📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 অন্তর ও আত্মার উপর আল্লাহর প্রভাব

📄 অন্তর ও আত্মার উপর আল্লাহর প্রভাব


আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মান্য কর, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যাতে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। বস্তুতঃ তোমরা সবাই তাঁরই নিকট সমবেত হবে।' (সূরাহ আনফাল, ৮:২৪)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু কাসির বলেছেন, আস-সুদ্দী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘এর অর্থ হলো আল্লাহ মানুষকে তার নিজ-অন্তরের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখেন। ফলে সে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনতে বা কুফরি করতে পারে না。[১]
সকল মানুষের অন্তর আল্লাহর আঙ্গুলির মাঝে অবস্থান করে এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে অন্তরগুলো পরিবর্তন করতে থাকেন। পূর্বের আলোচনাতে এসেছে, ‘অন্তর’ এর আরবি প্রতিশব্দ ‘ক্বলব’ এর শব্দমূল হলো ‘কা-লা-বা’, এর অর্থ পরিবর্তন করা, বদলানো, রূপান্তর ইত্যাদি। মানুষের অন্তর সব সময় পরিবর্তিত হতে থাকে। সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার হলো যদি ঈমান থেকে কুফরে পরিবর্তন ঘটে। এমনকি আল্লাহর রাসূল (সা.) অবাধ্য অন্তরের ক্ষতি থেকে আশ্রয় চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করতেন। তিনি বলতেন, 'আদম সন্তানের কলবগুলো পরম দয়াময় আল্লাহর দুই আংগুলের মাঝে থাকা একটি কলবের মতো। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন।' এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হে আল্লাহ! হে কলবসমূহ পরিবর্তনকারী! আমাদের কলবকে আপনার আনুগত্যের উপর স্থির রাখুন।' (মুসলিম)
আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত লাভের মাধ্যমে বান্দা নিজের অন্তর ও আমলে ইখলাস (আন্তরিকতা) অর্জন করতে পারে। এর মাধ্যমে সে বিপর্যয়ের মুখে দৃঢ়পদ থাকতে পারে, করতে পারে সবর এবং শুকরিয়া আদায় করতে পারে প্রাচুর্য, সচ্ছলতার সময়ে।
শাহর ইবনু হাওশাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উম্মে সালামা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন বেশির ভাগ সময় কি দুআ করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, বেশির ভাগ সময় তিনি এই বলে দুআ করতেন,
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
“হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, তোমার দ্বীনের আমার অন্তরকে অটল রেখো।”
এরপর তিনি (উম্মে সালামাহ) বলেন, আমি জানতে চাইলাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কেন প্রায়শই এই দুআ করেন, 'হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, তোমার দ্বীনের উপর আমার অন্তরকে অটল রেখো?' তিনি বললেন, 'হে উম্মে সালামা! এমন কোনো মানুষ নেই যার অন্তর আল্লাহর দুই আঙুলের মাঝে নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন দৃঢ় রাখেন আর যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন।' হাদিসের বর্ণনাকারী (মুয়াজ)
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
'হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা... (সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ৮)。' (সহিহ হাদিস, তিরমিযি)।
এই হাদিসে নির্দেশিত হয়েছে মানুষের অন্তরসমূহ আল্লাহর আংগুলের নিয়ন্ত্রণে থাকে। যাকে ইচ্ছা তিনি হিদায়াত করেন আর যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও করুণা অনুসারে কখনোই হিদায়াতযোগ্য ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় চালিত করেন না আর যে হিদায়াতের যোগ্যতা রাখে না তাকে হিদায়াত দেন না। আল্লাহ বলেন,
'যার জন্যে শাস্তির হুকুম অবধারিত হয়ে গেছে আপনি কি সে জাহান্নামীকে মুক্ত করতে পারবেন? (সূরাহ যুমার, ৩৯:১৯)
'আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোন বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।' (সূরাহ তাগাবুন, ৬৪:১১)
প্রত্যেক সালাতে যখন আমরা সূরাহ ফাতিহা পাঠ করি আমরা আল্লাহর হিদায়াত প্রার্থনা করি,
'আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাজিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। (সূরাহ ফাতিহা, ১:৬-৭)
