📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য

📄 মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য


ইসলাম অনুসারে, উম্মাহ একটি সামাজিক ধারণা। এর দ্বারা ঈমানদার মুসলিমদের সমাজকে বোঝায়। এটি একটি বিশ্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা, যা ঈমানের কাঠামোর উপর নির্মিত ও ঐক্যবদ্ধ। যা ছাপিয়ে যায় জাতীয়তা, নৃতাত্ত্বিকতা, বর্ণ, গোত্র ও অন্যান্য সকল পার্থক্যকে। পৃথিবীর সকল স্থান, কাল, প্রজন্ম, জাতি, শ্রেণী, বর্ণ, গোত্র, সংস্কৃতি নির্বিশেষে উম্মাহ একটি পরিবার, একটি জাতি এবং একটি গোষ্ঠী। এটি এমন এক সমাজ; যারা একই মূল্যবোধ-বিশ্বাস-লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ধারণ করে; একতাবোধ লালন করে; যারা গঠনমূলক ভাব বিনিময়ের দ্বারা পরস্পরের প্রতি প্রদর্শন করে সত্যিকারের পরোপকারী মানসিকতা ও সহমর্মিতা।
আল-হাশিমির বর্ণনা করেছেন যে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজে নিম্নরুপ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে;
১। একমাত্র আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ
২ নিখুঁত শরিয়া
৩। সকল আইন-কানুন আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা
৪। ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব
৮। পরস্পর পরামর্শ করা
৯। ঐক্য ও সমৃদ্ধি
১০। ন্যায়বিচার ও সমতা
১১। ইলম ও আমল
৫। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ
১২। সহনশীলতা
৬। পরিশুদ্ধ চরিত্র ও মানবতা
১৩। স্বাধীনতা
৭। সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ
১৪। শক্তি ও জিহাদ
১৫। উন্নতি, অগ্রগতি。[৩০]

টিকাঃ
[৩০] al-Hashimi, M. A., 2007, The Ideal Muslim Society: as Defined in the Quran and Sunnah, Riyadh: International Islamic Publishing House, pp. 25-26.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ভালোবাসা ও ভাতৃত্ব

📄 ভালোবাসা ও ভাতৃত্ব


রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়— (১) যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয়; (২) যে একমাত্র আল্লাহরই জন্য কোনো বান্দাকে মুহাব্বত করে এবং (৩) আল্লাহ তাআলা কুফর থেকে মুক্তি দেওয়ার পর যে কুফরে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করে।' (বুখারি ও মুসলিম)
মুসলিমদের দ্বীনি ভাতৃত্ব ও ভালোবাসা আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে, তাই প্রত্যেক মুসলিমের পারস্পরিক ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার সাথে সংযুক্ত। তারা একে অপরকে ভালবাসেন ও আচরণ প্রদর্শন করেন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক। তাদের ভালোবাসার এই বিশেষ বন্ধন কখনো ছিন্ন হবার নয়; আর সেই বন্ধনের নাম— সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি ঈমান। তাদের হৃদয়-মনকে এই বন্ধন এমনভাবে এক সুতোয় গেঁথে দেয়, যে তারা অপর মুসলিমের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের খাতিরে যেকোনো কিছু কোরবান করতে প্রস্তুত থাকে। দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে কিছু করেন না তারা। যদিও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সামাজিক সহায়তার (social support) বিভিন্ন উপকারিতা উঠে এসেছে, কিন্তু এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের উপকারিতা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জনৈক ব্যক্তি তার এক (মুসলমান) ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য অন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে আল্লাহ তার জন্য অপেক্ষা করার উদ্দেশ্যে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। অতপর তিনি প্রশ্ন করেন, 'তার প্রতি কি তুমি কোনো অনুগ্রহ করেছিলে? (যার বদলা নেয়ার জন্যে সাক্ষাত করতে চাও)। লোকটি বলল, না, আমি তাকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে ভালোবাসি। তখন ফেরেশতা বলেন, 'আমি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তাবাহক, তিনি আমাকে এই সংবাদ জানাতে পাঠিয়েছেন যে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে সেরূপ ভালোবাসেন, যেরূপ তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসো।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারি, মুসলিম)。
তিনি আরও বলেছেন, 'তুমি মুমিনদের পারস্পারিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে একটি দেহের ন্যায় দেখতে পাবে। যখন দেহের একটি অঙ্গ রোগে আক্রামত্ম হয়, তখন শরীরের সমসত্ম অঙ্গ-প্রতঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ গ্রহণ করে। (বুখারি ও মুসলিম)
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে ইসলামের নিঃস্বার্থ দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃত মুসলিমরা অপরাপর মুসলিমকে আল্লাহর রাহে আন্তরিকভাবে ভালোবাসে। এই ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য তারা লড়াই করতেও প্রস্তুত। নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্যের জন্য পছন্দ করে এবং কিছুতেই সম্পর্কচ্ছেদ করে না। সহনশীলতা ও ভুলত্রুটি ক্ষমা করা তাদের গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তারা পরস্পরের ভুলত্রুটি ঢেকে রাখে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা, হিংসা, আক্রোশ থাকেনা। শত্রুতা ও ঝগড়াঝাঁটির মাধ্যমে অন্য মুসলিমকে কষ্ট দেয় না। মুখলিস দ্বীনি ভাইবোনরা পরনিন্দা-পরচর্চা, গীবত হতে নিজেরা বিরত থাকে, অন্যকেও বিরত রাখে। তাদের প্রতি সদয় ও উদার মানসিকতা প্রদর্শন করে, উপদেশ চাইলে আন্তরিক ও গঠনমূলক উপদেশ প্রদান করে। সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করতে তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকে না। দ্বীনি ভাইবোনদের অনুপস্থিতিতেও তাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে ও সম্মান রক্ষা করে চলে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই হাদিসের মাধ্যমে মুখলিস (আন্তরিক) দ্বীনি ভাইবোনদের জন্য সংরক্ষিত বিরাট পুরস্কারের কথা জানিয়েছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের পার্থিব বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করল, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার পারলৌকিক বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করবেন। কোনো ব্যক্তি অপর মুসলিমের দোষ গোপন রাখলে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কষ্ট সহজ করে দেয়, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট সহজ করে দেবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য সহযোগিতায় রত থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্য- সহায়তায় রত থাকেন।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন, ওহে! যারা আমার সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়েছিল (তারা কোথায়?) আজ আমি তাদেরকে আমার সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেব। আর আজ আমার প্রদানকৃত ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া নেই। (মুসলিম)
যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না, দুনিয়াতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যারা পরস্পরকে ভালোবেসেছিল, সেদিন তারা আরশের নিচে আশ্রয় লাভ করবে। এই ভালবাসার বিনিময়ে আল্লাহ যে পুরস্কার প্রদান করবেন সেটা আমাদের কল্পনাতীত এবং আমরা নিজে নিজে এই পুরস্কার অর্জনে সক্ষমও নই। এই বাস্তবতার মাধ্যমে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসার গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে।
ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে ভালোবাসা, ঈমান ও দ্বীনের প্রতি বিশ্বস্ততার উপর। দ্বীনি ভাইবোনরা যখন একই আকিদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, মতাদর্শ ও আচার-অনুষ্ঠান অনুশীলন করে তখন তাদের হৃদয়-মন এমন এক বাঁধনে বাঁধা পড়ে, যা অন্য কিছু দ্বারা হওয়া সম্ভব নয়, সহজে ছিন্ন হবারও নয়। এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে সহায়তা, সহমর্মিতা ও সমর্থনের উপর। আল্লাহ বলেন,
• 'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০৩)

