📄 মানব আত্মার প্রকৃতি
মানবাত্মার প্রকৃতি ও মূলনীতির আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে চলুন কয়েকটি পরিভাষা জেনে নেওয়া যাক। এখন আমরা রূহ, নফস ও কলব সম্পর্কে আলোচনা শুরু করছি।
রূহ: এই পরিভাষাটি কুরআনে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে (রূহ শব্দটি আত্মা, প্রাণ অথবা শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি নামেও ব্যবহৃত হয়)। এটি গায়েবের বিভিন্ন বিষয়কেও নির্দেশ করে, যেমন- ফেরেশতা, ওহী, আসমানি অনুপ্রেরণা ইত্যাদি। এর মাধ্যমে মানব সত্তার আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি আর আত্মাও বোঝানো হয়。[১৮] এটি দেহ ও মনে প্রাণদানকারী মূল উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালক। রূহ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে তাড়িত করে। সত্তাগতভাবে এটি দেহ থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যখন রূহ চলে যায়, তখন দেহের সকল কার্যক্রম থেমে যায়।
নফস : আত্মা বা 'মন' (psyche) বোঝাতে কুরআনের আরেকটি বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা হচ্ছে নফস (বহুবচন আনফুস, নুফুস)। প্রসঙ্গভেদে এই শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে; মানব আত্মা ও নিজের আপন সত্তা。[১৯] কখনো কখনো এই শব্দের মাধ্যমে আত্মা বা রূহকে বোঝানো হয় আবার কখনো দৈহিক সত্তার সাথে জড়িত মানুষের নিজের সত্তাকে বোঝানো হয়। শব্দটির উভমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মা ও মানুষের আপন সত্তার মাঝে সূক্ষ্ম সংযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ফুটে উঠে। নফসের সংজ্ঞায় ড. জামাল জারাবযো, কারযুন (karzoon) এর প্রদত্ত সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন;
'এটি মানব সত্তার আভ্যন্তরীণ বিষয় যার প্রকৃত ধরণ উপলব্ধির বাইরে। নফস ভালো বা মন্দের নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারে। বিভিন্ন মানবিক স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য-এর সমন্বয়ে নফস আমাদের আচরণকে স্পষ্টতঃ প্রভাবিত করে। [২০]
অধিকাংশ মুসলিম আলিম 'নফস' ও 'রূহ' পরিভাষা দুটিকে পস্পরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। সাধারণত উভয়ের প্রধান পার্থক্য হলো আত্মা যখন দেহাভ্যন্তরে থাকে তখন তাকে 'নফস' বলে অভিহিত করা হয়, আর দেহ থেকে আত্মা পৃথক হয়ে গেলে তাকে 'রূহ' বলা হয়। তবে সর্বত্র এটা প্রযোজ্য নাও হতে পারে, যেমনটা বিভিন্ন হাদিস হতে স্পষ্ট। [২১] যেমন- নিম্নের দুটি হাদিসে মৃত্যুকালে দেহ হতে আত্মা বের হওয়া প্রসঙ্গে রূহ/নফস (উভয়) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যখন রূহ কবয করা হয়, তখন চোখ তার অনুসরণ করে।' (মুসলিম)। আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা কি মানুষের দিকে লক্ষ্য কর না? যখন 'সে মারা যায় তখন তার চোখ উপরের দিকে উল্টে থাকে।' সাহাবিগণ বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'এ হলো সে মুহুর্ত যখন চোখ নফসের দিকে চেয়ে থাকে। (মুসলিম)। সুতরাং, এই এখানে সুস্পষ্টভাবে 'রূহ' ও 'নফস' পরিভাষাদ্বয়কে মানব আত্মা বর্ণনা প্রসঙ্গে আন্তঃপরিবর্তনীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উভয়ের ভাষাগত পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম।
ইবনুল কাইয়িম এর কাজের উপর ভিত্তি করে আল-কানাদি মানব আত্মা সম্পর্কে বলেছেন:
'আত্মা এমন এক সত্তা যা বস্তুগত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জড়সত্তা হতে ভিন্ন। এটি এক উচ্চতর আলোকময় সত্তা, যা জীবন্ত ও গতিশীল। দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আত্মা এমনভাবে সঞ্চালিত হয়, যেভাবে পানি সঞ্চালিত হয় গোলাপের পাঁপড়িতে, তেল সঞ্চালিত হয় যায়তুনে, আগুন সঞ্চালিত হয় জ্বলন্ত কয়লাতে। প্রত্যেকেই যৌক্তিকভাবে নিজের দেহে আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাব অনুভব করতে পারে, এটি অ-শারীরিক হলেও শারীরিক ছাঁচেই তার আকৃতি। [২২]
রূহের রহস্য কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে, আমরা রূহের রহস্য সম্পর্কে খুব অল্প জ্ঞান রাখি। এ সংক্রান্ত অধিকাংশ জ্ঞান আল্লাহ যথাযোগ্য হিকমত অনুসারে গোপন রেখেছেন। তিনি বলেছেন,
‘তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।’ (সূরাহ ইসরা, ১৭:৮৫)
অত্র আয়াতে নির্দেশিত হয়েছে যে রূহের প্রকৃতি ও ধরণ পরিপূর্ণভাবে বোঝার জন্য মানুষের যথেষ্ট ক্ষমতা নেই। আমরা কখনোই রূহ, জীবন-মৃত্যুর রহস্য ও এর পেছনের কারণগুলো আবিষ্কার করতে পারব না। বিজ্ঞানের মাধ্যমেও এগুলো জয় করা সম্ভব নয়, কেননা গায়েবের জগৎ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির আওতা বহির্ভূত।
রূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং এটি মানবদেহে ফুঁকে দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেছেন,
'অতঃপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নেব এবং তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেয়ো।' (সূরাহ হিজর, ১৫:২৯)
• অন্যত্র বলেছেন,
'অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন, তাতে রূহ সঞ্চার করেন এবং তোমাদেরকে দেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:৯)
এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট করা জরুরি, রূহ হলো প্রাণ ও আত্মার একটি উপাদান যা আল্লাহ দেহের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এটি তার নিজের সত্তা (স্পিরিট) বা সত্তার অংশ নয়। রূহ সত্তাগতভাবে দৈহিক সত্তার মতোও নয়। কেননা, রূহ এমন কিছু থেকে তৈরি যার সমতুল্য কোনো বস্তু নেই। রূহের সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা অসম্ভব。[২০] ওহীর জ্ঞান থেকে আমরা কেবল এতটুকু জানি যে রূহের অবতরণ-আরোহণ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে দেখা, শোনা ও বলার ক্ষমতা ইত্যাদি। তবে এগুলো আমাদের পরিচিত ও বোধগম্য বস্তুগত বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্ন。[২১]
দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জুড়ে রূহ বিস্তৃত। দৈহিক সঞ্চালন, অনুভূতি ও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে রূহ তাড়িত করতে পারে। রূহ চলে গেলে মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) লিখেছেন,
'যেভাবে প্রাণের সঞ্চালন পুরো দেহের বৈশিষ্ট্য, সেভাবে রূহ দেহের কোনো নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সম্পূর্ণ অংশে বিস্তৃত থাকে। জীবন রূহের উপর নির্ভরশীল, যখন দেহে রূহ থাকে তখন তা জীবিত, আর রূহ চলে গেলে তা মৃত。[২২]
আরবিতে 'মানুষ' বোঝাতে ইনসান শব্দ ব্যবহৃত হয়, এর মাধ্যমে মানুষের দেহ ও রূহ উভয়কে বোঝানো হয়। কুরআনে সূরাহ ইনসানের সূচনা ঘটেছে এভাবে, 'মানুষের উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:১) ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) উল্লেখ করেছেন, 'ইনসান' (মানুষ) শব্দের মাধ্যমে দেহ ও রূহ উভয়টি বোঝায়; তবে অবশ্যই দেহ অপেক্ষা রূহ বোঝাতে এটি অধিক প্রযোজ্য। রূহের জন্য দেহ কেবল একটি ধারক। [২৬]
টিকাঃ
[১৮] Ahmad, 1992, Qur'anic Concepts of Human Psyche. In Z. A. Ansari (Ed.) Quranic Concepts of Human Psyche. Islamabad, Pakistan: Islamic Research Institute Press, p. 25.
