📄 পরিবার ও পারেটিিং (সন্তান প্রতিপালন)
পরিবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কারণ, পরিবারগুলোর উপর পুরো সামাজিক কাঠামোটি দাঁড়িয়ে থাকে। সুস্থ কর্মক্ষম পরিবার ব্যতীত সমাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, যেমনটা আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি কিছু দেশে। এ কারণে ইসলামি শরিয়তে বিভিন্ন নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে পরিবারের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। পরিবারের বিভিন্ন উপকারী প্রভাব রয়েছে সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর।
📄 বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্ব
একটি পরিবারে বৈবাহিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় অন্যান্য উপাদানগুলো। যদি এই কেন্দ্রীয় বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কার্যকর থাকে, তবে আশা করা যায় বাকি সিস্টেমও ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে। বিপরীতে বৈবাহিক সম্পর্কে অসামঞ্জস্য বা বিবাদ থাকলে, পুরো সিস্টেমে বিশৃংখলা দেখা দেবে। একটি মজবুত বৈবাহিক সম্পর্ক দ্বারা গঠিত হয় একটি সুস্থ কর্মক্ষম পরিবার। আর, একটি কার্যকর পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় মজবুত সামাজিক ভিত্তি।
বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্বের প্রতি জোর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যাদের সক্ষমতা আছে সে যেন বিবাহ করে...' (বুখারি)। তিনি আরো বলেছেন, 'যে বিবাহ করল সে অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করল। কাজেই সে যেন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চলে।' (আত-তায়লাসি, সনদ নির্ভরযোগ্য)। বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের দ্বীনি যোগ্যতার বিকাশে ও আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যে সহযোগী হয়।
বিয়ের মাধ্যমে যখন আমরা আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করি, তখন আমরা লাভ করি সামনের আয়াতে বর্ণিত সাকিনা (প্রশান্তি), আল্লাহ বলেছে:
• আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।' (সূরাহ রুম, ৩০:২১)
একটি ইসলামি বিবাহের অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা, নিঃস্বার্থ প্রেম এবং বৈবাহিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করে চলা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'সেই সর্বোত্তম মুসলিম যার আখলাক সর্বোত্তম আর তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে নিজ স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণকারী।' (তিরমিযি, সনদ নির্ভরযোগ্য)। পরিবারে সংঘাত ও বিচ্ছেদ এড়াতে অবশ্যই বৈবাহিক সম্পর্কে সহযোগিতা, ছাড় দিয়ে চলা, পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা, ক্ষমার গুণ ইত্যাদি থাকতে হবে। আল্লাহ বলেছেন,
• '... নারীদের সাথে সমভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন।' (সূরাহ নিসা, ৪:১৯)
সমাজবিজ্ঞানের গবেষকগণ বিয়ের অনেক সামাজিক, পারিবারিক এবং দাম্পত্য উপকারিতা ও সুবিধা নির্ণয় করেছেন। বার বার ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় একই ফলাফল এসেছে যে, অবিবাহিতদের তুলনায় বৈবাহিক দম্পতিরা আবেগিক ও মানসিকভাবে বেশি ভালো থাকেন। [১১] বিভিন্ন দেশের বহুসংখ্যক মানুষের মধ্যে পরিচালিত একটি জরিপে উঠে এসেছে, বিবাহিত দম্পতি 'অবিবাহিত দম্পতি'র তুলনায় সুখী জীবন যাপন করেন। [১২] নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সমানতালে রিপোর্ট করেছেন যে 'বিবাহবহির্ভূত দম্পতি' (cohabitation) এর তুলনায় বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ানোর পর তারা ২.৪ গুণ সুখী জীবনযাপন করছেন। [১০] সিঙ্গেল, তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা, বিপত্নীক কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানো যুগলদের তুলনায় বিবাহিত নারীপুরুষরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম মাত্রায় ডিপ্রেশনে আক্রান্ত বলেও জানা গেছে। [১৪]