যদি আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত না দিতেন তাহলে এই দুআ করার কোনো প্রয়োজন হতো না। সূরাহ বাকারায় আল্লাহ উল্লেখ করেছেন হিদায়াত তাঁর পক্ষ থেকেই আসে। তিনি বলেছেন,
'এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য, যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে
এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।
তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২-৫)
এই আয়াতে হিদায়াতপ্রাপ্তদের সেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে যার কারণে তারা সঠিক পথের উপরে রয়েছে। আরও জানানো হয়েছে, হিদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ বলেন,
'.... অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হিদায়াত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২১৩)
'আর আল্লাহ শান্তি-নিরাপত্তার আলয়ের প্রতি আহবান জানান এবং যাকে ইচ্ছা সরলপথ প্রদর্শন করেন।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:২৫)
• অন্যত্র বলেছেন, '... আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন।' (সূরাহ শুরা, ৪২:১৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'এটা উপদেশ, অতএব যার ইচ্ছা হয় সে তার পালনকর্তার পথ অবলম্বন করুক। আল্লাহর অভিপ্রায় ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোন অভিপ্রায় পোষণ করবে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর রহমতে দাখিল করেন।...' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:২৯-৩১)
'...তারা (জান্নাতীরা) বলবে, 'আল্লাহর শোকর, যিনি আমাদেরকে এ পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। আমরা কখনও পথ পেতাম না, যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন। আমাদের প্রতিপালকের রসূল আমাদের কাছে সত্যকথা নিয়ে এসেছিলেন।...' (সূরাহ আরাফ, ৭:৪৩)
পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার অনুসারে আল্লাহ কেবল তাদেরকেই হিদায়াত করেন যারা এর যোগ্য। বিভিন্ন আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যারা আল্লাহর কাছে হিদায়াত কামনা করে এবং দ্বীনের পথে টিকে থাকার চেষ্টা করে, দ্বীনকে বোঝার চেষ্টা করে, ইলম অর্জন করে, আনুগত্য করে ও ঈমান আনে তারাই হিদাযয়াতের যোগ্য। শুরুতেই কেউ পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করতে পারে না তবে আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন,
• 'যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।' (সূরাহ আনকাবুত, ২৯:৬৯)
• অন্যত্র বলেছেন, 'অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।' (সূরাহ নিসা, ৪:১৭৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'এর দ্বারা আল্লাহ যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।' (সূরাহ মায়িদা, ৫: ১৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'কাফিররা বলেঃ তাঁর প্রতি তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন অবতীর্ণ হলো না? বলে দিন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে, মনোনিবেশ করে, তাকে নিজের দিকে পথপ্রদর্শন করেন।' (সূরাহ রাদ, ১৩:২৭)
অন্যত্র বলেছেন, 'অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেনা। আল্লাহ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:১২৫)
আল্লাহ মুমিনদের অন্তরকে প্রভাবিত করেন, এটি বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, যেন তারা দ্বীনের উপরে দৃঢ় থাকতে পারেন। এমন একটি উদাহরণ হলো যখন রাসূল (সা.) ও আবু বকর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেই যাত্রার এক পর্যায়ে তারা সাওর গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে গিয়ে লুকালেন। যখন কাফিররা গুহার মুখের কাছে চলে এলো, তখন আবু বকর উদ্বিগ্ন হলেন কারণ তিনি আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাসূল তাকে সান্ত্বনা প্রদান করলেন এবং আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। এরপর আল্লাহ তাদের অন্তরে সাকিনা (প্রশান্তি) ও নিরাপত্তা নাজিল করলেন।
• 'যদি তোমরা তাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফিররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু'জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা নাজিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফিরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ তাওবা, ৯:৪০)
