📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মিত্রতা ও বৈরিতা (আল ওয়ালা ওয়াল বারাআহ)

📄 মিত্রতা ও বৈরিতা (আল ওয়ালা ওয়াল বারাআহ)


ইসলামি সমাজে মিত্রতা ও বৈরিতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট। এটি নিবিড়ভাবে তাওহিদের সাথে জড়িত। মিত্রতার মধ্যে রয়েছে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পারস্পরিক সাহায্য; অর্থাৎ সাহায্য, ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা ও নিবেদিতপ্রাণ হওয়া। একজন ঈমানদার ব্যক্তি নবি-রাসূলদেরকে ভালোবাসবে, যারা তাদের অনুসারী তারা হবে পরস্পর বন্ধু, সাহায্যকারী, রক্ষক ও সমর্থক; এটি ঈমানের মৌলিক অনুষঙ্গ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
• 'তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৫-৫৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'ঈমানের সবচেয়ে মজবুত আংটা হলো আল্লাহর জন্য মিত্রতা ও আল্লাহর জন্য বৈরিতা, আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্যেই ঘৃণা।' (তাবারানি, উত্তম সনদে বর্ণিত)
মিত্রতার বিপরীত হলো বৈরিতা। যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতাকারী, তাদের সাথে শত্রুতা ও দূরত্বের ভিত্তিতে বৈরিতা পোষণ করা, সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং দূরত্ব বজায় রাখা ঈমানদার হিসেবে আমাদের কর্তব্য। দ্বীনের সক্রিয় বিরোধিতাকারীদের থেকে অবশ্যই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সকল ধরনের কাফিররাই এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন ইহুদি-খ্রিস্টান, নাস্তিক-মুরতাদ-মুশরিক ইত্যাদি। এই বিষয়ে নির্দেশনা সংবলিত বহু আয়াত রয়েছে এবং এটি কুরআনের ষষ্ঠ সূরার একটি অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, সেই অংশের শিরোনাম 'ঘৃণা'। সেখানে আলোচিত হয়েছে, সেসব কাফিরদের প্রতি এই বৈরিতা প্রযোজ্য হবে, যারা সক্রিয়ভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করে। অন্যান্য কাফিরদের মধ্যে যারা ইসলাম ও মুসলিমের কোনো ক্ষতি করে না কিংবা ক্ষতির কাজে শত্রুদের সহায়তা প্রদান করেনা, তারা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:২২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৩-২৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফিরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুতঃ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলেঃ আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দুরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন-ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫১-৫২)
ঈমান ও কুফরের ভিত্তিতে অন্যদের প্রতি একজন ঈমানদারের অবস্থান কী হবে তা এ সকল আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে。

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 তিন ধরনের মানুষ

📄 তিন ধরনের মানুষ


বাস্তবে মূলত তিন ধরনের মানুষ দেখতে পাওয়া যায়;
(১) সত্যিকার ঈমানদার, (২) ঈমানদার তবে ভালো-মন্দ উভয় ধরণের আমল মিশ্রিত রয়েছে, এবং (৩) কাফির। এই তিন ধরনের মানুষের প্রতি তাদের বিশ্বাসের লেভেল অনুসারে আচরণ করতে হয়। ঈমানদারদের পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও সমর্থন প্রাপ্য। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান রাখেন, ইলম অনুসারে ঈমান-আমল রক্ষা করেন, নিজেদের দায়দায়িত্ব ও আদিষ্ট বিষয়াদি পালন করেন এবং নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করেন। তাদের ভালোবাসা, আনুগত্য, বৈরিতা ও অসন্তুষ্টি সবকিছু আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। কাজেই ঈমানদারদেরকে অবশ্যই পরিপূর্ণ মিত্রতা, সমর্থন এবং সুরক্ষা প্রদান করতে হয়।
যেসব মুসলিমরা ভালো-মন্দ এবং আল্লাহর আনুগত্য-অবাধ্যতা মিশ্রিত অবস্থায় রয়েছেন, তারা উত্তম আমলের অবস্থা অনুযায়ী ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রাপ্য এবং মন্দ কাজের মাত্রা অনুযায়ী বৈরিতা প্রাপ্য。[৩২] বুখারির একটি হাদিসে এমন এক ব্যক্তির বর্ণনা এসেছে তিনি মদ পান করতেন ফলে আরেকজন ব্যক্তি তাকে অভিশাপ প্রদান করলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে অভিশাপ প্রদান করতে নিষেধ করলেন, কেননা সেই মদ্যপায়ী ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসতেন।
আর তৃতীয় ক্যাটাগরি হলো কাফিরদের ক্যাটাগরি। আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল, বিচার দিবস ও আখিরাতের প্রতি ইচ্ছাকৃত কুফরীর কারণে তারা ঈমানদার মুসলিমদের কাছ থেকে সহমর্মিতা লাভের যোগ্যতা রাখেন না। গাইরুল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে তারা শিরক করে। নবি-রাসূল, জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, মূর্তি ইত্যাদিকে উপাস্য সাব্যস্ত করে। তাদের ভালোবাসা, দুআ, ভয়, আশা, ইবাদাত, প্রশংসা ও ভরসা ইত্যদি পরিচালিত হয় গাইরুল্লাহর প্রতি।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) লিখেছেন, 'যে বা যারাই আল্লাহর রাসূলকে অস্বীকার করে, তাঁর আনুগত্য প্রত্যাহার করে, কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক করে, তাঁর আনীত দ্বীন পরিত্যাগ করে অন্য পথ অনুসরণ করে, সে এই নিশ্ছিদ্র দ্বীনে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিবর্তে সে নিজের নফস ও অজ্ঞতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কলবের খেয়ালখুশি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, তার অন্তরে রয়েছে কুফর। সত্য অস্বীকারের মাধ্যমে যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সে মূলতঃ শয়তানের মিত্র。[৩৩] মিত্রতা ও বৈরিতার ন্যূনতম পর্যায় হলো অন্তরে এই অনুভূতি উপস্থিত থাকা。
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, 'অন্তরে থাকা ঘৃণা-ভালোবাসা অথবা পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে কোনো কমতি থাকার সুযোগ নেই। সেখানে অবশ্যই পূর্ণতা থাকতে হবে। সেখানে কোনো রকমের কমতি থাকার অর্থ ঈমানের ঘাটতি। (এছাড়া) অন্যান্য আমল ব্যক্তির সামর্থ্য ও পরিস্থিতি অনুসারে সম্পাদিত হয়। অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ সঠিক হলে ব্যক্তির আমল সে অনুসারে পরিচালিত হবে। সক্ষম হলে সে আমল করবে, কিন্তু পরিপূর্ণ পুরস্কার পাবে কিনা সেটা নির্ভর করবে অন্তরে থাকা ইখলাস তথা আন্তরিকতার ওপর。[৩৪]

টিকাঃ
[৩১] al-Qahtani, 1999, p. 79.
[৩২] Ibid., p. 84.
[৩৩] Ibn al-Qayyim, Hidayat al-Hayara, p. 7; as quoted in al-Qahtani, 1999, p. 59.
[৩৪] Ibn Taymiyyah, Majmu' al-Fatawa, pp. 108-201: as quoted in al-Qahtani, 1999, p. 86.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00