📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আখিরাতের প্রতি ঈমান

📄 আখিরাতের প্রতি ঈমান


আখিরাত গায়েব বা অদৃশ্য জগতের বিষয়। এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত। পরকালীন জগতের আনন্দ ও শান্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে আখিরাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা আমাদের সাধ্যাতীত। কিন্তু আমরা যেন কিছুটা হলেও মেলাতে পারি, সেই উদ্দেশ্যে সদৃশ বিভিন্ন উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তু তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান তার বর্ণনা কখনো শুনেনি। আর কোনো মানুষ কোনো দিন তার ধারণা বা কল্পনাও করতে সক্ষম নয়। এ কথার সমর্থনে তোমরা এ আয়াত পাঠ করতে পার, "কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কী কী নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।” (সূরাহ আস সাজদাহ ৩২:১৭)' (বুখারি ও মুসলিম)
সমগ্র কুরআনে বারবার জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনার উদ্দেশ্য অনিবার্য গন্তব্যটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেই দুই গন্তব্যের একটিতে অবশ্যই আমাদেরকে পৌঁছানো হবে। উভয় বিষয়ের আলোচনা কুরআনে এসেছে সমসংখ্যক বার। এর দ্বারা, দুটোর যেকোনো একটা স্থানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা যে সমান সমান, সেই সতর্কবাণীই যেন ফুটে উঠেছে। এসব স্মরণিকার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তর ও আচরণে প্রভাব পড়ে। তাকে উত্তম আমল ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে, কেননা প্রত্যেকেই পুরস্কারের আশা রাখে ও শান্তি থেকে বাঁচতে চায়। [১১২]

টিকাঃ
[১৯] al-Fozan, 1997, p. 253.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি

📄 ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি


ঈমানের ধারণায় যদিও কিছুটা মতভিন্নতা আছে; আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী আলিমদের মতে: ঈমান ধ্রুবক নয়, বরং এর হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। আল্লাহর আনুগত্যে ঈমান বাড়ে, অবাধ্যতার মাধ্যমে ঈমান কমে। নিজ নিজ ঈমানের অবস্থার দিকে মনোযোগ প্রদান করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। কখন ঈমানের বৃদ্ধি হচ্ছে বা কমে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরী। এবং যথাসম্ভব ঈমানকে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে চেষ্টা-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উচিত।
কুরআনের অনেক আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় যে মুমিনের ঈমান ওঠা-নামা করে, এর হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। আল্লাহ বলেছেন,
'যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ার দেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।' (সূরাহ আনফাল, ৮:২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাজিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সূরাহ ফাতাহ, ৪৮:৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর। তখন তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ়তর হয়ে যায় এবং তারা বলে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; কতই না চমৎকার কামিয়াবী দানকারী।' (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৭৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর যখন কোন সূরাহ অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরাহ তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করলো? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরাহ তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে।' (সূরাহ তাওবা, ৯:১২৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'প্রত্যেক অন্তরের উপর মেঘের মতো আবরণ রয়েছে; মেঘ উজ্জ্বল চাঁদকেও ঢেকে দিতে সক্ষম। যখন মেঘ ঢেকে দেয় তখন তা সহসা অন্ধকার হয়ে যায়, আর মেঘ কেটে গেলে এর ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসে।' (তাবারানি বর্ণিত, আলবানি সনদ নির্ভরযোগ্য বলেছেন)。[১৩]
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি উপমা পেশ করে বলেছেন যে, আমাদের অন্তরের দৃষ্টান্ত চাঁদের মতো, আর চাঁদ যেভাবে মেঘের আচ্ছাদনের কারণে আলো হারিয়ে ফেলে, সেভাবে গুনাহের কারণে অন্তরে আচ্ছাদন পড়ে। ফলে সে অন্ধকার হয়ে যায়। মেঘ যেভাবে সরে যায়, সেভাবে অন্তরে আলো ফিরে আসে। যখন আমরা ঈমান বৃদ্ধিকারী আমলে ব্যস্ত থাকি তখন অন্তরে আলো বৃদ্ধি পায়。[১৪]
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'কাপড় যেভাবে পুরনো হয়ে যায় সেভাবে তোমাদের অন্তরে ঈমান পুরনো হয়ে যায়। কাজেই তোমরা আল্লাহর কাছে ঈমান নবায়ন করার প্রার্থনা করো。[১৫] (হাদিস সহিহ; আল হাকিম, আত-তাবারানি ও আল-হাইসামি)。 [১৬]
ঈমান বৃদ্ধি ও নবায়নের অনেক উপায় রয়েছে। ইনশাআল্লাহ এই বইয়ের সামনের দিকে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। ঈমান বৃদ্ধির প্রধান উপায়সমূহের মধ্যে রয়েছে ইলম অর্জন করা, নেক আমল বাড়িয়ে দেওয়া, আল্লাহর আনুগত্য করা, তাঁকে স্মরণ করা, কুরআনের আয়াতসমূহের উপর চিন্তা ও মনোযোগ দেয়া, আল্লাহর উত্তম নাম ও গুণবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে চিন্তা করা, মৃত্যু ও পরকালের জীবনের স্মরণ করা ইত্যাদি。[১৭]

