📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আশা

📄 আশা


আশার সমার্থক বিষয় হলো সুধারণা পোষণ করা, ইতিবাচক মানসিকতা রাখা। আর বিপরীত বিষয় হলো নৈরাশ্য। আশাবাদী ব্যক্তি সবকিছুর মধ্যে উত্তম ও কল্যাণকর বিষয় প্রত্যাশা করে। যেমন- কোনো গ্লাসে অর্ধেক পানি থাকলে সে বলে, 'এই গ্লাসের অর্ধেকটা ভর্তি!' আশাবাদী ব্যক্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে বর্তমানকে বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক মানসিকতা থেকে এবং ভালো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মনে লালন করে। মুমিন হিসেবে আমরা সব সময় প্রতিটি বিষয়ে সর্বোত্তম ফলাফলের আশা রাখব। বিশেষত কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত ও ফজলের আশা হারানো যাবে না। আল্লাহ বলেন,
• 'পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। তাঁকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৫৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:১৬)
এই আয়াত দুটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে মুমিনের অন্তরে থাকা আশার কথা, যে আশা সে করে আল্লাহর ওয়াদাকৃত বিরাট পুরস্কারের জন্য। যে লোক বিচার দিবসকে স্মরণ রাখে এবং সেই দিনের সফলতা ও পুরস্কারের আশা রাখে, সে তো ভালো কাজে আরও উৎসাহ পাবে, এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়াবী প্রাপ্তিতে ঘাটতি হলেও আখিরাতের পুরস্কার ও সুখস্বপ্নের মাঝে সে সান্ত্বনা খুঁজে নেবে। আর আখিরাতের সবচেয়ে আনন্দদায়ক পুরস্কার তো হবে আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করা। সুবহানআল্লাহ。
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যদি কোনো কাফির আল্লাহর রহমত সম্পর্কে জানত, সে জান্নাতে প্রবেশের আশা হারাত না। আর যদি কোনো মুমিন আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে জানত, সে নিজেকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ মনে করত না।' (বুখারি)
আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক মুমুর্ষু বালককে দেখতে গেলেন। রাসূল (সা.) জানতে চাইলেন, তুমি কেমন বোধ করছ? বালক জবাব দিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয়ের মাঝামাঝি রয়েছি। তিনি বললেন, এই দুই অবস্থা একত্রে কোনো বান্দার অন্তরে জমা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে আশাকৃত বিষয় প্রদান করবেন ও ভীতিকর বিষয় থেকে বাঁচিয়ে দেবেন।' (তিরমিযি, ইবনু মাজাহ এর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা)。
একটি চমকপ্রদ বিষয়
'আশাবাদ ও সুস্বাস্থ্য' এই বিষয়ে গবেষণাগুলো আমাদের জানাচ্ছে, যারা তুলনামূলকভাবে অধিক আশাবাদী ও ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী, তারা অন্যদের চেয়ে ভালো দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উপভোগ করে থাকেন। আশাবাদী মানুষের ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ কম থাকে। আশাবাদী পুরুষদের মধ্যে হৃদরোগের (coronary heart disease) হার কম, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বেশি, সার্জারি থেকে দ্রুত সেরে উঠার হার বেশি। ইতিবাচকতার সাথে সুস্বাস্থ্যের যে সম্পর্ক, এর কারণ হতে পারে অনেকগুলো; যেমন- অন্যদের তুলনায় বেশি অ্যাক্টিভ থাকা, মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকা (coping effort), স্ট্রেস এর সাথে সুন্দরভাবে মানিয়ে নেয়া (চাপ ও ধকলপূর্ণ পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা), আশেপাশের মানুষের সহানুভূতি খোঁজা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন (শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যপ্রদ খাদ্যাভ্যাস) ইত্যাদি।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ভালোবাসা, ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য

