📄 আল্লাহ অন্তরের গোপন খবর জানেন
মানুষ অন্তরের খবর প্রকাশ করুক বা গোপন রাখুক, আল্লাহ প্রতিটি সুক্ষ্ম বিষয়েও বিস্তারিত অবগত। মানুষকে বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিষয়টি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অনেকবার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্মরণিকা অনুসারে নিজেদের নিয়ত ও আচরণ সংশোধন করা উচিত। আল্লাহ বলেছেন,
'বলে দিন, তোমরা যদি মনের কথা গোপন করে রাখ অথবা প্রকাশ করে দাও, আল্লাহ সে সবই জানতে পারেন। আর আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সেসব ও তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:২৯)
• অন্যত্র বলেছেন,
'আল্লাহ আসমান ও জমিনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত। তিনি অন্তরের বিষয় সম্পর্কেও সবিশেষ অবহিত।' (সূরাহ ফাতির, ৩৫:৩৮)
• অন্যত্র বলেছেন,
'তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল অথবা প্রকাশ্যে বল, তিনি তো অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সূক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১৩-১৪)
• অন্যত্র বলেছেন,
'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।' (সূরাহ কাফ, ৫০:১৬)
শেষোক্ত আয়াতে যে 'নৈকট্য' বোঝানো হয়েছে তা জ্ঞানের মাধ্যমে নৈকট্য অর্থাৎ মানুষের সকল অবস্থা সম্পর্কে সর্বাবস্থায় সম্যক অবগত হওয়ার মাধ্যমে তিনি নিকটবর্তী।
📄 কলবের প্রকারভেদ
যেহেতু কলব (অন্তর) নফসের সাথে সম্পৃক্ত, তাই এরও তিনটি ধরণ রয়েছে যা নফসের অনুরুপ। এগুলো হলো সুস্থ অন্তর, মৃত অন্তর ও অসুস্থ বা ত্রুটিপূর্ণ অন্তর। যদি অন্তর উত্তম হয় তবে ব্যক্তির আমল উত্তম হবে, আর অন্তর দূষিত হলে আমল মন্দ হবে।
সুস্থ কলব (অন্তর): সুস্থ অন্তর এমন সব শাহওয়াত ও শুবুحات (কামনা বাসনা ও সন্দেহ) হতে মুক্ত থাকে যাতে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা ও ওহীর সাথে সংঘাত রয়েছে। এটি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে, নির্ভর করে। এই ধরনের অন্তর সজীব, বিনীত ও প্রশান্ত।।৩৫। বিশুদ্ধ অন্তর একমাত্র আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ে পরিপূর্ণ থাকে। আল্লাহ যা ভালবাসেন সেটি তার কাছে প্রিয় এবং তিনি যা অপছন্দ করেন সেটি সেই অন্তরে অপছন্দনীয়। বিচার দিবসে যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ ও অনুগত ক্বলব নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে একমাত্র সেই কলবই উপকারে আসবে। আল্লাহ বলেন,
'যে দিবসে ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।' (সূরাহ শুয়ারা, ২৬:৮৮-৮৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশুদ্ধ অন্তরের জন্য দুআ করতেন। তিনি বলতেন,
'হে আল্লাহ! আপনি আমার এবং আমার গুনাহসমূহের মধ্যে এমন দূরত্ব সৃষ্টি করুন যেরূপ দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার গুনাহসমূহ থেকে এমন পরিষ্কার করে দিন, যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার পাপসমূহ থেকে বরফ, পানি ও মেঘের শিলাখণ্ড দ্বারা ধৌত করে দিন।' (বুখারি)
সুস্থ অন্তর আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে প্রশান্তি ও স্বস্তি লাভ করে। আল্লাহ বলছেন, 'হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হিদায়াত ও রহমত মুসলমানদের জন্য।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:৫৭)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।' (সূরাহ রাদ, ১৩:২৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাজিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃপুনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:২৩)
