📄 ভয়
সাধারণত ভয়কে নেতিবাচক আবেগের মধ্যে গণ্য করা হয়। আমরা ভয় পাই কোনো কিছুর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, যেমন- কোনো ক্ষতি বা বিপদের আশঙ্কায় আমরা ভয় পাই। এটি একটি সহজাত প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেদেরকে ব্যথা-বেদনা, ক্ষতি, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। যখন আমরা কোনো ভীতিকর বস্তু বা পরিস্থিতির উপস্থিতি অনুভব করি তখন আতঙ্কিত হয়ে সেই বিষয় থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, কোনো কিছুকেই আল্লাহর থেকে বেশি ভয় করা চলবে না।
৬.২.১ আল্লাহর ভয়
যখন কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, তখন তাঁর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করবে, তাঁর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করবে এবং আনুগত্যের মাধ্যমে চেষ্টা করবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের। আল্লাহ বলেন,
• 'অতএব, আল্লাহর দিকে পলায়ন করো ... (সূরাহ যারিয়াত, ৫১:৫০)
আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া বা পলায়ন করার অর্থ শিরক, কুফর ও গুনাহের গ্রাস থেকে পলায়ন করা, তাওবা ইস্তিগফার করা ও আল্লাহর রহমত তালাশ করা। এভাবে একজন ব্যক্তি আল্লাহর শান্তি থেকে পলায়ন করে প্রবেশ করে তাঁর রহমতের মধ্যে। বাস্তবে কারো পক্ষেই কখনো আল্লাহ থেকে পলায়ন করা সম্ভব নয়, একমাত্র প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিই এটি বোঝেন। এখানে একটি চমৎকার বিষয় কিন্তু লক্ষণীয়, 'যখন কেউ কোনো সৃষ্টিকে ভয় করে তখন তার বিপরীত দিকে পলায়ন করে। কিন্তু যখন কেউ আল্লাহকে ভয় করে সে আল্লাহর দিকেই দৌড়ে আসে।।'খ
কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহকে ভয় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং অন্য কোনো সৃষ্টি বা মানুষকে ভয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
• 'হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু'জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।' (সূরাহ নিসা, ৪:১)
• অন্যত্র বলেছেন, '... আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।...' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৯৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে লোক নিজ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করবে এবং পরহেজগার হবে, অবশ্যই আল্লাহ পরহেজগারদেরকে ভালবাসেন।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৭৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০২)
৬.২.২. বিচার দিবস ও জাহান্নামের ভয়
প্রকৃত ঈমানদাররা বিচার দিবস ও জাহান্নামের অনন্ত শাস্তির ভয় রাখে। এই ভয়ই তাদেরকে টিকিয়ে রাখে সরল পথের উপর এবং বাঁচিয়ে রাখে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
• 'আর সে দিনের ভয় কর, যখন কেউ কারও সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নেয়া হবে না এবং তারা কোন রকম সাহায্যও পাবে না।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৪৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনি বলুন, আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হতে ভয় পাই কেননা, আমি একটি মহাদিবসের শাস্তিকে ভয় করি।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের ভয় রাখি।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:১০)
• অন্যত্র বলেছেন, 'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে...' (সূরাহ নাযিয়াত, ৭৯:৪০)
• অন্যত্র বলেছেন, 'এবং তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩১)
টিকাঃ
[2] al-Syed, M. F., 1995, Fear of Allah in the Light of the Quran, the Sunnah and the Predecessors, 'Compiled from the works of Ibn Rajab al-Hanbali, Ibn al-Qayyim al-Jawziyya, and Abu Hamid al-Ghazali', (M.A. Kholwadia, Trans.), London: Al-Firdous Ltd., p. 9.
