📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আগ্রাসী তাড়না

📄 আগ্রাসী তাড়না


মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, বিশেষত যখন উস্কানি দেয়া হয় কিংবা আত্মরক্ষার প্রয়োজন হয়। আগ্রাসনের সংজ্ঞায় বলা যায়; এটি ঐ সকল শারীরিক বা মৌখিক কাজ যার উদ্দেশ্য ক্ষতি বা ধ্বংস সাধন করা, এটা পূর্বশত্রুতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে, অথবা ঠাণ্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পনার শেষ ধাপ হিসেবেও হতে পারে。[১] আদম (আ.) এর সৃষ্টির ঘটনায় মানুষের এই আগ্রাসী প্রবণতার প্রমাণ রয়েছে:
• 'আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩০)
সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণে ফেরেশতারা জানতেন, আল্লাহর এই নতুন সৃষ্টি (মানুষ) উল্লেখিত ধ্বংসাত্মক কাজগুলো করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানান যে, মানবসৃষ্টির মাঝে এক বিশেষ প্রজ্ঞা নিহিত যার গূঢ়ার্থ একমাত্র তিনিই জানেন।
যখন আদম ও হাওয়াকে অবাধ্যতার কারণে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হচ্ছিল, তখন আল্লাহ বলেছিলেন:
• '... এবং আমি বললাম, তোমরা নেমে যাও। তোমরা পরস্পর একে অপরের শত্রু হবে এবং তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩৬)
এ আয়াতে (শয়তানের সাথে মানুষের শত্রুতা এবং) মানুষের পারস্পরিক শত্রুতার কথা এসেছে। এগুলোর ফলে বিভিন্ন সংঘাত-সংঘর্ষ, হিংসাত্মক আচরণ ও এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সংঘটিত হয়।
বস্তুত মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম আগ্রাসী কাজটি ঘটেছিল আদম (আ.) এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের ঘটনায়। কাবিল নিজের ভাই হাবিলকে হিংসার বশবর্তী হয়ে খুন করেছিল। ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে, আগ্রাসী মনোভাবের সাথে আমাদের কুপ্রবৃত্তিও জড়িত। আল্লাহ বলেন:
• 'আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহীত হয়নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বলল, আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন। যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা, আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অতঃপর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।' (সূরাহ মায়িদাহ, ৫: ২৭-৩০)
জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) এবং পরিবেশগত উভয় কারণের উপস্থিতিতে আগ্রাসন সৃষ্টি হয় ও প্রভাবিত হয়। কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এটা এতক্ষণে স্পষ্ট যে, মানুষ চাইলে নিজের আগ্রাসী মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সামাজিকভাবে 'গ্রহণযোগ্য' আচরণ বজায় রাখতে পারে। যদিও সমাজের উপকারার্থেও আগ্রাসনের আলাদা কল্যাণদায়ী ভূমিকা রয়েছে, যেমন বিশেষ করে 'জিহাদ'-এর আমলটি। জিহাদ একটি আরবি পরিভাষা; যার শাব্দিক অর্থ প্রচেষ্টা-সংগ্রাম-উন্নতি সাধনের চেষ্টা প্রভৃতি। শাব্দিক অর্থে এটি একজন ব্যক্তির যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টাকেই বুঝিয়ে থাকে। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় এর সাধারণ ও স্বাভাবিক অর্থকেই বুঝতে হবে*。[৮] (অর্থাৎ শাব্দিক অর্থের বদলে পারিভাষিক অর্থ প্রযোজ্য হবে)। ইসলামি পরিভাষায় জিহাদ অর্থ হলো, আল্লাহর পথে বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। জিহাদের লক্ষ্য আমাদের অন্তর থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ্ বলেন,
• 'তোমরা আল্লাহর জন্যে শ্রম স্বীকার কর যেভাবে শ্রম স্বীকার করা উচিত।...' (সূরাহ হাজ্জ, ২২:৭৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।' (সূরাহ আনকাবুত, ২৯:৬৯)
এরই অংশ হিসেবে যখন দৈহিক ও মিলিটারি (সামরিক) যুদ্ধের বিষয়টি আসে, তখন সঙ্গতকারণেই ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে নানা আগ্রাসন পরিচালনা করতে হয়।
