📄 বার্ধক্য ও বয়স বৃদ্ধি
• 'আমি যাকে দীর্ঘ জীবন দান করি, তাকে সৃষ্টিগত পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেই। তবুও কি তারা বুঝে না?' (সূরাহ ইয়াসীন, ৩৬:৬৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন, অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।' (সূরাহ রুম, ৩০:৫৪)
বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া (senescence) চলতে থাকে মানুষের পুরোটা জীবনব্যাপি। এর অর্থ হলো, বয়সের সাথে সাথে দৈহিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকা। বিকাশ মনোবিজ্ঞানের (Developmental Psychology) একটি বহুল প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো: বার্ধক্য আসা একটি সাধারণ ও প্রাকৃতিক ঘটনা, যা কিনা সকল প্রজাতির জেনেটিক নকশায় গাঁথা। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে স্বাভাবিক মনে হলেও, কেন এবং কিভাবে বার্ধক্য ঘটে— সেটার ব্যাখ্যা খোঁজার অন্য প্রচেষ্টাও নেয়া হয়েছে। যে তত্ত্বের পক্ষে দলিল-প্রমাণ এসেছে 'প্রতিটি প্রজাতির সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল জিনগতভাবে (জেনেটিক্যালি) নির্ধারিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে' এই ধারণা থেকে। যদিও মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল রয়েছে স্থিতিশীল (প্রায় ১২০ বছর)। এ কথাও গবেষণায় এসেছে যে, শৈশবে আমাদের কিছু জিন মস্তিষ্কের হরমোনের পরিবর্তন ঘটিয়ে দেহের কোষ বিভাজন ও মেরামত প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়ে এসে, যে জিনগুলো দৈহিক বৃদ্ধি ঘটাচ্ছিল, সেগুলো 'সুইচ অফ' বা বন্ধ হয়ে যায়। আর যে জিনগুলো বার্ধক্যের সূত্রপাত করে, সেগুলো 'অন' হয়। এর ফলে দেহের কার্যক্রমে একটি শুরু হয় ধারাবাহিক ধীর পতন, যা চলতে থাকে মৃত্যু অব্দি। শুধুমাত্র দৈহিকভাবে নয় বরং কগনিটিভ (বুদ্ধিবৃত্তিক), ইমোশনাল (আবেগিক) ও মানসিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। কুরআনে মানবজীবনের বিভিন্ন স্তরকে আলোকপাত করে বার্ধক্যের যথার্থ বর্ণনা এসেছে।
📄 মৃত্যুর অভিজ্ঞতা
মৃত্যু হলো জীবনের উল্টোপিঠ। মৃত্যু ঘটে, যখন দেহ ও রূহের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, রূহ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আরেক জগতে পদার্পণ করে। [২] প্রত্যেক প্রাণীকে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কুরআনে এসেছে:
• 'প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। ... '(সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৮৫)
• অন্যত্র এসেছে: 'আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' (সূরাহ আম্বিয়া, ২১:৩৪-৩৫)
প্রত্যেকের মৃত্যুর সময় তাকদিরে সুনির্ধারিত। সেটিকে এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই দুনিয়াতে মানুষের আয়ুষ্কাল লিখিত হয়ে যায় তাকদির অনুসারে। যদি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়নি, তাহলে সে মরবে না, বেঁচে যাবে। একইভাবে কেউ যদি সব ধরনের আধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়ে আয়ু বৃদ্ধির যাবতীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করে, তবুও সে তার আয়ুষ্কাল এক সেকেন্ডও বাড়াতে পারবে না।
• 'আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে।...' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৪৫)
• 'তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।...' (সূরাহ নিসা, ৪:৭৮)
• আরেক জায়গায় এসেছে: 'আমি তোমাদের মৃত্যুকাল নির্ধারিত করেছি এবং আমি অক্ষম নই।' (সূরাহ ওয়াকিয়াহ, ৫৬:৬০)
মৃত্যুর সঠিক সময়, স্থান ও ধরণ সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অবগত। এটি গায়েবের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। বিষয়টি মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখার একটি হিকমত হলো, যেন মানুষ সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে উৎসাহিত হয়। কেননা, যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যু চলে আসতে পারে।
• 'নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকল্য সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।' (সূরাহ লুকমান, ৩১:৩৪)
টিকাঃ
[২] al-Ashqar, 2002a, p. 28.