📄 আশা
আশার সমার্থক বিষয় হলো সুধারণা পোষণ করা, ইতিবাচক মানসিকতা রাখা। আর বিপরীত বিষয় হলো নৈরাশ্য। আশাবাদী ব্যক্তি সবকিছুর মধ্যে উত্তম ও কল্যাণকর বিষয় প্রত্যাশা করে। যেমন- কোনো গ্লাসে অর্ধেক পানি থাকলে সে বলে, 'এই গ্লাসের অর্ধেকটা ভর্তি!' আশাবাদী ব্যক্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে বর্তমানকে বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক মানসিকতা থেকে এবং ভালো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মনে লালন করে। মুমিন হিসেবে আমরা সব সময় প্রতিটি বিষয়ে সর্বোত্তম ফলাফলের আশা রাখব। বিশেষত কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত ও ফজলের আশা হারানো যাবে না। আল্লাহ বলেন,
• 'পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। তাঁকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৫৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:১৬)
এই আয়াত দুটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে মুমিনের অন্তরে থাকা আশার কথা, যে আশা সে করে আল্লাহর ওয়াদাকৃত বিরাট পুরস্কারের জন্য। যে লোক বিচার দিবসকে স্মরণ রাখে এবং সেই দিনের সফলতা ও পুরস্কারের আশা রাখে, সে তো ভালো কাজে আরও উৎসাহ পাবে, এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়াবী প্রাপ্তিতে ঘাটতি হলেও আখিরাতের পুরস্কার ও সুখস্বপ্নের মাঝে সে সান্ত্বনা খুঁজে নেবে। আর আখিরাতের সবচেয়ে আনন্দদায়ক পুরস্কার তো হবে আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করা। সুবহানআল্লাহ。
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যদি কোনো কাফির আল্লাহর রহমত সম্পর্কে জানত, সে জান্নাতে প্রবেশের আশা হারাত না। আর যদি কোনো মুমিন আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে জানত, সে নিজেকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ মনে করত না।' (বুখারি)
আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক মুমুর্ষু বালককে দেখতে গেলেন। রাসূল (সা.) জানতে চাইলেন, তুমি কেমন বোধ করছ? বালক জবাব দিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয়ের মাঝামাঝি রয়েছি। তিনি বললেন, এই দুই অবস্থা একত্রে কোনো বান্দার অন্তরে জমা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে আশাকৃত বিষয় প্রদান করবেন ও ভীতিকর বিষয় থেকে বাঁচিয়ে দেবেন।' (তিরমিযি, ইবনু মাজাহ এর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা)。
একটি চমকপ্রদ বিষয়
'আশাবাদ ও সুস্বাস্থ্য' এই বিষয়ে গবেষণাগুলো আমাদের জানাচ্ছে, যারা তুলনামূলকভাবে অধিক আশাবাদী ও ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী, তারা অন্যদের চেয়ে ভালো দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উপভোগ করে থাকেন। আশাবাদী মানুষের ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ কম থাকে। আশাবাদী পুরুষদের মধ্যে হৃদরোগের (coronary heart disease) হার কম, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বেশি, সার্জারি থেকে দ্রুত সেরে উঠার হার বেশি। ইতিবাচকতার সাথে সুস্বাস্থ্যের যে সম্পর্ক, এর কারণ হতে পারে অনেকগুলো; যেমন- অন্যদের তুলনায় বেশি অ্যাক্টিভ থাকা, মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকা (coping effort), স্ট্রেস এর সাথে সুন্দরভাবে মানিয়ে নেয়া (চাপ ও ধকলপূর্ণ পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা), আশেপাশের মানুষের সহানুভূতি খোঁজা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন (শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যপ্রদ খাদ্যাভ্যাস) ইত্যাদি।
📄 ভালোবাসা, ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য
প্রকৃত ঈমানদার ভালোবাসা, ভয় ও আশা— এই আবেগগুলোর মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে। কোনো একটিকে অন্যটির চেয়ে খুব বেশি প্রাধান্য দেয় না। আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি কারণ আমাদের উপর প্রতিনিয়ত অগণিত নিয়ামত দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একই সাথে আমরা নিজ গুনাহের দোষে তাঁর শাস্তি ও অসন্তুষ্টিকে ভয়ও করি। আবার একই সাথে আমরা এই আশাও রাখি যে, তিনি আমাদের ভালো আমলগুলো কবুল করে নেবেন এবং তাওবা কবুল করে গুনাহ মাফ করে দেবেন।
ইবনু রজব (রহ.) চমৎকারভাবে লিখেছেন, যদি কোনো মুসলিম আশা, ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে কেবল একটির ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে তবে সে ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্টতায় চলে যাবে। তিনি লিখেছেন,
'....যে ব্যক্তি ভয়, ভালোবাসা ও আশার ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে সে একজন মুওয়াহহিদ মুমিন (তাওহিদবাদী ঈমানদার)। প্রকৃত মুমিন কখনো অন্যগুলো বাদ দিয়ে কেবল একটি আবেগের প্রতি ঝুঁকে থাকে না। সেটা আশা, ভয় বা ভীতি যাই হোক না কেন। এককভাবে কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরা পথভ্রষ্ট দলগুলোর কাজ। এই জায়গায় ভারসাম্যহীনতার কারণে কেবলমাত্র আবেগই ভারসাম্যহীন হয় না, ঈমানও টালমাটাল হয়ে যায়। কাজেই প্রত্যেকটি আবেগিক উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যাতে করে একজন ব্যক্তির জন্য সত্যপথে চলার অনুপ্রেরণা মেলে বিশুদ্ধ নিয়তের সাথে।'[৩]
টিকাঃ
[3] Ibn Rajab, Worshipping Allah out of love, fear, and hope, retrieved October 10, 2010 fromhttp://abdurrahman.org/salah/worshippingallahoutof.html.