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মিত্রতা ও বৈরিতা (আল ওয়ালা ওয়াল বারাআহ)

📄 মিত্রতা ও বৈরিতা (আল ওয়ালা ওয়াল বারাআহ)


ইসলামি সমাজে মিত্রতা ও বৈরিতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট। এটি নিবিড়ভাবে তাওহিদের সাথে জড়িত। মিত্রতার মধ্যে রয়েছে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পারস্পরিক সাহায্য; অর্থাৎ সাহায্য, ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা ও নিবেদিতপ্রাণ হওয়া। একজন ঈমানদার ব্যক্তি নবি-রাসূলদেরকে ভালোবাসবে, যারা তাদের অনুসারী তারা হবে পরস্পর বন্ধু, সাহায্যকারী, রক্ষক ও সমর্থক; এটি ঈমানের মৌলিক অনুষঙ্গ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
• 'তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৫-৫৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'ঈমানের সবচেয়ে মজবুত আংটা হলো আল্লাহর জন্য মিত্রতা ও আল্লাহর জন্য বৈরিতা, আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্যেই ঘৃণা।' (তাবারানি, উত্তম সনদে বর্ণিত)
মিত্রতার বিপরীত হলো বৈরিতা। যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতাকারী, তাদের সাথে শত্রুতা ও দূরত্বের ভিত্তিতে বৈরিতা পোষণ করা, সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং দূরত্ব বজায় রাখা ঈমানদার হিসেবে আমাদের কর্তব্য। দ্বীনের সক্রিয় বিরোধিতাকারীদের থেকে অবশ্যই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সকল ধরনের কাফিররাই এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন ইহুদি-খ্রিস্টান, নাস্তিক-মুরতাদ-মুশরিক ইত্যাদি। এই বিষয়ে নির্দেশনা সংবলিত বহু আয়াত রয়েছে এবং এটি কুরআনের ষষ্ঠ সূরার একটি অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, সেই অংশের শিরোনাম 'ঘৃণা'। সেখানে আলোচিত হয়েছে, সেসব কাফিরদের প্রতি এই বৈরিতা প্রযোজ্য হবে, যারা সক্রিয়ভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করে। অন্যান্য কাফিরদের মধ্যে যারা ইসলাম ও মুসলিমের কোনো ক্ষতি করে না কিংবা ক্ষতির কাজে শত্রুদের সহায়তা প্রদান করেনা, তারা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:২২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৩-২৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফিরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুতঃ যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলেঃ আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দুরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন-ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫১-৫২)
ঈমান ও কুফরের ভিত্তিতে অন্যদের প্রতি একজন ঈমানদারের অবস্থান কী হবে তা এ সকল আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে。

