📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 অনুপ্রেরণা

📄 অনুপ্রেরণা


অনেক সময় আল্লাহ অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে মুমিনদেরকে গাইড করেন। সাধারণত রাসূলদের প্রতি ওহী নাযিলের মাধ্যমে এটা ঘটে। যেমন সামনের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
• 'কোন মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন। কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোন দূত প্রেরণ করবেন, অতঃপর আল্লাহ যা চান, সে তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ শুরা, ৪২:৫১)
অনেক সময় অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে গোপনে কাউকে কিছু জানিয়ে দেয়া হতে পারে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.) এর মায়ের উদাহরণ পেশ করেছেন। শিশু মূসা জন্মের পর তিনি খুবই আতঙ্কিত ছিলেন। ফিরআউন বনি ইসরাইলের সকল পুত্রসন্তানকে হত্যা করছিল। তিনি অনেক ভীত ও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। বুঝে উঠতে পারছিলেন না কিভাবে শিশুকে রক্ষা করবেন। তখন আল্লাহ তাঁর অন্তরে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন ও উপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করেন,
• 'আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।' (সূরাহ ক্বাসাস, ২৮:৭)
এখানে সরাসরি মূসার মায়ের অন্তরে অনুপ্রেরণা প্রদান করা হয়েছিল। চলুন, সেই ঘটনাটি পড়ে দেখি,
'অতঃপর ফেরাউন পরিবার মূসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যান। নিশ্চয় ফেরাউন, হামান, ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল। ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন খবর ছিল না। সকালে মুসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসাজনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ববাসীগণের মধ্যে। তিনি মূসার ভগিণীকে বললেন, তার পেছন পেছন যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে দেখে যেতে লাগল। পূর্ব থেকেই আমি ধাত্রীদেরকে মুসা থেকে বিরত রেখেছিলাম। মুসার ভগিনী বলল, আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবারের কথা বলব কি, যারা তোমাদের জন্যে একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার হিতাকাঙ্ক্ষী? অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না।' (সূরাহ ক্বাসাস, ২৮:৮-১৩)
আল্লাহ মুমিনদের অন্তর নিয়ন্ত্রণ করেন এই কথার পক্ষে উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে দলিল পাওয়া যায়। মূসার মা যেন সত্য প্রকাশ করে না দেন সেজন্য আল্লাহ তার অন্তরকে 'বেঁধে' রেখেছিলেন। শুধু তাই নয় তার অন্তরে পুঞ্জীভূত দুঃখ, যাতনা ও উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য আল্লাহ শিশু মুসাকে আবার তার কোলে ফিরিয়ে এনেছেন এবং অন্তরে প্রশান্তি প্রদান করেছেন। আল্লাহর সাহায্য সবসময়ই নিকটে।
এই অনুপ্রেরণা অনেক সময় স্বপ্নের মাধ্যমেও আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে সামনে 'ঘুম ও স্বপ্ন' অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটি মুমিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহারস্বরূপ। এর মাধ্যমে হিদায়াত ও সুরক্ষা প্রদান করা হয়। তবে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল অন্তরের অনুপ্রেরণার উপর নির্ভর করা উচিত নয় বরং সেক্ষেত্রে সাধারণ বোধশক্তি ও ইসলামের দিকনির্দেশনার সাথে মিলিয়ে নিতে হবে। কেননা, শয়তান আমাদের অন্তরে মন্দ কাজের অনুপ্রেরণা প্রদান করতে সক্ষম। শয়তান মন্দ বিষয়কে সুশোভিত করে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে অথচ বাস্তবে সেই 'সুশোভিত' কাজগুলো মোটেও আল্লাহর কাছে সন্তোষজনক নয়।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ফেরেশতাদের সহযোগিতা