📄 ভালোবাসা, ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য


প্রকৃত ঈমানদার ভালোবাসা, ভয় ও আশা— এই আবেগগুলোর মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে। কোনো একটিকে অন্যটির চেয়ে খুব বেশি প্রাধান্য দেয় না। আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি কারণ আমাদের উপর প্রতিনিয়ত অগণিত নিয়ামত দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একই সাথে আমরা নিজ গুনাহের দোষে তাঁর শাস্তি ও অসন্তুষ্টিকে ভয়ও করি। আবার একই সাথে আমরা এই আশাও রাখি যে, তিনি আমাদের ভালো আমলগুলো কবুল করে নেবেন এবং তাওবা কবুল করে গুনাহ মাফ করে দেবেন।
ইবনু রজব (রহ.) চমৎকারভাবে লিখেছেন, যদি কোনো মুসলিম আশা, ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে কেবল একটির ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে তবে সে ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্টতায় চলে যাবে। তিনি লিখেছেন,
'....যে ব্যক্তি ভয়, ভালোবাসা ও আশার ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে সে একজন মুওয়াহহিদ মুমিন (তাওহিদবাদী ঈমানদার)। প্রকৃত মুমিন কখনো অন্যগুলো বাদ দিয়ে কেবল একটি আবেগের প্রতি ঝুঁকে থাকে না। সেটা আশা, ভয় বা ভীতি যাই হোক না কেন। এককভাবে কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরা পথভ্রষ্ট দলগুলোর কাজ। এই জায়গায় ভারসাম্যহীনতার কারণে কেবলমাত্র আবেগই ভারসাম্যহীন হয় না, ঈমানও টালমাটাল হয়ে যায়। কাজেই প্রত্যেকটি আবেগিক উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যাতে করে একজন ব্যক্তির জন্য সত্যপথে চলার অনুপ্রেরণা মেলে বিশুদ্ধ নিয়তের সাথে।'[৩]

টিকাঃ
[3] Ibn Rajab, Worshipping Allah out of love, fear, and hope, retrieved October 10, 2010 fromhttp://abdurrahman.org/salah/worshippingallahoutof.html.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ঘৃণা

📄 ঘৃণা


যেভাবে আমরা আল্লাহ ও তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদেরকে ভালোবাসব, ঠিক তেমনিভাবে তাদেরকে ঘৃণা করব যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ ও তাঁর মনোনীত দ্বীন ইসলামের সক্রিয় বিরোধিতা করে। এই ঘৃণা হবে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে কোনো পদক্ষেপও নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখানো চলবে না। যে বিষয়গুলোর প্রতি ঘৃণা রাখা জরুরি তার মধ্যে রয়েছে কুফর (যখন অবিশ্বাসটা না জানার কারণে নয়), নিফাক, বিদআত এবং গুনাহ। কুফর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
• 'তোমাদের জন্যে ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদাত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে... (সূরাহ মুমতাহানা, ৬০:৪)
মুনাফিকরা ইসলামের নিকৃষ্টতম শত্রু। আল্লাহর ওয়াস্তে তাদেরকে ঘৃণা করা বাধ্যতামূলক। কুরআনে আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। সুতরাং একজন প্রকৃত ঈমানদারের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ছাড়া অন্য কিছুই থাকতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফির হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না। আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠসদৃশ্য। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে?' (সূরাহ মুনাফিকুন, ৬৩:২-৪)
