📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 জ্ঞান

📄 জ্ঞান


মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসগত বিষয়ে জ্ঞানের গুরুত্ব সুস্পষ্ট। যার কারণে এর মর্যাদাও অনেক বেশি। জ্ঞান ছাড়া আমরা কেবল বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিশুদ্ধ ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো অসম্ভব। অবশ্য মনন-চর্চার দ্বারাও জ্ঞান অর্জিত হতে পারে। জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন বিষয়ের ভুল-শুদ্ধ, হালাল-হারাম জানতে পারি। আর আমাদের সহজাত ফিতরাতের বৈশিষ্ট্য যেহেতু একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। কিন্তু তা বিশুদ্ধভাবে করা অসম্ভব এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যজ্ঞান না থাকলে।
জ্ঞানের গুরুত্ব
যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে প্রথম ওহী নিয়ে ফেরেশতা জিবরাইল এলেন, সেই ঘটনার মাধ্যমে ইসলামে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি ফুটে উঠেছে:
• 'পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।' (সূরাহ আলাক্বক, ৯৬:১-৫)
বিগত অধ্যায়ের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি, আল্লাহ তাআলা আদমকে বিভিন্ন বস্তুর নামকরণের যোগ্যতা প্রদান করেছিলেন। এই যোগ্যতা তিনি ফেরেশতাদেরকে দেননি। নতুন কিছু শেখা ও বোঝার এই ক্ষমতার কারণেই আমরা অন্যান্য সৃষ্টি থেকে অনন্য। এবং এই ক্ষমতাটি আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাথে সরাসরি যুক্ত। জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা ছাড়া কোনো কিছু যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কার্যতঃ অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।' (মুসলিম)। এই বাধ্যবাধকতা আমাদের পুরোটা জীবনব্যাপী বজায় রয়েছে, যতক্ষণ না আমাদের চিন্তাশক্তি ও বোঝার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে (বার্ধক্য বা রোগ-ব্যাধির কারণে)।
জ্ঞান অর্জনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আমাদের খুঁজে দেয় সরল পথ এবং এই পথে অটল থাকতেও আমাদের সহায়তা করে। সত্য ও বিশুদ্ধ জ্ঞান ব্যতীত আমাদের দুনিয়ার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে, ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে অবশেষে। এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বারবার কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে,
• '... আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।' (সূরাহ ফাতির, ৩৫:২৮)
• 'এ সকল উদাহরণ আমি মানুষের জন্যে দেই; কিন্তু জ্ঞানীরাই তা বোঝে।' (সূরাহ, ২৯:৪৩)
• অন্যত্র বলেছেন, '... বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৯)
• অন্যত্র বলেছেন, '... তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।...' (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:১১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যদি আল্লাহ কোনো ব্যক্তির কল্যাণের ইচ্ছা করেন তবে তাকে দ্বীনের বোধশক্তি প্রদান করেন (কুরআন ও হাদিস বোঝার ক্ষমতা প্রদান করেন)।' (বুখারি)।
তিনি আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইলম (কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান) হাসিলের জন্য কোনো রাস্তা অতিক্রম করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের রাস্তাসমূহের মধ্যে একটি রাস্তা অতিক্রম করান। আর ফেরেশতারা তালিবে-ইলম বা জ্ঞান অন্বেষণকারীর জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন এবং আলিমের জন্য আসমান ও জমিনের সব কিছুই মাগফিরাত কামনা করে, এমনকি পানিতে বসবাসকারী মাছও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আবিদের উপর আলিমের ফজিলত এরূপ, যেরূপ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের ফজিলত সমস্ত তারকারাজির উপর। আর আলিমগণ হলেন, নবিদের ওয়ারিস, এবং নবিগণ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও দিরহাম (রৌপ্যমূদ্রা) মীরাছ হিসাবে রেখে যান না, বরং তাঁরা রেখে যান- ইলম। কাজেই যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করল, সে প্রচুর সম্পদের মালিক হলো।' (আবু দাউদ, তিরমিযি, উত্তম সনদে বর্ণিত হাদিস)।
