📄 মুমিনের ব্যক্তিত্ব
সত্যিকার মুমিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (পার্সোনালিটি) অন্যান্য মানুষদের থেকে পৃথক। তাদের চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা বাকিদের মতো নয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণের সাথে তারা আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণ করেন। উন্নত ও মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উন্নয়নে মুজাহাদা (সংগ্রাম) করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে-যার চরিত্র সর্বোত্তম।' (আবু দাউদ)। আরেক হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন মুমিন বান্দার আমলনামায় সচ্চরিত্রের চাইতে অধিকতর ভারী আর কোনো আমলই হবে না।' (বুখারি)
একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন করলেন, 'আমি কি বলব তোমাদের মধ্যে কাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি এবং কে বিচার দিবসে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে?' সাহাবিরা চুপ থাকলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশ্ন দুই বা তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন। এরপর তারা বললেন, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাদেরকে বলুন!' তখন তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র সর্বোত্তম।' (বুখারি)
এ সকল হাদিস অনুসারে একজন মুসলিম উত্তম আমল সম্পাদন ও নেক গুণাবলী অর্জনে খুবই মনোযোগী থাকেন। তারা নিজেদের অবস্থা উন্নয়নে কখনো ক্লান্ত হন না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো নিজেরা দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা ও অপরকে শেখানো। কেননা, ইলমের মাধ্যমেই মানুষ ভালো-মন্দ পৃথক করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ (সা.) উত্তম চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিত্ব উন্নয়ন ও আত্ম-উপলব্ধির জন্য তিনি আমাদের 'রোল মডেল'। আল্লাহ তাআলা তাঁর চরিত্র আলোচনা করে বলেছেন, 'আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।' (সূরাহ কালাম, ৬৮:৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।' (বুখারি)
📄 ইতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
মুমিনরা নিজেদের নফসকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে ও নিজেরা সরল পথে চলে। এ কারণে তারা উত্তম আচরণ নিজেদের ভিতর লালন করে। সময়ের সাথে সাথে পথ পরিক্রমায় এসব উন্নত আচরণ তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়, এরপর এগুলো তাদের ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। আল-জাযায়েরি বলেছেন, 'যখন এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যরে কারণে সদগুণ ও সত্যের প্রতি আগ্রহ জন্মে, উত্তম আমলের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, দান সাদাকাহ ও কল্যাণমূলক কাজ করার বাসনা মনে জাগে, ভালো কাজে আনন্দ ও মন্দ কাজে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়, আর এগুলো স্বভাবের অংশ হয়ে অনুপ্রেরণা প্রদান করতে থাকে, তখন এটাই 'উত্তম চরিত্রের' সংজ্ঞা。[৩]
এসব ইতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। [৪] মুমিনরা যেসব বৈশিষ্ট্য উন্নত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে তার মধ্যে রয়েছে দয়া, নম্রতা, সত্যবাদিতা, বিনয়, সবর, ন্যায় বিচার ইত্যাদি।
