📄 নারী-পুরুষের পৃথক ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষকে একই ধরনের 'আধ্যাত্মিক প্রকৃতি' দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাদের উভয়কে বিচার দিবসে দুনিয়ার কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের ধর্মীয় দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা একই, কিছু ছোটখাটো পার্থক্য বাদে। যেমন: ঋতুবতী অবস্থায় নারীরা সালাত ও সিয়াম থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। ঈমান ও নেক-আমলের জন্য উভয়েই আখিরাতে পুরস্কৃত হবে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লৈঙ্গিক কারণে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় কেবলমাত্র তাকওয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে। শুধুমাত্র আল্লাহ বলেন:
• '... আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক। ...' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোন সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।' (সূরাহ নিসা, ৪:১২৪)
এই সার্বজনীন কাঠামোর অধীনে আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষের জন্য সমাজে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সমাজ ও পরিবারের সুষ্ঠু কার্যক্রমের জন্য নারী ও পুরুষের ভূমিকা পরস্পরের পরিপূরক। উভয়কে আল্লাহ তাআলা নিজ নিজ দায়িত্ব পূরণ করার জন্য দরকারী ও উপযুক্ত যোগ্যতা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়েই পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
• 'পুরুষেরা নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই জন্য যে, পুরুষ তাদের ধন সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা সংরক্ষিত করেছেন তা হিফাযত করে।...' (সূরাহ নিসা, ৪:৩৪)
আল্লাহ তাআলা পুরুষদেরকে পরিবারের রক্ষক, যোগানদাতা এবং পরিবারের কর্তা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। নারীদের দায়িত্ব সন্তান প্রতিপালন করা, তাদেরকে নেককার হিসেবে গড়ে তোলা এবং গৃহস্থালী সকল বিষয়ের যত্ন নেওয়া। নারীদের কাছে এটাই প্রত্যাশিত যে, তারা স্বামীর অনুগত থাকবে (যতক্ষণ না স্বামী তাকে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণের নির্দেশ করছে)। আল্লাহ তাআলা সিস্টেমগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃংখল করে সৃষ্টি করেছেন। একটি পরিবারকে কার্যকরভাবে কার্যক্ষম রাখতে নারী-পুরুষের ভূমিকা বণ্টন খুবই জরুরি। আর একটি পরিবার তখনই সবচেয়ে কার্যকর থাকে যখন সেখানে আল্লাহর বিধি-বিধানগুলো মেনে চলা হয়。
📄 পরিবার কাঠামো পুনসংস্থাপনের প্রচেষ্টা
প্রতিনিয়ত পরিবারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলছে। পরিবারের কার ভূমিকা কী হবে, চলছে সেটাকেও বদলানোর চেষ্টা। যেমন, কিছু কিছু সমাজে সাম্য বা সমতা প্রতিষ্ঠার নামে (equality) নারীপুরুষের ঐতিহ্যগত পারিবারিক ভূমিকাকে বদলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নারীকে পুরুষের সমান ধরা হচ্ছে জীবনের সকল ক্ষেত্রে এবং পুরুষের সাথে সমপর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এই সব মতাদর্শে মাতৃত্বের ভূমিকাকে একটি অপমানজনক কাজ মনে করা হয়। অর্থ, ক্ষমতা ও দুনিয়াবী লক্ষ্য পূরণকারী ক্যারিয়ারের চেয়ে মাতৃত্বকে কম মূল্যবান বিবেচনা করা হয়। 'সমতা' (equality) অর্জনের পথে নারীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে, গর্ভধারণ ও শিশু পালনকে দেখা হয় একটি উপদ্রব বা ঝামেলা হিসেবে।