মৃত অন্তর: মৃত অন্তর তার রবের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। সে তার রবকে চিনে না, ইবাদাত করে না। কেবল নিজের খেয়ালখুশি অনুসরণ করে ও দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকে। নিজের কামনা বাসনা অনুসরণ করে এবং মন যা চায় সে সকল কাজে ব্যস্ত থাকে। ওদিকে আল্লাহর কাছে সেসব কাজ অপছন্দনীয় কি না তা পরোয়া করে না। এটি কঠিন ও রুক্ষ অন্তর। [৩৬] যখন এই ধরনের অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর কালাম কুরআনের আয়াত শুনে তখন বিপরীত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। আল্লাহ বলেন, 'যখন খাঁটিভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায়, আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্যদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তারা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৪৫)
যারা আল্লাহর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে তাদের অন্তরগুলো অন্ধ ও বধির। তাদের বোধশক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা মৃত। যখন কোনো গুনাহের কাজ করা হয় তখন অন্তরে একটি দাগ বা আবরণ পড়ে যায়। তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সেই আবরণ অপসারণ করা যায়। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি তাওবা না করে, তবে গুনাহের আবরণ গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে, এক পর্যায়ে সমস্ত অন্তরে তালাবদ্ধ হয়ে যায় এবং ব্যক্তি আধ্যাত্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। আল্লাহ বলেন, 'কখনও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের হৃদয় মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।' (সূরাহ মুতাফফিফিন, ৮৩:১৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৭)
এধরনের অন্তরের ব্যাপারে কুরআনের একটি চমৎকার উপমা উপস্থাপন করা হয়েছে, 'অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন। পাথরের মধ্যে এমনও আছে; যা থেকে ঝরণা প্রবাহিত হয়, এমনও আছে, যা বিদীর্ণ হয়, অতঃপর তা থেকে পানি নির্গত হয় এবং এমনও আছে, যা আল্লাহর ভয়ে খসেপড়তে থাকে! আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৭৪)
এই আয়াতটি বনি ইসরাইলিদের সাথে সম্পর্কিত, তারা আল্লাহর বিরোধিতা করেছে ও তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে তাদের অন্তরগুলো পাথরের থেকেও কঠিন হয়ে গেছে ও সকল প্রকারের হিদায়াত লাভের পথ যুগপৎভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
অসুস্থ অন্তর: অন্তরের তৃতীয় ধরণ হচ্ছে অসুস্থ অন্তর। এটি পূর্বোক্ত উভয় প্রকার অন্তরের মধ্যবর্তী ধরণ। এতে প্রাণের কিছু ছোঁয়া রয়েছে কিন্তু তা ত্রুটিপূর্ণ। এতে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ঈমান এবং তাওয়াক্কুল রয়েছে কিন্তু একইসাথে অর্থহীন।
কামনা-বাসনা ও বস্তুগত দুনিয়ার প্রতি মোহ লালায়িত আছে। এই অন্তর সবসময় নিরাপত্তা ও ধ্বংসের মাঝে দুলতে থাকে。[৩৭]
যদি কোনো ব্যক্তি হারাম ও সন্দেহজনক কাজে লিপ্ত হয় তবে তার অন্তর দুর্বল হতে থাকে এবং পরবর্তী আক্রমণ ও ব্যাধির প্রতি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। যদি তাকে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা না করা হয় তবে সেটি একটি মৃত অন্তরে পরিণত হয়।
ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ অন্তরের তিনটি অবস্থাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন: 'অন্তর তিন ধরনের। প্রথম ধরন ঈমান ও সকল কল্যাণ হতে বঞ্চিত। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অন্তরকে শয়তান ওয়াসওয়াসা প্রদান করে ও নিজের বিশ্রামাগার বানিয়ে ফেলে। আর যখন শয়তান সেখানে বসতি স্থাপন করে তখন নিজের রাজত্ব স্থাপন করে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর ঈমানের আলোকে আলোকিত হলেও রয়েছে কিছু অন্ধকার। সেখানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত রয়েছে কিন্তু প্রদীপের নিচে থাকা অন্ধকারের মতো রয়েছে আবেগ ও তাড়না। এই অন্তরে কখনো শয়তান অভ্যর্থনা লাভ করে আবার কখনও প্রত্যাখ্যাত হয় কিন্তু শয়তান আশা হারায় না, বরং দখলের আকুতি অনুভব করে। দুই পক্ষেই যুদ্ধ চলতে থাকে। এই ধরনের লোকদের অবস্থা ব্যাপক পরিবর্তনশীল। কারো ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় শয়তান বিজয় লাভ করে আবার কারো ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় শয়তান পরাজিত হয়; আবার কারো ক্ষেত্রে দুই পক্ষে জয়-পরাজয় চলতে থাকে।