সূরাহ ফাতাহ'তে আল্লাহ দুইবার উল্লেখ করেছেন যে তিনি আল্লাহর হিদায়াত ও রাসূলের অনুসরণকারী ঈমানদারদের অন্তরে সাকিনা নাজিল করেন,
'তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাজিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ ফাতাহ, ৪৮:৪)
এই আয়াতে সেই সাহাবিদের কথা বলা হয়েছে যারা হুদাইবিয়া চুক্তির ব্যাপারে আল্লাহর আহ্বান ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। সাহাবিরা সেই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে আল্লাহ তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদের উপর সাকিনা নাজিল করেছেন। [২] আল্লাহ বলেছেন,
'কেননা, কাফিররা তাদের অন্তরে মূর্খতাযুগের জেদ পোষণ করত। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাদের জন্যে সংযমের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিলেন। বস্তুতঃ তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।' (সূরাহ ফাতাহ, ৪৮:২৬)
পূর্বের তিনটি আয়াতে প্রশান্তি বোঝাতে 'সাকিনা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ আল্লাহর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত ও প্রশান্ত মন, শান্তি, প্রশান্তি, নিরাপত্তা। [৩] এটি অর্জিত হয় আল্লাহর অনুপ্রেরণার মাধ্যমে। কোনো ব্যক্তি নিজে নিজে সাকিনা সৃষ্টি করতে পারে না; কোনো চিন্তা বা আচরণের মাধ্যমে নয় বরং এটি আল্লাহর অনুগ্রহ যার মাধ্যমে তিনি ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধি করেন।
সূরাহ কাহাফে বর্ণিত সেই গুহাবাসী যুবকদের ঘটনাতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে তিনি যুবকদের অন্তরে দৃঢ়তা প্রদান করেছেন, যেন তারা বিরোধিতা, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। এই অনুগ্রহ তারা পেয়েছিল আল্লাহর উপর দৃঢ় ঈমান ও তাদের আন্তরিক ইবাদাতের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেছেন,
• 'আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বলল, আমাদের পালনকর্তা আসমান ও জমিনের পালনকর্তা আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে।' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:১৪)
এই আয়াতগুলোতে নির্দেশিত হয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগত তিনি তাদেরকে দৃঢ়তা প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য করবেন, যেন তারা জীবনের সকল বাধাবিপত্তি ও বিপর্যয় সহনশীলতার সাথে অতিক্রম করতে পারে। শুধু তাই নয় তিনি তাদের অন্তরে সাকিনা (প্রশান্তি) প্রদান করবেন যেন তাদের অন্তর শান্ত থাকে এবং উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, পেরেশানী দূর হয়। ফলে এটি তাদের ঈমান ও দৃঢ়তা অধিকতর শক্তিশালী করে।
যারা পথভ্রষ্টতার যোগ্য সেসব কাফিরদেরকে আল্লাহ পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন। তাদের অন্তরে সঙ্কীর্ণতা চাপিয়ে দেন ও মোহর মেরে দেন। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
• 'অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:১২৫)
বনি ইসরাইলিদের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন,
• '... অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।' (সূরাহ ছফ, ৬১:৫)
• অন্যত্র বলেছেন, 'একদলকে পথ প্রদর্শন করেছেন এবং একদলের জন্যে পথভ্রষ্টতা অবধারিত হয়ে গেছে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং ধারণা করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৩০)
আল্লাহ চাইলে সকলকে হিদায়াত দিতে পারতেন কিন্তু এটা তাঁর সুমহান পরিকল্পনার অংশ নয়। আখিরাতে মানুষের জবাবদিহিতা, বিচার ও আল্লাহর ন্যায্যতার মধ্যে এর হিকমত রয়েছে। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত ও কাজের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের মুখোমুখি হবো। এক্ষেত্রে যে হিদায়াতের দাবিদার নয় তাকে হিদায়াত দেয়া অন্যায়। আল্লাহ বলেন,
• 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে এক জাতি করে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। তোমরা যা কর সে বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'সরল পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন।' (সূরাহ নাহল, ১৬:৯)

টিকাঃ
[১] Ibid., Vol. 4, p. 287.