৩.৩.১ দয়া, নম্রতা ও করুণা: দয়া এবং নম্রতা এমন দুটি মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যার অনুপস্থিতিতে একজন ব্যক্তি নানা ধরনের মন্দ বিষয়ের দিকে পরিচালিত হয়। একজন ব্যক্তি যাদের সাথে লেনদেন করে তাদের প্রত্যেকের সাথে দয়ার সদগুণ বিকশিত করা উচিত, যেমন- স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, পশুপাখি, সামগ্রিক পরিবেশ এবং সমাজ। বেশ কয়েকটি হাদিসে দয়া ও নম্রতার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নম্রতা যে কোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর কোনো বিষয় থেকে নম্রতা বিদূরিত হলে তাকে কলুষিত করে।' (মুসলিম)।
একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, 'হে আইশা, আল্লাহ তাআলা নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার মাধ্যমে এমন কিছু দান করেন যা কঠোরতার মাধ্যমে দান করেন না; আর অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমেও তা দান করেন না।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।' (মুসলিম)
৩.৩.২ সততা ও সত্যবাদিতা: ইসলাম সত্যের ধর্ম। ইসলামের অনুসারী মুসলিমদের উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো সততা ও সত্যবাদিতা। আল্লাহ বলেছেন, 'যারা সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো খোদাভীরু।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'সত্য আঁকড়িয়ে ধর। সত্যবাদিতা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। কেননা, সততা নেকীর দিকে পরিচালিত করে, আর নেকী জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। কোনো ব্যক্তি সর্বদা সত্য বলার অভ্যাস রপ্ত করলে ও সত্যের উপর সংকল্পবদ্ধ হলে আল্লাহর কাছে সে সত্যবাদীরুপে লিপিবদ্ধ হয়। আর তোমরা মিথ্যা থেকে সাবধান থাক! কেননা, মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে। আর পাপ নিশ্চিত (জ্যহান্নামের) অগ্নির দিকে পরিচালিত করে। কোনো ব্যক্তি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে এবং মিথ্যার উপর সংকল্পবদ্ধ হলে তার নাম আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদীরুপে লিপিবদ্ধ হয়।' (মুসলিম)
সত্যবাদিতা নানাভাবে প্রকাশ পায়, যেমন-[৫]
১। কথায় সত্যবাদিতা: মুমিন কোনো কথা বলার আগে নিশ্চিত হয়ে নেয় যে সে সত্য বলছে।
২। লেনদেন ও পারস্পরিক মেলামেশায় সত্যবাদিতা: মুমিন ব্যক্তি লেনদেনের ক্ষেত্রে সকল ধরনের ধোঁকা ও প্রতারণা, জালিয়াতি পরিহার করে চলে।
৩। ওয়াদা পূরণে সত্যবাদিতা: সত্যবাদিতার আরেক নিদর্শন হলো প্রতিশ্রুতি পূরণে সত্যবাদিতা।
৪। ভান-ভণিতা পরিহার করা: যা ভেতরে নেই তা বাইরে প্রদর্শন করা পরিহার করা।
৩.৩.৩ বিনয়: বিনয় উত্তম গুণসমূহের অন্যতম। তবে এর বিকাশ ঘটানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। আল্লাহ বিনয়ী বান্দাদের প্রশংসা করেছন, 'হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।' (সূরাহ মায়িদা, ৫: ৫৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ আমার নিকট ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্র আচরণ কর, এমনকি কেউ কারো উপর গৌরব করবে না এবং একজন আরেকজনের উপর বাড়াবাড়ি করবে না।' (মুসলিম)। আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'দানে সম্পদ কমে না। আল্লাহ যাকে ক্ষমার গুণে সমৃদ্ধ করেন, তাকে অবশ্যই সম্মান দ্বারা ধন্য করেন। যে লোক শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে, মহামহিম আল্লাহ তার মর্যাদা উন্নীত করেন।' (মুসলিম)