উল্লেখিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলোতে ইলম অর্জনের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ইলম নিজে শেখা ও অপরকে শেখানোর মধ্যে নিহিত আছে অনেক উপকারিতা ও ফজিলত। মানুষ যত রকম কর্মকাণ্ড ও চেষ্টায় শ্রম দিয়ে থাকে, তার মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ। ইলমচর্চার পুরস্কারও কল্পনাতীত। বাস্তবেও কারো পক্ষে জ্ঞান ব্যতীত উচ্চ মর্যাদা অর্জন সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান ও সত্য পথসহ (দুনিয়ায়) পাঠিয়েছেন, তার উপমা বৃষ্টির মতো। বৃষ্টির পানি কোনো ভালো জমিতে পড়লে জমির উর্বর অংশ তা শুষে নেয় এবং নতুন নতুন তাজা ঘাস জন্মায়। অপরদিকে জমির শুকনো অংশে বৃষ্টির পানি আটকে থাকে এবং আল্লাহ তার দ্বারা মানুষের উপকার করেন। তারা সেখান থেকে পানি তুলে নিয়ে পান করে এবং তা দিয়ে জমিতে সেচকার্য চালায় এবং ফসল উৎপাদন করে। জমির আর এক অংশ থাকে ঘাসহীন অনুর্বর, সেখানে পানিও আটকায় না, ঘাসও জন্মায় না। এটা হলো সেই লোকের উপমা, যে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে গভীর বুৎপত্তি লাভ করে এবং আল্লাহ যা কিছু দিয়ে আমায় পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হয়। এভাবে সে নিজেও জ্ঞান অর্জন করে এবং অপরকেও জ্ঞান দান করে। অপরদিকে শেষোক্ত দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির যে দ্বীনি জ্ঞানের দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না এবং আল্লাহর যে বিধানসহ আমায় পাঠানো হয়েছে তা সে গ্রহণও করে না।' (বুখারি)
উক্ত হাদিসে আলোকপাত করা হয়েছে, ইলমের সাথে সম্পর্কিত মানুষ তিন প্রকার। প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হলো যারা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জন করে, নিজেরাও আমল করে এবং অন্যদের কাছে সেটা পৌঁছে দেয়। এই ধরনের লোকেরা নিজেরা জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় এবং অন্যান্য মানুষের কাছেও জ্ঞানের উপকারিতা পৌঁছে দিয়ে উপকৃত হয়। এর ফলে তারা সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে। দ্বিতীয় প্রকারের মধ্যে রয়েছে যারা জ্ঞান অর্জন করে এবং অন্যদের কাছেও সেটা পৌঁছে দেয় কিন্তু নিজেরা জ্ঞানের সকল চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এই ধরনের লোকেরা প্রথম দলের তুলনায় কম মর্যাদাবান এবং তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করা হতে পারে। শেষ প্রকার হলো যারা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেগুলো এড়িয়ে চলে। তারা নিজেরা ইলম শেখে না অথবা অপরের কাছ থেকে নিজের উপকারের জন্য শোনে না কিংবা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করে না। এরাই তিন প্রকারের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, 'কেবল মাত্র দুই ধরনের ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা রাখা যেতে পারে, একজন এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং ন্যায়পথে তা ব্যয় করার মত ক্ষমতাবান বানিয়েছেন। অপরজন এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ হিকমত (প্রজ্ঞা, দ্বীনের জ্ঞান) দান করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা দেন ও অন্যান্যকে তা শিক্ষা দেন।' (বুখারি)
কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে ঈর্ষা করা বৈধ কেননা এই দুইক্ষেত্রে আমলকারী ব্যক্তির উচ্চ মর্যাদা ও সদগুণ প্রকাশিত হয়েছে। অন্যের নিয়ামত দেখে হতাশাগ্রস্ত হওয়া বা অভিযোগ পেশ করা বা তার ক্ষতি হোক এমন ইচ্ছা পোষণ করা – এখানে এখানে ঈর্ষার অর্থ নয়। বরং অন্যের সদগুণ, যোগ্যতা, আল্লাহর নিয়ামত লাভ ইত্যাদি দেখে নিজেও অনুরুপ লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করাকে বোঝানো হয়েছে। এই হাদিসে 'হিকমত' বা প্রজ্ঞা শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে কুরআন ও হাদিসের গভীর জ্ঞান, যে জ্ঞান মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী। কল্যাণ কেবল এই জ্ঞানের মাঝেই যার দ্বারা আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলি (রা.) কে বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ একটি লোককেও সুপথ প্রদর্শন করলে সেটা তোমার জন্য (মূল্যবান) লাল উটের চেয়ে উত্তম।' (বুখারি ও মুসলিম)
লাল উটের থেকেও উত্তম এই উপমা প্রদানের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে এটি অন্য সবকিছুর থেকে উত্তম। সেই সময়ে আরবে লাল উটকে অত্যন্ত দামী ও মূল্যবান বিবেচনা করা হতো। এই হাদিসে সেই লাল উটের দৃষ্টান্ত পেশ করে হিদায়েতের গুরুত্ব ও মূল্য বোঝানো হয়েছে। মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবানের পূর্বে নিজের ইলম থাকতেই হবে। কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান হাসিল করা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ইলম ছাড়া কেউ আরেকজনকে হিদায়াত এর দিশা প্রদান করতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'দুনিয়া অভিশপ্ত এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে সেগুলোও অভিশপ্ত। তবে অভিশপ্ত নয় কেবল আল্লাহর জিকর ও তাঁর আনুগত্য এবং আলিম ও ইলম হাসিলকারী।' (তিরমিযি, ইবনু মাজাহ, সনদ নির্ভরযোগ্য)
এই হাদিসে বোঝানো হয়েছে দুনিয়ার সবকিছুই অভিশপ্ত যদি সেগুলো কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন বানিয়ে দেয়। এর আরেকটি অর্থ হতে পারে, তাদের জন্য দুনিয়া অভিশপ্ত যারা সারাজীবনে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহকে স্মরণ করে না। জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা একজন ইবাদাতকারী বান্দাকে অবশ্যই জানতে হবে কোনো কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর কীসে তাঁর অসন্তুষ্টি। এ কারণে জ্ঞানের ধারক-বাহক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে উল্লেখিত হাদিসে অভিশপ্ত বিষয়বস্তুর বাইরে রাখা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আবিদের (ইবাদাতকারীর) ওপর আলিমের (জ্ঞানীর) শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক তেমনি পর্যায়ের যেমন তোমাদের একজন সাধারণ মুসলমানের ওপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যারা লোকদেরকে দ্বীনের ইলম শেখায় আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ এবং পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীবৃন্দ এমন কি গর্তে অবস্থানকারী পিঁপড়া, এমনকি মাছেরাও তাদের জন্য দুআ করে। (নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় বর্ণিত তিরমিযির হাদিস)।
'আলিম' শব্দের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের ব্যাপারে জ্ঞানী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা নিজেরা ফরজ আমল পালন করেন, সুন্নাত অনুসরণ করেন এবং সে মোতাবেক জ্ঞান অর্জন করেন ও অপরকে শিক্ষা প্রদান করেন। আর আবেদ হলো সেই ব্যক্তি যে তার অধিকাংশ সময়ে আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দেয়। এই হাদিসের মাধ্যমে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা ও জমিনের অন্যান্য সকল সৃষ্টির কাছে আলিমদের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সেই ব্যক্তির উপর আল্লাহর রহমত করেন যিনি মানুষকে উপকারী জ্ঞান (ইসলামের জ্ঞান) শিক্ষা দেন। ফেরেশতারা তাঁর মাগফিরাত ও গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেন। অন্যান্য সৃষ্টিও তাঁর কল্যাণের দুআ করেন। একজন আবিদের উপরে আলেমের শ্রেষ্ঠত্বের একটি কারণ হলো আলিমের ইলমের উপকারিতা সমাজের অন্যান্য মানুষদের কাছেও পৌঁছে যায়, অপরদিকে আবিদের নফল আমল ও আল্লাহর স্মরণের উপকারিতা কেবল তাঁর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কিন্তু কোন জ্ঞান?