• 'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।' (সূরাহ হজুরাত, ৪৯:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ!... আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৯০-১৯৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ফিতনা *১ দূরীভূত হয়ে এবং আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তারপর যদি তারা বিরত হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন।' (সূরাহ আনফাল, ৮:৩৯)
জিহাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াতে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর দ্বীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করা, যেমনটি উল্লেখিত আয়াতে এসেছে। তিনি একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য। একমাত্র তাঁর ইবাদাতের মাধ্যমেই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। বৈধ ও অবৈধ আগ্রাসনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো নিয়ত এবং লক্ষ্য। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা ঈমানদার তারা জিহাদ করে আল্লাহর রাহে। পক্ষান্তরে যারা কাফির তারা লড়াই করে তাগুতের রাহে। সুতরাং তোমরা জিহাদ করতে থাক শয়তানের পক্ষালম্বনকারীদের বিরুদ্ধে, (দেখবে) শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল।' (সূরাহ নিসা, ৪:৭৬)
কাজেই প্রকৃত ঈমানদাররা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর কাফিররা লড়াই করে নানান বাতিল ইলাহ ও পূজনীয় বস্তু বা মতাদর্শের পক্ষে (যেমন- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ক্ষমতা, তেল, সম্পদ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত)।
আল্লাহর কালিমা ও আইনকে জমিনে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশীল (সার্বভৌমত্ব) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা জিহাদের লক্ষ্য। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যে আল্লাহর কালিমা উচ্চ করার জন্য লড়াই করে, সে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।' (বুখারি)। এ বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। কেননা, প্রকৃত অর্থে আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদাত করা কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সকল কার্যক্রমে দ্বীন ইসলাম বিজয়ী থাকবে। ইসলাম একমাত্র দ্বীন যা সার্বিকভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের উপর জোর দিয়েছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে- সামাজিক থেকে অর্থনৈতিক, পারিবারিক থেকে রাজনৈতিক, প্রতিটি ক্ষেত্রে। আল্লাহর কালিমা বাস্তবায়নের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম। এর সাথে অনিবার্যভাবে জিহাদের অন্যান্য লক্ষ্যগুলো জড়িত থাকে। তবে প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য লক্ষ্যগুলো পূরণ হতে থাকবে। অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে জমিনের বুক থেকে অন্যায়, অবিচার, জুলুম, শোষণ, বঞ্চনা নিরসন করা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচারপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা প্রভৃতি।
এমনকি যে সকল মুমিনরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে জিহাদের আমল করছেন, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যেন পদ্ধতিগতভাবে এই কাজটি আল্লাহর শরিয়াহ মোতাবেক সম্পাদিত হয়। কুরআনের বিভিন্ন জিহাদের আয়াতে নানা সতর্কবাণীর মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন থেকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। যেমন নারী, শিশু ও বয়স্কদের হত্যা করা যাবে না যতক্ষণ না তারা নিজেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। সাধারণভাবে সকল ধরনের নৃশংসতা, নির্মমতা, অত্যাচার করা, মৃতদেহ বিকৃত করা, অঙ্গহানি ঘটানো ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই সীমাগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়াটা আমাদের বর্তমান মুসলিমদের মারাত্মক একটি ভুল। এবং এটিকে কেন্দ্র করে অমুসলিমরা বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের ওপর নানারকম জঘন্য আক্রমণ পরিচালনা করছে। এই সব ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ইসলামকে বিকৃত করছে এবং লোকেদেরকে ইসলামের প্রকৃত বার্তা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