📄 ফেরেশতাদের সহযোগিতা


আল্লাহ তাঁর সুমহান পরিকল্পনা অনুসারে প্রত্যেক মানুষের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিয়েছেন, সেই ফেরেশতা আমাদের সাথে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়োজিত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নিযুক্ত একজন সাথী রয়েছে। জিনের মধ্য থেকে একজন, আরেকজন রয়েছে ফেরেশতাদের মধ্য থেকে। (মুসলিম)।
সাথী ফেরেশতা মানুষকে ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করে। এভাবে আল্লাহর ইবাদাত ও আত্মসমর্পণ, সত্যের পথ অনুসরণ, মন্দপথ পরিহার এবং গুনাহ বর্জন করতে উৎসাহিত করে। জিন ও ফেরেশতার উভয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যখন কেউ শয্যা গ্রহণ করে একজন ফেরেশতা ও একজন জিন দ্রুত তার দিকে ছুটে যায়। ফেরেশতা বলে, 'তোমার দিনের সমাপ্তি শুভ হোক। ভালো কাজের মাধ্যমে তোমার দিন সমাপ্ত কর।' আর শয়তান (জিন) বলে, 'তোমার দিনের সমাপ্তি হোক মন্দ কাজের মাধ্যমে!' তখন ব্যক্তি যদি আল্লাহকে স্মরণ করে তখন ঘুমিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা সেই জিনকে বহিস্কার করে দেয় এবং সারারাত তাকে পাহারায় রাখে। যখন ঘুম থেকে উঠে তখন আবার একজন ফেরেশতা ও জিন দ্রুত তার দিকে ছুটে আসে। ফেরেশতা বলে, 'তোমার দিন শুরু করো ভালো কাজের মাধ্যমে।' আর জিন বলে, 'তোমার দিন শুরু করো মন্দ কাজের মাধ্যমে।' তখন যদি সে বলে, 'আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমার দেহে প্রাণ দিয়েছেন মৃত্যুর পর এবং ঘুমন্ত অবস্থায় আমার মৃত্যু ঘটাননি। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি সেসব রূহকে আটকে রেখেছেন যাদের উপর তাকদীরে মৃত্যু লিপিবদ্ধ হয়েছিল আর সেগুলো ফেরত পাঠিয়েছেন যাদের ওপর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করা বাকি রয়েছে। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আসমান ও জমিনকে ধারণ করে আছেন যেন সেগুলো নিজ স্থান থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়ে। আর যদি সেগুলো নিজ স্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ বাদে এমন কেউ নেই যে সেগুলো ধারণ করতে পারে। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আসমান কে ধারণ করে আছেন যেন সেটা জমিনের উপর পতিত না হয় তার অনুমতি ব্যতিরেকে। এরপর সেই ফেরেশতা শয়তানকে (জিন) বহিষ্কার করে দেয় এবং সারাদিন সেই ব্যক্তির পাহারায় কাটিয়ে দেয়。[৪]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যারা আল্লাহকে স্মরণ করে ও নিয়মিত দুআ পাঠ করে তাদেরকে জিন শয়তান থেকে সুরক্ষিত রাখা হয় এবং ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য ও হিদায়াত প্রদান করা হয়। এই সাহায্যের মাধ্যমে সে আরো বেশি ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হয়। ফলে ফেরেশতাদের কাছ থেকে আরো ভালোবাসা ও সাহায্য পেতে থাকে। যেহেতু ফেরেশতারা আল্লাহর একান্ত নিবেদিত গোলাম, কাজেই তারা কেবল সেই ব্যক্তির জন্য ভালো বিষয় নিয়েই আগমন করেন।
মানুষদের মধ্যে ফেরেশতারা বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য ভালোবাসা পোষণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মহান আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরিল (আ.) কে ডেকে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন; কাজেই তুমিও তাকে ভালোবাস। তারপর জিবরিল তাকে ভালোবাসেন এবং আসমানবাসীদের মাঝে ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন; কাজেই তোমরাও তাকে ভালোবাস। অতঃপর আসমানবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ায় তা গৃহীত হয়ে যায়। (বুখারি ও মুসলিম)