তৃতীয় প্রকারের অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ, আলোয় আলোকিত এবং সেখান থেকে কামনা-বাসনার আবরণ উন্মোচিত ও অন্ধকারের ছায়া দূরীভূত! ফলে তার বক্ষদেশ আলোয় ঝলমল করতে থাকে। নূরের ছটায় ভ্রান্ত পথের হাতছানি জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই অন্তর উল্কাপিণ্ড দ্বারা সুরক্ষিত নভোমন্ডলের অনুরূপ। যদি শয়তান সেদিকে যেতে চায় তখন উল্কাপিণ্ড তাকে ধাওয়া করে এবং জ্বালিয়ে দেয়। নিশ্চয়ই মুমিনের অন্তর অপেক্ষা অলঙ্ঘনীয় কোনো নভোমন্ডল নেই। আল্লাহ তাকে এমনভাবে রক্ষা করেন যেভাবে তিনি ঊর্ধ্বজগতে শয়তানের প্রবেশকে আটকে রাখেন কেননা ঊর্ধ্বজগৎ ফেরেশতাদের ইবাদাতখানা, সেখান থেকেই ওহী নাজিল হয়, সেটি এমন স্থান যেখান থেকে আনুগত্যের আলোকধারা বিচ্ছুরিত হয়। আর মুমিনের অন্তর হলো তাওহিদ, আল্লাহর ভালোবাসা ও মারেফাতের কেন্দ্র। এখানে ঈমানের আলো ঝলমল করে। কাজেই, এটি শত্রুর চক্রান্ত থেকে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা লাভের দাবীদার। শত্রু এই অন্তর থেকে কিছুই লাভ করেনা-যদি না অন্তর নিজেই উদাসীন হয়ে শত্রুর ধোঁকাকে আমন্ত্রণ জানায়。[৩৮]
সুস্থ অন্তরের নিদর্শন: অন্তর সুস্থ ও বিশুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে কিনা তা কিছু নিদর্শনের মাধ্যমে বোঝা যায়। সেই পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য হলো সুস্থ অন্তর দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে থাকে না বরং সে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি সংযুক্ত থাকে। সুস্থ অন্তরের নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, [৩৯]
১। নিজেকে আখিরাতের বাসিন্দা মনে করা; পরকালীন জীবনে পৌঁছাতে আগ্রহী হওয়া।
২। গুনাহের পর তাওবা না করা পর্যন্ত অস্বস্তিবোধ করতে থাকা।
৩। প্রাত্যহিক যিকির-আযকার, হামদ, দুআ ও তিলাওয়াত ছুটে গেলে অখুশি ও অতৃপ্ত বোধ করা।
৪। সব রকম আনন্দ অপেক্ষা আল্লাহর ইবাদাতে অধিক আনন্দ লাভ করা।
৫। সালাতরত অবস্থায় দুনিয়ার দুঃখ দুশ্চিন্তার অনুপস্থিতি অনুভব করা।
৬। একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমল করা হলো কিনা ভেবে উদ্বিগ্ন ও পেরেশান থাকা।
৭। আমলের গুণগত মান ও শুদ্ধতা নিয়ে অধিক উদ্বিগ্ন হওয়া।
৮। সময় অপচয়ের বদলে প্রতি মুহুর্ত সদ্বব্যবহারে সচেষ্ট হওয়া।
অসুস্থ অন্তরের নিদর্শন: যে ব্যক্তির অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত বা দূষিত তা বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে বোঝা যায়। [৪০] যেমন,
১। গুনাহ করার সময় কোনো ব্যথা বেদনা অনুভব না করা।
২। আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে আনন্দ অনুভব করা।
৩। কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে অধিক মনোযোগী অথচ অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে উদাসীন।
৪। সত্য মানতে, পছন্দ করতে ও আত্মসমর্পণ করতে অপছন্দ করা।
৫। নেক ব্যক্তিদের সাহচর্যে অস্বস্তি অনুভব করা কিন্তু পথভ্রষ্ট, গুনাহগার ব্যক্তিদের সাহচর্যে আনন্দ অনুভব করা।
৬। সন্দেহ-সংশয় ও ভুল ধারণার পেছনে লেগে থাকা, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য উপকারি আমলের বদলে নানা রকম ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্কের প্রতি আকৃষ্ট থাকা।
৭। ওয়াজ-নসীহতে ভাবান্তর না হওয়া।
টিকাঃ
[es] Zarabozo, J., 1999, Commentary on the Forty Hadith of al-Nawawi, Denver, CO: Al Basheer Company for Publications and Translations, Vol. 1, pp. 469-470.
