📄 তাড়না ও অভিপ্রায় (MOTIVES) পূরণে মধ্যমপন্থা
দৈহিক ও মানসিক উভয় ধরনের তাড়না পূরণ করা জীবনে পরিতৃপ্ত ও 'ভালো থাকা'র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যেও এগুলো জরুরি। আমাদের ভিতরে এই চাহিদাগুলো আল্লাহ তাআলা বিনা কারণে সৃষ্টি করেননি, এগুলো পুরোপুরি দমন করার নির্দেশনাও প্রদান করেননি যেমনটি অন্যান্য ধর্মে (বৈরাগ্য অনুসরণের মাধ্যমে) দেখা যায়। বরং ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত সীমানা মেনে এসব চাহিদা পরিতৃপ্ত করার বৈধতা রয়েছে। আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক এই অনুভূতিগুলো পরিচালনা করলে ব্যক্তিও লাভবান হয়, উপকৃত হয় সমাজও। জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে অবশ্যই এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে যেন সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে হারাম বিষয় পরিহার করা। যেমন হারাম খাদ্য, পানীয়, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বৈধ চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অনুসরণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্তরে ঈমান ও তাকওয়া থাকলে এসব চাহিদাকে বৈধ উপায়ে তৃপ্ত করে সন্তুষ্ট থাকা যায়। কেননা এই দৃঢ়বিশ্বাস ও আল্লাহভীতিই করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো ইলমের ভিত্তিতে চিনিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন,
• 'হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৩১)
খাদ্য পানীয় গ্রহণে মধ্যমপন্থা অনুসরণের গুরুত্ব গবেষণার মাধ্যমে আজ নিশ্চিত হয়েছে। আমরা সকলেই জানি অতিরিক্ত পানাহার করা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অধিক খাদ্য গ্রহণকারী ব্যক্তিরা স্থূলদেহের অধিকারী হবার ফলে নানা রকমের ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদী) রোগে আক্রান্ত হন। যেমন- উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগ। এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের তুলনায় তারা মৃত্যুবরণও করেন অল্প বয়সে। এছাড়া স্থূলদেহী হবার কারণে মর্মপীড়া, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি নানান মানসিক সমস্যায় তাদেরকে ভুগতে দেখা যায়।
একইভাবে ধন-সম্পদের ব্যাপারেও আমাদেরকে মধ্যমপন্থী হতে হবে। মিতব্যয়িতার নামে কৃপণতা পরিহার করতে হবে, দান সাদাকা-র অভ্যাস করতে হবে। তবে কোনো কাজেই অপচয়কারী ও অমিতব্যয়ী হওয়া যাবে না, বিলাসিতা করা যাবে না। ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে উভয় ধরনের প্রান্তিকতা বর্তমান দুনিয়ার একটি সাধারণ চিত্র। অনেকে দারিদ্র্যের ভয়ে বা সম্পদ শেষ হয়ে যাবার ভয়ে সম্পদ জমিয়ে রাখে। আবার অনেকে বেখেয়ালি হয়ে বিলাস-ব্যসনে সম্পদ খরচ করে, যা অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। বিশেষত যখন সারা দুনিয়ায় এই মুহুর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। মুমিনরা কিভাবে নিজেদের সম্পদ সামলায় থাকে সে সম্পর্কে আল্লাহ জানিয়েছেন,
• 'এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।' (সূরাহ ফুরক্বান, ২৫:৬৭)
টিকাঃ
[১০] Myers, 2007, p. 540.
📄 সম্পদ ও সুখের পারস্পরিক সম্পর্ক
এবারে আমরা দারুণ একটি গবেষণার ফলাফল দেখব। সম্পদ ও সুখের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে এই গবেষণাটি করা হয়েছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে, 'wealth is like health: its utter absence can breed misery, yet having it is no guarantee of happiness' অর্থাৎ, 'সম্পদ ঠিক স্বাস্থ্যের মতো; এর অনুপস্থিতি কৃপণতা সৃষ্টি করে, তবে সম্পদ থাকলেই সুখপ্রাপ্তির গ্যারান্টি আছে তা নয়।' ১০। মায়ার্স (Myers) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনেছেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৯৫ সাল এর মধ্যে দেখা গেছে, একজন গড়পড়তা আমেরিকার নাগরিকের উপার্জন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (ট্যাক্স প্রদানের পর যা অবশিষ্ট থাকে)। কিন্তু পূর্বের তুলনায় ধনী হলেও তাদের জীবনে সুখ কিন্তু বাড়েনি। ১৯৫৭ সালে ৩৫% লোক বলেছেন তারা 'খুবই সুখী', একই কথা ২০০৪ সালে বলেছেন ৩৪% লোক। আমেরিকা এবং একই সাথে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং চীনে পরিচালিত জরিপ থেকে সিদ্ধান্ত যেটা এলো তা হলো- "economic growth in affluent countries has provided no apparent boost to morale or social well being" – অর্থাৎ, “ধনী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাদের নৈতিক বা সামাজিক জীবনে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে পারেনি."[১১] উপরন্তু অনেকে এমন যুক্তিও পেশ করতে পারেন যে, এসব 'উন্নত দেশে'র লোকেরাই বরং বেশি দুঃখ-কষ্টে আছে। কেনন, তাদের মধ্যে অপরাধ, তালাক, কিশোর বয়সে আত্মহত্যা ও ডিপ্রেশনের হার বেশি।
স্টাডিতে আরও দেখা গেছে, যারা অধিক সম্পদ অর্জনের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে তাদের আবেগিক স্বাস্থ্যের গ্রাফ নিম্নমুখী। বিশেষত যারা ক্ষমতা অর্জন করা, লোক দেখানো বা নিজেকে প্রমাণের জন্য সম্পদ উপার্জন করতে চায় তাদের ক্ষেত্রে এটি অধিক সত্য। যারা 'যা পেয়েছি তাতেই খুশি' থাকে অর্থাৎ কৃতজ্ঞতাপূর্ণ জীবনযাপন করে তারা অন্যদের তুলনায় অধিক সুখ অনুভব করে。[১২] গবেষণার মাধ্যমে উঠে আসা এই বিষয়টি বহু আগেই আল্লাহ তাআলা নিশ্চিত করেছেন ওহীর মাধ্যমে। ইসলাম আমাদের শেখায়, নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে সেই আল্লাহর প্রতি, যিনি আমাদের সকল নিয়ামতরাজি সরবরাহ করে চলেছেন।
টিকাঃ
[১১] Ibid., pp. 540-541.
[১৯] Ibid., pp. 540-541.