[১৯] Ahmad, 1992, p. 30.
[২০] Zarabozo, 2002, p. 60.
[২১] al-Kanadi, M., 1996, Mysteries of the Soul Expounded, Jeddah, Saudi Arabia: Inheritors of Abu Bilal Mustafa al Kanadi, p. 10.
[২২] al-Kanadi, 1996, p. 3, translating a passage from Ibn al-Qayyim, Kitab ar-Ruh, pp 249- 250.
[২০] al-Ashqar, U.S., 2002, The Minor Resurrection (What Happens after Death) in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh, Saudia Arabia: International Islamic Publishing House, p. 119.
[২১] Ibid., p. 119.
[২২] Ibid., p. 119.
📄 ভালো ও মন্দ
ওহীর জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদেরকে জানানো হয়েছে যে মানুষ ভালো-মন্দ উভয় ধরনের কাজ করতে সক্ষম। মানুষের আত্মা সৃষ্টিগতভাবে অশুভ নয়, তবে অশুভ কাজ করার যোগ্যতা রয়েছে, তেমনিভাবে ভালো কাজের যোগ্যতাও রয়েছে। বস্তুতঃ ফিতরাতের (সহজাত বৈশিষ্ট্য) কারণে ভালো কাজের প্রতিই অধিক ঝোঁক থাকে। অশুভ বিষয়গুলোকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে, সেগুলোর কুপ্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। এ বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।
ভালো কাজের প্রতি মানুষের সহজাত আগ্রহের বিষয়টি এটা থেকে সুস্পষ্ট যে, যারা অমুসলিম, আল্লাহর হিদায়াত হতে পথভ্রষ্ট, সরল পথ হতে বিচ্যুত; তারাও তাদের জীবনে কিছু না কিছু ভালো কাজ করে। যদি এমনটি না হতো তাহলে এই দুনিয়া বর্তমান সময়ের থেকেও অধিক ফিতনা ফাসাদ, বিশৃংখল ও ধ্বংসাত্মক কাজে পরিপূর্ণ হয়ে যেত (যা কল্পনা করাও কষ্টকর)। সাধারণত (এর ভিত্তিতেই) মানুষ বিভিন্ন নীতি-নৈতিকতা, জীবনবোধ ও আইন-কানুনের কাঠামো তৈরি করে এবং ঠিক করে যে, কোনো আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য ও কোনোগুলো অগ্রহণযোগ্য। যদিও এসকল নীতি-নৈতিকতাগুলো সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ); তবে সেখানে ধর্মের কিছু প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। অমুসলিমরা তাদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হতে পারে, তবে সেই পুরস্কার দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আখিরাতে তাদের কোনো পুরস্কার প্রদান করা হবে না। কেননা, তারা এককভাবে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে ও তাঁর ইবাদাত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অথচ তিনিই এর যোগ্য ও একমাত্র দাবিদার।
মন্দ ও অশুভ কাজ সৃষ্টির উদ্দেশ্য এগুলোর মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করা। যদি আল্লাহ আমাদেরকে কেবলমাত্র ভালো কাজ সম্পাদনের যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করতেন, যদি দুনিয়াতে কেবল 'ভালো' থাকত তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা সবাই আল্লাহর অনুগত ও বাধ্য হতাম। সেক্ষেত্রে মানুষের জবাবদিহিতা গ্রহণ ও বিচার করার কোনো প্রয়োজন থাকত না। বরং সকলেই সক্ষম হতো জান্নাতের লক্ষ্য অর্জনে। যেহেতু আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য মানুষকে ভালো-মন্দ উভয় অবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা এবং কাফিরদের থেকে সত্যিকার ঈমানদারদের পৃথক করা; ফলে মন্দকাজের প্রতি প্রলোভন সেই মহাপরিকল্পনার অংশ। আমাদের চারপাশে নানারকম মন্দকাজের প্রলোভন রয়েছে, এমনকি আমাদের নফসের মধ্যেও রয়েছে।
টিকাঃ
[২৬] Ibn Taymiyah, Sharh at-Tahawiyah, p. 442, as quoted in al-Ashqar, 2002a, p. 126.