[২] Ibid., Vol. 9, p. 128
[৩] Wehr, H., 1974, A Dictionary of Modern Written Arabic, Beirut: Librairie du Liban, p. 418.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 অনুপ্রেরণা

📄 অনুপ্রেরণা


অনেক সময় আল্লাহ অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে মুমিনদেরকে গাইড করেন। সাধারণত রাসূলদের প্রতি ওহী নাযিলের মাধ্যমে এটা ঘটে। যেমন সামনের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
• 'কোন মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন। কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোন দূত প্রেরণ করবেন, অতঃপর আল্লাহ যা চান, সে তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ শুরা, ৪২:৫১)
অনেক সময় অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে গোপনে কাউকে কিছু জানিয়ে দেয়া হতে পারে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.) এর মায়ের উদাহরণ পেশ করেছেন। শিশু মূসা জন্মের পর তিনি খুবই আতঙ্কিত ছিলেন। ফিরআউন বনি ইসরাইলের সকল পুত্রসন্তানকে হত্যা করছিল। তিনি অনেক ভীত ও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। বুঝে উঠতে পারছিলেন না কিভাবে শিশুকে রক্ষা করবেন। তখন আল্লাহ তাঁর অন্তরে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন ও উপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করেন,
• 'আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।' (সূরাহ ক্বাসাস, ২৮:৭)
এখানে সরাসরি মূসার মায়ের অন্তরে অনুপ্রেরণা প্রদান করা হয়েছিল। চলুন, সেই ঘটনাটি পড়ে দেখি,
'অতঃপর ফেরাউন পরিবার মূসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যান। নিশ্চয় ফেরাউন, হামান, ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল। ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন খবর ছিল না। সকালে মুসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসাজনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ববাসীগণের মধ্যে। তিনি মূসার ভগিণীকে বললেন, তার পেছন পেছন যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে দেখে যেতে লাগল। পূর্ব থেকেই আমি ধাত্রীদেরকে মুসা থেকে বিরত রেখেছিলাম। মুসার ভগিনী বলল, আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবারের কথা বলব কি, যারা তোমাদের জন্যে একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার হিতাকাঙ্ক্ষী? অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না।' (সূরাহ ক্বাসাস, ২৮:৮-১৩)
আল্লাহ মুমিনদের অন্তর নিয়ন্ত্রণ করেন এই কথার পক্ষে উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে দলিল পাওয়া যায়। মূসার মা যেন সত্য প্রকাশ করে না দেন সেজন্য আল্লাহ তার অন্তরকে 'বেঁধে' রেখেছিলেন। শুধু তাই নয় তার অন্তরে পুঞ্জীভূত দুঃখ, যাতনা ও উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য আল্লাহ শিশু মুসাকে আবার তার কোলে ফিরিয়ে এনেছেন এবং অন্তরে প্রশান্তি প্রদান করেছেন। আল্লাহর সাহায্য সবসময়ই নিকটে।
এই অনুপ্রেরণা অনেক সময় স্বপ্নের মাধ্যমেও আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে সামনে 'ঘুম ও স্বপ্ন' অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এটি মুমিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহারস্বরূপ। এর মাধ্যমে হিদায়াত ও সুরক্ষা প্রদান করা হয়। তবে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল অন্তরের অনুপ্রেরণার উপর নির্ভর করা উচিত নয় বরং সেক্ষেত্রে সাধারণ বোধশক্তি ও ইসলামের দিকনির্দেশনার সাথে মিলিয়ে নিতে হবে। কেননা, শয়তান আমাদের অন্তরে মন্দ কাজের অনুপ্রেরণা প্রদান করতে সক্ষম। শয়তান মন্দ বিষয়কে সুশোভিত করে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে অথচ বাস্তবে সেই 'সুশোভিত' কাজগুলো মোটেও আল্লাহর কাছে সন্তোষজনক নয়।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ফেরেশতাদের সহযোগিতা