কেন অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিতরা অধিকতর সুখী ও মানসিকভাবে সুন্দর জীবনযাপন করেন এবং জীবনে বেশি পরিতৃপ্ত থাকেন- এই বিষয়ের নানান ব্যাখ্যা রয়েছে। সাধারনত বিবাহিত মানুষরা অবিবাহিতদের তুলনায় ভালো দৈহিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হন আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী লোকেদের অধিকতর সুখী হবার সম্ভাবনা বেশি।।১০। বৈবাহিক সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি উচ্চমাত্রার দায়িত্ববোধ থাকে, ফলে অধিকতর নিরাপত্তা অনুভূত হয় ও জীবনে 'স্ট্রেস' কমে আসে, বয়ে আনে উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য। [১৬] অবিবাহিত পুরুষের তুলনায় বিবাহিত পুরুষদের আয় রোজগার বেশি এবং তারা অধিক কর্মোদ্যমী, তাদের পদোন্নতির সম্ভাবনাও বেশি। [১৭] বিবাহিত নারীরা সিঙ্গেল নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অধিক অর্থনৈতিক সম্পদের অধিকারী হন। [১৮] বেশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বিবাহিত জীবনে কমে আসে 'স্ট্রেস', ভালো থাকা যায় বেশি, সেই সাথে মানোন্নয়ন ঘটতে থাকে সম্পর্কটিরও। [১১]
দৈহিক স্বাস্থ্যের উপর বৈবাহিক সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, মূলত স্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের মাধ্যমে। অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে ধূমপান, মদ্যপান, মাদকদ্রব্য ব্যবহারের মতো স্বাস্থ্যহানিকর অভ্যাস কম দেখা যায়। এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আচরণের দিকে খেয়াল রাখেন এবং আত্মসংযমে পরস্পরকে উৎসাহিত করেন। বিশেষত এটি পুরুষদের জন্য বেশি দরকার। দ্বিতীয়ত, তারা জীবনসাথীর কাছ থেকে সামাজিক সমর্থন লাভ করেন। যার কারণে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে সফল ভাবে মানিয়ে নেয়া সহজ হয়। তৃতীয়ত, বিবাহিত ব্যক্তি সহজেই জীবনের অর্থ খুঁজে পান এবং পরিবারের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ অনুভব করেন। এটাই তার ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাকে দমিয়ে দেয় এবং স্বাস্থ্য-সচেতন হতে উৎসাহিত করে। [২০]
উন্নত দৈহিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আরও দেখা যায়, বিবাহিত নারী-পুরুষের মৃত্যুর হার অবিবাহিতদের তুলনায় কম। [২১] এটিই স্বাভাবিক, কেননা বিবাহিত মানুষে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও বাজে অভ্যাস কম থাকে। ইতোমধ্যে আমরা উল্লেখ করেছি, বিয়ে করলে দুনিয়াবী বস্তুগত সম্পদও বৃদ্ধি পায়। ফলে দীর্ঘায়ুর জন্য দরকারী উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, সুষম খাদ্য, ভালো পরিবেশ নিশ্চিত হয়। বিয়ে ব্যক্তিকে একটি সামাজিক নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করে দেয় এবং এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবনের জন্য। [২২]
শিশুদের উপরেও পিতামাতার বৈবাহিক সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে, যা না বললেই নয়। গবেষকরা দেখেছেন, যেসব শিশু বৈবাহিক সম্পর্কজাত এবং পিতা-মাতা উভয়ের সাহচর্যে বেড়ে উঠে, তারা তুলনামূলকভাবে কম আবেগিক-আচরণগত (emotional-beahavioural) সমস্যার সম্মুখীন হয়। ২৩। অন্যদের তুলনায় স্কুল থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা কম; মাদকদ্রব্য সেবনের, অবৈধ দৈহিক সম্পর্কে জড়ানো ও নির্যাতিত হবার হার কম。[২৪] বিবাহিত ও পিতামাতা উভয়ে বিদ্যমান, এমন পরিবারের শিশুরা পড়ালেখায় অন্যদের তুলনায় ভালো ফলাফল অর্জন করে। [২৫]
'সিঙ্গেল প্যারেন্ট' (সাধারণত সিঙ্গেল মাদার) পরিবারের শিশুদের ফলাফল খারাপ হবার ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক ভূমিকা রাখে দারিদ্র। বাকি অর্ধেকের প্রভাবক হচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্ক দুজন ব্যক্তির (পিতামাতা) সময় ও মনোযোগ কম পাওয়া। দুইজন 'প্যারেন্ট'কে পেলে শিশু বেশি অভিভাবকের তত্ত্বাবধান পায়, অধিক সামাজিক সমর্থন পায় ও হোমওয়ার্কে দুইজন 'বড় মানুষের' সহযোগিতা লাভ করে। 'সিঙ্গেল প্যারেন্ট' ফ্যামিলিতে পিতা অথবা মাতার মধ্যে যেকোনো একজনের সাথে শিশু সময় কাটায়; ফলে কম মনোযোগ পায় এবং সাধারণত দেখা যায় এসব শিশুদের সাথে পিতামাতার সম্পর্কও মজবুত হয়না。[২৬]
টিকাঃ
[১১] Kim, H. K., & McKenry, P. C, 2002, The relationship between marriage and psychological well-being: A longitudinal analysis, Journal of Family Issues, 23, pp. 885-911; Lees, D., 2007, Research Note: The Psychological Benefits of Marriage, retrieved October 15, 2009 from http://www.maxim.org.nz/files/pdf/psychologicalbenefitsofmarriage.pdf, pp. 1-4.