টিকাঃ
[১] Myers, 2007, p. 751.
[৮] কুরআনে যেসকল আয়াতে জিহাদ শব্দ এসেছে, তার মধ্যে কেবল চারটি স্থানে সাধারণ প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম অর্থ অন্তর্ভুক্ত; অন্যান্য আয়াতে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা বোঝানো হয়েছে। সেগুলো হলো সূরাহ হাজ্জ ২২:৭৮, সূরাহ আনকাবুত ২৯:৬,৬৯, সূরাহ ফুরকান ২৫:৫২ এবং সূরাহ তাহরীম ৬৬:৯। সূত্র- ইবনে নুহাস。
[১] * ফিতনা শব্দের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। এখানে ফিতনা অর্থ কুফর ও শিরকের শাসন। তাফসীর মারেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত। ৮:৩৯ আয়াতের তাফসীর দ্র।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 সহযোগী তাড়না

📄 সহযোগী তাড়না


অপরের সাথে মানসিক বন্ধনের অনুভূতি এবং অনেকের মাঝে নিজের জায়গাটা অনুভব করা (আমি এই পরিবারেরই একজন—এই বোধ) মানুষের আরেকটি অন্তর্নিহিত তাড়না। মানুষ যে বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট থাকে ও নিজের গ্রহণযোগ্যতা খুঁজে ফেরে—তা এই চাহিদারই প্রকাশ। যেমন ধরুন বন্ধুত্ব, বিয়ে ও পরিবারের মাঝে আমরা সামাজিক নিশ্চয়তা অনুভব করি যা আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ফলে আমাদের ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা ও অল্পবয়সে মৃত্যুর হারও কমে আসে। পক্ষান্তরে, নিঃসঙ্গ ব্যক্তিরা অনেক বেশি মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা অনুভব করেন। এ বিষয়টি সামনে সামাজিক সাইকোলজি অধ্যায়ে আরও আলোচনায় আসবে। এখানে আমরা বিষয়টি উল্লেখ করলাম কারণ এটি মানুষের জীবনে খুবই শক্তিশালী 'মোটিভেশনাল ফ্যাক্টর'।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 তাড়না ও অভিপ্রায় (MOTIVES) পূরণে মধ্যমপন্থা

📄 তাড়না ও অভিপ্রায় (MOTIVES) পূরণে মধ্যমপন্থা


দৈহিক ও মানসিক উভয় ধরনের তাড়না পূরণ করা জীবনে পরিতৃপ্ত ও 'ভালো থাকা'র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যেও এগুলো জরুরি। আমাদের ভিতরে এই চাহিদাগুলো আল্লাহ তাআলা বিনা কারণে সৃষ্টি করেননি, এগুলো পুরোপুরি দমন করার নির্দেশনাও প্রদান করেননি যেমনটি অন্যান্য ধর্মে (বৈরাগ্য অনুসরণের মাধ্যমে) দেখা যায়। বরং ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত সীমানা মেনে এসব চাহিদা পরিতৃপ্ত করার বৈধতা রয়েছে। আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক এই অনুভূতিগুলো পরিচালনা করলে ব্যক্তিও লাভবান হয়, উপকৃত হয় সমাজও। জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে অবশ্যই এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে যেন সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে হারাম বিষয় পরিহার করা। যেমন হারাম খাদ্য, পানীয়, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বৈধ চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অনুসরণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্তরে ঈমান ও তাকওয়া থাকলে এসব চাহিদাকে বৈধ উপায়ে তৃপ্ত করে সন্তুষ্ট থাকা যায়। কেননা এই দৃঢ়বিশ্বাস ও আল্লাহভীতিই করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো ইলমের ভিত্তিতে চিনিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন,
• 'হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৩১)
খাদ্য পানীয় গ্রহণে মধ্যমপন্থা অনুসরণের গুরুত্ব গবেষণার মাধ্যমে আজ নিশ্চিত হয়েছে। আমরা সকলেই জানি অতিরিক্ত পানাহার করা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অধিক খাদ্য গ্রহণকারী ব্যক্তিরা স্থূলদেহের অধিকারী হবার ফলে নানা রকমের ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদী) রোগে আক্রান্ত হন। যেমন- উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগ। এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের তুলনায় তারা মৃত্যুবরণও করেন অল্প বয়সে। এছাড়া স্থূলদেহী হবার কারণে মর্মপীড়া, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি নানান মানসিক সমস্যায় তাদেরকে ভুগতে দেখা যায়।
একইভাবে ধন-সম্পদের ব্যাপারেও আমাদেরকে মধ্যমপন্থী হতে হবে। মিতব্যয়িতার নামে কৃপণতা পরিহার করতে হবে, দান সাদাকা-র অভ্যাস করতে হবে। তবে কোনো কাজেই অপচয়কারী ও অমিতব্যয়ী হওয়া যাবে না, বিলাসিতা করা যাবে না। ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে উভয় ধরনের প্রান্তিকতা বর্তমান দুনিয়ার একটি সাধারণ চিত্র। অনেকে দারিদ্র্যের ভয়ে বা সম্পদ শেষ হয়ে যাবার ভয়ে সম্পদ জমিয়ে রাখে। আবার অনেকে বেখেয়ালি হয়ে বিলাস-ব্যসনে সম্পদ খরচ করে, যা অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। বিশেষত যখন সারা দুনিয়ায় এই মুহুর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। মুমিনরা কিভাবে নিজেদের সম্পদ সামলায় থাকে সে সম্পর্কে আল্লাহ জানিয়েছেন,
• 'এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।' (সূরাহ ফুরক্বান, ২৫:৬৭)