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 তিন ধরনের মানুষ

📄 তিন ধরনের মানুষ


বাস্তবে মূলত তিন ধরনের মানুষ দেখতে পাওয়া যায়;
(১) সত্যিকার ঈমানদার, (২) ঈমানদার তবে ভালো-মন্দ উভয় ধরণের আমল মিশ্রিত রয়েছে, এবং (৩) কাফির। এই তিন ধরনের মানুষের প্রতি তাদের বিশ্বাসের লেভেল অনুসারে আচরণ করতে হয়। ঈমানদারদের পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও সমর্থন প্রাপ্য। কেননা, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান রাখেন, ইলম অনুসারে ঈমান-আমল রক্ষা করেন, নিজেদের দায়দায়িত্ব ও আদিষ্ট বিষয়াদি পালন করেন এবং নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করেন। তাদের ভালোবাসা, আনুগত্য, বৈরিতা ও অসন্তুষ্টি সবকিছু আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। কাজেই ঈমানদারদেরকে অবশ্যই পরিপূর্ণ মিত্রতা, সমর্থন এবং সুরক্ষা প্রদান করতে হয়।
যেসব মুসলিমরা ভালো-মন্দ এবং আল্লাহর আনুগত্য-অবাধ্যতা মিশ্রিত অবস্থায় রয়েছেন, তারা উত্তম আমলের অবস্থা অনুযায়ী ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রাপ্য এবং মন্দ কাজের মাত্রা অনুযায়ী বৈরিতা প্রাপ্য。[৩২] বুখারির একটি হাদিসে এমন এক ব্যক্তির বর্ণনা এসেছে তিনি মদ পান করতেন ফলে আরেকজন ব্যক্তি তাকে অভিশাপ প্রদান করলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে অভিশাপ প্রদান করতে নিষেধ করলেন, কেননা সেই মদ্যপায়ী ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসতেন।
আর তৃতীয় ক্যাটাগরি হলো কাফিরদের ক্যাটাগরি। আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল, বিচার দিবস ও আখিরাতের প্রতি ইচ্ছাকৃত কুফরীর কারণে তারা ঈমানদার মুসলিমদের কাছ থেকে সহমর্মিতা লাভের যোগ্যতা রাখেন না। গাইরুল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে তারা শিরক করে। নবি-রাসূল, জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, মূর্তি ইত্যাদিকে উপাস্য সাব্যস্ত করে। তাদের ভালোবাসা, দুআ, ভয়, আশা, ইবাদাত, প্রশংসা ও ভরসা ইত্যদি পরিচালিত হয় গাইরুল্লাহর প্রতি।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) লিখেছেন, 'যে বা যারাই আল্লাহর রাসূলকে অস্বীকার করে, তাঁর আনুগত্য প্রত্যাহার করে, কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক করে, তাঁর আনীত দ্বীন পরিত্যাগ করে অন্য পথ অনুসরণ করে, সে এই নিশ্ছিদ্র দ্বীনে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিবর্তে সে নিজের নফস ও অজ্ঞতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কলবের খেয়ালখুশি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, তার অন্তরে রয়েছে কুফর। সত্য অস্বীকারের মাধ্যমে যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সে মূলতঃ শয়তানের মিত্র。[৩৩] মিত্রতা ও বৈরিতার ন্যূনতম পর্যায় হলো অন্তরে এই অনুভূতি উপস্থিত থাকা。
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, 'অন্তরে থাকা ঘৃণা-ভালোবাসা অথবা পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে কোনো কমতি থাকার সুযোগ নেই। সেখানে অবশ্যই পূর্ণতা থাকতে হবে। সেখানে কোনো রকমের কমতি থাকার অর্থ ঈমানের ঘাটতি। (এছাড়া) অন্যান্য আমল ব্যক্তির সামর্থ্য ও পরিস্থিতি অনুসারে সম্পাদিত হয়। অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ সঠিক হলে ব্যক্তির আমল সে অনুসারে পরিচালিত হবে। সক্ষম হলে সে আমল করবে, কিন্তু পরিপূর্ণ পুরস্কার পাবে কিনা সেটা নির্ভর করবে অন্তরে থাকা ইখলাস তথা আন্তরিকতার ওপর。[৩৪]

টিকাঃ
[৩১] al-Qahtani, 1999, p. 79.
[৩২] Ibid., p. 84.
[৩৩] Ibn al-Qayyim, Hidayat al-Hayara, p. 7; as quoted in al-Qahtani, 1999, p. 59.
[৩৪] Ibn Taymiyyah, Majmu' al-Fatawa, pp. 108-201: as quoted in al-Qahtani, 1999, p. 86.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00