📄 ঘৃণা
যেভাবে আমরা আল্লাহ ও তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদেরকে ভালোবাসব, ঠিক তেমনিভাবে তাদেরকে ঘৃণা করব যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ ও তাঁর মনোনীত দ্বীন ইসলামের সক্রিয় বিরোধিতা করে। এই ঘৃণা হবে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে কোনো পদক্ষেপও নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখানো চলবে না। যে বিষয়গুলোর প্রতি ঘৃণা রাখা জরুরি তার মধ্যে রয়েছে কুফর (যখন অবিশ্বাসটা না জানার কারণে নয়), নিফাক, বিদআত এবং গুনাহ। কুফর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
• 'তোমাদের জন্যে ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদাত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে... (সূরাহ মুমতাহানা, ৬০:৪)
মুনাফিকরা ইসলামের নিকৃষ্টতম শত্রু। আল্লাহর ওয়াস্তে তাদেরকে ঘৃণা করা বাধ্যতামূলক। কুরআনে আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। সুতরাং একজন প্রকৃত ঈমানদারের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ছাড়া অন্য কিছুই থাকতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফির হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না। আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠসদৃশ্য। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে?' (সূরাহ মুনাফিকুন, ৬৩:২-৪)
একই কথা প্রযোজ্য ফাসেক, গুনাহগার ও বিদাতিদের ক্ষেত্রে। তাদের প্রতি ঘৃণার মাত্রা নির্ধারিত হবে ইসলাম হতে তাদের দূরত্ব অনুসারে।
অন্তরে ঘৃণা রাখার পর তাদের সাথে নিঃসম্পর্ক ঘোষণা করতে হবে। মুমিনদের কর্তব্য হলো যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, তাদের থেকে নিজেদেরকে পৃথক ও দূরে রাখা। তাদের শত্রুতা ও বৈরিতার মাত্রানুসারে তাদের প্রতি শত্রুতা ও দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। সকল কাফিররাই এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন ইহুদি-খ্রিস্টান, নাস্তিক, মুশরিক, মুরতাদ নির্বিশেষে যারাই সক্রিয়ভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতির চেষ্টায় ব্যস্ত। এই বক্তব্যের সমর্থনে কুরআনের বহু আয়াত দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে কয়েকটি আয়াত সামনে উল্লেখ করা হলো:
আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:২২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৩-২৪)
এমন অনেক কাফির রয়েছে যারা ইসলামের বার্তা পায়নি এবং এ কারণে সেটা কবুল করেনি। আবার অনেকে ইসলামের বার্তা পেয়েছে কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছে। অবশ্য তারা ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতি করে না, কিংবা শত্রুদের সহায়তাও করে না। তারা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহর রাহে ঘৃণা ও ভালবাসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো আমাদের অন্তর। ইবনু তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন,
'কোনো কিছুর প্রতি ঘৃণা-ভালোবাসা বা পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ে অন্তরে অবশ্যই পরিপূর্ণতা থাকতে হবে। অন্তরে কোনো ঘাটতির অর্থ ঈমানের ঘাটতি, তা না হলে অন্তরে এ ব্যাপারে কোনো কমতি থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু কর্মের কথায় এলে, কর্ম মানুষের নিজ সামর্থ্য ও পরিস্থিতির অনুসারে কম-বেশি হতে পারে। কিন্তু অন্তরে কোনো কমতি থাকা চলবে না। অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ যখন পরিপূর্ণতা পায়, তখন মানুষ কর্মে উদ্বুদ্ধ হয় নিজ সক্ষমতা অনুপাতে যতটুকু কুলায়। যতটুকুই সে করতে পারুক, পরিপূর্ণ পুরস্কারই তাকে দেয়া হবে যদি অন্তরের পরিপূর্ণতা থাকে。[৪]
কাফিরদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাথী হিসেবে গ্রহণ করা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ। এ বিষয়ে ইবনু তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন,
'আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, কোনো ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের কাছ থেকে সহমর্মিতা প্রত্যাশা করতে পারে না। স্বয়ং ঈমানই তা করতে দেয় না, ঠিক যেভাবে দুইটি বিপরীত বিষয় পরস্পর বিকর্ষণ করে। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দুশমনের প্রতি ভালোবাসা থাকা অসম্ভব। আর যদি কোনো ব্যক্তি নিজের অন্তরকে কাফিরদের প্রতি সংযুক্ত রাখে, তখন এটাই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে তার অন্তরেও কোনো ঈমান নেই。[৫]
টিকাঃ
[৪] al-Qahtani, M. S., 1999, Al-Wala' wa'l-Bara' According to the Aqeedah of the Salaf (Part 2), London: Al-Firdous, Ltd., p. 86.
[*] Yasin, 1997