📄 জীবনের উদ্দেশ্য : আল্লাহর ইবাদাত করা
একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও অর্থ। আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন,
'তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?' (সূরাহ মুমিনুন, ২৩:১১৫)
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে হয়রান হয়েছে। অথচ ইসলামে বিষয়টির আলোকপাত একদম সুস্পষ্ট ও সরল। জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদাত করা, আর কিচ্ছু না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বহু আয়াত উল্লেখ করেছেন:
'বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করতে আদিষ্ট হয়েছি।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:১১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমার ইবাদাত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।' (সূরাহ যারিয়াত, ৫১:৫৬)
'হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তা ইবাদাত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পারবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আর ইবাদাত কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।' (সূরাহ নিসা, ৪:৩৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যককে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন এবং কিছু সংখ্যকের জন্যে বিপথগামিতা অবধারিত হয়ে গেল। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ মিথ্যারোপকারীদের কিরূপ পরিণতি হয়েছে।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৩৬)
আল্লাহর ইবাদাত করাই আমাদের জীবন ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য। আর বৈধ ইবাদাতসমূহের মধ্যে রয়েছে ঈমান, অন্তরের আমল, কথা, দৈহিক ও আর্থিক আমল ইত্যাদি। ঈমানের মাধ্যমে অন্যান্য সকল ইবাদাতের ভিত্তি স্থাপিত হয়, আর ঈমানকে অবশ্যই তাওহিদের উপর কেন্দ্রীভূত থাকতে হবে। তাওহিদের সহজ অর্থ এককভাবে আল্লাহকে রব হিসেবে গ্রহণ করা। অন্তরের আমলসমূহের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, ভয়, আশা, ভরসা, আত্মসমর্পণ এবং তওবা। এগুলো একমাত্র আল্লাহর দিকে পরিচালিত হতে হবে। কথার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা, সাহায্য কামনা করা, তাঁর কাছে দুআ করা, প্রশংসা ঘোষণা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি। দৈহিক আমলের মধ্যে রয়েছে সালাত, সিয়াম, হজ্ব ইত্যাদি। অর্থনৈতিক আমলের মধ্যে রয়েছে যাকাত ও অন্যান্য দান সাদাকাহ।[৬]
ইবাদাতের মাধ্যমে আমরা সম্পর্ক ও সংযোগ বজায় রাখি আমাদের স্রষ্টার সাথে, যাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে আমাদের। কেবলমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্যেই ইবাদাত সীমাবদ্ধ বলে ইসলাম আমাদেরকে জানায় না। বরং আন্তরিকভাবে (ইখলাসের সাথে) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য শরিয়াহ অনুসারে যা কিছু করা হয় তার সবকিছুই ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- নিষিদ্ধ বিষয়াদি পরিত্যাগ করা, অন্যের সাথে সদাচারণ, সৎকাজে অংশগ্রহণ, মন্দকাজে বাধা প্রদান ইত্যাদি সবকিছু ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত এবং এসবগুলোর সাথেই রয়েছে পুরস্কারের ওয়াদা। আল্লাহ আমাদেরকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে দিয়েছেন। এই ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে আমরা তাঁর ইবাদাত করতেও পারি অথবা চাইলে বিমুখও থাকতে পারি। আমাদের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আমাদের সম্মান কিংবা অপমান।
আন্তরিক ইবাদাতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তিনটি। যদি এর কোনো একটিও অনুপস্থিত থাকে, তাহলে ইবাদাত বাতিল হয়ে যাবে। সেগুলো হলো:
১। নিয়তের বিশুদ্ধতা: যদি একমাত্র আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত না থাকে তাহলে নেক আমলগুলো কবুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করেছে, তাই পাবে...।' (নিয়ত সম্পর্কে সামনে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।)
২। ইখলাস তথা আন্তরিকতা: আল্লাহর আদেশকৃত বিষয় পালন ও নিষেধকৃত বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে দৃঢ় সংকল্পের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া।
৩। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নতের অনুসরণ করা: আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে যা কিছু নির্দেশ করেছেন সেগুলো অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাত করা। ভক্তি-শ্রদ্ধার বিষয় অনুসন্ধান করা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। যদি কোনো মানুষ একমাত্র ইবাদাত পাবার অধিকার আল্লাহকে প্রদান না করে তবে সে অবশ্যই অন্য কিছুর ইবাদাত শুরু করবে; হোক সেটা কোনো মূর্তি অথবা তার মতই আরেকজন মানুষ কিংবা কোনো দার্শনিক চিন্তাধারা, অর্থ-সম্পদ, বা এরকমই কোনো বস্তু বা আইডল। এটি শিরক অর্থাৎ আল্লাহর একক অধিকারে অংশীদার সাব্যস্ত করা। তাওহিদের বিপরীত হলো শিরক, যা সমস্ত গুনাহের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। যে এই গুনাহ থেকে তওবা করবে না সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে।
