📄 আমলনামা ও বিবেচনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম
মানুষকে আরও কার্যকরভাবে 'মোটিভেইট' করার জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের যাবতীয় কার্যক্রম রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা রেখেছেন। বিষয়টি Behaviour management system এর মতো— যেখানে সবসময় চলতি হিসাব ও কাজকর্ম সংরক্ষিত হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা চাইলে মানুষের কাছ থেকে এই তথ্য গোপন রাখতে পারতেন। কিন্তু তার অসীম প্রজ্ঞা অনুসারে তিনি মানুষকে এটা জানিয়ে দিয়েছেন যেন আমরা আরও বেশি ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত হই। তিনি সেই ফেরেশতাদেরও সৃষ্টি করেছেন যারা আমাদের আমলনামা রেকর্ড করছেন। আমাদের প্রত্যেকের উপর দুইজন ফেরেশতা সদা-সর্বদা মোতায়েন রয়েছেন, যারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমাদের প্রতিটি কাজ লিপিবদ্ধ করছেন。[৪] আল্লাহ বলেছেন,
• 'অবশ্যই তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে যা তোমরা কর।' (সূরাহ ইনফিতার, ৮২:১০-১২)
• অন্যত্র বলেছেন 'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী। যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।' (সূরাহ কাফ, ৫০:১৬- ১৮)
এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, ফেরেশতারা সব সময় আমাদের প্রতিটি কথা ও কর্মকে সংরক্ষণ করে রাখছেন। এই রেকর্ড কিতাবের আকারে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেয়া হবে হবে বিচার দিবসে। আমাদের প্রত্যেকের ডান পাশের ফেরেশতা ভালো কাজগুলো সংরক্ষণ করছেন, আর বাম পাশের জন মন্দ কাজগুলো। আল্লাহর অসীম রহমত অনুসারে ফেরেশতারা মন্দ কাজকে সাথে সাথেই লিপিবদ্ধ করেন না, বরং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেটা লেখা থেকে বিরত থাকেন, যেন এর মাঝে গুনাহকারী ব্যক্তি তাওবা করে নিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'বাম কাঁধের ফেরেশতা ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কলম উঠিয়ে রাখেন। যদি কোনো মুসলিম গুনাহ করে এবং যদি সে তাওবা করে ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তিনি (সেটা লেখা থেকে) বিরত থাকেন। অন্যথায় তিনি একটি (মন্দ আমল) লিপিবদ্ধ করেন। (আলবানির তাহকীককৃত নির্ভরযোগ্য হাদিস)
টিকাঃ
[৪] al-Ashqar, 2005, p. 68.
📄 প্রতিযোগিতামূলক তাড়না
জীবনে অর্থপূর্ণ কোনোকিছু অর্জনের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সকলেই চায় কোনো বিষয়ে বিশেষ পারদর্শীতা অর্জন করতে কিংবা উঁচু মানের জীবন কাটাতে। এই ধারণাটাকে বলা হয় 'এচিভমেন্ট মোটিভেশন' বা অর্জনের অনুপ্রেরণা। এখানে একই সাথে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা চলে আসে। প্রতিযোগিতা করা ও অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়নাটি (drive) বিভিন্ন আকাংক্ষিত লক্ষ্যের সাথে জড়িত। সেটা বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু হতে পারে, অর্থনৈতিক কোনো লক্ষ্য হতে পারে, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো অবস্থানও হতে পারে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার কিছু উপকারিতা থাকলেও স্মরণ রাখতে হবে যেন সেটা ইসলামি শরিয়ahর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে ফেলে।
আমাদেরকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। আর তা হলো উত্তম ও নেক আমল, সদাচার। এই প্রতিযোগিতা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা অর্জনের জন্য, জান্নাত লাভের জন্য। আল্লাহ কুরআনে এই প্রতিযোগিতার আলোচনা করে বলেছেন:
• 'নিশ্চয়ই সৎলোকগণ থাকবে পরম আরামে, সিংহাসনে বসে অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমন্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। তার মোহর হবে কস্তুরী। এ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।' (সূরাহ মুতাফফিফিন, ৮৩:২২-২৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা অগ্রে ধাবিত হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যা আকাশ ও পৃথিবীর মত প্রশস্ত। এটা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারীদের জন্যে। এটা আল্লাহর কৃপা, তিনি যাকে ইচ্ছা, এটা দান করেন। আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী।' (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:২১)
• 'অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই। তারাই নৈকট্যশীল, অবদানের উদ্যানসমূহে,' (সূরাহ ওয়াকেয়াহ, ৫৬:১০-১২)
তারাই অগ্রবর্তী যারা এই প্রতিযোগিতায় সফলতা অর্জন করেছে ও দুনিয়ার জীবনকে কাজে লাগিয়ে আখিরাতে অন্যদেরকে ছাড়িয়ে গেছে। আখিরাতেও তারা অন্যদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে এবং অর্জন করে নেবে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা।
📄 বস্তুগত তাড়না
মানুষের সহজাত স্বভাবে লালায়িত রয়েছে বস্তুগত সামগ্রী অর্জনের ইচ্ছা। এজন্য মানুষ একে অপরের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত। এই তাড়নার সাথে মূলত জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা লাভ, দারিদ্র্য ও অভাব থেকে মুক্তি ইত্যাদি বিষয়। কুরআন ও হাদিস- উভয় স্থানে এই তাড়নার আলোচনা এসেছে:
• 'মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।' (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:২০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কোনো আদম সন্তানের যদি এক উপত্যকা ভর্তি স্বর্ণ থাকে তবে অবশ্যই সে দ্বিতীয় আরেকটি চাইবে। আর মাটি ছাড়া কিছুই তার মুখ ভর্তি করতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন।' (উত্তম সনদে বর্ণিত, আহমাদ, তাবারানি)।
উল্লেখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদিস হতে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সম্পদ আহরণের তাড়না আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে প্রদান করেছেন। তবে এটিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। এই চাহিদা আমাদের মাঝে দেবার উদ্দেশ্য হলো আমাদেরকে পরীক্ষা করা। যাদেরকে সম্পদ দেয়া হয়েছে তারা সেটা বৈধ পথে খরচ করছে কিনা এবং যারা সম্পদ অর্জন করছে তারাও বৈধ পথে অর্জন করছে কিনা, আল্লাহর নির্দেশিত পথে খরচ করছে কিনা, সম্পদের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে কিনা ইত্যাদি যাচাই করার জন্য।
সাধারণভাবে, সম্পদ ও রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত। কাকে কতটুকু সম্পদ দেয়া হবে সেগুলো তাকদিরে নির্ধারিত। আল্লাহ বলেন,
• 'আর পৃথিবীতে কোন বিচরণশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে।' (সূরাহ হুদ, ১১:৬)
মানুষ পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখনই তাকদির অনুসারে তার দুনিয়ার ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তারপর সেখানে (মাতৃগর্ভে) ফেরেশতা পাঠানো হয়। অতঃপর সে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করায় এবং ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য হুকুম দেয়া হয়— (গর্ভে থাকা শিশুর) রিজিক, বয়স, আমল এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান। (বুখারি)
একজন ব্যক্তি যাই করুক না কেন তাকদিরে নির্ধারিত রিজিকের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। যা তাকদিরে লিপিবদ্ধ আছে সেটা পাবেই আর যা পায়নি তা কখনো পাবার ছিল না।। সুতরাং যদি কেউ মনে করে সে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে অথবা আল্লাহর ইবাদাতে কিছু ছাড় দিলে আরও বাড়তি আয় হবে, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।।
সম্পদ ও দুনিয়ার আনন্দদায়ক বস্তু অর্জনে কাজ করায় কোনো পাপ নেই। তবে অবশ্যই সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে এবং সম্পদ অর্জন করা যেন ব্যক্তির জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত না হয়। যদি হালাল পথে, বিশুদ্ধ উপায়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উপার্জন করা হয় তবে সেটাও ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, আল্লাহর কাছ থেকে সেই কাজের পুরস্কার প্রদান করা হবে। এভাবে সম্পদ উপার্জনকে একটি নিয়ামতে পরিণত করা যায়। আর নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে করলে সেটা হবে অভিশাপ।
* 'বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৪)
* অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন。
সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।' (সূরাহ তাওবা, ৯:৩৪-৩৫)
• অন্যত্র বলেছেন,
'মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলেঃ আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। এটা অমূলক, বরং তোমরা এতীমকে সম্মান কর না। এবং মিসকীনকে অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না। এবং তোমরা মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে কুক্ষিগত করে ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালবাস। (সূরাহ ফজর, ৮৯:১৫-২০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'লাঞ্ছিত হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং খামিসার (এক ধরণের দামী পোশাক) গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। (তাদের পায়ে) কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ তুলে দেবে না। ...' (বুখারি)।
এই সুনির্দিষ্ট হাদিসে নির্দেশিত হয়েছে যারা সম্পদ কে ভালবাসে তারা সম্পদের গোলামে পরিণত হয়। আর যারা নিজেদের লালসা ও আকাঙ্ক্ষার গোলামে পরিণত হয় তারা সত্যিকারভাবে আল্লাহর গোলাম হতে পারেনা। তারা যত বেশি দুনিয়াকে ভালোবাসবে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও নিবেদন তত কমে আসতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কিয়ামত যত নিকটবর্তী হতে থাকবে ততই দুনিয়ার প্রতি মানুষের লালসা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এটা ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে তারা আল্লাহ থেকে বহু দূরে সরে যাবে।' (আল-হাকিম, উত্তম সনদে বর্ণিত হাদিস)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই উম্মাহর জন্য সম্পদের ফিতনার আশংকা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমি তোমাদের উপরে দারিদ্র্যের ভয় করি না বরং আমি ভয় করি তোমরা একে অন্যের সাথে সম্পদের আধিক্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করবে।' (আল হাকিম, বিশুদ্ধ হাদিস)। এ কারণে তিনি প্রায়শই এই দুআ করতেন, 'ইয়া আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় চাই সম্পদের ফিতনা থেকে। আমি আরো আশ্রয় চাই দারিদ্রের অভিশাপ থেকে।' (বুখারি ও মুসলিম)
টিকাঃ
[e] Qadhi, 2002, 15 Ways to Increase Your Earnings from the Qur'an and Sunnah. Birmingham, UK: Al-Hidaayah Publishing and Distribution, p. 16.