📄 নফসের প্রকারভেদ
সাধারণত আমলের ভিত্তিতে মানুষের নফস তিন ধরণের হয়, যথা:
১. নফসে আম্মারাহ (نفس امارة) বা মন্দকাজের আদেশদানকারী আত্মা
২. নফসে লাওয়ামাহ (نفس لوامة) বা আত্ম-তিরস্কারকারী আত্মা
৩. নফসে মুত্বমাইন্নাহ (نفس مطمئنة) বা প্রশান্ত আত্মা
এর অর্থ এমন নয় যে, একই ব্যক্তির মধ্যে তিন ধরনের নফস বিদ্যমান বরং এর অর্থ হলো বিভিন্ন অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে একই নফস বিভিন্নরূপে আচরণ করে। সামনে এর ব্যাখা প্রদান করা হলো,
নফসে আম্মারাহ; এই নফস মানুষকে মন্দকাজের দিকে প্রলুব্ধ করে। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন,
'আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু।' (সূরাহ ইউসুফ, ১২:৫৩)
এটি নফসের সবচেয়ে নীচু পর্যায়। এটি দুনিয়ার বস্তুগত আসক্তি ও দৈহিক পরিতৃপ্তি, ফূর্তি ইত্যাদি তালাশ করে। পরিচালিত হয় নিজের খেয়াল খুশি অনুসারে এবং সহজেই নানা রকমের গুনাহ ও অবাধ্যতা সম্পাদন করে। যদি কেউ নিজের নফসকে এ ধরনের নিচু কামনা-বাসনার প্রতি অবাধ ছেড়ে দেয় তাহলে সে গুনাহের প্রতি ঘৃণা হারিয়ে ফেলে। [২] ধীরে ধীরে যত গুনাহের পথে নামতে থাকে তত সত্যকে অনুধাবনের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। মন্দ বিষয়াদি তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে ও অন্তর কঠিন হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
'কখনও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের হৃদয় মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।' (সূরাহ মুতাফফিফিন, ৮৩:১৪)
এ ধরনের নফসের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আল্লাহকে নিজেদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে না। তখন তাদের জন্য আল্লাহ একজন সাথী নিযুক্ত করে দেন, আর সে হলো শয়তান। আল্লাহ বলেছেন,
'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। শয়তানরাই মানুষকে সৎপথে বাধা দান করে, আর মানুষ মনে করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে।' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৩৬-৩৭)
শয়তান তাদেরকে ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা প্রদান করে ও সহজেই মন্দ কাজে অনুপ্রাণিত করে। যেহেতু এই নফস ইতোমধ্যেই মন্দকাজের প্রতি আসক্ত, সেহেতু সে স্বেচ্ছায় শয়তানের আনুগত্য করে。[২৮]
নফসে লাওয়ামাহ (نفس لوامة) বা আত্ম-তিরস্কারকারী নফস:
এই নফস মন্দকে মন্দ হিসেবে শনাক্ত করে, নিজের বদ আমলের জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয় ও অনুতপ্ত হয়। এই নফস বেশি বেশি ভালো কাজ না করার জন্যেও নিজেকে দোষারোপ করে。[২৯] আল্লাহ বলেছেন,
'আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়-' (সূরাহ কিয়ামাহ, ৭৫:২)
নিজের নফসের মন্দ প্রকৃতি আবিষ্কার ও জুলুম শনাক্ত করার পর নফসে লাওয়ামাহ'র অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করে এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে। আল্লাহ বলেন,
'তারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৫)
এই নফস সর্বদা ভালো-মন্দের মাঝে সংগ্রামরত থাকে。[৩০]
নফসে মুত্বমাইল্লাহ (نفس مطمئنة) বা প্রশান্ত আত্মা: যখন ব্যক্তির অন্তরে আন্তরিকতাপূর্ণ ঈমান শক্তিশালী হয়, তখন মন্দ কাজের প্রতি ঝোঁক কমে আসে। নফসে পরিপূর্ণ পরহেজগারী ও নেক আমল প্রাধান্য লাভ করে। ভালো কাজকে পছন্দ করে এবং মন্দ কাজকে ঘৃণা করে, ফলে এই নফসের অধিকারী ব্যক্তির দ্বারা মন্দ কাজের আহবানে সাড়া দেয়া বিরল ঘটনা হয়ে যায়。[৩১] এটি হলো নফসের প্রশান্তিময় পর্যায়। আল্লাহ বলেন,
'হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।' (সূরাহ ফাজর, ৮৯:২৭-৩০)
টিকাঃ
[*] Zarabozo, 2002, pp. 62-63.
[২৮] Zarabozo, 2002, p. 63.
[২৯] Ibid., pp. 66-67.
[00] al-Ashqar, 2002a, p. 133.
[৩১] Zarabozo, 2002, pp. 67.
📄 অন্তর (কলব)
অন্তর বা হৃদয়ের আরবি প্রতিশব্দ 'কলব', এটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ হয়েছে। এর মাধ্যমে কখনো সরাসরি অন্তরকে বোঝানো হয়েছে, আবার কখনো অন্তরকে ধারণকারী বক্ষদেশ বোঝানো হয়েছে। 'কলব' শব্দের ধাতুমূল দ্বারা এমন বিষয়সমূহ বোঝানো হয় যা সর্বদা দ্রুত পরিবর্তনশীল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কলব (অন্তর) এসেছে 'তাকাল্লুব' থেকে যা সর্বদা পরিবর্তনশীল। অন্তর গাছের গোড়ায় পড়ে থাকা পালকের মতো সদাসর্বদা বাতাসে উলট পালট হতে থাকে।' (হাদিস সহিহ, আহমাদ)। অন্তরের এই পরিবর্তনশীল অবস্থা ঈমানের স্তরের সাথে সম্পর্কিত।
ইসলামি মানদণ্ডে, অন্তর নিছক ভালোলাগা ও আবেগের স্থান নয়, এটি একইসাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত (cognitive) বিষয়াদি, অনুধাবনশক্তি, ভালো-মন্দ বাছাই ও নিয়ত বা সংকল্পের কেন্দ্র। [৩৩] এটি একটি 'সুপার-সেন্সরি অর্গান' বা 'অতিন্দ্রিয় অঙ্গ' যার পরাবাস্তবতা ও সত্যতা সম্পর্কে আমরা অবগত। 'ক্বলব' রূহের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, যদিও এই সংযোগের প্রকৃত ধরণ আমাদের অজানা।
যেমনটা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে, কলব আবেগ ও যুক্তি উভয় ধরনের কাজে সক্ষম। কলব কোনো কিছু বিশ্লেষণ করা ও বোঝার ক্ষমতা রাখে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এমনটি উল্লেখ হয়েছে, 'তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তারা সমঝদার হৃদয় (কলব) ও শ্রবণ শক্তি সম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারে? বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই (কলব) অন্ধ হয়।' (সূরাহ হাজ্জ, ২২:৪৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর (কলব) রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।' (সূরাহ আরাফ, ৭:১৭৯)