টিকাঃ
[১৩] al-Munajjid, M. S., 2009, Weakness of Faith, Riyadh: International Islamic Publishing House, p. 47.
[১৪] al-Munajjid, 2009, p. 48.
[*] al-Munajjid, 2009, p. 47.
[১৬] As quoted in al-Munajjid, 2009, p. 47.
[১৭] Yasin, M.N., 1997, Book of Emaan According to the Classical Works of Shaikul-Islam Ibn Taymiyyah, London: Al-Firdous Ltd., pp. 184-186; al- Munajjid, 2009, pp. 19-43.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মানব আত্মার প্রকৃতি

📄 মানব আত্মার প্রকৃতি


মানবাত্মার প্রকৃতি ও মূলনীতির আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে চলুন কয়েকটি পরিভাষা জেনে নেওয়া যাক। এখন আমরা রূহ, নফস ও কলব সম্পর্কে আলোচনা শুরু করছি।
রূহ: এই পরিভাষাটি কুরআনে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে (রূহ শব্দটি আত্মা, প্রাণ অথবা শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি নামেও ব্যবহৃত হয়)। এটি গায়েবের বিভিন্ন বিষয়কেও নির্দেশ করে, যেমন- ফেরেশতা, ওহী, আসমানি অনুপ্রেরণা ইত্যাদি। এর মাধ্যমে মানব সত্তার আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি আর আত্মাও বোঝানো হয়。[১৮] এটি দেহ ও মনে প্রাণদানকারী মূল উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালক। রূহ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে তাড়িত করে। সত্তাগতভাবে এটি দেহ থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যখন রূহ চলে যায়, তখন দেহের সকল কার্যক্রম থেমে যায়।
নফস : আত্মা বা 'মন' (psyche) বোঝাতে কুরআনের আরেকটি বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা হচ্ছে নফস (বহুবচন আনফুস, নুফুস)। প্রসঙ্গভেদে এই শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে; মানব আত্মা ও নিজের আপন সত্তা。[১৯] কখনো কখনো এই শব্দের মাধ্যমে আত্মা বা রূহকে বোঝানো হয় আবার কখনো দৈহিক সত্তার সাথে জড়িত মানুষের নিজের সত্তাকে বোঝানো হয়। শব্দটির উভমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মা ও মানুষের আপন সত্তার মাঝে সূক্ষ্ম সংযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ফুটে উঠে। নফসের সংজ্ঞায় ড. জামাল জারাবযো, কারযুন (karzoon) এর প্রদত্ত সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন;
'এটি মানব সত্তার আভ্যন্তরীণ বিষয় যার প্রকৃত ধরণ উপলব্ধির বাইরে। নফস ভালো বা মন্দের নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারে। বিভিন্ন মানবিক স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য-এর সমন্বয়ে নফস আমাদের আচরণকে স্পষ্টতঃ প্রভাবিত করে। [২০]
অধিকাংশ মুসলিম আলিম 'নফস' ও 'রূহ' পরিভাষা দুটিকে পস্পরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। সাধারণত উভয়ের প্রধান পার্থক্য হলো আত্মা যখন দেহাভ্যন্তরে থাকে তখন তাকে 'নফস' বলে অভিহিত করা হয়, আর দেহ থেকে আত্মা পৃথক হয়ে গেলে তাকে 'রূহ' বলা হয়। তবে সর্বত্র এটা প্রযোজ্য নাও হতে পারে, যেমনটা বিভিন্ন হাদিস হতে স্পষ্ট। [২১] যেমন- নিম্নের দুটি হাদিসে মৃত্যুকালে দেহ হতে আত্মা বের হওয়া প্রসঙ্গে রূহ/নফস (উভয়) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যখন রূহ কবয করা হয়, তখন চোখ তার অনুসরণ করে।' (মুসলিম)। আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা কি মানুষের দিকে লক্ষ্য কর না? যখন 'সে মারা যায় তখন তার চোখ উপরের দিকে উল্টে থাকে।' সাহাবিগণ বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'এ হলো সে মুহুর্ত যখন চোখ নফসের দিকে চেয়ে থাকে। (মুসলিম)। সুতরাং, এই এখানে সুস্পষ্টভাবে 'রূহ' ও 'নফস' পরিভাষাদ্বয়কে মানব আত্মা বর্ণনা প্রসঙ্গে আন্তঃপরিবর্তনীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উভয়ের ভাষাগত পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম।