এই বাস্তবতার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো 'নারীর ক্ষমতায়ন' ('Empowerment of women')। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান একে সমর্থন দিচ্ছে। জাতিসংঘের United Nations Human Development Report এবং Arab Human Development Report-এ 'নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়ন' এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসমূহের উল্লেখ রয়েছে। এমনকি এই 'মানব উন্নয়ন রিপোর্ট'-এ (gender empowerment measure; GEM) বা 'লৈঙ্গিক ক্ষমতায়ন পরিমাপক' নামক সূচকের মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লিঙ্গবৈষম্যের মাত্রাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের 'হাই কমিশনার অফ হিউম্যান রাইটস' অফিস থেকে পরিচালিত 'নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ'- সনদটি এই লৈঙ্গিক ভূমিকা বদলে দেবার সবচেয়ে সুচিন্তিত প্রচেষ্টা। এই কমিটির একটি প্রধান লক্ষ্য নিম্নরূপঃ
'জেনে রাখুন, নারী ও পুরুষের মধ্যে পূর্ণ সমতা (equality) অর্জনের জন্য সমাজে ও পরিবারে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের প্রথাগত ভূমিকার পরিবর্তন প্রয়োজন... এ ব্যাপারে 'স্টেইট পার্টি'* যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন: তারা নারী পুরুষের ঐসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ, কুসংস্কার, প্রথা ও রীতিনীতি পরিবর্তন করবেন, যেগুলো লৈঙ্গিক শ্রেষ্ঠত্ব বা নিম্নতার উপর প্রতিষ্ঠিত অথবা নারী-পুরুষের প্রথাগত ভূমিকা নির্ধারণ করে。[২৭] (*স্টেইট পার্টি হলো সেসব দেশ যারা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশন এ চুক্তিবদ্ধ)।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, এই কমিটি খোলাখুলিভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতিকে টার্গেট করেছে, তারা মত প্রকাশ করেছে যে, 'সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে নারীর অধিকারের বিশ্বজনীনতার অবমাননা ঘটতে দেওয়া যায় না।'[২৮] এই কমিটির মত অনুসারে, 'সব দেশে যেসব প্রভাবকের মাধ্যমে জীবনের মূল স্রোতে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ কাঠামো ও ধর্মীয় বিশ্বাস'[২৯]।
ধর্মীয় মূল্যবোধ, ধর্মীয় জীবন ও পরিবারের উপর অশুভ আক্রমণের নিদর্শন এসব প্রচেষ্টা। এসব অর্গানাইজেশনের প্রধান লক্ষ্য নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত পৃথক ভূমিকা নির্মূল করা এবং 'সাম্য ও সমতার' ধারণায় সাজানো। এটি একটি নারীবাদী (ফেমিনিস্ট) এজেন্ডা, যা বিগত প্রায় ৫০ বছর বা ততোধিক সময় ধরে চলে আসছে। নারীবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, নারীদেরকে মাতৃত্বের বাঁধন ছিঁড়ে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে এবং ঘরের বাইরে এসে জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক)। বৈবাহিক কাঠামো, পরিবার গঠন ও সন্তান প্রতিপালনের চিরায়ত ধারণার বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক মানসিকতা নিহিত রয়েছে এসব চিন্তাচেতনা ও কার্যক্রমের ভেতরে।
নারীর ক্ষমতায়নের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে বটে। যেমন- বৈষম্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ইত্যাদি। তবে এসকল 'লাভের' সাথে অনেক বিপদজনক বিষয়ও জড়িত। বাহ্যিকদৃষ্টিতে যদিও কিছু মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে বলে মনে হয়, কিন্তু চূড়ান্ত পরিণতি হলো পরিবার কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়া, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো সমাজ।
'নারীর ক্ষমতায়ন' ('Empowerment of women') এর অর্থ কি? বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখলে নারীর ক্ষমতায়নের আসল অর্থ হল-
১। নারীদের একটির জায়গায় একত্রে দুইটি কাজ করতে হচ্ছে। ঘর ও সন্তান দেখাশোনা করা নারীদের মৌলিক কাজ, এর সাথে অতিরিক্ত যুক্ত হচ্ছে ঘরের বাইরে অর্থ উপার্জনের কাজ।
২। নারী কাজ করছে পুরুষ-প্রধান (male dominated) পরিবেশে। দৈনিক পুরুষদের সাথে উঠাবসা করা; অথচ এ ধরনের পুরুষদের (গায়রে মাহরাম; যাদেরকে বিয়ে করা বৈধ) সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অনুমতি নেই।