📄 ফেরেশতাদের সহযোগিতা


আল্লাহ তাঁর সুমহান পরিকল্পনা অনুসারে প্রত্যেক মানুষের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিয়েছেন, সেই ফেরেশতা আমাদের সাথে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়োজিত থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নিযুক্ত একজন সাথী রয়েছে। জিনের মধ্য থেকে একজন, আরেকজন রয়েছে ফেরেশতাদের মধ্য থেকে। (মুসলিম)।
সাথী ফেরেশতা মানুষকে ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করে। এভাবে আল্লাহর ইবাদাত ও আত্মসমর্পণ, সত্যের পথ অনুসরণ, মন্দপথ পরিহার এবং গুনাহ বর্জন করতে উৎসাহিত করে। জিন ও ফেরেশতার উভয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যখন কেউ শয্যা গ্রহণ করে একজন ফেরেশতা ও একজন জিন দ্রুত তার দিকে ছুটে যায়। ফেরেশতা বলে, 'তোমার দিনের সমাপ্তি শুভ হোক। ভালো কাজের মাধ্যমে তোমার দিন সমাপ্ত কর।' আর শয়তান (জিন) বলে, 'তোমার দিনের সমাপ্তি হোক মন্দ কাজের মাধ্যমে!' তখন ব্যক্তি যদি আল্লাহকে স্মরণ করে তখন ঘুমিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা সেই জিনকে বহিস্কার করে দেয় এবং সারারাত তাকে পাহারায় রাখে। যখন ঘুম থেকে উঠে তখন আবার একজন ফেরেশতা ও জিন দ্রুত তার দিকে ছুটে আসে। ফেরেশতা বলে, 'তোমার দিন শুরু করো ভালো কাজের মাধ্যমে।' আর জিন বলে, 'তোমার দিন শুরু করো মন্দ কাজের মাধ্যমে।' তখন যদি সে বলে, 'আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমার দেহে প্রাণ দিয়েছেন মৃত্যুর পর এবং ঘুমন্ত অবস্থায় আমার মৃত্যু ঘটাননি। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি সেসব রূহকে আটকে রেখেছেন যাদের উপর তাকদীরে মৃত্যু লিপিবদ্ধ হয়েছিল আর সেগুলো ফেরত পাঠিয়েছেন যাদের ওপর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করা বাকি রয়েছে। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আসমান ও জমিনকে ধারণ করে আছেন যেন সেগুলো নিজ স্থান থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়ে। আর যদি সেগুলো নিজ স্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ বাদে এমন কেউ নেই যে সেগুলো ধারণ করতে পারে। প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আসমান কে ধারণ করে আছেন যেন সেটা জমিনের উপর পতিত না হয় তার অনুমতি ব্যতিরেকে। এরপর সেই ফেরেশতা শয়তানকে (জিন) বহিষ্কার করে দেয় এবং সারাদিন সেই ব্যক্তির পাহারায় কাটিয়ে দেয়。[৪]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যারা আল্লাহকে স্মরণ করে ও নিয়মিত দুআ পাঠ করে তাদেরকে জিন শয়তান থেকে সুরক্ষিত রাখা হয় এবং ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য ও হিদায়াত প্রদান করা হয়। এই সাহায্যের মাধ্যমে সে আরো বেশি ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হয়। ফলে ফেরেশতাদের কাছ থেকে আরো ভালোবাসা ও সাহায্য পেতে থাকে। যেহেতু ফেরেশতারা আল্লাহর একান্ত নিবেদিত গোলাম, কাজেই তারা কেবল সেই ব্যক্তির জন্য ভালো বিষয় নিয়েই আগমন করেন।
মানুষদের মধ্যে ফেরেশতারা বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য ভালোবাসা পোষণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মহান আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরিল (আ.) কে ডেকে বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন; কাজেই তুমিও তাকে ভালোবাস। তারপর জিবরিল তাকে ভালোবাসেন এবং আসমানবাসীদের মাঝে ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন; কাজেই তোমরাও তাকে ভালোবাস। অতঃপর আসমানবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর দুনিয়ায় তা গৃহীত হয়ে যায়। (বুখারি ও মুসলিম)