ইবনুল কাইয়িম এর কাজের উপর ভিত্তি করে আল-কানাদি মানব আত্মা সম্পর্কে বলেছেন:
'আত্মা এমন এক সত্তা যা বস্তুগত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জড়সত্তা হতে ভিন্ন। এটি এক উচ্চতর আলোকময় সত্তা, যা জীবন্ত ও গতিশীল। দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আত্মা এমনভাবে সঞ্চালিত হয়, যেভাবে পানি সঞ্চালিত হয় গোলাপের পাঁপড়িতে, তেল সঞ্চালিত হয় যায়তুনে, আগুন সঞ্চালিত হয় জ্বলন্ত কয়লাতে। প্রত্যেকেই যৌক্তিকভাবে নিজের দেহে আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাব অনুভব করতে পারে, এটি অ-শারীরিক হলেও শারীরিক ছাঁচেই তার আকৃতি। [২২]
রূহের রহস্য কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে, আমরা রূহের রহস্য সম্পর্কে খুব অল্প জ্ঞান রাখি। এ সংক্রান্ত অধিকাংশ জ্ঞান আল্লাহ যথাযোগ্য হিকমত অনুসারে গোপন রেখেছেন। তিনি বলেছেন,
‘তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।’ (সূরাহ ইসরা, ১৭:৮৫)
অত্র আয়াতে নির্দেশিত হয়েছে যে রূহের প্রকৃতি ও ধরণ পরিপূর্ণভাবে বোঝার জন্য মানুষের যথেষ্ট ক্ষমতা নেই। আমরা কখনোই রূহ, জীবন-মৃত্যুর রহস্য ও এর পেছনের কারণগুলো আবিষ্কার করতে পারব না। বিজ্ঞানের মাধ্যমেও এগুলো জয় করা সম্ভব নয়, কেননা গায়েবের জগৎ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির আওতা বহির্ভূত।
রূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং এটি মানবদেহে ফুঁকে দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেছেন,
'অতঃপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নেব এবং তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেয়ো।' (সূরাহ হিজর, ১৫:২৯)
• অন্যত্র বলেছেন,
'অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন, তাতে রূহ সঞ্চার করেন এবং তোমাদেরকে দেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' (সূরাহ সাজদাহ, ৩২:৯)
এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট করা জরুরি, রূহ হলো প্রাণ ও আত্মার একটি উপাদান যা আল্লাহ দেহের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এটি তার নিজের সত্তা (স্পিরিট) বা সত্তার অংশ নয়। রূহ সত্তাগতভাবে দৈহিক সত্তার মতোও নয়। কেননা, রূহ এমন কিছু থেকে তৈরি যার সমতুল্য কোনো বস্তু নেই। রূহের সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা অসম্ভব。[২০] ওহীর জ্ঞান থেকে আমরা কেবল এতটুকু জানি যে রূহের অবতরণ-আরোহণ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে দেখা, শোনা ও বলার ক্ষমতা ইত্যাদি। তবে এগুলো আমাদের পরিচিত ও বোধগম্য বস্তুগত বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্ন。[২১]
দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জুড়ে রূহ বিস্তৃত। দৈহিক সঞ্চালন, অনুভূতি ও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে রূহ তাড়িত করতে পারে। রূহ চলে গেলে মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) লিখেছেন,
'যেভাবে প্রাণের সঞ্চালন পুরো দেহের বৈশিষ্ট্য, সেভাবে রূহ দেহের কোনো নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সম্পূর্ণ অংশে বিস্তৃত থাকে। জীবন রূহের উপর নির্ভরশীল, যখন দেহে রূহ থাকে তখন তা জীবিত, আর রূহ চলে গেলে তা মৃত。[২২]
আরবিতে 'মানুষ' বোঝাতে ইনসান শব্দ ব্যবহৃত হয়, এর মাধ্যমে মানুষের দেহ ও রূহ উভয়কে বোঝানো হয়। কুরআনে সূরাহ ইনসানের সূচনা ঘটেছে এভাবে, 'মানুষের উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না।' (সূরাহ ইনসান, ৭৬:১) ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) উল্লেখ করেছেন, 'ইনসান' (মানুষ) শব্দের মাধ্যমে দেহ ও রূহ উভয়টি বোঝায়; তবে অবশ্যই দেহ অপেক্ষা রূহ বোঝাতে এটি অধিক প্রযোজ্য। রূহের জন্য দেহ কেবল একটি ধারক। [২৬]