[99] Ibn Taymiyyah, 1998, Diseases of the Hearts and their Cures, Birmingham, U.K: Al Hidaayah Publishing and Distribution, p. 11.
[৩৬] Ibid.
[৩৭] lbid., p. 11.
[৩৮] al-Jawziyah, 2000, p. 31.
[৩৯] Zarabozo, 1999, pp. 471-2.
[৪০] Zarabozo, 1999, pp. 472-3.
📄 অন্তর বিষাক্তকারী বিষয়ের বর্ণনা
সকল অবাধ্যতার কাজের মাধ্যমে অন্তর বিষাক্ত হয়ে উঠে ও অসুস্থ হয়। তবে চারটি সুনির্দিষ্ট অবাধ্যতা বেশি বিস্তৃত দেখা যায় এবং এগুলো অন্তরের সুস্থতার ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেগুলো হলো-অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কথাবার্তা, অনিয়ন্ত্রিত চাহনি, অতিরিক্ত পানাহার ও অসৎ সঙ্গ। [৪১] প্রথম তিনটি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে আর চতুর্থটি সামাজিক সম্পর্ক অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
২.১৬.১ অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কথা: অনেক মানুষই এই বিষয়টি ভুলে যায় যে কাজকর্মের পাশাপাশি কথার জন্যেও তাদেরকে হিসাব দিতে হবে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'বান্দাহ এমন একটি কথা বলে, যে ব্যাপারে সে কিছু চিন্তা করেনা। (অথচ) এর কারণে সে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরত্বে জাহান্নামে চলে যায়।' (মুসলিম)
আরেক হাদিসে এসেছে, 'নিশ্চয় বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো কথা উচ্চারণ করে অথচ সে কথার গুরুত্ব সম্পর্কে চেতনা নেই কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেন। আবার বান্দা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কোনো কথা বলে ফেলে যার পরিণতি সম্পর্কে সচেতন নয়, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে পতিত হবে।' (বুখারি)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যাক্তি আমার (সন্তুষ্টির) জন্য তার দু'চোয়ালের মধ্যবর্তী বস্তু (জিহ্বা) এবং দু'রানের মাঝখানের বস্তু (লজ্জাস্থান) এর হিফাজত করবে আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করব।' (বুখারি)
মুখ ও জিহ্বা হিফাজতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; এই দুটি দ্বারা সম্পাদিত অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকা, যেমন মিথ্যাচারিতা, পরচর্চা, পরনিন্দা, অভিশাপ, ঝগড়া ইত্যাদি। মুখ ও জিহ্বার মাধ্যমে হারাম খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকাও এর হিফাজতের অন্তর্ভুক্ত। জিহ্বা সহজেই দ্রুততার সাথে নড়াচড়া করানো যায়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর অনুসারীদেরকে এর ক্ষতি থেকে সতর্ক করে দিয়েছেন। যেকোনো কথা একবার মুখ থেকে বের হয়ে গেলে তার মাধ্যমে প্রভূত ক্ষতি সাধিত হতে পারে। সেটাকে আর ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় থাকেনা, তার কোনো প্রতিকার করা যায় না। এর পরিবর্তে যদি শুরুতেই জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রিত রাখা হতো সেটিই ছিল তুলনামূলক সহজ এবং উত্তম, তাহলে আর পরবর্তী ফলাফলের দায়দায়িত্ব ঘাড়ে চাপত না।
২,১৬.২ অনিয়ন্ত্রিত চাহনি: আল্লাহ তাআলা শালীনতা ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষার্থে দৃষ্টি নত রাখতে ও নিষিদ্ধ বস্তু থেকে নজর হিফাজত করতে নির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন, 'মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে।...' (সূরাহ নূর, ২৪:৩০-৩১)