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বিনয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন যা তাঁর জীবনের নানা ঘটনায় ফুটে উঠেছে। হাসান আল-বাসরি এক ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, 'এক গরমের দিনে উমর বাইরে বের হলেন। (রোদ থেকে বাঁচার জন্য) তিনি নিজের চাদর মাথার উপরে ধরেছিলেন। তখন এক যুবক গাধায় চড়ে তাকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল। তিনি বললেন, 'হে যুবক! আমাকে তোমার বাহনের পিছনে উঠিয়ে নাও।' যুবকটি গাধা থেকে নেমে বলল, 'আপনি উঠুন, হে আমিরুল মুমিনীন!' উমর বললেন, 'না তুমিও উঠ। আমি তোমার পেছনে বসছি। তুমি কি আমাকে অধিক আরামদায়ক স্থানে (সামনে) বসতে দিতে চাও, আর নিজে কম আরামদায়ক স্থানে (পেছনে) বসবে?' তিনি যুবকের পেছনে বসলেন। এভাবে মদিনার ভেতর প্রবেশ করলেন। আর লোকেরা এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল।'[৬]
উরওয়া ইবনু যুবায়ের হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাবকে একটি পানির কলস ঘাড়ে করে নিয়ে যেতে দেখেছি।' আমি বললাম, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনার তো এ কাজ করার দরকার নেই!' তিনি বললেন, 'যখন প্রতিনিধি দল এসে আমার কথা শুনছিল ও আনুগত্য করছিল, তখন আমি কিছুটা গর্ব অনুভব করলাম। তাই আমি সেটা দমন করার ইচ্ছা করলাম।'[৭]
৩.৩.৪ সবর: সবর তথা ধৈর্য্য একজন মুসলিমের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এর বিকাশ ঘটানো জীবনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। কুরআনে নব্বইটির অধিক স্থানে সবরের আলোচনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন,
'ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাজের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব। যারা একথা খেয়াল করে যে, তাদেরকে সম্মুখীন হতে হবে স্বীয় পরওয়ারদেগারের এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৪৫-৪৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আপনি সবর করবেন। আপনার সবর আল্লাহর জন্য ব্যতীত নয়, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ১২৭)
সবরের একটি অর্থ নিজেকে ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত থাকা, 'কবুলিয়ত' ও আত্মসমর্পণের সাথে অপছন্দনীয় বিষয় সহ্য করে যাওয়া। [৮] নিজেকে ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত রাখার অর্থ আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা, দুঃখকষ্টে পতিত হলে ধৈর্যশীলতার সাথে সহ্য করা, উত্তম বিষয়ের মাধ্যমে মন্দের মোকাবেলা করা, আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কারের আশায় ক্ষতিকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা ও মার্জনা করা。 আল্লাহ বলেছেন,
'বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:১০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সবরের সাথে ক্ষমার উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শত্রুদের দেয়া কষ্ট, কঠিন পরিস্থিতি ও বিদ্রুপের মুখে তিনি বিনয় অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেছেন, 'দানে সম্পদ কমে না। আল্লাহ যাকে ক্ষমার গুণে সমৃদ্ধ করেন, তাকে অবশ্যই সম্মান দ্বারা ধন্য করেন। যে লোক শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে, মহামহিম আল্লাহ তার মর্যাদা উন্নীত করেন।' (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জেনে রেখো যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্রই রাখেন। যে ব্যক্তি কারো মুখাপেক্ষী হতে চায় না, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে তোলেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য অবলম্বন করতে চায় আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীলতা দান করেন। ধৈর্যের চাইতে উত্তম ও প্রশস্ত আর কোনো জিনিস কাউকে দেয়া হয়নি।' (বুখারি ও মুসলিম)