আমরা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।' (মুসলিম)। কিন্তু আজকাল দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই হাদিসকে সব ধরনের জ্ঞানের ক্ষেত্রে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন ধর্মীয় জ্ঞানের বাধ্যবাধকতার প্রতি। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, তাঁর নাম ও গুণবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ জানা, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য অনুধাবন করা, কিভাবে ইবাদাত করতে হবে, আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে এবং দুনিয়াতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ কিভাবে আমাদের আখিরাতের জীবনকে প্রভাবিত করবে ইত্যাদি বিষয় বাধ্যতামূলক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বুঝে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ; ব্যক্তিগতভাবে যে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক (ফরজে আইন) তার সাথে সমষ্টিগত বাধ্যতামূলক (ফরজে কিফায়া) জ্ঞানের কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য যে জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক তার মধ্যে রয়েছে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান, যেমন- কুরআন ও হাদিস বোঝা, ঈমান, আকিদা, ইবাদাত বন্দেগি, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানসমূহ ও দৈনন্দিন বিষয়াদির হালাল-হারাম সংক্রান্ত জ্ঞান। আর সমাজের উপর সামষ্টিকভাবে যে জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক সেগুলো মুসলিম সমাজের কিছু ব্যক্তির মধ্যে থাকলেই যথেষ্ট। তখন বাকি মানুষের উপর সেই বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। কিন্তু যদি সমাজের কেউ সেই দায়িত্ব পূরণ না করে, তাহলে প্রত্যেকেই দায়ী থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি শরীয়ত সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন, চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশল বিদ্যা, শিক্ষাদান ও অন্যান্য বিষয়।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতা

📄 প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতা


জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য কী— তা নিয়ে যুগে যুগে মানব জাতি বহু আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করেছে। কিভাবে এ বিষয়ে প্রজ্ঞা অর্জন করা যেতে পারে, এ নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। সেক্যুলার পরিভাষায় প্রজ্ঞা (উইজডম) অর্থ: সঠিক বিষয়টি বাছাই করার ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। এটি অভিজ্ঞতালব্ধ বুদ্ধি এবং গভীর অনুধাবন শক্তি ও অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে পরিশীলিত তথ্যকে বোঝায়। যদিও এ বিষয়টিকে অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সংযুক্ত করা হয়, কিন্তু দুনিয়াবী বিষয়ে জ্ঞানার্জন প্রজ্ঞাবান হওয়ার জন্য কোনো জরুরি শর্ত নয়। পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি, সেক্যুলার শিক্ষা পদ্ধতির প্রধান মনোযোগ থাকে বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের উপর; আধ্যাত্মিক বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় খুব অল্পই।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে 'স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স' নামে নতুন একটি পরিভাষা আনা হচ্ছে। এর সংজ্ঞা হিসেবে বলা হচ্ছে; ('স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স' হলো) আধ্যাত্মিক তথ্য উপাত্তের মানানসই (adaptive) ব্যবহার যা দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে ও লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে。[৫] নিম্নের বিষয়গুলোর প্রস্তাব করা হয়েছে 'স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স' এর উপাদান হিসেবে;
১। দৈহিক ও মানসিক (সীমাবদ্ধতা) অতিক্রমের ক্ষমতা。
২। আশপাশ সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন থাকার সামর্থ্য।
৩। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে পরিশুদ্ধ করার সামর্থ্য।
৪। আধ্যাত্মিক উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য।
৫। নিষ্ঠাবান বা গুণবান হবার ক্ষমতা। [৬]
স্পিরিচুয়ালিটির (আধ্যাত্মিকতা) সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক। এরমধ্যে নানাবিধ চিন্তাচেতনা, বিশ্বাস, মতাদর্শ ও আচার-অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, প্রজ্ঞার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংজ্ঞাটিকে ফোকাস করা হয়, সর্বজ্ঞানী আল্লাহর নাজিলকৃত ওহীর উপর ভিত্তি করে।