ফেরেশতারা মুমিনদের উপর রহমতের দুআ করেন। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও রহমতের দোয়া করেন-অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোকে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু।' (সূরাহ আহযাব, ৩৩:৪৩)
এখানে রহমত এর অর্থ ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেন ও তাদের মাগফিরাত কামনা করেন। কুরআনের এই আয়াতের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়েছে ফেরেশতাদের দুআর বরকতে আল্লাহ মুমিনদের কুফরের অন্ধকার, শিরক এবং গুনাহ থেকে রক্ষা করেন ও সত্যের আলোকময় পথ অর্থাৎ ইসলামের দিকে পরিচালিত করেন। এই আলোর মাধ্যমে মুমিন উত্তম কথা ও নেক কাজের হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় ও নেক সঙ্গীসাথীদের সাহচর্য লাভ করে。[৫]
কিছু সুনির্দিষ্ট আমল রয়েছে যা করলে ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়, এর একটি হলো মানুষদেরকে ইলম শিক্ষা দেওয়া, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যারা লোকদেরকে দ্বীনের ইলম শেখায় আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীবৃন্দ এমনকি গর্তে অবস্থানকারী পিঁপড়া, এমনকি মাছেরাও তাদের জন্য দুআ করে।' (তিরমিযি)
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেও ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'এমন কোনো মুসলিম নেই, যে সকাল বেলা কোনো মুসলিম রোগীকে দেখতে যায় এবং সন্ধ্যে পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ না করে, আর সন্ধ্যে বেলা কোনো রোগীকে দেখতে যায় এবং সকাল পর্যন্ত তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা দু'আ না করে। তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান নির্ধারিত করে দেয়া হয়।' (তিরমিযী, আবু দাউদ)
নবিজির উপর দরুদ পেশ করার মাধ্যমেও ফেরেশতাদের দুআ লাভ হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি আমার প্রতি দুরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে আমার প্রতি দুরূদ পাঠরত থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দুআ করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার পরিমাণ (দরূদ পাঠ) কমাতেও পারে বা বাড়াতেও পারে।' (ইবনু মাজাহ)
আরো বেশ কিছু কাজের মাধ্যমে ফেরেশতাদের দুআ পাওয়া যায়। যেমন ফরজ সালাতের জামাতের জন্য অপেক্ষা করা, প্রথম রাকাতে সালাত আদায় করা, কাতারে শূন্যস্থান পূরণ করা, রামাদান মাসে রোজা রাখার জন্য সেহরি খাওয়া ইত্যাদি。[৬]
আরেকটি খুশির খবর হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রহরী ফেরেশতা মোতায়ন করা রয়েছে যারা তাকদির অনুসারে সকল বিপদাপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে থাকেন। এই ফেরেশতারা রয়েছেন আমাদের সামনে, পেছনে; দিনরাত সর্বদা তারা আমাদের সুরক্ষা প্রদান করতে থাকেন। আর যখন তাকদীরে নির্ধারিত বিপদ সেই ব্যক্তির সামনে চলে আসে, তখন তারা নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেন। আল্লাহ বলেছেন
• 'তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে, আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হিফাজত করে।...' (সূরাহ রাদ, ১৩:১১)
মৃত্যু পর্যন্ত এই প্রহরী ফেরেশতারা আমাদের উপর নিযুক্ত থাকেন। মৃত্যুর ফেরেশতা জান কবজ করতে আসা পর্যন্ত তারা থাকেন। আল্লাহ বলেন,
• '... যখন তোমাদের কারও মৃত্যু আসে তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার আত্মা হস্তগত করে নেয় এবং তারা নিজেদের কাজে ব্যর্থ হয় না।' (সূরাহ আনয়াম, ৬:৬১)

টিকাঃ
[৪] A sound hadith recorded by Ibn Hibban and al-Hakim, as quoted in al- Ashqar, U.S., 2005, The World of the Noble Angels in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh: International Islamic Publishing House, pp. 67-68.
[e] al-Ashqar, 2005, p. 83.
