📄 ভালোবাসা
ভালোবাসা একটি সহজাত ও সর্বজনীন অনুভূতি। এটি বিভিন্নরূপে ও মাত্রায় প্রকাশ পেয়ে থাকে। আমরা আমাদের জীবনসঙ্গীকে একভাবে ভালোবাসি, পিতামাতাকে আরেকভাবে, আবার শিশুদেরকে আরেকভাবে ভালোবাসি। এগুলো সবই আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের অংশ। এগুলো সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য ও উৎসাহিত; এমনকি কিছুক্ষেত্রে কাফিরদের প্রতিও সহানুভূতির কথা বলা হয়েছে। এখানে একমাত্র শর্ত এটাই যে, কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর থেকে বেশি ভালোবাসা যাবে না। ভালোবাসা নিন্দনীয় হবে তখন, যখন কোনোকিছুকে বা কাউকে আল্লাহর চেয়ে বেশি ভালোবাসা হবে, কিংবা কারো ভালোবাসা, স্বীকৃতি, অনুমোদন পেতে গিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা অনন্য ও পৃথক এক ভালোবাসা, যা বাকি সবকিছু থেকে স্বতন্ত্র।
ঈমানের একটি জরুরি ও বাধ্যতামূলক অনুষঙ্গ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসা। একইভাবে অন্যান্য মুমিনদেরকেও ভালোবাসতে হবে এবং যা কিছু আল্লাহ উত্তম ও কল্যাণকর হিসেবে নির্ধারণ করেছেন (ঈমান, আমল) সেগুলোকেও ভালোবাসতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসাকে অন্যসব ভালোবাসার উপরে প্রাধান্য দিতে হবে, যেমন- নিজের পরিবার, সম্পদ বা দুনিয়ার অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি। আল্লাহ বলেছেন:
• 'বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৪)
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অন্য যেকোনো ব্যক্তি, বস্তু তথা সবকিছু থেকে বেশি ভালোবাসা সত্যিকার মুমিনের নিদর্শন। এর মাধ্যমে ঈমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। এই ভালোবাসার অর্থ বান্দা আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্য অর্জনের ভিতরে সুখ খুঁজে পাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়। (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছুর থেকে প্রিয় হওয়া; (২) কাউকে খালিস আল্লাহর জন্যই মুহাব্বত করা; (৩) কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা।' (মুসলিম)
তিনি আরো বলেছেন, 'তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।' (মুসলিম)
আল্লাহকে ভালোবাসার অর্থ তার আনুগত্য করা ও তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করা। অনুগত হৃদয়ে, উৎসাহের সাথে তাঁর আনুগত্য করতে হবে যদিও সেটা আমাদের নফসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হোক না কেন। আল্লাহ যা কিছু বাধ্যতামূলক করেছেন ও অনুমোদন করেছেন সেগুলোকে ভালোবাসতে হবে। আর যা কিছু নিষেধ করেছেন সেগুলো ঘৃণা করতে হবে। আল্লাহর হিকমত, কুরআন ও শরিয়াহ-কে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা ও তা অনুসরণ করে সুপথ লাভের আকাঙ্ক্ষা রাখা ও ব্যাকুল হওয়া এই ভালোবাসার লক্ষণ।
আর রাসূলকে ভালোবাসার অর্থ হলো তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যত বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন সেগুলোর উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং নিজের দৈনন্দিন জীবনে সর্বোচ্চ সাধ্যমত সুন্নাহ বাস্তবায়ন করা। মুমিন হিসেবে আমরা সকল নবি রাসূল, তাদের অনুসারী ও নেক বান্দাদের ভালোবাসি, কারণ তারা সকলেই আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা-ই করেছেন। আল্লাহকে ভালোবাসার উদ্দেশ্যে আমরা তাদেরকেও ভালোবাসব ও ওয়ালি (বন্ধু, মিত্র, অভিভাবক) হিসেবে গ্রহণ করব। এর অর্থ তাঁদেরকে মুহাব্বত করা, সাহায্য-সমর্থন যোগানো, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা-সম্মান-শ্রদ্ধা ও নিবেদিতপ্রাণ হওয়া। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৫-৫৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী তারা যারা মুত্তাকী, সে যেই হোক, যেখানেই থাকুক।' (আহমাদ, সনদ উত্তম)
যারা সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভালোবাসে তাদের পরিচয় এসেছে এই আয়াতে,
• 'হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৫৪)
যারা আল্লাহকে ভালোবাসে এবং আল্লাহও যাদেরকে ভালোবাসেন, এই আয়াতে তাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো হলো;
১। মুমিনদের প্রতি বিনয়-নম্র হওয়া; অর্থাৎ তারা দ্বীনি ভাইবোনদের প্রতি নম্র, সহমর্মী এবং সদয়।
২। সেসব কাফিরদের প্রতি ঘৃণা ও কঠোরতা পোষণ করা যারা ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করার চেষ্টায় ব্যস্ত।