একজন মুমিন কেবল বৈধ দৃশ্য দেখতে পারে। যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায় তবে মুমিন নারী কিংবা পুরুষকে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'নিজেকে রাস্তার ওপর বসা থেকে বাঁচাও। সাহাবাগণ নিবেদন করলেন, আমাদের জন্যে (রাস্তায়) বসা তো জরুরী। আমরা রাস্তায় বসে কথা বলি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমাদের যদি বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় করো। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কি? তিনি বললেন, (১) দৃষ্টিকে নিম্নমুখী রাখা, (২) কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া, (৩) (পথিকের) সালামের জবাব দেয়া, (৪) সৎকাজের হুকুম দেয়া, (৫) মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। (বুখারি ও মুসলিম)
তিনি আরও বলেছেন, 'আমাকে ছয়টি বিষয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করো আমি তোমাদের জান্নাতের নিশ্চয়তা প্রদান করব। যখন তোমাদের কেউ কথা বলবে সে মিথ্যা বলবে না, আমানত প্রদান করা হলে খেয়ানত করবে না, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করবে না, দৃষ্টি নত রাখবে, নিজের হাতকে সংবরণ করবে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে।' (আহমাদ ও ইবনু হিব্বান সংরক্ষিত নির্ভরযোগ্য হাদিস)। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দৃষ্টি প্রদানের মাধ্যমে অন্তরে কুমন্ত্রণা জাগ্রত হয় এবং আকর্ষণ ও কামনা-বাসনার উদ্রেক ঘটে। ফলে একজন ব্যক্তি হারাম কাজ করার মাধ্যমে সে তাড়না নিবারণ করে।
• আত্মার পরিশুদ্ধি বিষয়ে রচিত গ্রন্থে ফরিদ উল্লেখ করেছেন, 'শয়তান প্রবেশ করে দৃষ্টির মাধ্যমে, এর সাহায্যে সে শূন্যস্থানে বায়ুর থেকেও দ্রুত গতিতে সফর করে। সাধারণ বিষয়কেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলে এবং অন্তরে পূজনীয় মূর্তিতে রূপান্তরিত করে। এরপর সে মিথ্যা পুরস্কারের ওয়াদা প্রদান করে অন্তরে কামনার আগুন প্রজ্বলিত করে, এরপর সেই আগুনে লাকড়ি স্বরূপ গুনাহের কাজ সম্পাদন করে। অথচ কিছুই ঘটত না যদি শুরুতেই সে নিষিদ্ধ দৃষ্টি প্রদান হতে বিরত থাকত। [৪২]
রাসূলুল্লাহ (সা.) অনিয়ন্ত্রিত চাহনি ও লজ্জাস্থানের পারস্পরিক সংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, 'মানুষের জন্যে তার ব্যভিচারের অংশ লেখা হয়েছে, যা সে নিশ্চিতভাবেই পেয়ে যাবে। (সুতরাং) দুই চোখের জিনা হলো পরস্ত্রীর প্রতি নজর করা, দুই কানের জিনা হলো যৌন উত্তেজক কথা-বার্তা শ্রবণ করা, মুখের জিনা হলো পরস্ত্রীর সাথে রসালো কন্ঠে কথা বলা। হাতের জিনা হলো পরস্ত্রীকে স্পর্শ করা হাত দিয়ে ধরা এবং পায়ের জিনা হয়ে যৌন মিলনের উদ্দেশ্যে পরস্ত্রীর কাছে গমন। অন্তরের ব্যাভিচার হলো হারাম বস্তু কামনা করা, আর (পরিশেষে) লজ্জাস্থান এসবের সত্যতা প্রমাণ করে কিংবা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। (বুখারি ও মুসলিম)।
এধরনের ফাঁদে ধরা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের প্রধান কাজগুলোর প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলে, অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যায়। যেমন- আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য হতে গাফেল হয়ে যায়। এভাবে অবাধ্যতার কারণে অন্তর অন্ধ হয়ে যায়। ফলে সে মিথ্যা হতে সত্য পৃথক করতে পারে না।