সমস্ত জীবনব্যাপী মুমিন ক্রমাগত দুটি অবস্থা অতিক্রম করতে থাকে; হয়তো সে শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করে, নয়তো সবর করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'একজন মুমিনের অবস্থা খুবই বিস্ময়কর। (কেননা) তার সকল কাজই কল্যাণপ্রদ। মুমিন ছাড়া অন্যের অবস্থা এমন নয়। একজন মুমিনের যদি আনন্দদায়ক কিছু ঘটে তবে সে আল্লাহর শোকর আদায় করে; এতে তার মঙ্গল সাধিত হয়। পক্ষান্তরে ক্ষতিকর কিছু ঘটলে সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়।' (মুসলিম)
৩.৩.৫ ন্যায়বিচার: ন্যায়বিচারের একটি অর্থ সাম্য, ন্যায্যতা অনুসরণ এবং বৈষম্য, অসমতা ও জুলুম পরিহার করা। ব্যক্তি কিংবা সমাজ উভয়ের জন্যেই ন্যায়বিচার অপরিহার্য। এটি ব্যক্তিকে সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি প্রদান করে এবং সমাজকে সুষ্ঠুভাবে কার্যক্ষম রাখে। আল্লাহ্ বলেন,
'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৯০)
ন্যায়বিচার হারিয়ে গেলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং অনেক সময় নিজেদের অধিকার বুঝে পেতে সহিংসতা অবলম্বন করে।
ন্যায় বিচারের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে。[১] যেমন-
১। আল্লাহর সাথে ন্যায়বিচার: এককভাবে শরিকবিহীন আল্লাহর ইবাদাত করা, তাঁর আদেশের আনুগত্য করা।
২। মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করা: প্রত্যেক প্রাপকের অধিকার প্রদান করা। আল্লাহ তাআলা মুমিন নারী-পুরুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।' (সূরাহ হুজুরাত ৪৯;৯)।
৩। পরিবারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা: স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে কাউকে অন্যায়ভাবে প্রাধান্ না দেওয়া।
৪। কথায় ন্যায়বিচার: মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান না করা।
৫। ঈমানে ন্যায়বিচার: সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বিশ্বাস না করা।
সমাজে ন্যায়বিচারের প্রভাব কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর একটি চমৎকার ঘটনা রয়েছে; বর্ণিত হয়েছে যে একবার রোমের বাদশা উমর ইবনুল খাত্তাবের অবস্থা ও কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য একজন দূত প্রেরণ করল। তার প্রতিনিধিরা মদিনায় আগমন করল, এরপর তারা উমরকে খুঁজতে শুরু করল। প্রশ্ন করল, 'তোমাদের রাজা কোথায়?' তারা বললেন, 'না! আমাদের কোনো রাজা নেই কিন্তু একজন সম্মানিত আমির আছেন। তিনি মদিনার বাইরে গিয়েছেন।' ফলে রোমের বাদশার সেই প্রতিনিধি তাকে খুঁজতে বের হলো এবং উমরকে খুঁজে পেল। সে দেখল উমর মাটির উপর নিজের লাঠিকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে আছেন। সেটা ছিল একটি ছোট ছড়ি যা তিনি সবসময় সাথে রাখতেন। এর মাধ্যমে তিনি কাউকে কোনো মন্দ কাজ করতে দেখলে বিরত করতেন। দূত তাকে গাছের নিচে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে অন্তরে বিনয় অনুভব করল এবং নিজেকে বলল, 'এই ব্যক্তির ভয়ে দুনিয়ার তাবৎ রাজা-বাদশাহরা ভীত! অথচ তাঁর অবস্থা কত সাধারণ! হে উমর, তুমি এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছ কারণ তুমি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছ। আর আমাদের রাজা-বাদশাহরা একেকজন জালিম। ফলে তারা সারারাত আতঙ্কিত অবস্থায় জেগে থাকে। [১০]
টিকাঃ
[৩] al-Jaza'iry, A. B. J., 2001, Minhaj al-Muslim, Riyadh: Darussalam, Vol. 1, p. 287.
[৪] See for example al-Hashimi, The Ideal Muslim and The Ideal Muslimah (Riyadh: International Islamic Publishing House).
[e] al-Jaza'iry, 2001, pp. 330-331.
[6] Sallabi, A. M., 2007, 'Umar ibn al-Khattab: His Life and Times, Riyadh: International Islamic Publishing House, p. 241.
[7] Ibid., p. 242.
[৮] al-Jaza'iry, 2001, p. 292.