৩। নিজের জান, হাত, জিহ্বা (কথা), সম্পদ তথা সবকিছু দিয়ে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।
৪। কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করা বরং এই ভেবে অন্তরে তৃপ্তি অনুভব করা যে এই কাজগুলো আল্লাহর কাছে সন্তোষজনক হলে সমালোচনাকারীর সমালোচনা কিংবা প্রশংসাকারীর প্রশংসায় কিছু এসে যায় না।
এই মূলনীতিগুলো বোঝা ও কবুল করার মাধ্যমে আমাদের ঈমান মজবুত হবে ও আমরা আল্লাহর নিকটতর হতে পারব।
📄 ভয়
সাধারণত ভয়কে নেতিবাচক আবেগের মধ্যে গণ্য করা হয়। আমরা ভয় পাই কোনো কিছুর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, যেমন- কোনো ক্ষতি বা বিপদের আশঙ্কায় আমরা ভয় পাই। এটি একটি সহজাত প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেদেরকে ব্যথা-বেদনা, ক্ষতি, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। যখন আমরা কোনো ভীতিকর বস্তু বা পরিস্থিতির উপস্থিতি অনুভব করি তখন আতঙ্কিত হয়ে সেই বিষয় থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, কোনো কিছুকেই আল্লাহর থেকে বেশি ভয় করা চলবে না।
৬.২.১ আল্লাহর ভয়
যখন কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, তখন তাঁর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করবে, তাঁর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করবে এবং আনুগত্যের মাধ্যমে চেষ্টা করবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের। আল্লাহ বলেন,
• 'অতএব, আল্লাহর দিকে পলায়ন করো ... (সূরাহ যারিয়াত, ৫১:৫০)
আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া বা পলায়ন করার অর্থ শিরক, কুফর ও গুনাহের গ্রাস থেকে পলায়ন করা, তাওবা ইস্তিগফার করা ও আল্লাহর রহমত তালাশ করা। এভাবে একজন ব্যক্তি আল্লাহর শান্তি থেকে পলায়ন করে প্রবেশ করে তাঁর রহমতের মধ্যে। বাস্তবে কারো পক্ষেই কখনো আল্লাহ থেকে পলায়ন করা সম্ভব নয়, একমাত্র প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিই এটি বোঝেন। এখানে একটি চমৎকার বিষয় কিন্তু লক্ষণীয়, 'যখন কেউ কোনো সৃষ্টিকে ভয় করে তখন তার বিপরীত দিকে পলায়ন করে। কিন্তু যখন কেউ আল্লাহকে ভয় করে সে আল্লাহর দিকেই দৌড়ে আসে।।'খ
কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহকে ভয় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং অন্য কোনো সৃষ্টি বা মানুষকে ভয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
• 'হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু'জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।' (সূরাহ নিসা, ৪:১)
• অন্যত্র বলেছেন, '... আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।...' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৯৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যে লোক নিজ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করবে এবং পরহেজগার হবে, অবশ্যই আল্লাহ পরহেজগারদেরকে ভালবাসেন।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৭৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০২)
৬.২.২. বিচার দিবস ও জাহান্নামের ভয়
প্রকৃত ঈমানদাররা বিচার দিবস ও জাহান্নামের অনন্ত শাস্তির ভয় রাখে। এই ভয়ই তাদেরকে টিকিয়ে রাখে সরল পথের উপর এবং বাঁচিয়ে রাখে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
• 'আর সে দিনের ভয় কর, যখন কেউ কারও সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নেয়া হবে না এবং তারা কোন রকম সাহায্যও পাবে না।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৪৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনি বলুন, আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হতে ভয় পাই কেননা, আমি একটি মহাদিবসের শাস্তিকে ভয় করি।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের ভয় রাখি।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:১০)
• অন্যত্র বলেছেন, 'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে...' (সূরাহ নাযিয়াত, ৭৯:৪০)
• অন্যত্র বলেছেন, 'এবং তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩১)
টিকাঃ
[2] al-Syed, M. F., 1995, Fear of Allah in the Light of the Quran, the Sunnah and the Predecessors, 'Compiled from the works of Ibn Rajab al-Hanbali, Ibn al-Qayyim al-Jawziyya, and Abu Hamid al-Ghazali', (M.A. Kholwadia, Trans.), London: Al-Firdous Ltd., p. 9.