• অন্যত্র বলেছেন, 'অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন, তাতে রূহ সঞ্চার করেন এবং তোমাদেরকে দেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'জেনে রাখ, মানুষের শরীরে এক টুকরা গোশত রয়েছে। সেটি সুস্থ ও দোষমুক্ত থাকলে সমগ্র শরীরও সুস্থ ও দোষমুক্ত থাকে এবং সেটি দূষিত ও অসুস্থ হলে সমগ্র শরীরই দূষিত ও অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সেটা হচ্ছে 'কলব' বা অন্তঃকরণ।' (বুখারি ও মুসলিম)।
হাদিসের বর্ণনা হতে দেখা যায়, মানব মনস্তত্ত্বে কলবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি নিছক একটি রক্ত সঞ্চালনকারী অঙ্গ (হার্ট) নয়। সম্পূর্ণ দেহে এর ব্যাপক আধ্যাত্মিক ভূমিকা রয়েছে। যদি অন্তর সুস্থ থাকে তাহলে সমস্ত দেহ সুস্থ থাকবে, দেহের মাধ্যমে সংঘটিত আমলগুলো বিশুদ্ধ হবে। আর অসুস্থ অন্তর চালিত করে অসুস্থ দেহ ও অসুস্থ কার্যক্রমের দিকে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান সময়ে মুসলিমরা ক্বলবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বুঝতে উদাসীন। সাধারণত তারা আমল বা ঈমানের প্রতি মনোযোগী হলেও আবেগের প্রতি অল্প মনোযোগী থাকেন। অথচ আমলের কবুলিয়াত নির্ভর করে কলবের অবস্থার উপর। আমরা সালাত আদায় করতে পারি, সিয়াম ও অন্যান্য ফরযিয়াত পালন করতে পারি কিন্তু যদি অন্তরে আল্লাহর জন্য করার নিয়ত না থাকে অথবা উদাসীনতার সাথে আমল করা হয় তবে আমাদের আমলগুলো মোটেও কবুল হবে না। এমনকি সেই আমল আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ধরা হবে যদি ইবাদাতে ভিন্ন কোনো কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যে থাকে, যেমন- মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা বা স্বীকৃতি লাভ। হয়তো এ কারণেই সুফিবাদ সাধারণ মানুষের কাছে এত জনপ্রিয়। কেননা, সেখানে মানুষের আবেগের প্রতি মনোযোগ দেয়া হয় (যদিও সাধারণত ঈমান ও আমলের ক্ষতিকারক পদ্ধতি বেশি দেখা যায়)।
ক্বলব বা অন্তরের অবস্থা আলোচনা করে ড. জামাল জারাবযো বলেছেন, 'দেহের বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ কলবের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে। কলব কমান্ডার, আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ সৈনিক। যদি কলবের অবস্থা উত্তম হয় তাহলে সৈনিকদের কার্যক্রম উত্তম হবে, আর যদি কলব মন্দ হয় তাহলে সৈনিকদের কার্যক্রমও মন্দ হবে। যদি কলব পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ হয় তাহলে সেখানে একমাত্র আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহ যা ভালোবাসেন সেগুলোকে ভালবাসবে। আল্লাহর ভয় থাকবে ও যাতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি তাতে লিপ্ত হবার ভয় থাকবে। এ ধরনের কলব সকল প্রকার নিষিদ্ধ ও সংশয়জনক কাজ থেকে দূরে থাকবে। আর যদি অন্তর ব্যাপকভাবে দূষিত হয় তাহলে নফসের কামনা-বাসনা অনুসরণ করবে এবং আল্লাহর পরোয়া না করে নিজের ইচ্ছামত আমল করতে থাকবে।[৩৪]
টিকাঃ
[৩৩] Haque, 2004, p. 48.