📄 ঘুমের আবর্তকতা
ঘুমের আগে নবিজির বিভিন্ন সুন্নাত অনুসরণের জন্য মুসলিমদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ওযু করে ডান কাত হয়ে ঘুমানো। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যখন তুমি বিছানা গ্রহণ করবে, তখন নামাজের মত ওযু করবে, তারপর তোমার ডান পার্শ্বদেশে শুয়ে পড়বে। তারপর বল, 'হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার কাছেই সোপর্দ করলাম,..' (বুখারি ও মুসলিম)
ওযু করে শোয়া বাধ্যতামূলক নয় তবে বিভিন্ন কারণে এটি প্রশংসিত। ঘুমের আগে পবিত্রতা অবস্থায় শোয়া জরুরি কেননা ঘুমিয়ে গেলে রূহকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেটা ফেরত দেয়া হবে কিনা আমরা জানিনা। রূহ যদি ফিরিয়ে দেয়া না হয়, তবে পবিত্র অবস্থায় মৃত্যুটা হলো। আর পবিত্র অবস্থায় মৃত্যুবরণ তো আমাদের সকলেরই আকাঙ্ক্ষিত। আরেকটি বিষয় হলো, ওযু অবস্থায় দেখা স্বপ্ন সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং আপনি শয়তানের ক্ষতি থেকেও সুরক্ষিত থাকবেন。[৪] ডান কাতে ঘুমাতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও আবিষ্কৃত হয়েছে এর বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপকারিতা, যেমন- হৃদপিন্ডের ওপর কম চাপ সৃষ্টি হওয়া, হজমে সহযোগিতা, পিঠের জন্য উপকারিতা ইত্যাদি। বিভিন্ন হাদিসে উপুড় হয়ে ঘুমানোকে নিন্দা করা হয়েছে।
রাতে ঘুমানোর পূর্বে একজন ব্যক্তির উচিত কুরআনের সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন সূরাহ, বিশেষ আয়াত ও দুআ পাঠ করে ঘুমানো, যেন ক্ষতিকর বিষয় ও অশুভ জিন শয়তান হতে সে রাতে সুরক্ষিত থাকে। যেমন, কুরআনের সর্বশেষ তিনটি সূরাহ (ইখলাস, ফালাক ও নাস), আয়াতুল কুরসি (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৫৫) এবং সূরাহ বাকারার শেষের দুই আয়াত ইত্যাদি।
আইশা (রা.) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সা.) প্রতি রাতে যখন শয্যাগ্রহণ করতেন তখন তাঁর দুই অঞ্জলী একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন। সে সময় 'কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, কুল আউযু বিরাব্বিল-ফালাক এবং কুল আউযু বিরাব্বিন-নাস' পাঠ করতেন। তারপর উভয় হাতে যথাসম্ভব দেহ মাসেহ করতেন। মাথা চেহারা এবং শরীরের সামনের দিক থেকে তিনি তা শুরু করতেন। এভাবে তিনবার করতেন।' (বুখারি)
ঘুমের আগে পাঠ করার জন্য হাদিসে বিভিন্ন দুআ রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ যখন তার শয্যা গ্রহণ করতে বিছানায় আসে, সে যেন তার কাপড়ের আঁচল দিয়ে বিছানা ঝেড়ে নেয় এবং বিসমিল্লাহ পড়ে নেয়। কেননা, সে জানেনা যে, শয্যা ত্যাগ করার পর তার বিছানায় কি আছে। এরপর যখন সে শয্যা গ্রহণ করবে তখন যেন ডান কাত হয়ে শয্যা গ্রহণ করে। এরপর সে যেন বলে, হে আমার প্রতিপালক! আপনি পবিত্র। আপনার নামেই আমি আমার পাঁজর রাখলাম, আপনার নামেই তা উঠাব। আপনি যদি আমার প্রাণ নিয়ে দেন তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি আপনি তাকে ফিরিয়ে দেন তাহলে তাকে হিফাজত করুন যেভাবে আপনি আপনার নেক বান্দাদের হিফাজত করে থাকেন।' (বুখারি ও মুসলিম)
টিকাঃ
[৪] ash-Shulboob, F. A., 2003, The Book of Manners, Riyadh, Saudi Arabia: Darussalam, p. 280.