📄 আশা
আশার সমার্থক বিষয় হলো সুধারণা পোষণ করা, ইতিবাচক মানসিকতা রাখা। আর বিপরীত বিষয় হলো নৈরাশ্য। আশাবাদী ব্যক্তি সবকিছুর মধ্যে উত্তম ও কল্যাণকর বিষয় প্রত্যাশা করে। যেমন- কোনো গ্লাসে অর্ধেক পানি থাকলে সে বলে, 'এই গ্লাসের অর্ধেকটা ভর্তি!' আশাবাদী ব্যক্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে বর্তমানকে বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক মানসিকতা থেকে এবং ভালো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মনে লালন করে। মুমিন হিসেবে আমরা সব সময় প্রতিটি বিষয়ে সর্বোত্তম ফলাফলের আশা রাখব। বিশেষত কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত ও ফজলের আশা হারানো যাবে না। আল্লাহ বলেন,
• 'পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। তাঁকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৫৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:১৬)
এই আয়াত দুটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে মুমিনের অন্তরে থাকা আশার কথা, যে আশা সে করে আল্লাহর ওয়াদাকৃত বিরাট পুরস্কারের জন্য। যে লোক বিচার দিবসকে স্মরণ রাখে এবং সেই দিনের সফলতা ও পুরস্কারের আশা রাখে, সে তো ভালো কাজে আরও উৎসাহ পাবে, এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়াবী প্রাপ্তিতে ঘাটতি হলেও আখিরাতের পুরস্কার ও সুখস্বপ্নের মাঝে সে সান্ত্বনা খুঁজে নেবে। আর আখিরাতের সবচেয়ে আনন্দদায়ক পুরস্কার তো হবে আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করা। সুবহানআল্লাহ。
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যদি কোনো কাফির আল্লাহর রহমত সম্পর্কে জানত, সে জান্নাতে প্রবেশের আশা হারাত না। আর যদি কোনো মুমিন আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে জানত, সে নিজেকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ মনে করত না।' (বুখারি)
আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক মুমুর্ষু বালককে দেখতে গেলেন। রাসূল (সা.) জানতে চাইলেন, তুমি কেমন বোধ করছ? বালক জবাব দিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয়ের মাঝামাঝি রয়েছি। তিনি বললেন, এই দুই অবস্থা একত্রে কোনো বান্দার অন্তরে জমা হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে আশাকৃত বিষয় প্রদান করবেন ও ভীতিকর বিষয় থেকে বাঁচিয়ে দেবেন।' (তিরমিযি, ইবনু মাজাহ এর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা)。
একটি চমকপ্রদ বিষয়
'আশাবাদ ও সুস্বাস্থ্য' এই বিষয়ে গবেষণাগুলো আমাদের জানাচ্ছে, যারা তুলনামূলকভাবে অধিক আশাবাদী ও ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী, তারা অন্যদের চেয়ে ভালো দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উপভোগ করে থাকেন। আশাবাদী মানুষের ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ কম থাকে। আশাবাদী পুরুষদের মধ্যে হৃদরোগের (coronary heart disease) হার কম, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বেশি, সার্জারি থেকে দ্রুত সেরে উঠার হার বেশি। ইতিবাচকতার সাথে সুস্বাস্থ্যের যে সম্পর্ক, এর কারণ হতে পারে অনেকগুলো; যেমন- অন্যদের তুলনায় বেশি অ্যাক্টিভ থাকা, মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকা (coping effort), স্ট্রেস এর সাথে সুন্দরভাবে মানিয়ে নেয়া (চাপ ও ধকলপূর্ণ পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা), আশেপাশের মানুষের সহানুভূতি খোঁজা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন (শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যপ্রদ খাদ্যাভ্যাস) ইত্যাদি।
📄 ভালোবাসা, ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য
প্রকৃত ঈমানদার ভালোবাসা, ভয় ও আশা— এই আবেগগুলোর মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে। কোনো একটিকে অন্যটির চেয়ে খুব বেশি প্রাধান্য দেয় না। আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি কারণ আমাদের উপর প্রতিনিয়ত অগণিত নিয়ামত দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একই সাথে আমরা নিজ গুনাহের দোষে তাঁর শাস্তি ও অসন্তুষ্টিকে ভয়ও করি। আবার একই সাথে আমরা এই আশাও রাখি যে, তিনি আমাদের ভালো আমলগুলো কবুল করে নেবেন এবং তাওবা কবুল করে গুনাহ মাফ করে দেবেন।
ইবনু রজব (রহ.) চমৎকারভাবে লিখেছেন, যদি কোনো মুসলিম আশা, ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে কেবল একটির ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে তবে সে ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্টতায় চলে যাবে। তিনি লিখেছেন,
'....যে ব্যক্তি ভয়, ভালোবাসা ও আশার ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদাত করে সে একজন মুওয়াহহিদ মুমিন (তাওহিদবাদী ঈমানদার)। প্রকৃত মুমিন কখনো অন্যগুলো বাদ দিয়ে কেবল একটি আবেগের প্রতি ঝুঁকে থাকে না। সেটা আশা, ভয় বা ভীতি যাই হোক না কেন। এককভাবে কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরা পথভ্রষ্ট দলগুলোর কাজ। এই জায়গায় ভারসাম্যহীনতার কারণে কেবলমাত্র আবেগই ভারসাম্যহীন হয় না, ঈমানও টালমাটাল হয়ে যায়। কাজেই প্রত্যেকটি আবেগিক উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যাতে করে একজন ব্যক্তির জন্য সত্যপথে চলার অনুপ্রেরণা মেলে বিশুদ্ধ নিয়তের সাথে।'[৩]
টিকাঃ
[3] Ibn Rajab, Worshipping Allah out of love, fear, and hope, retrieved October 10, 2010 fromhttp://abdurrahman.org/salah/worshippingallahoutof.html.