[] Ibid., pp. 81-82.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 শয়তানের পথভ্রষ্টতা

📄 শয়তানের পথভ্রষ্টতা


মানুষকে মন্দকাজের দিকে অনুপ্রাণিত করে এমন শক্তির অস্তিত্বও রয়েছে। শয়তান ও তার অনুসারীরা এই ধরনের শক্তি। 'শয়তান' একটি পরিভাষা যার মাধ্যমে জিন ও মানুষের মধ্যে বিদ্রোহী, আল্লাহর হিদায়াত অস্বীকারকারী, দুরাচার ও অনাচার সৃষ্টিকারীদেরকে বোঝানো হয়ে থাকে। এরা মানুষের দুশমন। মানুষকে সরলপথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টায় তারা সদাব্যস্ত। জিন আল্লাহর এমন একটি সৃষ্টি যাদেরকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা আমাদেরকে দেখতে পারে কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখি না, এবং সাধারণত তাদের উপস্থিতিও বুঝতে পারিনা। কিছু বিষয়ে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা মানুষের থেকেও বেশি。[৭]
শয়তান অন্তরে (ক্বলব) ওয়াসওয়াসা প্রদান করার মাধ্যমে উস্কানি দেয় ও আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ-অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা এমন সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যে মানুষ বুঝতে পারে না ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে কুরআনের সর্বশেষ সূরাহতে আল্লাহ বলেছেন,
• 'বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের রবের, মানুষের অধিপতির, মানুষের মাবুদের; আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।' (সূরাহ নাস, ১১৪:১-৬)
সারাদিনব্যাপী শয়তানের বিপক্ষে আল্লাহর সুরক্ষা লাভের জন্য এই সূরাহ পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। সেই শয়তান মানুষ বা জিন যাদের মধ্য থেকেই হোক না কেন। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীরে সূরাহ নাস সম্পর্কে লিখেছেন, 'মানুষ যখন অমনোযোগী হয় এবং ওয়াসওয়সার প্রতি বেখেয়াল থাকে তখন শয়তান আদম সন্তানের অন্তর জবরদখল করতে চায়। আর যখন মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে তখন শয়তান পিছু হটে。[৮] শয়তানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আরো পরিপূর্ণ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই বইয়ের তেরোতম অধ্যায়ে。
ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ শয়তান সম্পর্কে বলেছেন,
'প্রতিটি মানুষের অন্তরে তাওহিদ, মা'রিফাত, ঈমান ও ইয়াকিন রয়েছে আল্লাহর ওয়াদা ও সতর্কতার ব্যাপারে। আবার একই অন্তরে রয়েছে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা, অহমিকা ও রিপুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। সুতরাং অন্তরের অবস্থান এই দুইয়ের মাঝামাঝি।
কখনো অন্তর ঝুঁকে পড়ে ঈমানের দাওয়াত, মা'রিফাত, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর একান্ত সন্তুষ্টির দিকে। আবার কখনো অন্তর ঝুঁকে যায় শয়তানের আহবান, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও পাশবিক বৈশিষ্ট্যের দিকে। এই ধরনের অন্তরকে দেখে শয়তানের মনে আশার সঞ্চার হয়। সে এখানে এসে শিবির স্থাপন করে ও বসতি গাঁড়ে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে (শয়তানের বিরুদ্ধে) বিজয় প্রদান করেন।'
• '... আর সাহায্য শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১২৬)
মানুষের অন্তরের উপর শয়তানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই যতক্ষণ না মানুষ নিজেই শয়তানের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়। সেগুলো হলো প্রবৃত্তির তাড়না, সন্দেহজনক আমলের পিছে ব্যস্ত হওয়া, বিভ্রান্তি ও অলীক আশা। ফলে শয়তান মানুষের অন্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে, এরপর এসব অস্ত্র হাতে তুলে নেয় ও মানুষের বিরুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করতে থাকে। যদি মুমিনের ঈমানি বাহিনী প্রস্তুত থাকে, তবে তারা সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসবে, বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং শয়তানকে পরাজিত করবে। অন্যথায় সে ভূমি শত্রুর হস্তগত হবে, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ,' (বিপদ থেকে রক্ষাকারী কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নেই আল্লাহ ছাড়া)। যখন বান্দা নিজেই শত্রুকে আমন্ত্রণ জানায়, দূর্গের দরজা খুলে দেয়, নিজের অস্ত্র শত্রুর হাতে তুলে দেয়; তখন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ করা যায় না।' [১]

টিকাঃ
[۹] al-Sha'rawi, 1995, Magic and Envy in the Light of the Qur'an and Sunna, Dar al Taqwa, p. 9.
[৮] Ibn Kathir, 2000, p. 648.
[۱] al-Jawziyyah, 2000, pp. 32-33.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00