৩। নারীরা ছোট সন্তানদেরকে অন্যত্র রেখে আসতে বাধ্য হচ্ছে। যেমন, ডে-কেয়ার সেন্টার; এমনকি ছয় সপ্তাহের শিশু পর্যন্ত সেখানে রেখে আসতে দেখা যায়।
৪। নিজের সন্তানদের সাথে অর্থবহ আলাপ-আলোচনায় সপ্তাহে গড়ে মাত্র ৩০ মিনিট সময় লাভ করছেন একজন নারী।
৫। বিষণ্ণতা; কর্মজীবী নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশনের হার পুরুষের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত দেখা যায়। এর সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য মানসিক যাতনা; যেমন- উদ্বেগ, স্ট্রেস ইত্যাদি।
৬। নিজের সহজাত নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যের সাথে সংঘাত অনুভব করেন নারীরা; যেমন পরিচর্যা (nurturance), নমনীয়তা (deference), নির্ভরতা (affiliation) ইত্যাদি নারীসুলভ গুণাবলী। অন্যদিকে ক্যারিয়ার গঠনে প্রয়োজন নিজেকে জাহির করার মানসিকতা, স্বায়ত্তশাসন, স্বনির্ভরতা ইত্যাদি।
মাতৃত্বের ভূমিকা অবমূল্যায়নের কারণে সম্পূর্ন সমাজব্যবস্থা ভুক্তভোগী হয়। শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় ভালোবাসা, যত্ন ও মনোযোগ পায়না। ফলে অনাগত জীবনের উত্থানপতন ও পরীক্ষার সামনে তারা ভঙ্গুর হয়ে বেড়ে ওঠে। যেমন- বয়সন্ধিকালীন/শৈশবকালীন বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদক, অ্যালকোহল সেবন, কিশোর অপরাধ ইত্যাদি দেখা যায়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই মাতৃত্ব। একে সামাজিকভাবে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। পরিবার ও সমাজে স্থিতিশীলতা আনেন মায়েরাই। সমাজে অবদান রাখার উপযুক্ত, উত্তম চরিত্রবান হিসেবে সন্তানকে বড় করতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন এই মায়েরাই।
টিকাঃ
[২৭] United Nations, Division for the Advancement of Women, Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination against Women (CEDAW), retrieved October 14, 2009 from http://www.un.org/womenwatch/daw/cedaw/text/econvention.htm.
[২৮] Ibid.
[২৯] Ibid.
📄 মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য
ইসলাম অনুসারে, উম্মাহ একটি সামাজিক ধারণা। এর দ্বারা ঈমানদার মুসলিমদের সমাজকে বোঝায়। এটি একটি বিশ্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা, যা ঈমানের কাঠামোর উপর নির্মিত ও ঐক্যবদ্ধ। যা ছাপিয়ে যায় জাতীয়তা, নৃতাত্ত্বিকতা, বর্ণ, গোত্র ও অন্যান্য সকল পার্থক্যকে। পৃথিবীর সকল স্থান, কাল, প্রজন্ম, জাতি, শ্রেণী, বর্ণ, গোত্র, সংস্কৃতি নির্বিশেষে উম্মাহ একটি পরিবার, একটি জাতি এবং একটি গোষ্ঠী। এটি এমন এক সমাজ; যারা একই মূল্যবোধ-বিশ্বাস-লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ধারণ করে; একতাবোধ লালন করে; যারা গঠনমূলক ভাব বিনিময়ের দ্বারা পরস্পরের প্রতি প্রদর্শন করে সত্যিকারের পরোপকারী মানসিকতা ও সহমর্মিতা।
আল-হাশিমির বর্ণনা করেছেন যে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজে নিম্নরুপ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে;
১। একমাত্র আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ
২ নিখুঁত শরিয়া
৩। সকল আইন-কানুন আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা
৪। ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব
৮। পরস্পর পরামর্শ করা
৯। ঐক্য ও সমৃদ্ধি
১০। ন্যায়বিচার ও সমতা
১১। ইলম ও আমল
৫। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ
১২। সহনশীলতা
৬। পরিশুদ্ধ চরিত্র ও মানবতা
১৩। স্বাধীনতা
৭। সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ
১৪। শক্তি ও জিহাদ
১৫। উন্নতি, অগ্রগতি。[৩০]
টিকাঃ
[৩০] al-Hashimi, M. A., 2007, The Ideal Muslim Society: as Defined in the Quran and Sunnah, Riyadh: International Islamic Publishing House, pp. 25-26.
