📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণা/অভিপ্রায়

📄 মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণা/অভিপ্রায়


৫.৩.১ উদ্দীপক (Incentive):
চারপাশের যেসব উপাদান দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে একজন ব্যক্তি সেই উপাদানটি পেতে অনুপ্রাণিত হয় সেটাই উদ্দীপক। উদ্দীপক দ্বারা শরীর ও মনের বাইরের জিনিস বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ: মানুষ সারা মাস ধরে কাজ করে যায় মাসের শেষে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন হাতে পাওয়ার জন্য। এই বেতনের টাকাটা হলো সেই উদ্দীপক—যা তাকে কঠিন পরিশ্রম এবং আরও ভালো পারফর্মেন্স করতে উৎসাহ যোগায়। আবার (নেতিবাচক) উদ্দীপকের মাধ্যমে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত রাখাও সম্ভব। যেমন- শুধুমাত্র বেতনের টাকার জন্যেই আমরা কাজ করি না, বসের ঝাড়ি থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।
৫.৩.২ শাস্তি ও পুরষ্কার : শাস্তি ও পুরস্কার ইসলামি জীবনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর অনেক আলোচনা রয়েছে কুরআনে। মূলত মানুষের অধিকাংশ আচরণই পরিচালিত হয় পুরস্কার অর্জন বা শাস্তি এড়ানোর উদ্দেশ্যে।
কুরআনে উল্লেখিত পুরস্কার ও শাস্তির অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদে (আখিরাতে) সংঘটিত হবে, নগদ ঘটবে না। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় 'Delayed Gratification' বা 'বিলম্বিত পুরষ্কার'। অর্থাৎ নগদ ছোট পুরষ্কার অর্জনকে কিছুটা পিছিয়ে দেয়া, যেন পরবর্তীতে আরও বেশি পুরস্কার লাভ করা যায়। মুসলিমদের 'বিলম্বিত পুরস্কার' লাভের বিষয়টি ঘটবে আখিরাতে আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে। ঈমানদাররা নিজেদের বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও উত্তম আমলের বরকতে সেই পুরষ্কার পাবে। অপরদিকে কাফিরদের জন্য শাস্তি। এটাও বিলম্বিত রাখা হয়েছে তাদের কুফর ও অন্যায় আচরণের জন্য। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ব্যাপারে দুনিয়ার শান্তি ও পুরস্কারের সাথে আখিরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ দিক থেকেই সেগুলো ভিন্ন। সমস্ত কুরআন জুড়ে বারবার স্মরণিকা হিসেবে শাস্তি ও পুরষ্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেছেন,
• 'অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দেবেন সজীবতা ও আনন্দ। এবং তাদের সবরের প্রতিদানে তাদেরকে দেবেন জান্নাত ও রেশমী পোশাক। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে রৌদ্র ও শৈত্য অনুভব করবে না। তার বৃক্ষছায়া তাদের উপর ঝুঁকে থাকবে এবং তার ফলসমূহ তাদের আয়ত্তাধীন রাখা হবে।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:১১-১৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনি যখন সেখানে দেখবেন, তখন নিয়ামতরাজি ও বিশাল রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা সবুজ রেশম এবং তাদেরকে পরিধান করানো হবে রৌপ্য নির্মিত কংকণ এবং তাদের পালনকর্তা তাদেরকে পান করাবেন 'শরাবান-তহুরা'। এটা তোমাদের প্রতিদান। তোমাদের প্রচেষ্টা স্বীকৃতি লাভ করেছে।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:২০-২২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার নষ্ট করি না। তাদেরই জন্যে আছে বসবাসের জান্নাত। তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। তাদের তথায় স্বর্ণ-কংকনে অলংকৃত করা হবে এবং তারা পাতলা ও মোটা রেশমের সবুজ কাপর পরিধান করবে এমতাবস্থায় যে, তারা সিংহাসনে সমাসীন হবে। চমৎকার প্রতিদান এবং কত উত্তম আশ্রয়।' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:৩০-৩১)
• অন্যত্র বলেছেন,
'আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, অবশ্য আমি প্রবিষ্ট করাব তাদেরকে জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহর সমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্ত্রীগণ। তাদেরকে আমি প্রবিষ্ট করব ঘন ছায়া নীড়ে।' (সূরাহ নিসা, ৪:৫৭)
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে 'নেতিবাচক উদ্দীপক' (negative reinforcement) বলে সেগুলোও কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হলো, খারাপ পরিণতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে আচরণকে ঠিক করার প্রচেষ্টা। যেমন- সূরাহ ইসরাতে বিচারদিবসের নানা ভয়-ভীতির কথা এসেছে, সেদিন কিছু মানুষকে আল্লাহ ভয়-ভীতি ও দুঃখ, চিন্তা ও পেরেশানি থেকে মুক্ত রাখবেন। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