একই কথা প্রযোজ্য ফাসেক, গুনাহগার ও বিদাতিদের ক্ষেত্রে। তাদের প্রতি ঘৃণার মাত্রা নির্ধারিত হবে ইসলাম হতে তাদের দূরত্ব অনুসারে।
অন্তরে ঘৃণা রাখার পর তাদের সাথে নিঃসম্পর্ক ঘোষণা করতে হবে। মুমিনদের কর্তব্য হলো যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, তাদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক ও দূরে রাখা। তাদের শত্রুতা ও বৈরিতার মাত্রানুসারে তাদের প্রতি শত্রুতা ও দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। সকল কাফিররাই এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন ইহুদি-খ্রিস্টান, নাস্তিক, মুশরিক, মুরতাদ নির্বিশেষে যারাই সক্রিয়ভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতির চেষ্টায় ব্যস্ত। এই বক্তব্যের সমর্থনে কুরআনের বহু আয়াত দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে কয়েকটি আয়াত সামনে উল্লেখ করা হলো:
আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:২২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৩-২৪)
এমন অনেক কাফির রয়েছে যারা ইসলামের বার্তা পায়নি এবং এ কারণে সেটা কবুল করেনি। আবার অনেকে ইসলামের বার্তা পেয়েছে কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছে। অবশ্য তারা ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতি করে না, কিংবা শত্রুদের সহায়তাও করে না। তারা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহর রাহে ঘৃণা ও ভালবাসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো আমাদের অন্তর। ইবনু তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন,
'কোনো কিছুর প্রতি ঘৃণা-ভালোবাসা বা পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ে অন্তরে অবশ্যই পরিপূর্ণতা থাকতে হবে। অন্তরে কোনো ঘাটতির অর্থ ঈমানের ঘাটতি, তা না হলে অন্তরে এ ব্যাপারে কোনো কমতি থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু কর্মের কথায় এলে, কর্ম মানুষের নিজ সামর্থ্য ও পরিস্থিতির অনুসারে কম-বেশি হতে পারে। কিন্তু অন্তরে কোনো কমতি থাকা চলবে না। অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ যখন পরিপূর্ণতা পায়, তখন মানুষ কর্মে উদ্বুদ্ধ হয় নিজ সক্ষমতা অনুপাতে যতটুকু কুলায়। যতটুকুই সে করতে পারুক, পরিপূর্ণ পুরস্কারই তাকে দেয়া হবে যদি অন্তরের পরিপূর্ণতা থাকে。[৪]
কাফিরদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাথী হিসেবে গ্রহণ করা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ। এ বিষয়ে ইবনু তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন,
'আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, কোনো ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের কাছ থেকে সহমর্মিতা প্রত্যাশা করতে পারে না। স্বয়ং ঈমানই তা করতে দেয় না, ঠিক যেভাবে দুইটি বিপরীত বিষয় পরস্পর বিকর্ষণ করে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দুশমনের প্রতি ভালোবাসা থাকা অসম্ভব। আর যদি কোনো ব্যক্তি নিজের অন্তরকে কাফিরদের প্রতি সংযুক্ত রাখে, তখন এটাই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে তার অন্তরেও কোনো ঈমান নেই。[৫]

