📄 মুনাফিকের ব্যক্তিত্ব
মুনাফিকরা এক বিশেষ ক্যাটাগরীর মানুষ। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করেছেন। সূরাহ বাকারার শুরুতে প্রথমে মুমিনদের সম্পর্কে, এরপর কাফিরদের সম্পর্কে, এরপর মুনাফিকদের সম্পর্কে আলোচনা করে আল্লাহ বলেছেন,
• 'আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।
• তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।
• তাদের অন্তঃকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুতঃ তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।
• আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি।
• মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।
• আর যখন তাদেরকে বলা হয়, অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরাও কি ঈমান আনব বোকাদেরই মত! মনে রেখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বোঝে না।
• আর তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র।
• বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের অহংকার ও কুমতলবে হয়রান ও পেরেশান থাকে।
• তারা সে সমস্ত লোক, যারা হেদায়েতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করে। বস্তুতঃ তারা তাদের এ ব্যবসায় লাভবান হতে পারেনি এবং তারা হিদায়াতও লাভ করতে পারেনি।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৮-১৬)
সূরাহ মুনাফিকুন-এ তাদের সম্পর্কে এভাবে আলোচনা করা হয়েছে, 'মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী。
তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ।
এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফির হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না।
আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠসদৃশ্য। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে?' (সূরাহ মুনাফিকুন, ৬৩:১-৪)
এ আয়াতগুলোতে মুনাফিকদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়েছে। তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য বাহ্যিকভাবে তারা ঈমান প্রদর্শন করে অথচ ভেতরে কুফর লুকিয়ে রাখে। 'নিফাক' আরবি শব্দটির মাধ্যমে বোঝানো হয়, কোনো বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ ও অশুভ ইচ্ছা লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে একাত্মতা ও সত্যায়ন করা。[১০] যখন তারা মুমিনদের সাথে একত্রিত হয়, তখন দাবি করে আল্লাহ ও বিচার দিবসে ঈমান রাখে। কিন্তু এগুলো তাদের মিথ্যাচার। বাস্তবে তারা এসব বিষয়ে ঈমান রাখে না。[১৮] শুধুমাত্র জিহ্বার মাধ্যমে উচ্চারণ করে কিন্তু অন্তর ও আমলের মাধ্যমে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে। তাদের অন্তরগুলো সন্দেহ সংশয়ে ব্যাধিগ্রস্ত।
মুনাফিকরা জমিনে ফিতনা-ফাসাদের বিস্তারে ব্যস্ত থাকে। যেমন- আল্লাহর অবাধ্যতা করা ও নিষেধকৃত বিষয় পালন করা। তারা আল্লাহর আওলিয়াদের বিরুদ্ধে কাফিরদেরকে সাহায্য-সমর্থন ও ভালোবাসা প্রদান করে। মুনাফিকদের প্রধান অপকর্ম হলো তারা তাদের বাহ্যিক আচরণ ও বেশভূষা দিয়ে মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করে রাখে। এভাবে বাকি মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করে ও ধোঁকা দেয়। এ কারণে তারা কাফিরদের থেকেও মারাত্মক কেননা কাফিররা ভান না করে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে。[১৭]
মুনাফিকদের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো মিথ্যাচারিতা, ওয়াদা ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুনাফিকের আলামত তিনটি, (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) ওয়াদা করলে খেলাফ করে এবং (৩) তার কাছে আমানত রাখা হলে সে তা খেয়ানত করে। (বুখারি, মুসলিম)
যাদের অন্তরে ঈমান রয়েছে তারাও কিছু মাত্রায় নিফাকে আক্রান্ত হতে পারে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'চারটি স্বভাব যার মধ্যে রয়েছে সে খাঁটি মুনাফিক; উক্ত চারটির একটিও যদি কারো মধ্যে থাকে, তাহলে সেটা বর্জন না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব রয়ে যায়; (১) সে কথা বললে মিথ্যা বলে, (২) চুক্তি করলে তা ভঙ্গ করে, (৩) ওয়াদা করলে খেলাফ করে এবং (৪) ঝগড়া করলে কটূক্তি করে।' (বুখারি, মুসলিম)
মুমিনরা সবসময় নিজের ব্যক্তিত্বকে সকল ধরনের নিফাক থেকে মুক্ত রাখতে ব্যস্ত থাকে।
টিকাঃ
[১০] Ibn Kathir, 2000, Tafsir ibn Kathir (Abridged), Riyadh: Darussalam, Vol. 1, p. 126.
[১৮] Ibid., p. 126.
[১৭] lbid., pp. 132-133.