২.১৬.৩ অতিরিক্ত পানাহার: কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে মুমিনদেরকে অতিরিক্ত পানাহার পরিহার করতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন,
'হে বনি-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।' (সূরাহ আরাফ, ৭:৩১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কোনো মানুষ পেটের চাইতে খারাপ কোনো পাত্র ভর্তি করে না। মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক গ্রাস খাদ্যই তার জন্য যথেষ্ট। এর চাইতেও যদি বেশি প্রয়োজন হয়, তবে পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে এক- তৃতীয়াংশ তার খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ তার পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ভাগ করে নেবে।' (তিরমিযি ও ইবনু মাজাহ, সনদ বিশুদ্ধ)
অতিরিক্ত পানাহারের মাধ্যমে ফরজ আমল পালনে অলসতা সৃষ্টি হয়। যেমন- সালাত ও অন্যান্য আমল। অতিরিক্ত পানাহারের ফলে কামনাবাসনা উদ্দীপ্ত হয়, নাফরমান কাজে শক্তি ও সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে আসে। উদাহরণস্বরূপ; ভরপেট আহার করার পর মানুষের মধ্যে রাগের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত যে ভরপেট আহার করার পর মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। পাকস্থলী পরিপূর্ণ হয়ে গেলে খাদ্য হজমের জন্য সেখানে অধিক রক্ত সঞ্চালিত হয়, ফলে মস্তিষ্কে তুলনামূলক কম রক্ত সঞ্চালন ঘটে।
টিকাঃ
[৪১] Farid, A., (Ed.), 1993, The Purification of the Soul (Works of al-Hanbali, al Jawziyya, al- Ghazali), London, U.K: Al Firdous Ltd, p. 23.
[৪২] Ibid., p. 27.
📄 অন্তর ও আত্মায় গুনাহের প্রভাব
কলব (অন্তর) ও নফসের (আত্মা) উপর গুনাহের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে, ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে গুনাহের তীব্রতার উপর। কুরআন ও হাদিসে পাপী ব্যক্তির অন্তর সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। তিরমিযি সংরক্ষিত নির্ভরযোগ্য সনদের হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'মুমিন ব্যক্তি যখন গুনাহ করে তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর সে তাওবা করলে, পাপকাজ ত্যাগ করলে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার কলব পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে আরও গুনাহ করলে সেই কালো দাগ বেড়ে যায়। এই সেই মরিচা যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন: 'কক্ষনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে জং (মরিচা) ধরিয়েছে' (সূরাহ আল-মুতাফফিফীন: ১৪)।
গুনাহের ফলে একদিকে অন্তরে আল্লাহর আনুগত্যের সংকল্প দুর্বল হয়ে আসে, আরেকদিকে ভবিষ্যতে আরও গুনাহ করার সংকল্প শক্তিশালী হয়। ধীরে ধীরে তাওবার ইচ্ছা দুর্বল হয়ে একসময় অন্তর থেকে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। [৪০] এভাবে গুনাহ অন্তরকে ব্যধিগ্রস্ত করে অথবা সম্পূর্ণভাবে মেরে ফেলে। যখন কোনো ব্যক্তি ক্রমাগত গুনাহ করতে থাকে তখন তার অন্তরে মোহর পড়ে যায়। মরিচা বৃদ্ধি করে পেয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সম্পূর্ণরূপে অন্তরকে ঢেকে ফেলে, তখন আল্লাহর সাথে অন্তরের সংযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়। এই অন্তরকে পরিশুদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন -যেভাবে একটি ধাতব বস্তু থেকে মরিচা দূর করা কঠিন।