ফেরেশতারা মুমিনদের উপর রহমতের দুআ করেন। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও রহমতের দোয়া করেন-অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোকে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।' (সূরাহ আহযাব, ৩৩:৪৩)
এখানে রহমত এর অর্থ ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেন ও তাদের মাগফিরাত কামনা করেন। কুরআনের এই আয়াতের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়েছে ফেরেশতাদের দুআর বরকতে আল্লাহ মুমিনদের কুফরের অন্ধকার, শিরক এবং গুনাহ থেকে রক্ষা করেন ও সত্যের আলোকময় পথ অর্থাৎ ইসলামের দিকে পরিচালিত করেন। এই আলোর মাধ্যমে মুমিন উত্তম কথা ও নেক কাজের হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় ও নেক সঙ্গীসাথীদের সাহচর্য লাভ করে。[৫]
কিছু সুনির্দিষ্ট আমল রয়েছে যা করলে ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়, এর একটি হলো মানুষদেরকে ইলম শিক্ষা দেওয়া, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যারা লোকদেরকে দ্বীনের ইলম শেখায় আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীবৃন্দ এমনকি গর্তে অবস্থানকারী পিঁপড়া, এমনকি মাছেরাও তাদের জন্য দুআ করে।' (তিরমিযি)
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেও ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'এমন কোনো মুসলিম নেই, যে সকাল বেলা কোনো মুসলিম রোগীকে দেখতে যায় এবং সন্ধ্যে পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ না করে, আর সন্ধ্যে বেলা কোনো রোগীকে দেখতে যায় এবং সকাল পর্যন্ত তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা দু'আ না করে। তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান নির্ধারিত করে দেয়া হয়।' (তিরমিযী, আবু দাউদ)
নবিজির উপর দরুদ পেশ করার মাধ্যমেও ফেরেশতাদের দুআ লাভ হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি আমার প্রতি দুরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে আমার প্রতি দুরূদ পাঠরত থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দুআ করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার পরিমাণ (দরূদ পাঠ) কমাতেও পারে বা বাড়াতেও পারে।' (ইবনু মাজাহ)
আরো বেশ কিছু কাজের মাধ্যমে ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়। যেমন ফরজ সালাতের জামাতের জন্য অপেক্ষা করা, প্রথম রাকাতে সালাত আদায় করা, কাতারে শূন্যস্থান পূরণ করা, রামাদান মাসে রোজা রাখার জন্য সেহরি খাওয়া ইত্যাদি。[৬]
আরেকটি খুশির খবর হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রহরী ফেরেশতা মোতায়ন করা রয়েছে যারা তাকদির অনুসারে সকল বিপদাপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে থাকেন। এই ফেরেশতারা রয়েছেন আমাদের সামনে, পেছনে; দিনরাত সর্বদা তারা আমাদের সুরক্ষা প্রদান করতে থাকেন। আর যখন তাকদীরে নির্ধারিত বিপদ সেই ব্যক্তির সামনে চলে আসে, তখন তারা নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেন। আল্লাহ বলেছেন
• 'তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে, আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হিফাজত করে।...' (সূরাহ রাদ, ১৩:১১)
মৃত্যু পর্যন্ত এই প্রহরী ফেরেশতারা আমাদের উপর নিযুক্ত থাকেন। মৃত্যুর ফেরেশতা জান কবজ করতে আসা পর্যন্ত তারা থাকেন। আল্লাহ বলেন,
• '... যখন তোমাদের কারও মৃত্যু আসে তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার আত্মা হস্তগত করে নেয় এবং তারা নিজেদের কাজে ব্যর্থ হয় না।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:৬১)