• 'নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না।' (সূরাহ আহকাফ, ৪৬:১৩)
• অন্যত্র বলেছেন,
'হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের আজ কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না।' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৬৮)
আখিরাতের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর সুমহান চেহারার দর্শন (দীদার) লাভ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন, হে জান্নাতের অধিবাসীগণ! তারা বলবে, আমরা উপস্থিত আছি। হে আমাদের প্রতিপালক! সব কল্যাণ তোমার হতে নিহিত! মহান আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ। তার বলবে, হে আমাদের রব! আমরা কেন খুশি হবো না? আপনি আমাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন তা অপর কোনো সৃষ্টিকে দেননি। মহান আল্লাহ বলবেন, এর চেয়ে উত্তম বস্তু আমি কি তোমাদের দেব না? তারা বলবে, এর চেয়ে উত্তম ও উন্নত বস্তু আর কি হতে পারে? মহান আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি অবতীর্ণ করব। এরপর আমি আর কখনো তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো না।' (বুখারি ও মুসলিম)
সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তি হলো আল্লাহর সুমহান চেহারার পানে চেয়ে থাকা। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন,
• 'সেদিন অনেক মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তার পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।' (সূরাহ কিয়ামাহ, ৭৫:২২-২৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জান্নাতবাসীরা জান্নাতে যাওয়ার পর কল্যাণ ও বরকতের মালিক আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা কি অধিক আর কিছু চাও? তারা বলবে,
আপনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেননি? আপনি আমাদের জান্নাতে গমন করাননি এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে মুক্তি দেননি? এ সময় আল্লাহ তাআলা পর্দা সরিয়ে নেবেন। জান্নাতবাসীদের আল্লাহ দর্শন লাভের চেয়ে অধিক প্রিয় বস্তু আর কিছুই দেয়া হবে না।' (মুসলিম, তিরমিযি)。 সুতরাং, এই হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহর দীদার লাভ করাই মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য যার জন্য মানুষের প্রতিযোগিতা ও সংগ্রাম করা উচিত।।২।
এই সকল আয়াত ও অন্যান্য দলিলের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয়েছে যে আল্লাহর ভয়, নেক আমল ও দুনিয়াতে সবর করার কারণে মুমিনদেরকে পুরস্কৃত করা হবে。[৩] আল্লাহ বলেছেন,
• 'এই যে, জান্নাতের উত্তরাধিকারী তোমরা হয়েছ, এটা তোমাদের কর্মের ফল।' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৭২)
একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো, পুরস্কারের যোগ্য হলেও কেউ আল্লাহর রহমত ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের প্রাপ্য শাস্তির আলোচনা এসেছে,
• 'এতে সন্দেহ নেই যে, আমার নিদর্শন সমুহের প্রতি যেসব লোক অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, আমি তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করব। তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা পালটে দেব অন্য চামড়া দিয়ে, যাতে তারা আযাব আস্বাদন করতে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, হেকমতের অধিকারী।' (সূরাহ নিসা, ৪:৫৬)
.... আমি জালেমদের জন্যে অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদের কে পরিবেষ্টন করে থাকবে। যদি তারা পানীয় প্রার্থনা করে, তবে পুঁজের ন্যায় পানীয় দেয়া হবে যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে। কত নিকৃষ্ট পানীয় এবং খুবই মন্দ আশ্রয়।' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:২৯)
আখিরাতে কাফির মুশরিকদের লাঞ্ছিত করা হবে এবং তারা কখনোই লাভ করতে পারবে না আল্লাহর মহান চেহারা দর্শনের আনন্দ ও সম্মান। এটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তি।
• 'হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয় তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলে তাকে সবসময়ে অপমানিত করলে; আর জালেমদের জন্যে তো সাহায্যকারী নেই।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯২)
• অন্যত্র বলেছেন,