[১২] Stack, S., & Eshleman, J. R., 1998, Marital status and happiness: A 17- nation study, Journal of Marriage and Family, 60(2), pp. 527-536.
[১৩] Ibid.
[১৪] Brown, S. L., 2000, The effect of union type on psychological well-being: Depression among cohabitors versus marrieds, Journal of Health and Social Behavior, 41, pp. 241- 255; Earle, J. R., Smith, M. H., Harris, C. T., & Longino, C. F., 1998, Women, marital status and symptoms of depression in a midlife sample, Journal of Women and Aging, 10, p. 10; Lamb, K. E., Lee, G. R., & Demaris, A., 2003, Union formation and depression: Selection and relationship effects, Journal of Marriage and Family, 65, pp. 953-962; Simon, R. W., 2002, Revisiting the relationships among gender, marital status, and mental health, American Journal of Sociology, 107, pp. 1065-1096.
[*] Lees, 2007, p. 1.
[১৬] Marcussen, K., 2004, Explaining differences in mental health between married and cohabiting individuals, paper presented at the American Sociological Association Meeting, San Francisco, CA.
[১৭] Korenman, S., & Neumark, D., 2001, Does marriage really make men more productive?, The Journal of Human Resources, 26, pp. 282-307.
[১৮] Hahn, B.A., 1993, Marital status and women's health: The effect of economic marital acquisition, Journal of Marriage and Family, 55, pp. 495-504.
[১৯] Ibid.
[২০] Waite, L.J., 1995, Does marriage matter?, Demography, 32(4), pp. 486-488.
[২১] Hu, Y., & Goldman, N., 1990, Mortality differentials by marital status: An international comparison, Demography, 27(2), pp. 233-250; Waite, 1995, pp. 488-489.
[২২] Waite, 1995, pp. 488-489.
[২৩] Brown, S. L., 2004, Family structure and child well-being: The significance of parental cohabitation, Journal of Marriage and Family, 66, pp. 351-367; Hou, F., and Ram, B., 2003, Changes in family structure and child outcomes: Roles of economic and familial resources, Policy Studies Journal, 31, pp. 309-330.
[২৪] Flewelling, R. L, and Bauman, K. E., 1990, Family structure as a predictor of initial substance use and sexual intercourse in early adolescence, Journal of Marriage and the Family, 52, pp. 171-181; Waite, 1995, pp. 493-495.
[২৫] Haurin, R. J., 1992, Patterns of childhood residence and the relationship to young adult outcomes, Journal of Marriage and the Family, 54, pp. 846-860; Hou et al., 2003, pp. 309-330; Jeynes, W. H., 2000, The effects of several of the most common family structures on the academic achievement of eighth graders, Marriage and Family Review, 30(1/2), pp. 73-97.
[২৬] Waite, 1995, pp. 493-495.