টিকাঃ
[৪] al-Qahtani, M. S., 1999, Al-Wala' wa'l-Bara' According to the Aqeedah of the Salaf (Part 2), London: Al-Firdous, Ltd., p. 86.
[*] Yasin, 1997

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 রাগ

📄 রাগ


সাধারণভাবে রাগকে নেতিবাচক আবেগ হিসেবে ধরা হয়, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। তবে আল্লাহর খাতিরে রাগের বৈধতা রয়েছে। বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যে রেগে ওঠা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মুমিনরা এ সময়ও নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং আল্লাহর দেয়া সীমা লঙ্ঘন করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবলমাত্র তখনই রেগে যেতেন, যদি দেখতেন আল্লাহর হক নষ্ট করা হচ্ছে। যেমন ধরুন, তিনি রেগে গিয়েছিলেন যখন তাকে একজন ইমামের ব্যাপারে অভিযোগ করা হয়েছিল যে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করেন, ফলে লোকেদের কষ্ট হয়। আরেকবার রাগ করেছিলেন যখন তিনি আম্মাজান আইশার ঘরে প্রাণীর ছবি যুক্ত পর্দা দেখতে পেলেন, তখন।
আরেক ঘটনায় যখন উসামা ইবনু যায়েদ এসে একজন মহিলা চোরের ব্যাপারে সুপারিশ করেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন তার সুপারিশের ভিত্তিতে হয়তো শাস্তি কমিয়ে দেয়া হবে। রাসূল (সা.) বলেছিলেন, 'তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘনকারিণীর সাজা (হাত কাটা) মওকুফের সুপারিশ করছ?' (বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রাগ সম্পর্কে কুরআনে এভাবে আলোচনা করেছেন,
• 'যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন। (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কার্য থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে,....' (সূরাহ শুরা, ৪২:৩৭)
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, 'কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করাতে বীরত্ব নেই, বরং ক্রোধের মুহূর্তে নিজকে সংবরণ করতে পারাই প্রকৃত বীরত্বের পরিচায়ক। (বুখারি, মুসলিম)
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, জনৈক ব্যক্তি এসে নবি (সা.) কে বলল, আমাকে কোনো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার একই অনুরোধ করল। প্রত্যেকবার নবি (সা.) বললেন, 'রাগ করো না! রাগ করো না!' (বুখারি)
রাসূলুল্লাহ (সা.) রাগ প্রশমনের বিভিন্ন উপায় ও পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন যেন মানুষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো আল্লাহর কাছে শয়তানের ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে রাগকে রূপান্তরিত করে ক্রোধে। সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবি (সা.)-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। তখন দুজন লোক পরস্পর গালমন্দ করছিল। তাদের এক জনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল। তখন নবি (সা.) বললেন, আমি এমন একটি দুআ জানি, যদি লোকটি পড়ে তবে সে যে রাগ অনুভব করছে তা দূর হয়ে যাবে। (তিনি বললেন) সে যদি পড়ে "আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তান”-আমি শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তবে তার রাগ চলে যাবে... (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি রেগে ওঠে এবং বলে আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম; তাহলে তারা রাগ চলে যাবে। (বুখারি)
রাগ নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে নীরবতা অবলম্বন ও অবস্থান পরিবর্তন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।' (বিশুদ্ধ হাদিস, আহমদ)। রেগে গেলে চুপ করে থাকা ও নীরবতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেউ রেগে গেলে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং কুফরি কথা পর্যন্ত উচ্চারণ করে ফেলে অথবা অন্য ব্যক্তিকে অভিশাপ বা গালমন্দ করে কিংবা নিজের স্ত্রীকে রাগান্বিত হয়ে তালাক পর্যন্ত দিয়ে দেয়। নীরব থাকলে নিজের ও নিজের প্রিয়জনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এভাবে অন্য ব্যক্তির সাথে বৈরিতা, ঘৃণা ও তিক্ততা সৃষ্টির সম্ভাবনাকেও সীমিত রাখা যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে যদি সে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে যেন বসে যায়। তবে তার রাগ নেমে যাবে। যদি এতে রাগ চলে না যায় তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে।' (বিশুদ্ধ হাদিস, আহমদ)। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে যাওয়া কিংবা মাটিতে শুয়ে পড়ার মাধ্যমে কাউকে শারীরিক ক্ষতি করা বা আঘাত করার সম্ভাবনা কমে যায়। রেগে গেলে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তি বা বস্তুর ক্ষতি হতে পারে, কাউকে আঘাত করে ফেলতে পারে, সেখান থেকে জখম কিংবা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই রাগ পড়ে গেলে মানুষ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, লজ্জিত বোধ করে রাগান্বিত অবস্থায় ঘটে যাওয়া কাজের জন্য। সুতরাং সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে রাগের অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টির সম্ভাব্য সকল রাস্তা আটকে দেয়া।
মুমিন অবশ্যই রাগ নিয়ন্ত্রণের বিশাল পুরস্কারের কথা স্মরণে রাখবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'রাগান্বিত অবস্থায় প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহ তার অন্তরকে বিচার দিবসে পরিতৃপ্তিতে ভরে দেবেন।' (বিশুদ্ধ হাদিস, তাবারানি)। আরেক হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর থেকে নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।' (ইবনু মাজাহ)
রাগ এবং সুস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য। রাগ এবং বৈরিতা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় (রিস্ক ফ্যাক্টর) এবং এই রাগ থেকেও হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। রাগের কারণে সৃষ্টি হয় উচ্চ রক্তচাপের। এছাড়া স্ট্রোক এবং ডায়াবেটিসেও রাগের কম-বেশি ভূমিকা রয়েছে。[৬] সুতরাং মানসিক এবং সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি রাগের দরুণ দৈহিক ক্ষতিও হয়ে থাকে। দীর্ঘসময় রেগে থাকার ভিতরে কোনো কল্যাণ নেই। এক্ষেত্রে একমাত্র রাসূল (সা.) এর সুন্নাত অনুসরণের মধ্যেই নিশ্চিত স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিহিত।

টিকাঃ
[৬] Taylor, S., 2006, Health Psychology (6th Ed.), Boston, MA: McGraw-Hill, p. 348.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00