টিকাঃ
[২] al-Ashqar, U.S., 2002, Paradise and Hell in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh, Saudi Arabia: International Islamic Publishing House, p. 309.
[e] For more details, see al-Ashqar, 2002b.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আমলনামা ও বিবেচনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম

📄 আমলনামা ও বিবেচনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম


মানুষকে আরও কার্যকরভাবে 'মোটিভেইট' করার জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের যাবতীয় কার্যক্রম রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা রেখেছেন। বিষয়টি Behaviour management system এর মতো— যেখানে সবসময় চলতি হিসাব ও কাজকর্ম সংরক্ষিত হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা চাইলে মানুষের কাছ থেকে এই তথ্য গোপন রাখতে পারতেন। কিন্তু তার অসীম প্রজ্ঞা অনুসারে তিনি মানুষকে এটা জানিয়ে দিয়েছেন যেন আমরা আরও বেশি ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত হই। তিনি সেই ফেরেশতাদেরও সৃষ্টি করেছেন যারা আমাদের আমলনামা রেকর্ড করছেন। আমাদের প্রত্যেকের উপর দুইজন ফেরেশতা সদা-সর্বদা মোতায়েন রয়েছেন, যারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমাদের প্রতিটি কাজ লিপিবদ্ধ করছেন。[৪] আল্লাহ বলেছেন,
• 'অবশ্যই তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে যা তোমরা কর।' (সূরাহ ইনফিতার, ৮২:১০-১২)
• অন্যত্র বলেছেন 'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী। যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।' (সূরাহ কাফ, ৫০:১৬- ১৮)
এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, ফেরেশতারা সব সময় আমাদের প্রতিটি কথা ও কর্মকে সংরক্ষণ করে রাখছেন। এই রেকর্ড কিতাবের আকারে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেয়া হবে হবে বিচার দিবসে। আমাদের প্রত্যেকের ডান পাশের ফেরেশতা ভালো কাজগুলো সংরক্ষণ করছেন, আর বাম পাশের জন মন্দ কাজগুলো। আল্লাহর অসীম রহমত অনুসারে ফেরেশতারা মন্দ কাজকে সাথে সাথেই লিপিবদ্ধ করেন না, বরং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেটা লেখা থেকে বিরত থাকেন, যেন এর মাঝে গুনাহকারী ব্যক্তি তাওবা করে নিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'বাম কাঁধের ফেরেশতা ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কলম উঠিয়ে রাখেন। যদি কোনো মুসলিম গুনাহ করে এবং যদি সে তাওবা করে ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তিনি (সেটা লেখা থেকে) বিরত থাকেন। অন্যথায় তিনি একটি (মন্দ আমল) লিপিবদ্ধ করেন। (আলবানির তাহকীককৃত নির্ভরযোগ্য হাদিস)

টিকাঃ
[৪] al-Ashqar, 2005, p. 68.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 প্রতিযোগিতামূলক তাড়না