টিকাঃ
[১০] Myers, 2007, p. 540.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 সম্পদ ও সুখের পারস্পরিক সম্পর্ক

📄 সম্পদ ও সুখের পারস্পরিক সম্পর্ক


এবারে আমরা দারুণ একটি গবেষণার ফলাফল দেখব। সম্পদ ও সুখের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে এই গবেষণাটি করা হয়েছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে, 'wealth is like health: its utter absence can breed misery, yet having it is no guarantee of happiness' অর্থাৎ, 'সম্পদ ঠিক স্বাস্থ্যের মতো; এর অনুপস্থিতি কৃপণতা সৃষ্টি করে, তবে সম্পদ থাকলেই সুখপ্রাপ্তির গ্যারান্টি আছে তা নয়।' ১০। মায়ার্স (Myers) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনেছেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৯৫ সাল এর মধ্যে দেখা গেছে, একজন গড়পড়তা আমেরিকার নাগরিকের উপার্জন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (ট্যাক্স প্রদানের পর যা অবশিষ্ট থাকে)। কিন্তু পূর্বের তুলনায় ধনী হলেও তাদের জীবনে সুখ কিন্তু বাড়েনি। ১৯৫৭ সালে ৩৫% লোক বলেছেন তারা 'খুবই সুখী', একই কথা ২০০৪ সালে বলেছেন ৩৪% লোক। আমেরিকা এবং একই সাথে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং চীনে পরিচালিত জরিপ থেকে সিদ্ধান্ত যেটা এলো তা হলো- "economic growth in affluent countries has provided no apparent boost to morale or social well being" – অর্থাৎ, “ধনী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাদের নৈতিক বা সামাজিক জীবনে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে পারেনি."[১১] উপরন্তু অনেকে এমন যুক্তিও পেশ করতে পারেন যে, এসব 'উন্নত দেশে'র লোকেরাই বরং বেশি দুঃখ-কষ্টে আছে। কেনন, তাদের মধ্যে অপরাধ, তালাক, কিশোর বয়সে আত্মহত্যা ও ডিপ্রেশনের হার বেশি।
স্টাডিতে আরও দেখা গেছে, যারা অধিক সম্পদ অর্জনের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে তাদের আবেগিক স্বাস্থ্যের গ্রাফ নিম্নমুখী। বিশেষত যারা ক্ষমতা অর্জন করা, লোক দেখানো বা নিজেকে প্রমাণের জন্য সম্পদ উপার্জন করতে চায় তাদের ক্ষেত্রে এটি অধিক সত্য। যারা 'যা পেয়েছি তাতেই খুশি' থাকে অর্থাৎ কৃতজ্ঞতাপূর্ণ জীবনযাপন করে তারা অন্যদের তুলনায় অধিক সুখ অনুভব করে。[১২] গবেষণার মাধ্যমে উঠে আসা এই বিষয়টি বহু আগেই আল্লাহ তাআলা নিশ্চিত করেছেন ওহীর মাধ্যমে। ইসলাম আমাদের শেখায়, নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে সেই আল্লাহর প্রতি, যিনি আমাদের সকল নিয়ামতরাজি সরবরাহ করে চলেছেন।

টিকাঃ
[১১] Ibid., pp. 540-541.
[১৯] Ibid., pp. 540-541.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00