'আল্লাহ বলেন, 'তারা কাফির, যারা বলে যে, মরিময়-তনয় মসীহ-ই আল্লাহ; অথচ মসীহ বলেন, হে বনি-ইসরাইল, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, যিনি আমার পালন কর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।' (সূরাহ মায়িদা, ৫:৭২)
• অন্যত্র বলেছেন, 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।' (সূরাহ নিসা, ৪:৪৮)
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি নবি (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোনো গুনাহ আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বড়?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর সাথে সমকক্ষ স্থাপন করা অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (বুখারি ও মুসলিম)
শয়তান সদা নিয়োজিত মানুষকে শিরকের পথে পরিচালিত করার কাজে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে বলেছেন, “যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখ কাল দেখবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নামে নয় কি? আর যারা শিরক থেকে বেঁচে থাকত, আল্লাহ তাদেরকে সাফল্যের সাথে মুক্তি দেবেন, তাদেরকে অনিষ্ট স্পর্শ করবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” (সূরাহ যুমার, ৩৯:৬০-৬১)
শয়তান জানে শিরক মানুষকে জাহান্নামী করে দেবে। ফলে তার প্রধান কৌশল মানুষকে প্রলুব্ধ করে শিরকের ফাঁদে আটকে ফেলা এবং অন্য কোনো বস্তু বা বিষয়কে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ ও সুপারিশকারী (ভায়া, মাধ্যম) বানিয়ে নিতে প্ররোচিত করা।
'আর উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে, না লাভ এবং বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও জমিনের মাঝে? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছ।' (সূরাহ ইউনুস, ১০:১৮)
দুনিয়ার জীবন আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা। পরীক্ষাটা এটা নির্ণয়ের জন্য যে, কারা আল্লাহর দাসত্বে নিজেকে সঁপে দিয়ে আনুগত্য করে; আর কারা শয়তানের অনুসারী হয়ে অবাধ্যতা ও অহংকার প্রদর্শন করে। এ পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেয়া হবে বিচার দিবসে, যেদিন মুমিন ও কাফিরকে পাঠিয়ে দেয়া হবে নিজ নিজ চিরস্থায়ী ঠিকানায়। আল্লাহ বলেছেন, 'যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:২)
অন্যত্র আদম আলাইহিস সালাম ও তাঁর স্ত্রীর ঘটনাতেও এসেছে যে দুনিয়াতে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে। আল্লাহ বলেছেন,
'আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হিদায়াত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে।
আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অন্তকাল সেখানে থাকবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩৮-৩৯)
প্রত্যেক মানুষের জীবনের লক্ষ্যই হবে আল্লাহর চূড়ান্ত আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ। অর্থাৎ নিজের আত্মাকে একমাত্র সত্য ইলাহ আল্লাহর অভিমুখী করা— মানে নিজেকে তার সকল চিন্তা-আবেগ-কর্ম সমেত আল্লাহর সামনে নত করা। ঠিক এই একই বার্তা প্রত্যেক রাসূল নিয়ে এসেছেন এবং পৃথিবীতে ইসলামের মাধ্যমে সেই বার্তাই আজ অব্দি চলমান। কুরআনে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও অন্যান্য নবিদের ঘটনাগুলো তাদের আন্তরিক আত্মসমর্পণের প্রসঙ্গকেই আলোকপাত করেছে:
• 'স্মরণ কর, যখন ইবরাহিম ও ইসমাঈল কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দুআ করেছিলঃ পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।
• পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর, আমাদের হজ্বের রীতিনীতি বলে দাও এবং আমাদের ক্ষমা কর। নিশ্চয় তুমি তওবা কবুলকারী। দয়ালু।
• হে পরওয়ারদেগার! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুণ যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা।
• ইবরাহিমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।
• স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, অনুগত হও। সে বলল, আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম।
• এরই ওসিয়ত করেছে ইবরাহিম তাঁর সন্তানদের এবং ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না।
• তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল, আমার পর তোমরা কার ইবাদাত করবে? তারা বললে, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য।
• আমরা সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তারা ছিল এক সম্প্রদায়-যারা গত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদেরই জন্যে। তারা কি করত, সে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।