আল্লাহর প্রজ্ঞা
চূড়ান্ত প্রজ্ঞা আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি সর্বজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাবান। বিষয়টি একেবারে সুস্পষ্ট। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এর উল্লেখ রয়েছে,
• 'যে কেউ পাপ করে, সে নিজের পক্ষেই করে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ নিসা, ৪:১১১)
• 'নভোমন্ডলে ও ভূ-মন্ডলে তাঁরই গৌরব। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ জাছিয়া, ৪৫:৩৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনার পালনকর্তাই তাদেরকে একত্রিত করে আনবেন। নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাবান, জ্ঞানময়।' (সূরাহ হিজর, ১৫:২৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও
সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ মুমিন, ৪০:৮)
মানুষের কখনো এমন ধারণা পোষণ করা উচিত নয় যে তারা আল্লাহর থেকেও প্রজ্ঞাবান! কেননা, এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত যা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। বাস্তবে মানুষের প্রজ্ঞা মহান আল্লাহর প্রজ্ঞার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। তিনি নিজ ইচ্ছামাফিক প্রজ্ঞা ও অনুধাবন শক্তি প্রদান করেন, আর যাকে ইচ্ছা তা থেকে বঞ্চিত করেন।
কুরআনে প্রজ্ঞা
মানুষ কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর দেয়া প্রজ্ঞার কিছু অংশ অর্জন করতে পারে। বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, কুরআন প্রজ্ঞাবান গ্রন্থ। আল্লাহ বলেছেন,
• 'প্রজ্ঞাময় কোরআনের কসম।' (সূরাহ ইয়াসীন, ৩৬:২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমি একে করেছি কোরআন, আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝ। নিশ্চয় এ কোরআন আমার কাছে সমুন্নত অটল রয়েছে লওহে মাহফুযে।' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৩-৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রজ্ঞা
রাসূলুল্লাহ (সা.) কে আল্লাহর প্রজ্ঞা থেকে কিছু বিশেষ প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে তাকে নবি ও রাসূল হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। সেই প্রজ্ঞা সংরক্ষিত হয়েছে হাদিস ও সুন্নতের মাধ্যমে। এগুলো আল্লাহর ওহীরই অংশ। ফেরেশতা জিবরাইল রাসূলের অন্তরে প্রজ্ঞা স্থাপন করেছেন। নবিজি (সা.) বলেছেন, 'আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু' অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর (ফেরেশতা) দু' ব্যক্তির মাঝে থাকা ব্যক্তিকে (আমাকে) উল্লেখ করে বললেন, 'আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হলো-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেট যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হলো। তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল...' (বুখারি)
রাসূলকে যে প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তার আলোচনা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে। সাধারণত তাকে যে কিতাব প্রদান করা হয়েছে অর্থাৎ কুরআনের প্রসঙ্গে সেই হিকমতের কথা উল্লেখ করা হয়,
• 'তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।' (সূরাহ জুমুয়াহ, ৬২:২)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘...আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশী গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম।’ (সূরাহ নিসা, ৪:১১৩)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘... আল্লাহর সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা তোমাদের উপর নাজিল করা হয়েছে যার দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়....' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৩১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর আল্লাহ যখন নবিগনের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহন করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অতঃপর তোমাদের নিকট কোন রসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে দেয়ার জন্য, তখন সে রসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে....' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৮১)