[৬] Ibid., p. 14.
📄 আগ্রাসী তাড়না
মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, বিশেষত যখন উস্কানি দেয়া হয় কিংবা আত্মরক্ষার প্রয়োজন হয়। আগ্রাসনের সংজ্ঞায় বলা যায়; এটি ঐ সকল শারীরিক বা মৌখিক কাজ যার উদ্দেশ্য ক্ষতি বা ধ্বংস সাধন করা, এটা পূর্বশত্রুতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে, অথবা ঠাণ্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পনার শেষ ধাপ হিসেবেও হতে পারে。[১] আদম (আ.) এর সৃষ্টির ঘটনায় মানুষের এই আগ্রাসী প্রবণতার প্রমাণ রয়েছে:
• 'আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩০)
সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণে ফেরেশতারা জানতেন, আল্লাহর এই নতুন সৃষ্টি (মানুষ) উল্লেখিত ধ্বংসাত্মক কাজগুলো করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানান যে, মানবসৃষ্টির মাঝে এক বিশেষ প্রজ্ঞা নিহিত যার গূঢ়ার্থ একমাত্র তিনিই জানেন।
যখন আদম ও হাওয়াকে অবাধ্যতার কারণে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হচ্ছিল, তখন আল্লাহ বলেছিলেন:
• '... এবং আমি বললাম, তোমরা নেমে যাও। তোমরা পরস্পর একে অপরের শত্রু হবে এবং তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩৬)
এ আয়াতে (শয়তানের সাথে মানুষের শত্রুতা এবং) মানুষের পারস্পরিক শত্রুতার কথা এসেছে। এগুলোর ফলে বিভিন্ন সংঘাত-সংঘর্ষ, হিংসাত্মক আচরণ ও এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সংঘটিত হয়।
বস্তুত মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম আগ্রাসী কাজটি ঘটেছিল আদম (আ.) এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের ঘটনায়। কাবিল নিজের ভাই হাবিলকে হিংসার বশবর্তী হয়ে খুন করেছিল। ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে, আগ্রাসী মনোভাবের সাথে আমাদের কুপ্রবৃত্তিও জড়িত। আল্লাহ বলেন:
• 'আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহীত হয়নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বলল, আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন। যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা, আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অতঃপর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।' (সূরাহ মায়িদাহ, ৫: ২৭-৩০)
জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) এবং পরিবেশগত উভয় কারণের উপস্থিতিতে আগ্রাসন সৃষ্টি হয় ও প্রভাবিত হয়। কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এটা এতক্ষণে স্পষ্ট যে, মানুষ চাইলে নিজের আগ্রাসী মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সামাজিকভাবে 'গ্রহণযোগ্য' আচরণ বজায় রাখতে পারে। যদিও সমাজের উপকারার্থেও আগ্রাসনের আলাদা কল্যাণদায়ী ভূমিকা রয়েছে, যেমন বিশেষ করে 'জিহাদ'-এর আমলটি। জিহাদ একটি আরবি পরিভাষা; যার শাব্দিক অর্থ প্রচেষ্টা-সংগ্রাম-উন্নতি সাধনের চেষ্টা প্রভৃতি। শাব্দিক অর্থে এটি একজন ব্যক্তির যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টাকেই বুঝিয়ে থাকে। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় এর সাধারণ ও স্বাভাবিক অর্থকেই বুঝতে হবে*。[৮] (অর্থাৎ শাব্দিক অর্থের বদলে পারিভাষিক অর্থ প্রযোজ্য হবে)। ইসলামি পরিভাষায় জিহাদ অর্থ হলো, আল্লাহর পথে বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। জিহাদের লক্ষ্য আমাদের অন্তর থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ্ বলেন,
• 'তোমরা আল্লাহর জন্যে শ্রম স্বীকার কর যেভাবে শ্রম স্বীকার করা উচিত।...' (সূরাহ হাজ্জ, ২২:৭৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।' (সূরাহ আনকাবুত, ২৯:৬৯)
এরই অংশ হিসেবে যখন দৈহিক ও মিলিটারি (সামরিক) যুদ্ধের বিষয়টি আসে, তখন সঙ্গতকারণেই ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে নানা আগ্রাসন পরিচালনা করতে হয়।
• 'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।' (সূরাহ হজুরাত, ৪৯:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ!... আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৯০-১৯৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ফিতনা *১ দূরীভূত হয়ে এবং আল্লাহর দীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তারপর যদি তারা বিরত হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন।' (সূরাহ আনফাল, ৮:৩৯)
জিহাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াতে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর দ্বীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করা, যেমনটি উল্লেখিত আয়াতে এসেছে। তিনি একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য। একমাত্র তাঁর ইবাদাতের মাধ্যমেই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। বৈধ ও অবৈধ আগ্রাসনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো নিয়ত এবং লক্ষ্য। আল্লাহ বলেছেন,
• 'যারা ঈমানদার তারা জিহাদ করে আল্লাহর রাহে। পক্ষান্তরে যারা কাফির তারা লড়াই করে তাগুতের রাহে। সুতরাং তোমরা জিহাদ করতে থাক শয়তানের পক্ষালম্বনকারীদের বিরুদ্ধে, (দেখবে) শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল।' (সূরাহ নিসা, ৪:৭৬)
কাজেই প্রকৃত ঈমানদাররা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর কাফিররা লড়াই করে নানান বাতিল ইলাহ ও পূজনীয় বস্তু বা মতাদর্শের পক্ষে (যেমন- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ক্ষমতা, তেল, সম্পদ সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত)।
আল্লাহর কালিমা ও আইনকে জমিনে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশীল (সার্বভৌমত্ব) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা জিহাদের লক্ষ্য। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যে আল্লাহর কালিমা উচ্চ করার জন্য লড়াই করে, সে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।' (বুখারি)। এ বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। কেননা, প্রকৃত অর্থে আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদাত করা কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সকল কার্যক্রমে দ্বীন ইসলাম বিজয়ী থাকবে। ইসলাম একমাত্র দ্বীন যা সার্বিকভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের উপর জোর দিয়েছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে- সামাজিক থেকে অর্থনৈতিক, পারিবারিক থেকে রাজনৈতিক, প্রতিটি ক্ষেত্রে। আল্লাহর কালিমা বাস্তবায়নের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম। এর সাথে অনিবার্যভাবে জিহাদের অন্যান্য লক্ষ্যগুলো জড়িত থাকে। তবে প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য লক্ষ্যগুলো পূরণ হতে থাকবে। অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে জমিনের বুক থেকে অন্যায়, অবিচার, জুলুম, শোষণ, বঞ্চনা নিরসন করা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচারপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা প্রভৃতি।
এমনকি যে সকল মুমিনরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে জিহাদের আমল করছেন, তাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যেন পদ্ধতিগতভাবে এই কাজটি আল্লাহর শরিয়াহ মোতাবেক সম্পাদিত হয়। কুরআনের বিভিন্ন জিহাদের আয়াতে নানা সতর্কবাণীর মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন থেকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। যেমন নারী, শিশু ও বয়স্কদের হত্যা করা যাবে না যতক্ষণ না তারা নিজেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। সাধারণভাবে সকল ধরনের নৃশংসতা, নির্মমতা, অত্যাচার করা, মৃতদেহ বিকৃত করা, অঙ্গহানি ঘটানো ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই সীমাগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়াটা আমাদের বর্তমান মুসলিমদের মারাত্মক একটি ভুল। এবং এটিকে কেন্দ্র করে অমুসলিমরা বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের ওপর নানারকম জঘন্য আক্রমণ পরিচালনা করছে। এই সব ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ইসলামকে বিকৃত করছে এবং লোকেদেরকে ইসলামের প্রকৃত বার্তা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
টিকাঃ
[১] Myers, 2007, p. 751.
[৮] কুরআনে যেসকল আয়াতে জিহাদ শব্দ এসেছে, তার মধ্যে কেবল চারটি স্থানে সাধারণ প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম অর্থ অন্তর্ভুক্ত; অন্যান্য আয়াতে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা বোঝানো হয়েছে। সেগুলো হলো সূরাহ হাজ্জ ২২:৭৮, সূরাহ আনকাবুত ২৯:৬,৬৯, সূরাহ ফুরকান ২৫:৫২ এবং সূরাহ তাহরীম ৬৬:৯। সূত্র- ইবনে নুহাস。
[১] * ফিতনা শব্দের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। এখানে ফিতনা অর্থ কুফর ও শিরকের শাসন। তাফসীর মারেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত। ৮:৩৯ আয়াতের তাফসীর দ্র।