📄 ভালোবাসা ও ভাতৃত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়— (১) যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সব কিছু থেকে প্রিয়; (২) যে একমাত্র আল্লাহরই জন্য কোনো বান্দাকে মুহাব্বত করে এবং (৩) আল্লাহ তাআলা কুফর থেকে মুক্তি দেওয়ার পর যে কুফরে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করে।' (বুখারি ও মুসলিম)
মুসলিমদের দ্বীনি ভাতৃত্ব ও ভালোবাসা আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে, তাই প্রত্যেক মুসলিমের পারস্পরিক ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার সাথে সংযুক্ত। তারা একে অপরকে ভালবাসেন ও আচরণ প্রদর্শন করেন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক। তাদের ভালোবাসার এই বিশেষ বন্ধন কখনো ছিন্ন হবার নয়; আর সেই বন্ধনের নাম— সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি ঈমান। তাদের হৃদয়-মনকে এই বন্ধন এমনভাবে এক সুতোয় গেঁথে দেয়, যে তারা অপর মুসলিমের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের খাতিরে যেকোনো কিছু কোরবান করতে প্রস্তুত থাকে। দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে কিছু করেন না তারা। যদিও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সামাজিক সহায়তার (social support) বিভিন্ন উপকারিতা উঠে এসেছে, কিন্তু এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের উপকারিতা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জনৈক ব্যক্তি তার এক (মুসলমান) ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য অন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে আল্লাহ তার জন্য অপেক্ষা করার উদ্দেশ্যে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। অতপর তিনি প্রশ্ন করেন, 'তার প্রতি কি তুমি কোনো অনুগ্রহ করেছিলে? (যার বদলা নেয়ার জন্যে সাক্ষাত করতে চাও)। লোকটি বলল, না, আমি তাকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে ভালোবাসি। তখন ফেরেশতা বলেন, 'আমি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তাবাহক, তিনি আমাকে এই সংবাদ জানাতে পাঠিয়েছেন যে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে সেরূপ ভালোবাসেন, যেরূপ তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসো।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারি, মুসলিম)。
তিনি আরও বলেছেন, 'তুমি মুমিনদের পারস্পারিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে একটি দেহের ন্যায় দেখতে পাবে। যখন দেহের একটি অঙ্গ রোগে আক্রামত্ম হয়, তখন শরীরের সমসত্ম অঙ্গ-প্রতঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ গ্রহণ করে। (বুখারি ও মুসলিম)
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে ইসলামের নিঃস্বার্থ দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃত মুসলিমরা অপরাপর মুসলিমকে আল্লাহর রাহে আন্তরিকভাবে ভালোবাসে। এই ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য তারা লড়াই করতেও প্রস্তুত। নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্যের জন্য পছন্দ করে এবং কিছুতেই সম্পর্কচ্ছেদ করে না। সহনশীলতা ও ভুলত্রুটি ক্ষমা করা তাদের গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তারা পরস্পরের ভুলত্রুটি ঢেকে রাখে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা, হিংসা, আক্রোশ থাকেনা। শত্রুতা ও ঝগড়াঝাঁটির মাধ্যমে অন্য মুসলিমকে কষ্ট দেয় না। মুখলিস দ্বীনি ভাইবোনরা পরনিন্দা-পরচর্চা, গীবত হতে নিজেরা বিরত থাকে, অন্যকেও বিরত রাখে। তাদের প্রতি সদয় ও উদার মানসিকতা প্রদর্শন করে, উপদেশ চাইলে আন্তরিক ও গঠনমূলক উপদেশ প্রদান করে। সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করতে তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকে না। দ্বীনি ভাইবোনদের অনুপস্থিতিতেও তাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে ও সম্মান রক্ষা করে চলে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই হাদিসের মাধ্যমে মুখলিস (আন্তরিক) দ্বীনি ভাইবোনদের জন্য সংরক্ষিত বিরাট পুরস্কারের কথা জানিয়েছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের পার্থিব বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করল, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার পারলৌকিক বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করবেন। কোনো ব্যক্তি অপর মুসলিমের দোষ গোপন রাখলে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কষ্ট সহজ করে দেয়, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট সহজ করে দেবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য সহযোগিতায় রত থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্য- সহায়তায় রত থাকেন।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন, ওহে! যারা আমার সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়েছিল (তারা কোথায়?) আজ আমি তাদেরকে আমার সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেব। আর আজ আমার প্রদানকৃত ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া নেই। (মুসলিম)
যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না, দুনিয়াতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যারা পরস্পরকে ভালোবেসেছিল, সেদিন তারা আরশের নিচে আশ্রয় লাভ করবে। এই ভালবাসার বিনিময়ে আল্লাহ যে পুরস্কার প্রদান করবেন সেটা আমাদের কল্পনাতীত এবং আমরা নিজে নিজে এই পুরস্কার অর্জনে সক্ষমও নই। এই বাস্তবতার মাধ্যমে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসার গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে।
ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে ভালোবাসা, ঈমান ও দ্বীনের প্রতি বিশ্বস্ততার উপর। দ্বীনি ভাইবোনরা যখন একই আকিদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, মতাদর্শ ও আচার-অনুষ্ঠান অনুশীলন করে তখন তাদের হৃদয়-মন এমন এক বাঁধনে বাঁধা পড়ে, যা অন্য কিছু দ্বারা হওয়া সম্ভব নয়, সহজে ছিন্ন হবারও নয়। এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে সহায়তা, সহমর্মিতা ও সমর্থনের উপর। আল্লাহ বলেন,
• 'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০৩)