টিকাঃ
[৪] A sound hadith recorded by Ibn Hibban and al-Hakim, as quoted in al- Ashqar, U.S., 2005, The World of the Noble Angels in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh: International Islamic Publishing House, pp. 67-68.
[e] al-Ashqar, 2005, p. 83.
[] Ibid., pp. 81-82.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 শয়তানের পথভ্রষ্টতা

📄 শয়তানের পথভ্রষ্টতা


মানুষকে মন্দকাজের দিকে অনুপ্রাণিত করে এমন শক্তির অস্তিত্বও রয়েছে। শয়তান ও তার অনুসারীরা এই ধরনের শক্তি। 'শয়তান' একটি পরিভাষা যার মাধ্যমে জিন ও মানুষের মধ্যে বিদ্রোহী, আল্লাহর হিদায়াত অস্বীকারকারী, দুরাচার ও অনাচার সৃষ্টিকারীদেরকে বোঝানো হয়ে থাকে। এরা মানুষের দুশমন। মানুষকে সরলপথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টায় তারা সদাব্যস্ত। জিন আল্লাহর এমন একটি সৃষ্টি যাদেরকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা আমাদেরকে দেখতে পারে কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখি না, এবং সাধারণত তাদের উপস্থিতিও বুঝতে পারিনা। কিছু বিষয়ে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা মানুষের থেকেও বেশি。[৭]
শয়তান অন্তরে (ক্বলব) ওয়াসওয়াসা প্রদান করার মাধ্যমে উস্কানি দেয় ও আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ-অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা এমন সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যে মানুষ বুঝতে পারে না ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে কুরআনের সর্বশেষ সূরাহতে আল্লাহ বলেছেন,
• 'বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের রবের, মানুষের অধিপতির, মানুষের মাবুদের; আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।' (সূরাহ নাস, ১১৪:১-৬)
সারাদিনব্যাপী শয়তানের বিপক্ষে আল্লাহর সুরক্ষা লাভের জন্য এই সূরাহ পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। সেই শয়তান মানুষ বা জিন যাদের মধ্য থেকেই হোক না কেন। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীরে সূরাহ নাস সম্পর্কে লিখেছেন, 'মানুষ যখন অমনোযোগী হয় এবং ওয়াসওয়সার প্রতি বেখেয়াল থাকে তখন শয়তান আদম সন্তানের অন্তর জবরদখল করতে চায়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে তখন শয়তান পিছু হটে。[৮] শয়তানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আরো পরিপূর্ণ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই বইয়ের তেরোতম অধ্যায়ে。
ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ শয়তান সম্পর্কে বলেছেন,
'প্রতিটি মানুষের অন্তরে তাওহিদ, মা'রিফাত, ঈমান ও ইয়াকিন রয়েছে আল্লাহর ওয়াদা ও সতর্কতার ব্যাপারে। আবার একই অন্তরে রয়েছে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা, অহমিকা ও রিপুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। সুতরাং অন্তরের অবস্থান এই দুইয়ের মাঝামাঝি।
কখনো অন্তর ঝুঁকে পড়ে ঈমানের দাওয়াত, মা'রিফাত, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর একান্ত সন্তুষ্টির দিকে। আবার কখনো অন্তর ঝুঁকে যায় শয়তানের আহবান, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও পাশবিক বৈশিষ্ট্যের দিকে। এই ধরনের অন্তরকে দেখে শয়তানের মনে আশার সঞ্চার হয়। সে এখানে এসে শিবির স্থাপন করে ও বসতি গাঁড়ে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে (শয়তানের বিরুদ্ধে) বিজয় প্রদান করেন।'
• '... আর সাহায্য শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১২৬)
মানুষের অন্তরের উপর শয়তানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই যতক্ষণ না মানুষ নিজেই শয়তানের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়। সেগুলো হলো প্রবৃত্তির তাড়না, সন্দেহজনক আমলের পিছে ব্যস্ত হওয়া, বিভ্রান্তি ও অলীক আশা। ফলে শয়তান মানুষের অন্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে, এরপর এসব অস্ত্র হাতে তুলে নেয় ও মানুষের বিরুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করতে থাকে। যদি মুমিনের ঈমানি বাহিনী প্রস্তুত থাকে, তবে তারা সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসবে, বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং শয়তানকে পরাজিত করবে। অন্যথায় সে ভূমি শত্রুর হস্তগত হবে, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ,' (বিপদ থেকে রক্ষাকারী কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নেই আল্লাহ ছাড়া)। যখন বান্দা নিজেই শত্রুকে আমন্ত্রণ জানায়, দূর্গের দরজা খুলে দেয়, নিজের অস্ত্র শত্রুর হাতে তুলে দেয়; তখন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ করা যায় না।' [১]