[১] Ibid., 2001, pp. 311-312
📄 ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান
সমসাময়িক সেক্যুলার মনোবিজ্ঞানে 'ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান' (positive psychology) নামে একটি নতুন পরিভাষা ও ক্ষেত্র চালু হয়েছে। এটি বেশ লক্ষণীয়। এর সংজ্ঞায়ন করে বলা হয়েছে; এটি সর্বোচ্চ মানবিক কার্যক্ষমতার (optimal human functioning) বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন, যার প্রাথমিক লক্ষ্য সেসব গুণ ও ক্ষমতা আবিষ্কার করা এবং প্রসার ঘটানো যা ব্যক্তি ও সমাজকে বিকশিত করে। [১১] ইতিবাচক মনস্তত্ত্বের আবিষ্কারকগণ এর ভূমিকায় বলেন:
'(এখানে) ইতিবাচক মানসিক অভিজ্ঞতাগুলোকে একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করা হয়। যখন জীবন ব্যর্থ ও অর্থহীন লাগতে থাকে, তখন (ব্যক্তির) ইতিবাচক স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নিয়মনীতির মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করার একটি সম্ভাবনা দেখা যায়।
আমাদের এই বিষয়ে (মনোবিজ্ঞানে) আলোচনা-গবেষণায় আমরা প্যাথলজির (মনোরোগ) দিকটাতে অতিরিক্ত মনোযোগ প্রদান করে এসেছি। ফলে মানবসত্তাকে আমরা যেভাবে চিনেছি, তাতে সেইসব ইতিবাচক (মনস্তাত্বিক) উপাদানের ঘাটতি রয়ে গেছে, যেগুলো জীবনকে অর্থপূর্ণ ও উপভোগ্য করে তোলে। আশা, প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা, দূরদর্শীতা, সাহস, আধ্যাত্মিকতা, দায়বদ্ধতা ও অধ্যবসায় ইত্যাদি মানসিক ব্যাপারগুলোকে হয়তো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। নয়তো অন্য নেতিবাচক প্রবণতাকে মূল ধরে নিয়ে এগুলোকে তা থেকে উৎসারিত মনে করা হচ্ছে। লেখকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, পরবর্তী শতাব্দীতে মানুষ এমন একটি বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র ও পেশা দেখতে পাবে যা সেইসব ফ্যাক্টরগুলো নিয়ে কাজ করবে যেগুলো ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজকে বিকশিত করে。[১২]
সামনের ছকে মানসিক শক্তিমত্তার একটি তালিকা দেয়া হলো, যা তত্ত্ববিদগণ মূলত মানব উন্নয়ন ও মেডিকেল চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করার নিমিত্তে তৈরি করেছেন।
টিকাঃ
[১০] Ibid., 2001, p. 313.
[১১] Myers, 2007, p. 628.
[১২] Seligman, M. E. P., & Csikszentmihalyl, M., 2000, Positive psychology: An introduction, American Psychologist 55(1).
📄 মানবিক শক্তিমত্তার তালিকা
[১৩]
জ্ঞানীয় শক্তি (Strengths of cognition):
১. আগ্রহ/কৌতূহল
২. জ্ঞান ও কোনো কিছু শেখার প্রতি ভালোবাসা
৩. বোধশক্তি/ বিচারক্ষমতা
৪. মৌলিকতা/ স্বাতন্ত্র
৫. ব্যক্তিগত, আবেগিক ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তা
পারস্পরিক ও নাগরিক শক্তি (Relational and civic strengths):
১১. দয়া/উদারতা/যত্ন/পরিচর্যা
১২. দায়িত্ববোধ/ন্যায্যতা/সহনশীলতা
১৩. রসবোধ/কৌতুক
১৪. ভালোবাসা গ্রহণ ও প্রদানের ক্ষমতা
১৫. নাগরিকত্ব/দায়িত্ব/আনুগত্য/জোটবদ্ধ কাজ
১৬. নেতৃত্ব
আবেগিক শক্তি (Strengths of emotion):
৬. সৌন্দর্য্য ও উৎকর্ষতা মূল্যায়ন/ভক্তি/বিস্ময়/কৃতজ্ঞতা
৭. আশা/দূরদৃষ্টি/পরিকল্পনা
৮. জীবনকে ভালোবাসা/আনন্দ
যৌক্তিক শক্তি (Strengths of coherence):
১৭. সততা/শুদ্ধতা
১৮. ভারসাম্য/পরিমিতিবোধ
১৯. আত্ম-নিয়ন্ত্রণ/আত্ম-পরিচালনা
২০. বিজ্ঞতা/প্রজ্ঞা
২১. আধ্যাত্মিকতা/জীবনের উদ্দেশ্য/বিশ্বাস/ধর্ম
ইচ্ছাশক্তি (Strengths of will):
৯. সাহস/সততা
১০. পরিশ্রম/অধ্যবসায়
টিকাঃ
[১৩] Seligman, M.E.P., 2000, 'Positive Clinical Psychology', in L.G., Aspinwall & U.M., Staudinger (Eds.), A Psychology of Human Strengths: Perspectives on an Emerging Field, Washington, DC: American Psychological Association.