📄 স্বপ্ন
স্বপ্ন বিষয়ে নানা সমসাময়িক তত্ত্ব দেখা যায় কিন্তু সেগুলোতে কোনো নিষ্পত্তি আসেনি। কেননা, যিনি স্বপ্ন দেখেছেন কেবলমাত্র তিনিই নিজের স্বপ্ন 'ভেরিফাই' (যাচাই) করতে সক্ষম। এটি আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় নয়। এজন্যই স্বপ্নের প্রকৃত জ্ঞান ও ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসা সম্ভব। ইসলামে স্বপ্নকে ঐশী অনুপ্রেরণার মতো মনে করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উপর ওহীর সূচনা ঘটেছিল কিন্তু স্বপ্নের মাধ্যমেই। আর নবি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করতে আদিষ্ট হয়েছিলেনও স্বপ্নে। [১]
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিস থেকে জানা যায়, স্বপ্ন তিন প্রকারের হয়ে থাকে বা তিনটি উৎস থেকে আসে। তিনি বলেছেন, 'যখন কিয়ামতের সময় সন্নিকটে হবে তখন মুমিনের স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে, যে ব্যক্তি অধিক সত্যবাদী তার স্বপ্নও অধিক সত্য হবে। মুমিনের স্বপ্ন হলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। স্বপ্ন হলো তিন ধরনের:
(১) সৎ স্বপ্ন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ স্বরূপ।
(২) আরেক স্বপ্ন হলো শয়তানের পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য আতংক বা ক্লেশ স্বরূপ।
(৩) আরেক ধরনের স্বপ্ন হলো মানুষ মনে যা ভাবে বা তার সাথে যা ঘটে, তা স্বপ্নে দেখে। যদি কেউ কোনো অপছন্দনীয় বিষয়ে স্বপ্নে দেখে, তাহলে কাউকে বলা উচিত নয়; বরং উঠে গিয়ে সালাত আদায় করা উচিত।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তাই যখন কেউ পছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে তখন এমন ব্যক্তির কাছেই বলবে, যাকে সে পছন্দ করে। আর যখন অপছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে, তখন যেন সে এর ক্ষতি ও শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং তিনবার থুথু ফেলে। আর সে যেন তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।' (মুসলিম)
এই হাদিসের মাধ্যমে স্বপ্নের রকমফের অনুসারে নির্দিষ্ট আদবকেতা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি আপনি ভালো স্বপ্ন দেখবেন, তখন খুশিতে কেবল মুহাব্বতের লোকদেরকে জানাবেন। মন্দ স্বপ্ন দেখলে বামদিকে তিনবার থুথু ফেলবেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন অভিশপ্ত শয়তান, জিন ও স্বপ্নের ক্ষতি থেকে। অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে, এক্ষেত্রে ঘুমের পার্শ্ব পরিবর্তন করা উচিত। যদি কেউ বাম কাত হয়ে শুয়ে থাকে তাহলে সে ঘুরে গিয়ে ডান কাতে শয়ন করবে অথবা ঘুম থেকে উঠে দুই রাকাত সালাত আদায় করবে, যেমনটি মুসলিমের হাদিসে এসেছে। মন্দ স্বপ্নের ব্যাপারে চূড়ান্ত নির্দেশনা হলো সেগুলো কাউকে জানানো যাবে না। এ সকল পদক্ষেপ অনুসরণের মাধ্যমে স্বপ্নের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
টিকাঃ
[2] See Qur'an 37: 102
📄 স্বপ্নের ব্যাখ্যা
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল নির্বাচিত ব্যক্তিরাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের যোগ্যতা লাভ করেন, যেমন নবি-রাসূলগণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের কথা শুনতেন এবং সাধারণত তিনি সাহাবিদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন ফজর সালাতের পর。[৬] বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজর সালাত শেষ করার পর পেছনের দিকে ঘুরতেন এবং প্রশ্ন করতেন যে গত রাতে তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি না।
এখানে লক্ষ্য করা জরুরি, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারতেন কারণ আল্লাহ তাকে ফেরেশতা জিবরাইল এর মাধ্যমে সেই জ্ঞান প্রদান করতেন। এটি তাঁর নিজস্ব জ্ঞান বা অনুমান ছিল না, বরং সেই ব্যাখাগুলো ওহীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণে তাঁর সকল ব্যাখ্যা পরিপূর্ণ সঠিক ছিল।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে ইউসুফ (আ.) সুদক্ষ ছিলেন। সূরাহ ইউসুফে এসেছে,
• 'হে পালনকর্তা আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতাও দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্য সহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন।...' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:১০১)
কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় বন্দীদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন ইউসুফ (আ.), এবং তিনি রাজার সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাও প্রদান করেছিলেন যার ফলে মারাত্মক দুর্ভিক্ষের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন:
'বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী-এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক। তারা বলল, এটা কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন। এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই। দু'জন কারারুদ্ধের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পর স্মরণ হলে, সে বলল, আমি তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলছি। তোমরা আমাকে প্রেরণ কর। সে তথায় পৌঁছে বলল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে খাচ্ছে সাতটি শীর্ণ গাভী এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে আপনি আমাদেরকে ব্যাখা প্রদান করুন যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের অবগত করাতে পারি। বলল, তোমরা সাত বছর উত্তম রূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে। এবং এরপরে আসবে সাতটি কঠিন বছর; এই সাত বৎসর, যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকে তা খাবে; কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। এরপরেই আসবে একবছর-এতে মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিংড়াবে।' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:৪৩-৪৯)
স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ড. বিলাল ফিলিপস পাঁচটি মূলনীতি চিহ্নিত করেছেন: [৭]
১। নবি রাসুল ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তিরাও স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন।
২। কেবলমাত্র ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
৩। ভালো স্বপ্নের কেবল ইতিবাচক ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
৪। কেবল নবিদের ব্যাখ্যা শতভাগ সঠিক; অন্যান্য মানুষের ব্যাখ্যা সঠিক হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
৫। ভালো স্বপ্নে যা দেখা গেছে সেগুলোর উপর আমল করা বৈধ।
টিকাঃ
[৬] Philips, A. A. B., 1996, Dream Interpretation According to the Qur'an and Sunnah, Sharjah, UAE: Dar Al Fatah, p. 38.
[৭] Ibid., pp. 43-49.