টিকাঃ
[۹] al-Sha'rawi, 1995, Magic and Envy in the Light of the Qur'an and Sunna, Dar al Taqwa, p. 9.
[৮] Ibn Kathir, 2000, p. 648.
[۱] al-Jawziyyah, 2000, pp. 32-33.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 নফসের কামনা-বাসনা ও দুর্বলতাসমূহ

📄 নফসের কামনা-বাসনা ও দুর্বলতাসমূহ


নফসের পরিশুদ্ধির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি বাধার নাম শাহওয়াত (কামনা-বাসনা) ও শুবুحات (সন্দেহ)।
৪.৫.১ (শাহওয়াত) কামনা-বাসনা: এগুলো নফসের ক্ষুধা বা চাহিদা। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে বিভিন্ন মাত্রার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যেমন- হিংসা, অহংকার, অলসতা ও বিভিন্ন গুনাহের প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি। আরো থাকতে পারে সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা, শক্তি ও কর্তৃত্বের প্রতি লোভ। এই আসক্তিগুলোর মাধ্যমে আমাদেরকে পরীক্ষা করা হয় এবং যাচাই করে দেখা হয় যে আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি কি না।
• 'অবশ্যই আমি ইচ্ছা করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম সে সকল নিদর্শনসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধঃপতিত এবং নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল....' (সূরাহ আরাফ, ৭:১৭৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।' (সূরাহ নাযিয়াত, ৭৯:৪০-৪১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জাহান্নামকে লোভনীয় বস্তু ও কামনা-বাসনা দ্বারা ঘিরে রাখা হয়েছে, আর জান্নাতকে ঘিরে রাখা হয়েছে সব ধরনের অপছন্দনীয় ও কষ্টকর বিষয় দ্বারা.'[১০] (বুখারি)
কখনো কখনো আমাদের বিপথগামীতা শয়তানের ওয়াসওয়াসার কারণে হয়, আবার কখনো নফসের কামনা-বাসনা, প্রবৃত্তির তাড়না থেকে হয়। আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য নফসের দুর্বলতাকে শয়তান অবশ্যই ব্যবহার করতে চায়। কাজেই, যদি প্রবৃত্তির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেই তাহলে এটি ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। প্রবৃত্তির তাড়নার কারণে মানুষ বিভিন্ন বিকৃত চাহিদা ও লক্ষ্য স্থির করে, গুনাহ করে。[১১] এগুলোর ফলাফল দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য খুবই নেতিবাচক। লাগামহীন ছেড়ে দিলে প্রবৃত্তির তাড়না ও লালসা আমাদের জীবনের প্রধান ফোকাস হয়ে যাবে। আমরা কামনার গোলামে পরিণত হবো, জীবনের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে প্রবৃত্তির হাতে। সুখ ও পরিতৃপ্তি নফসের তাড়নার উপর নির্ভরশীল হলে সেগুলো মেটানো ছাড়া আমরা কখনো তৃপ্ত হতে পারব না।
ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন, 'যে কিছু পেলে খুশি হয়, না পেলে অখুশি হয়-সে ঐ বিষয়ের গোলাম। কেননা, গোলামী ও দাসত্ব হলো মূলত অন্তরের গোলামী ও দাসত্ব। ফলে যা কিছু অন্তরকে বশ করে গোলামীতে নিয়ে আসে, অন্তর সেগুলোর দাসে পরিণত হয়। একারণে বলা হয়, 'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্ত থাকে যতক্ষণ সে যা আছে (আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন) তাই নিয়ে খুশি থাকে, আর স্বাধীন ব্যক্তিও গোলাম হয়ে যায় যতক্ষণ সে নিজের কামনা বাসনার পিছে ছুটতে থাকে。[১২]
নিজের কামনা-বাসনাকে কোনো ব্যক্তি উপাস্য বানিয়ে নিতে পারে, এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে,
• 'আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?' (সূরাহ জাসিয়া, ৪৫:২৩)