রাসূলের প্রজ্ঞার বাস্তব নিদর্শন হলো তার সুন্নাহ। মুসলিমরা সুন্নাহর সাথে লেগে থাকতে এবং নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির জীবনযাপন কেমন হতে পারে, আল্লাহর রাসূল (সা.) তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। রাসূলের সুন্নতের পেছনে কি কি হিকমত বা প্রজ্ঞা রয়েছে সেগুলোর সবটা আমরা নাও জানতে পারি, কিন্তু এরপরেও আমরা সেগুলো পালন করে চলি আল্লাহর আদেশ বলে। কেননা, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন আমাদের জন্য কোনো কোনো বিষয় উপকারী এবং তিনি সেগুলোর নির্দেশনাই প্রদান করেছেন।
লুকমান হাকিমের বিজ্ঞতা
কুরআনে যে সকল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের আলোচনা এসেছে তাদের মধ্যে লুকমান হাকিম অন্যতম। তাকে অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লুকমান দুনিয়াবী রাজত্ব ও ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি কিংবা ভিন্ন বর্ণনায় গোলাম। তাঁর 'প্রকৃত মানবিয় প্রজ্ঞা' উৎসারিত হয়েছে আসমানী প্রজ্ঞার উৎস হতে। সুতরাং সকল প্রজ্ঞার সূত্রপাত তখনই ঘটে যখন আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক জীবনকে চালানো হয়- অর্থাৎ আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক কী তা বুঝতে হবে এবং তাঁর ইবাদাত করতে হবে যথোপযুক্তভাবে। লুকমান (আ.) এর এই গভীর বোধশক্তি ছিল। আল্লাহ বলছেন:
• 'আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যানের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত。
• যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলল, হে বৎস, আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়。
• আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।
• পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো।
• হে বৎস, কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূ-গর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ গোপন ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।
• হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।
• অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।
• পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।' (সূরাহ লুকমান, ৩১:১২-১৯)
এই আয়াতগুলোতে প্রজ্ঞার মূল বিষয়গুলোর বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে এবং কিভাবে সেগুলো জীবনে প্রয়োগ করা যেতে পারে, তা আলোচিত হয়েছে। সেই প্রকৃত জ্ঞানী যে এই নির্দেশনাগুলো বুঝতে সক্ষম এবং স্বেচ্ছায় সেগুলো অনুসরণ করে পরিপূর্ণভাবে। পরিতৃপ্ত ও পরিপূর্ণ জীবনের জন্য এগুলো এক সুমহান নির্দেশিকা।

টিকাঃ
[২] Emmons, R. A., 2000, Is spirituality an intelligence? Motivation, cognition, and the psychology of ultimate concern, The International Journal of the Psychology of Religion, 10, p. 3.
[৬] Ibid., p. 10.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 জ্ঞানী সম্প্রদায়

📄 জ্ঞানী সম্প্রদায়


আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা প্রদান করেন। কুরআনের ভাষায় তাদেরকে বলা হয় প্রজ্ঞাবান সম্প্রদায় (أُولُو الألباب)। আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উপহার লাভ করা এক অসাধারণ নিয়ামত। তিনি বলেন,
• 'তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৬৯)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমি এদের পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধবংস করেছি। যাদের বাসভূমিতে এরা বিচরণ করে, এটা কি এদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করল না? নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।' (সূরাহ ত্বহা, ২০:১২৮)
বুদ্ধিমান ব্যক্তিবর্গ বোঝাতে এখানে যে আরবি শব্দ (أولي النهى) ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ বুদ্ধিমত্তা, অনুধাবন শক্তি, বোধশক্তি ইত্যাদি। আর পুরো আয়াতে জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি বলতে বোঝানো হয়েছে যারা পূর্ববর্তী উম্মাতের ঘটনাগুলো পাঠ করে এবং সেখান থেকে শিক্ষা আহরণ করে তাদেরকে।
বাস্তবতা হলো, দুনিয়াবী বিষয়ের বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন শক্তিকে প্রজ্ঞা বলা হয় না; বরং প্রজ্ঞা হলো আল্লাহ ও তাঁর আদেশ-নিষেধের কাছে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে আত্মসমর্পণ করাই হলো প্রজ্ঞা। মানুষের প্রজ্ঞা সম্পর্কে বিনয়ের সঙ্গে কেবল এতটুকু বলা যায় যে, আমাদের প্রজ্ঞাটুকু মহাপ্রজ্ঞার একচ্ছত্র অধিকারী আল্লাহর প্রজ্ঞার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র, আর এটাও যে তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন, তা তাঁর অপার করুণা আর অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00