বুখারি ও আবু দাউদ এর বিশুদ্ধ হাদিস অনুসারে অন্তরের বিভিন্ন ব্যাধি থেকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আশ্রয়প্রার্থনা করতেন, যেমন: দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণের বোঝা ও লোকজনের আধিপত্য থেকে। ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিষয় নিয়ে আশঙ্কা করলে অন্তরে উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়। আর অতীতের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলে অন্তরে দুঃখবোধ ও বিষণ্ণতা সৃষ্টি হয়। যখন ব্যক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থাকা বিষয়কে উপেক্ষা করে তখন এটা তার অক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ, আর অক্ষমতা হতে অপারগতার সৃষ্টি। অপারগতা যদি ইচ্ছাশক্তির অভাবে ঘটে তাহলে সেটা অলসতা। দৈহিক (ক্ষতির) কারণে অনাগ্রহী হলে সেটা কাপুরুষতা, আর সম্পদের কারণে (অনাগ্রহী) হলে কৃপণতা। ঋণী ব্যক্তির উপর পাওনাদার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে, আর যারা বিনা অজুহাতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে তারা অন্যকে পদাবনত বা জুলুম করতে চায়। [৪৪]
গুনাহের আরেকটি ক্ষতি হলো ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়া। পাপ ইলমের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়, মনকে দূষিত করে, অন্তর্দৃষ্টি হরণ করে। এমনকি সামনে সত্য উপস্থাপন করলেও সর্বগ্রাসী অন্ধকারের কারণে তারা সেটা চিনতে পারে না। তারা কুফর, বিদআত ও পথভ্রষ্টতার সংশয়ে নিমজ্জিত থাকে। গুনাহগারের অন্তর সর্বদা উদ্বিগ্ন ও পেরেশান থাকে। সে আল্লাহ ও অন্যান্য মানুষদের থেকে নিজেকে একাকী অনুভব করে। বিশেষত নেক ব্যক্তিদের থেকে তার নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধি পেতে থাকে যতক্ষণ না সে পুরোপুরি শয়তানের অনুচরদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। তখন জ্ঞানী ব্যক্তিদের জ্ঞান থেকে সে আর কোনো উপকার লাভ করতে পারে না।
দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা যত ক্ষতিকর ও মন্দ অভিজ্ঞতা অর্জন করি, এগুলো ঘটে আমাদের নিজেদের গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কারণে। [৪৫] আল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।' (সূরাহ শুরা, ৪২:৩০) আখিরাতে কাফিরদের শাস্তি উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, 'এই হলো সে সবের বিনিময় যা তোমরা তোমাদের পূর্বে পাঠিয়েছ নিজের হাতে। বস্তুতঃ এটি এ জন্য যে, আল্লাহ বান্দার উপর যুলুম করেন না।' (সূরাহ আনফাল, ৮:৫১)
গুনাহের আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো জীবন থেকে আল্লাহর সুরক্ষা ও নিয়ামত উঠে যাওয়া। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি দুআ ছিল এরকম, (তিনি বলতেন), 'হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পানাহ চাই, তোমার নিয়ামত সরে যাওয়া, তোমার ক্ষমা ওলটপালট হয়ে যাওয়া, তোমার আকস্মিক শাস্তি এবং তোমার সব রকমের অসন্তুষ্টি থেকে।' (মুসলিম)
টিকাঃ
[৪০] al-Jawziyyah, I. Q., 2006, Spiritual Disease and its Cure, London, UK: Al- Firdous Ltd., p. 74.
[88] Ibid., pp. 100-101.
[84] Ibid., pp. 57-58.