📄 মৃত্যুপ যন্ত্রণা ও বিচ্ছন্নতা
মৃত্যুবরণের প্রক্রিয়াটি কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক, আল্লাহ বলেন,
• 'মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। এ থেকেই তুমি টালবাহানা করতে।' (সূরাহ কাফ, ৫০:১৯)
এই আয়াতে ব্যবহৃত (সাকারাতুল মাউত) শব্দটিকে 'মৃত্যুযন্ত্রণা' অনুবাদ করা হয়েছে। এটি একটি নেশাগ্রস্থ, ঘোরাচ্ছন্ন অবস্থা। মৃত্যুকালে একজন ব্যক্তি যন্ত্রণাদায়ক সেই অবস্থা অনুভব করবে। এটি মাতাল বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অনুরূপ, কেননা মুমূর্ষু ব্যক্তি থেকে সেরকম লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। যেমন ধরুন, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, স্মৃতিভ্রম, হতবুদ্ধিতা ও প্রলাপ বকা। সামগ্রিকভাবে এই অভিজ্ঞতা কষ্টকর ও মর্মান্তিক।
মুমিনদের চেয়ে কাফির ও গুনাহগারদের মৃত্যুকালে অধিক দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তারা ব্যাপক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাবে, যখন তারা বুঝতে পারবে তাদের সামনে কী ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করছে। আল্লাহ বলেন:
• 'ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলেঃ আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাজিল করে দেখাচ্ছি যেমন আল্লাহ নাজিল করেছেন।
যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! অদ্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াত সমূহ থেকে অহংকার করতে।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:৯৩)
এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুযন্ত্রণার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এ বিষয়ে হাদিসে বর্ণনা এসেছে। আযইশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছি তখন তিনি মৃত্যুর নিকটবর্তী। তাঁর সামনে একটি পেয়ালা ছিল, তাতে পানি ভরা ছিল। তিনি পেয়ালার মধ্যে হাত প্রবেশ করাচ্ছিলেন তারপর (হাতের সাথে লেগে থাকা) পানি দিয়ে চেহারা মুবারক মুছলেন তারপর বললেন, لَا إِلَهَ إِلَّا الله، إِنَّ لِلمَوْتِ لَسَكَرات
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! ইন্না লিল মাওতি সাকারাত! নিশ্চয়ই মৃত্যুর সাথে রয়েছে (সাকারাত) যন্ত্রণা।' এরপর তিনি দুই হাত উপরে উত্তোলন করে বারবার বলতে থাকেন, فِي الرَّفِيقِ الْأَعْلَى
সর্বোচ্চ সাথীর সান্নিধ্য! সর্বোচ্চ সাথীর সান্নিধ্য!
এ অবস্থায় তাঁর ইন্তিকাল হলো আর হাত শিথিল হয়ে গেল। (বুখারি)。
রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সেই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা যেকোনো একটি বিষয় বেছে নিতে সুযোগ দিয়েছিলেন, চাইলে তিনি এই দুনিয়াতে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন অথবা তিনি জান্নাতে নেক ব্যক্তিদের সাহচর্যে চলে যাবেন (নবি, সিদ্দিক, শহীদ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ)। তখন তাঁর চূড়ান্ত বক্তব্য ছিল, 'সর্বোচ্চ সাথী (আল্লাহর)র সান্নিধ্য!' এভাবে তিনি দুনিয়ার উপরে আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন।
📄 মৃত্যুর পূর্ব তাউবা
রূহ কণ্ঠাগত না হওয়া পর্যন্ত মুমূর্ষু ব্যক্তির তাওবা কবুলের দরজা খোলা থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রূহ কণ্ঠাগত না হওয়া (মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত) পর্যন্ত মহামহিম আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন (তিরমিযি, আহমাদ, সনদ নির্ভরযোগ্য)。
এখানে হাদিসের অনুবাদ করা হয়েছে 'কণ্ঠাগত না হওয়া পর্যন্ত', এর আক্ষরিক অনুবাদ হলো, 'যতক্ষণ না সে গরগর আওয়াজ করতে শুরু করে' ততক্ষণ পর্যন্ত। যখন রূহ দেহ ছেড়ে চলে যাওয়ার মুহূর্ত উপস্থিত হয়, সেই অবস্থায় মৃতব্যক্তি গরগর আওয়াজ করতে থাকে। এখানে সেটি বোঝানো হয়েছে。[১]
যখন রূহ দেহ ছেড়ে চলে যেতে থাকে সে অবস্থায় তওবা করলে কিংবা ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান করলেও সেটা কবুল হয় না। আল্লাহ বলেছেন,
• 'আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকেঃ আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।' (সূরাহ নিসা, ৪:১৮)
টিকাঃ
[১] al-Kanadi, 1996, p. 20 (footnote).