সৃষ্টিগতভাবে এসকল বৈশিষ্ট্য থাকার অর্থ এই নয় যে ব্যক্তি নিজের অনৈতিক ও বিপথগামী কাজের পক্ষে এগুলোর দোহাই দেবে। জুনায়েদ আল-বাগদাদী বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তিকে তার স্বভাবের জন্য দোষ দেয়া যায় না, বরং তাকে দোষারোপ করা হয় স্বভাব অনুসারে কাজ করার জন্য。[১৩] আল্লাহ তাআলা নফসের এসকল বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন একটি পরীক্ষা হিসেবে। আবার তিনিই এসব নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করেছেন। এগুলো মোকাবেলা করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহতে পর্যাপ্ত উপকরণ দিয়ে দিয়েছেন, যেন আমরা সেগুলো প্রতিরোধ করতে পারি, মুজাহাদা করতে পারি। ফলে নিজেদের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ বিজয় করে আত্মোন্নয়ন ঘটাতে আমরা আশাবাদী।
৪.৫.২ সন্দেহ: সন্দেহ, অনিশ্চয়তা, ভুল ধারণা ইত্যাদি একজন ব্যক্তির মাঝে বিরাজমান জ্ঞান ও বিশ্বাসকে নষ্ট করে বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। সাধারণত সন্দেহ সৃষ্টি হয় অজ্ঞতা থেকে। একারণে ইসলামে ইলমের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। অজ্ঞতার কারণে একজন ব্যক্তি এমন আচরণ করতে পারে যা আল্লাহর কাছে অগ্রহণযোগ্য ও অসন্তোষজনক। অজ্ঞতার ফলে ইয়াকিনে কমতি আসে, দ্বীনি দৃঢ়তায় ঘাটতি শুরু হয়, আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের পথে ঘাটতি সৃষ্টি হয়。[১৪] আল্লাহ্ বলেন,
'আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত।' (সূরাহ ফুরক্বান, ২৫:৪৩-৪৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তারা আরও বলবেঃ যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১০)
সন্দেহজনক কাজে জড়িত ব্যক্তিরা অন্তরে কখনো প্রশান্তি পায় না। তাদের মন-মগজ বিক্ষুব্ধ থাকে, সবসময় ভাবতে থাকে তাদের কাজ কবুল হলো কি না। অপরদিকে মুমিনরা কেবল সেসব কাজ সম্পাদন করে যেগুলো করা বৈধ। ফলে তাদের অন্তর প্রশান্ত থাকে। 'এটা না করে ওটা করা উচিত ছিল'— তাদেরকে এমন ভাবতে হয় না। কিছু করলে সেজন্য নিজেদেরকে ধিক্কার দিতে হয় না, তারা ইয়াকিন অর্জন করে。[১২]
রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে দাও আর যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না, তাই গ্রহণ করো। সত্যপ্রীতি অবশ্যই শান্তিদায়ক আর মিথ্যা সন্দেহ সৃষ্টিকারী।' (তিরমিযি, নাসাঈ)।
মুমিন তারাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ও ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ বলেন,
• 'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।' (সূরাহ হুজুরাত, ৪৯:১৫)
ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসের বরকতে মুমিনরা আল্লাহর রাহে কাজ করতে অনুপ্রাণিত থাকে। এ পথে যেকোনো কুরবানী করতে তৈরি থাকে। তারা এমন আবেগ ও ইয়াকিনের সাথে কাজ করে যা অন্য কোনো ধর্মবিশ্বাসে অর্জন করা সম্ভব নয়。

টিকাঃ
[১০] Another way to state this is that the road to hell is paved with desires, while the road to heaven is paved with hardship. (Editor)
[১১] Zarabozo, 2002, p. 395.
[১২] Ibn Taymiyyah, 1999, Essay on Servitude. Birmingham, UK: Al Hidaayah Publishing and Distribution, pp. 100-101.
[১] Abu Nu'aym, A., Hilyat al-Awliya (Vol. 10), p. 287.
[২] Zarabozo, 2002, pp. 395, 398.
[*] Zarabozo, 1999, Vol. 1, p. 566.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00