📄 রাগ
সাধারণভাবে রাগকে নেতিবাচক আবেগ হিসেবে ধরা হয়, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। তবে আল্লাহর খাতিরে রাগের বৈধতা রয়েছে। বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যে রেগে ওঠা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মুমিনরা এ সময়ও নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং আল্লাহর দেয়া সীমা লঙ্ঘন করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবলমাত্র তখনই রেগে যেতেন, যদি দেখতেন আল্লাহর হক নষ্ট করা হচ্ছে। যেমন ধরুন, তিনি রেগে গিয়েছিলেন যখন তাকে একজন ইমামের ব্যাপারে অভিযোগ করা হয়েছিল যে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করেন, ফলে লোকেদের কষ্ট হয়। আরেকবার রাগ করেছিলেন যখন তিনি আম্মাজান আইশার ঘরে প্রাণীর ছবি যুক্ত পর্দা দেখতে পেলেন, তখন।
আরেক ঘটনায় যখন উসামা ইবনু যায়েদ এসে একজন মহিলা চোরের ব্যাপারে সুপারিশ করেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন তার সুপারিশের ভিত্তিতে হয়তো শাস্তি কমিয়ে দেয়া হবে। রাসূল (সা.) বলেছিলেন, 'তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘনকারিণীর সাজা (হাত কাটা) মওকুফের সুপারিশ করছ?' (বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রাগ সম্পর্কে কুরআনে এভাবে আলোচনা করেছেন,
• 'যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন। (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কার্য থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে,....' (সূরাহ শুরা, ৪২:৩৭)
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, 'কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করাতে বীরত্ব নেই, বরং ক্রোধের মুহূর্তে নিজকে সংবরণ করতে পারাই প্রকৃত বীরত্বের পরিচায়ক। (বুখারি, মুসলিম)
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, জনৈক ব্যক্তি এসে নবি (সা.) কে বলল, আমাকে কোনো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার একই অনুরোধ করল। প্রত্যেকবার নবি (সা.) বললেন, 'রাগ করো না! রাগ করো না!' (বুখারি)
রাসূলুল্লাহ (সা.) রাগ প্রশমনের বিভিন্ন উপায় ও পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন যেন মানুষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো আল্লাহর কাছে শয়তানের ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে রাগকে রূপান্তরিত করে ক্রোধে। সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবি (সা.)-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। তখন দুজন লোক পরস্পর গালমন্দ করছিল। তাদের এক জনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল। তখন নবি (সা.) বললেন, আমি এমন একটি দুআ জানি, যদি লোকটি পড়ে তবে সে যে রাগ অনুভব করছে তা দূর হয়ে যাবে। (তিনি বললেন) সে যদি পড়ে "আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তান”-আমি শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তবে তার রাগ চলে যাবে... (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি রেগে ওঠে এবং বলে আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম; তাহলে তারা রাগ চলে যাবে। (বুখারি)
রাগ নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে নীরবতা অবলম্বন ও অবস্থান পরিবর্তন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।' (বিশুদ্ধ হাদিস, আহমদ)। রেগে গেলে চুপ করে থাকা ও নীরবতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেউ রেগে গেলে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং কুফরি কথা পর্যন্ত উচ্চারণ করে ফেলে অথবা অন্য ব্যক্তিকে অভিশাপ বা গালমন্দ করে কিংবা নিজের স্ত্রীকে রাগান্বিত হয়ে তালাক পর্যন্ত দিয়ে দেয়। নীরব থাকলে নিজের ও নিজের প্রিয়জনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এভাবে অন্য ব্যক্তির সাথে বৈরিতা, ঘৃণা ও তিক্ততা সৃষ্টির সম্ভাবনাকেও সীমিত রাখা যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে যদি সে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে যেন বসে যায়। তবে তার রাগ নেমে যাবে। যদি এতে রাগ চলে না যায় তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে।' (বিশুদ্ধ হাদিস, আহমদ)। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে যাওয়া কিংবা মাটিতে শুয়ে পড়ার মাধ্যমে কাউকে শারীরিক ক্ষতি করা বা আঘাত করার সম্ভাবনা কমে যায়। রেগে গেলে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তি বা বস্তুর ক্ষতি হতে পারে, কাউকে আঘাত করে ফেলতে পারে, সেখান থেকে জখম কিংবা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই রাগ পড়ে গেলে মানুষ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, লজ্জিত বোধ করে রাগান্বিত অবস্থায় ঘটে যাওয়া কাজের জন্য। সুতরাং সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে রাগের অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টির সম্ভাব্য সকল রাস্তা আটকে দেয়া।
মুমিন অবশ্যই রাগ নিয়ন্ত্রণের বিশাল পুরস্কারের কথা স্মরণে রাখবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'রাগান্বিত অবস্থায় প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহ তার অন্তরকে বিচার দিবসে পরিতৃপ্তিতে ভরে দেবেন।' (বিশুদ্ধ হাদিস, তাবারানি)। আরেক হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর থেকে নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।' (ইবনু মাজাহ)
রাগ এবং সুস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য। রাগ এবং বৈরিতা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় (রিস্ক ফ্যাক্টর) এবং এই রাগ থেকেও হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। রাগের কারণে সৃষ্টি হয় উচ্চ রক্তচাপের। এছাড়া স্ট্রোক এবং ডায়াবেটিসেও রাগের কম-বেশি ভূমিকা রয়েছে。[৬] সুতরাং মানসিক এবং সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি রাগের দরুণ দৈহিক ক্ষতিও হয়ে থাকে। দীর্ঘসময় রেগে থাকার ভিতরে কোনো কল্যাণ নেই। এক্ষেত্রে একমাত্র রাসূল (সা.) এর সুন্নাত অনুসরণের মধ্যেই নিশ্চিত স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিহিত।
টিকাঃ
[৬] Taylor, S., 2006, Health Psychology (6th Ed.), Boston, MA: McGraw-Hill, p. 348.
📄 আবেগের সারকথা
নিজেদের ঈমান ও দ্বীনদারিতা মজবুত করে আমরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে পারি। কুরআন জানাচ্ছে, যারা আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলবে, তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে নেতিবাচক আবেগ লাঘবের মাধ্যমে। আল্লাহর তরফ থেকে এটি মুমিন বান্দাদের উপর এক বিরাট অনুগ্রহ। আল্লাহ বলেছেন,
• 'আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হিদায়াত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও দুঃখিত হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩৮)
এ বিষয়টি পৃথক অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।