📄 প্রতিযোগিতামূলক তাড়না


জীবনে অর্থপূর্ণ কোনোকিছু অর্জনের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সকলেই চায় কোনো বিষয়ে বিশেষ পারদর্শীতা অর্জন করতে কিংবা উঁচু মানের জীবন কাটাতে। এই ধারণাটাকে বলা হয় 'এচিভমেন্ট মোটিভেশন' বা অর্জনের অনুপ্রেরণা। এখানে একই সাথে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা চলে আসে। প্রতিযোগিতা করা ও অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়নাটি (drive) বিভিন্ন আকাংক্ষিত লক্ষ্যের সাথে জড়িত। সেটা বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু হতে পারে, অর্থনৈতিক কোনো লক্ষ্য হতে পারে, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো অবস্থানও হতে পারে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার কিছু উপকারিতা থাকলেও স্মরণ রাখতে হবে যেন সেটা ইসলামি শরিয়ahর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে ফেলে।
আমাদেরকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। আর তা হলো উত্তম ও নেক আমল, সদাচার। এই প্রতিযোগিতা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা অর্জনের জন্য, জান্নাত লাভের জন্য। আল্লাহ কুরআনে এই প্রতিযোগিতার আলোচনা করে বলেছেন:
• 'নিশ্চয়ই সৎলোকগণ থাকবে পরম আরামে, সিংহাসনে বসে অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমন্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। তার মোহর হবে কস্তুরী। এ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।' (সূরাহ মুতাফফিফিন, ৮৩:২২-২৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা অগ্রে ধাবিত হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যা আকাশ ও পৃথিবীর মত প্রশস্ত। এটা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারীদের জন্যে। এটা আল্লাহর কৃপা, তিনি যাকে ইচ্ছা, এটা দান করেন। আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী।' (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:২১)
• 'অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই। তারাই নৈকট্যশীল, অবদানের উদ্যানসমূহে,' (সূরাহ ওয়াকেয়াহ, ৫৬:১০-১২)
তারাই অগ্রবর্তী যারা এই প্রতিযোগিতায় সফলতা অর্জন করেছে ও দুনিয়ার জীবনকে কাজে লাগিয়ে আখিরাতে অন্যদেরকে ছাড়িয়ে গেছে। আখিরাতেও তারা অন্যদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে এবং অর্জন করে নেবে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 বস্তুগত তাড়না