টিকাঃ
[১৮] Ahmad, 1992, Qur'anic Concepts of Human Psyche. In Z. A. Ansari (Ed.) Quranic Concepts of Human Psyche. Islamabad, Pakistan: Islamic Research Institute Press, p. 25.
[১৯] Ahmad, 1992, p. 30.
[২০] Zarabozo, 2002, p. 60.
[২১] al-Kanadi, M., 1996, Mysteries of the Soul Expounded, Jeddah, Saudi Arabia: Inheritors of Abu Bilal Mustafa al Kanadi, p. 10.
[২২] al-Kanadi, 1996, p. 3, translating a passage from Ibn al-Qayyim, Kitab ar-Ruh, pp 249- 250.
[২০] al-Ashqar, U.S., 2002, The Minor Resurrection (What Happens after Death) in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh, Saudia Arabia: International Islamic Publishing House, p. 119.
[২১] Ibid., p. 119.
[২২] Ibid., p. 119.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ভালো ও মন্দ

📄 ভালো ও মন্দ


ওহীর জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদেরকে জানানো হয়েছে যে মানুষ ভালো-মন্দ উভয় ধরনের কাজ করতে সক্ষম। মানুষের আত্মা সৃষ্টিগতভাবে অশুভ নয়, তবে অশুভ কাজ করার যোগ্যতা রয়েছে, তেমনিভাবে ভালো কাজের যোগ্যতাও রয়েছে। বস্তুতঃ ফিতরাতের (সহজাত বৈশিষ্ট্য) কারণে ভালো কাজের প্রতিই অধিক ঝোঁক থাকে। অশুভ বিষয়গুলোকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে, সেগুলোর কুপ্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। এ বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।
ভালো কাজের প্রতি মানুষের সহজাত আগ্রহের বিষয়টি এটা থেকে সুস্পষ্ট যে, যারা অমুসলিম, আল্লাহর হিদায়াত হতে পথভ্রষ্ট, সরল পথ হতে বিচ্যুত; তারাও তাদের জীবনে কিছু না কিছু ভালো কাজ করে। যদি এমনটি না হতো তাহলে এই দুনিয়া বর্তমান সময়ের থেকেও অধিক ফিতনা ফাসাদ, বিশৃংখল ও ধ্বংসাত্মক কাজে পরিপূর্ণ হয়ে যেত (যা কল্পনা করাও কষ্টকর)। সাধারণত (এর ভিত্তিতেই) মানুষ বিভিন্ন নীতি-নৈতিকতা, জীবনবোধ ও আইন-কানুনের কাঠামো তৈরি করে এবং ঠিক করে যে, কোনো আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য ও কোনোগুলো অগ্রহণযোগ্য। যদিও এসকল নীতি-নৈতিকতাগুলো সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ); তবে সেখানে ধর্মের কিছু প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। অমুসলিমরা তাদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হতে পারে, তবে সেই পুরস্কার দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আখিরাতে তাদের কোনো পুরস্কার প্রদান করা হবে না। কেননা, তারা এককভাবে আল্লাহর উপর ঈমান আনতে ও তাঁর ইবাদাত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অথচ তিনিই এর যোগ্য ও একমাত্র দাবিদার।
মন্দ ও অশুভ কাজ সৃষ্টির উদ্দেশ্য এগুলোর মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করা। যদি আল্লাহ আমাদেরকে কেবলমাত্র ভালো কাজ সম্পাদনের যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করতেন, যদি দুনিয়াতে কেবল 'ভালো' থাকত তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা সবাই আল্লাহর অনুগত ও বাধ্য হতাম। সেক্ষেত্রে মানুষের জবাবদিহিতা গ্রহণ ও বিচার করার কোনো প্রয়োজন থাকত না। বরং সকলেই সক্ষম হতো জান্নাতের লক্ষ্য অর্জনে। যেহেতু আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য মানুষকে ভালো-মন্দ উভয় অবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা এবং কাফিরদের থেকে সত্যিকার ঈমানদারদের পৃথক করা; ফলে মন্দকাজের প্রতি প্রলোভন সেই মহাপরিকল্পনার অংশ। আমাদের চারপাশে নানারকম মন্দকাজের প্রলোভন রয়েছে, এমনকি আমাদের নফসের মধ্যেও রয়েছে।

টিকাঃ
[২৬] Ibn Taymiyah, Sharh at-Tahawiyah, p. 442, as quoted in al-Ashqar, 2002a, p. 126.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00