📄 স্বপ্ন
স্বপ্ন বিষয়ে নানা সমসাময়িক তত্ত্ব দেখা যায় কিন্তু সেগুলোতে কোনো নিষ্পত্তি আসেনি। কেননা, যিনি স্বপ্ন দেখেছেন কেবলমাত্র তিনিই নিজের স্বপ্ন 'ভেরিফাই' (যাচাই) করতে সক্ষম। এটি আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় নয়। এজন্যই স্বপ্নের প্রকৃত জ্ঞান ও ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসা সম্ভব। ইসলামে স্বপ্নকে ঐশী অনুপ্রেরণার মতো মনে করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উপর ওহীর সূচনা ঘটেছিল কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমেই। আর নবি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করতে আদিষ্ট হয়েছিলেনও স্বপ্নে। [১]
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিস থেকে জানা যায়, স্বপ্ন তিন প্রকারের হয়ে থাকে বা তিনটি উৎস থেকে আসে। তিনি বলেছেন, 'যখন কিয়ামতের সময় সন্নিকটে হবে তখন মুমিনের স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে, যে ব্যক্তি অধিক সত্যবাদী তার স্বপ্নও অধিক সত্য হবে। মুমিনের স্বপ্ন হলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। স্বপ্ন হলো তিন ধরনের:
(১) সৎ স্বপ্ন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ স্বরূপ।
(২) আরেক স্বপ্ন হলো শয়তানের পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য আতংক বা ক্লেশ স্বরূপ।
(৩) আরেক ধরনের স্বপ্ন হলো মানুষ মনে যা ভাবে বা তার সাথে যা ঘটে, তা স্বপ্নে দেখে। যদি কেউ কোনো অপছন্দনীয় বিষয়ে স্বপ্নে দেখে, তাহলে কাউকে বলা উচিত নয়; বরং উঠে গিয়ে সালাত আদায় করা উচিত।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তাই যখন কেউ পছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে তখন এমন ব্যক্তির কাছেই বলবে, যাকে সে পছন্দ করে। আর যখন অপছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে, তখন যেন সে এর ক্ষতি ও শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং তিনবার থুথু ফেলে। আর সে যেন তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।' (মুসলিম)
এই হাদিসের মাধ্যমে স্বপ্নের রকমফের অনুসারে নির্দিষ্ট আদবকেতা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি আপনি ভালো স্বপ্ন দেখবেন, তখন খুশিতে কেবল মুহাব্বতের লোকদেরকে জানাবেন। মন্দ স্বপ্ন দেখলে বামদিকে তিনবার থুথু ফেলবেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন অভিশপ্ত শয়তান, জিন ও স্বপ্নের ক্ষতি থেকে। অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে, এক্ষেত্রে ঘুমের পার্শ্ব পরিবর্তন করা উচিত। যদি কেউ বাম কাত হয়ে শুয়ে থাকে তাহলে সে ঘুরে গিয়ে ডান কাতে শয়ন করবে অথবা ঘুম থেকে উঠে দুই রাকাত সালাত আদায় করবে, যেমনটি মুসলিমের হাদিসে এসেছে। মন্দ স্বপ্নের ব্যাপারে চূড়ান্ত নির্দেশনা হলো সেগুলো কাউকে জানানো যাবে না। এ সকল পদক্ষেপ অনুসরণের মাধ্যমে স্বপ্নের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
টিকাঃ
[2] See Qur'an 37: 102
📄 স্বপ্নের ব্যাখ্যা
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল নির্বাচিত ব্যক্তিরাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের যোগ্যতা লাভ করেন, যেমন নবি-রাসূলগণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের কথা শুনতেন এবং সাধারণত তিনি সাহাবিদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন ফজর সালাতের পর。[৬] বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজর সালাত শেষ করার পর পেছনের দিকে ঘুরতেন এবং প্রশ্ন করতেন যে গত রাতে তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি না।
এখানে লক্ষ্য করা জরুরি, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারতেন কারণ আল্লাহ তাকে ফেরেশতা জিবরাইল এর মাধ্যমে সেই জ্ঞান প্রদান করতেন। এটি তাঁর নিজস্ব জ্ঞান বা অনুমান ছিল না, বরং সেই ব্যাখাগুলো ওহীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণে তাঁর সকল ব্যাখ্যা পরিপূর্ণ সঠিক ছিল।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে ইউসুফ (আ.) সুদক্ষ ছিলেন। সূরাহ ইউসুফে এসেছে,
• 'হে পালনকর্তা আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতাও দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্য সহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন।...' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:১০১)
কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় বন্দীদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন ইউসুফ (আ.), এবং তিনি রাজার সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাও প্রদান করেছিলেন যার ফলে মারাত্মক দুর্ভিক্ষের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন:
'বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী-এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক। তারা বলল, এটা কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন। এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই। দু'জন কারারুদ্ধের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পর স্মরণ হলে, সে বলল, আমি তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলছি। তোমরা আমাকে প্রেরণ কর। সে তথায় পৌঁছে বলল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে খাচ্ছে সাতটি শীর্ণ গাভী এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে আপনি আমাদেরকে ব্যাখা প্রদান করুন যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের অবগত করাতে পারি। বলল, তোমরা সাত বছর উত্তম রূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে। এবং এরপরে আসবে সাতটি কঠিন বছর; এই সাত বৎসর, যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকে তা খাবে; কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। এরপরেই আসবে একবছর-এতে মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিংড়াবে।' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:৪৩-৪৯)
স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ড. বিলাল ফিলিপস পাঁচটি মূলনীতি চিহ্নিত করেছেন: [৭]
১। নবি রাসুল ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তিরাও স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন।
২। কেবলমাত্র ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
৩। ভালো স্বপ্নের কেবল ইতিবাচক ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
৪। কেবল নবিদের ব্যাখ্যা শতভাগ সঠিক; অন্যান্য মানুষের ব্যাখ্যা সঠিক হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
৫। ভালো স্বপ্নে যা দেখা গেছে সেগুলোর উপর আমল করা বৈধ।
টিকাঃ
[৬] Philips, A. A. B., 1996, Dream Interpretation According to the Qur'an and Sunnah, Sharjah, UAE: Dar Al Fatah, p. 38.
[৭] Ibid., pp. 43-49.