থিওরি বেশ উন্নত হয়েছে। এমনকি এতটাই উন্নত হয়েছে যে এসকল সমস্যার 'অতিপ্রাকৃত' বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করা হচ্ছে। তবে এসব তত্ত্বের মধ্যে কোনোটি সঠিক, সেটা মৌলিক প্রশ্ন নয়। বরং দেখতে হবে নির্দিষ্ট রোগীর উপর কোন পদ্ধতিটি কাজ করছে। এর জন্য প্রয়োজন রোগীর সমস্যাগুলোর পূর্ণাঙ্গ এবং নিখুঁত মূল্যায়ন করে সমন্বিত সমাধানের, যেখানে মেডিকেল ডাক্তারদের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরাও একত্রে কাজ করবেন।

টিকাঃ
[১২] Ibn Taymiyah, Majmoo' al-Fatawa, Vol. 24, p. 276; as quoted in al-Ashqar, 1998, p. 87.
[১৩] Ibn Taymiyah, Majmoo' al-Fatdwa, Vol. 24, p. 277; as quoted in Philips, The Exorcist Tradition in Islam, p. 78.
[১৪] Philips, 1997, pp. 144-145.
[১৫] Ibn Taymeeyah's Essay on the Jinn (from Philips, The Exorcist Tradition in Islam, p. 93-4).

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00