📄 বস্তুগত তাড়না


মানুষের সহজাত স্বভাবে লালায়িত রয়েছে বস্তুগত সামগ্রী অর্জনের ইচ্ছা। এজন্য মানুষ একে অপরের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত। এই তাড়নার সাথে মূলত জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা লাভ, দারিদ্র্য ও অভাব থেকে মুক্তি ইত্যাদি বিষয়। কুরআন ও হাদিস- উভয় স্থানে এই তাড়নার আলোচনা এসেছে:
• 'মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।' (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:২০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কোনো আদম সন্তানের যদি এক উপত্যকা ভর্তি স্বর্ণ থাকে তবে অবশ্যই সে দ্বিতীয় আরেকটি চাইবে। আর মাটি ছাড়া কিছুই তার মুখ ভর্তি করতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন।' (উত্তম সনদে বর্ণিত, আহমাদ, তাবারানি)।
উল্লেখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদিস হতে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সম্পদ আহরণের তাড়না আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে প্রদান করেছেন। তবে এটিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। এই চাহিদা আমাদের মাঝে দেবার উদ্দেশ্য হলো আমাদেরকে পরীক্ষা করা। যাদেরকে সম্পদ দেয়া হয়েছে তারা সেটা বৈধ পথে খরচ করছে কিনা এবং যারা সম্পদ অর্জন করছে তারাও বৈধ পথে অর্জন করছে কিনা, আল্লাহর নির্দেশিত পথে খরচ করছে কিনা, সম্পদের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে কিনা ইত্যাদি যাচাই করার জন্য।
সাধারণভাবে, সম্পদ ও রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত। কাকে কতটুকু সম্পদ দেয়া হবে সেগুলো তাকদিরে নির্ধারিত। আল্লাহ বলেন,
• 'আর পৃথিবীতে কোন বিচরণশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে।' (সূরাহ হুদ, ১১:৬)
মানুষ পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখনই তাকদির অনুসারে তার দুনিয়ার ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তারপর সেখানে (মাতৃগর্ভে) ফেরেশতা পাঠানো হয়। অতঃপর সে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করায় এবং ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য হুকুম দেয়া হয়— (গর্ভে থাকা শিশুর) রিজিক, বয়স, আমল এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান। (বুখারি)
একজন ব্যক্তি যাই করুক না কেন তাকদিরে নির্ধারিত রিজিকের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। যা তাকদিরে লিপিবদ্ধ আছে সেটা পাবেই আর যা পায়নি তা কখনো পাবার ছিল না।। সুতরাং যদি কেউ মনে করে সে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে অথবা আল্লাহর ইবাদাতে কিছু ছাড় দিলে আরও বাড়তি আয় হবে, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।।
সম্পদ ও দুনিয়ার আনন্দদায়ক বস্তু অর্জনে কাজ করায় কোনো পাপ নেই। তবে অবশ্যই সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে এবং সম্পদ অর্জন করা যেন ব্যক্তির জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত না হয়। যদি হালাল পথে, বিশুদ্ধ উপায়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উপার্জন করা হয় তবে সেটাও ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, আল্লাহর কাছ থেকে সেই কাজের পুরস্কার প্রদান করা হবে। এভাবে সম্পদ উপার্জনকে একটি নিয়ামতে পরিণত করা যায়। আর নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে করলে সেটা হবে অভিশাপ।
* 'বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' (সূরাহ তাওবা, ৯:২৪)
* অন্যত্র বলেছেন, 'হে ঈমানদারগণ! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন。
সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।' (সূরাহ তাওবা, ৯:৩৪-৩৫)
• অন্যত্র বলেছেন,
'মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলেঃ আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। এটা অমূলক, বরং তোমরা এতীমকে সম্মান কর না। এবং মিসকীনকে অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না। এবং তোমরা মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে কুক্ষিগত করে ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালবাস। (সূরাহ ফজর, ৮৯:১৫-২০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'লাঞ্ছিত হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং খামিসার (এক ধরণের দামী পোশাক) গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। (তাদের পায়ে) কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ তুলে দেবে না। ...' (বুখারি)।
এই সুনির্দিষ্ট হাদিসে নির্দেশিত হয়েছে যারা সম্পদ কে ভালবাসে তারা সম্পদের গোলামে পরিণত হয়। আর যারা নিজেদের লালসা ও আকাঙ্ক্ষার গোলামে পরিণত হয় তারা সত্যিকারভাবে আল্লাহর গোলাম হতে পারেনা। তারা যত বেশি দুনিয়াকে ভালোবাসবে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও নিবেদন তত কমে আসতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কিয়ামত যত নিকটবর্তী হতে থাকবে ততই দুনিয়ার প্রতি মানুষের লালসা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এটা ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে তারা আল্লাহ থেকে বহু দূরে সরে যাবে।' (আল-হাকিম, উত্তম সনদে বর্ণিত হাদিস)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই উম্মাহর জন্য সম্পদের ফিতনার আশংকা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমি তোমাদের উপরে দারিদ্র্যের ভয় করি না বরং আমি ভয় করি তোমরা একে অন্যের সাথে সম্পদের আধিক্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করবে।' (আল হাকিম, বিশুদ্ধ হাদিস)। এ কারণে তিনি প্রায়শই এই দুআ করতেন, 'ইয়া আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় চাই সম্পদের ফিতনা থেকে। আমি আরো আশ্রয় চাই দারিদ্রের অভিশাপ থেকে।' (বুখারি ও মুসলিম)

টিকাঃ
[e] Qadhi, 2002, 15 Ways to Increase Your Earnings from the Qur'an and Sunnah. Birmingham, UK: Al-Hidaayah Publishing and Distribution, p. 16.
[৬] Ibid., p. 14.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00