📄 ইসলামে মাতৃত্ব
ইসলামে মাতৃত্বকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে, এতেই বোঝা যায় এর গুরুত্ব। একটি সুপরিচিত হাদিস থেকে জানা যায়: একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছ থেকে সদাচরণ ও উত্তম সঙ্গ পাওয়ার সবচেয় বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা। সে বলল, অতপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা।' (বুখারি ও মুসলিম)
ইসলামে মায়েরা অত্যন্ত দামী ও মূল্যবান, কেননা পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি ও অনুপ্রাণিত করার কাজে তারাই দায়িত্বশীল। একজন মায়ের অধিকাংশ সময় চলে যায় মাতৃত্বের ভূমিকা পালনে; যেমন: শিশুর পরিচর্যা, শিক্ষা ও দীক্ষা প্রদানে। এসব কারণে তারা যে সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তা অবশ্যই তাদেরকে দেয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা তার প্রজ্ঞা অনুসারে, নারীদের জন্যেই সুনির্দিষ্টভাবে মাতৃত্বের ভূমিকাকে সৃষ্টি করেছেন। এই দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে যেসকল অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, তিনি সেগুলোও নারীদেরকেই দিয়ে রেখেছেন, যেমন- সহমর্মিতা, নম্রতা, ধৈর্যশীলতা এবং দয়ামায়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন আল্লাহ তাআলা একশত রহমত সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকটি রহমত আকাশ ও পৃথিবীর দূরত্বের সমপরিমাণ। এই একশত রহমত হতে একভাগ রহমত পৃথিবীর জন্য নির্ধারণ করেছেন। এই (এক ভাগের) কারণেই মা সন্তানের প্রতি দয়া করে এবং বন্য পশু ও পাখিরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে।' (মুসলিম)
মাতৃত্ব একটি 'ফুলটাইম ক্যারিয়ার'। এখানে রয়েছে গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান, বুকের দুধ পান করানো এবং অনেক বছর ধরে ক্রমাগত শিশুর যত্ন নেওয়া ও তাকে বড় করে তোলার কাজ। এটিই একজন ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে যথেষ্ট। এজন্যই একজন মায়ের ঘাড়ে পরিবারের আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়নি। আল্লাহর রহমত যে তিনি নারীদের জন্য ঘরের বাইরে কাজ করাকে জরুরি করে দেননি। সন্তানের রিজিক উপার্জন করা মায়ের কাজ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বোঝা বহন করা নারীদের জন্য সাধ্যাতীত হয়ে দাঁড়ায়। যে পরিস্থিতে একজন মা নিজের প্রধান দায়িত্বগুলোয় তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগের সুযোগ পান, সেটাই কাম্য।
📄 নারী-পুরুষের পৃথক ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষকে একই ধরনের 'আধ্যাত্মিক প্রকৃতি' দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাদের উভয়কে বিচার দিবসে দুনিয়ার কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের ধর্মীয় দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা একই, কিছু ছোটখাটো পার্থক্য বাদে। যেমন: ঋতুবতী অবস্থায় নারীরা সালাত ও সিয়াম থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। ঈমান ও নেক-আমলের জন্য উভয়েই আখিরাতে পুরস্কৃত হবে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লৈঙ্গিক কারণে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় কেবলমাত্র তাকওয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে। শুধুমাত্র আল্লাহ বলেন:
• '... আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক। ...' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোন সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।' (সূরাহ নিসা, ৪:১২৪)
এই সার্বজনীন কাঠামোর অধীনে আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষের জন্য সমাজে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সমাজ ও পরিবারের সুষ্ঠু কার্যক্রমের জন্য নারী ও পুরুষের ভূমিকা পরস্পরের পরিপূরক। উভয়কে আল্লাহ তাআলা নিজ নিজ দায়িত্ব পূরণ করার জন্য দরকারী ও উপযুক্ত যোগ্যতা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়েই পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
• 'পুরুষেরা নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই জন্য যে, পুরুষ তাদের ধন সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা সংরক্ষিত করেছেন তা হিফাযত করে।...' (সূরাহ নিসা, ৪:৩৪)
আল্লাহ তাআলা পুরুষদেরকে পরিবারের রক্ষক, যোগানদাতা এবং পরিবারের কর্তা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। নারীদের দায়িত্ব সন্তান প্রতিপালন করা, তাদেরকে নেককার হিসেবে গড়ে তোলা এবং গৃহস্থালী সকল বিষয়ের যত্ন নেওয়া। নারীদের কাছে এটাই প্রত্যাশিত যে, তারা স্বামীর অনুগত থাকবে (যতক্ষণ না স্বামী তাকে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণের নির্দেশ করছে)। আল্লাহ তাআলা সিস্টেমগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃংখল করে সৃষ্টি করেছেন। একটি পরিবারকে কার্যকরভাবে কার্যক্ষম রাখতে নারী-পুরুষের ভূমিকা বণ্টন খুবই জরুরি। আর একটি পরিবার তখনই সবচেয়ে কার্যকর থাকে যখন সেখানে আল্লাহর বিধি-বিধানগুলো মেনে চলা হয়。