• তারা বলে, তোমরা ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান হয়ে যাও, তবেই সুপথ পাবে। আপনি বলুন, কখনই নয়; বরং আমরা ইবরাহিমের ধর্মে আছি যাতে বক্রতা নেই। সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
• তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।
• অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।
• আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই ইবাদাত করি।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১২৭-১৩৮)
এই আয়াতগুলো থেকে জানা যায় যে, পূর্ববর্তী সকল নবি-রাসূলের বার্তা ছিল আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ; তাঁরা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদেরকেও আমৃত্যু ইসলাম আঁকড়ে ধরার উপদেশ দিয়েছেন। ইসলামে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মানবাত্মা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূরণ করে। এবং এর মাধ্যমেই পূরণ হয় মানুষ হিসেবে তার জীবনের সত্যিকার উদ্দেশ্য। এই আত্মসমর্পণের পূর্ণতা কেবলমাত্র ইসলামের ভিতর দিয়েই সম্ভব। অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনবিধানের মাধ্যমে এই লক্ষ্যটা অর্জন করা যায় না। বিচার দিবসে অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদ আল্লাহ কবুল করবেন না। অন্যান্য সকল ধর্মের মৌলিক ত্রুটিই হলো শিরক, তথা আল্লাহ বাদে অন্য ইলাহের ইবাদাত করা। আর এই শিরকই সেই ধর্মের অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেয়। আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন সকল মিথ্যা মাবুদের ইবাদাত করা অযৌক্তিক ও মূর্খতাপূর্ণ কাজ। তারা না আমাদের কোনো ক্ষতি করে, আর না কোনো উপকার। কোনোকিছু দেয়া বা না দেয়ার ক্ষমতাও তারা রাখে না। তিনি বলেছেন,
'তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদাত করে, যে তাদের জন্যে ভুমন্ডল ও নভোমন্ডল থেকে সামান্য রুযী দেওয়ার ও অধিকার রাখে না এবং মুক্তি ও রাখে না।' (সূরাহ নাহল, ১৬: ৭৩)
• অন্যত্র বলেছেন, 'বলুন, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা কর, তাদের বিষয়ে ভেবে দেখেছ কি? দেখাও আমাকে তারা পৃথিবীতে কি সৃষ্টি করেছে? অথবা নভোমন্ডল সৃজনে তাদের কি কোনো অংশ আছে? এর পূর্ববর্তী কোন কিতাব অথবা পরস্পরাগত কোনো জ্ঞান আমার কাছে উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর পূজা করে, যে কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারা তো তাদের পুজা সম্পর্কেও বেখবর। যখন মানুষকে হাশরে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে।' (সূরাহ আহকাফ, ৪৬:৪-৬)
• অন্যত্র বলেছেন, 'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে-আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৩৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তিনি রাত্রিকে দিবসে প্রবিষ্ট করেন এবং দিবসকে রাত্রিতে প্রবিষ্ট করেন। তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকটি আবর্তন করে এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত। ইনি আল্লাহ; তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তাঁরই। তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কেয়ামতের দিন তারা তোমাদের শেরক অস্বীকার করবে। বস্তুতঃ আল্লাহর ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না।' (সূরাহ ফাতির, ৩৫:১৩-১৪)
• অন্যত্র বলেছেন, 'কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরী অবলম্বন করছ? অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ। অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে প্রাণ দান করেছেন, আবার মৃত্যু দান করবেন। পুনরায় তোমাদেরকে জীবনদান করবেন। অতঃপর তারই প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন।
যিনি তোমাকে তাঁর ইচ্ছামত আকৃতিতে গঠন করেছেন।' (সূরাহ ইনফিতার, ৮২:৬-৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব আশা করছ না। অথচ তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন রকমে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে উদগত করেছেন। অতঃপর তাতে ফিরিয়ে নিবেন এবং আবার পুনরুত্থিত করবেন।' (সূরাহ নুহ, ৭১:১৩-১৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের জন্যে তোমাদেরই শ্রেণী থেকে জোড়া পয়দা করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে তোমাদেরকে পুত্র ও পৌত্রাদি দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন। অতএব তারা কি মিথ্যা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে? (সূরাহ নাহল, ১৬: ৭২)
অন্যত্র বলেছেন, 'অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি?'
• 'বল, সকল প্রশংসাই আল্লাহর এবং শান্তি তাঁর মনোনীত বান্দাগণের প্রতি! শ্রেষ্ঠ কে? আল্লাহ না ওরা-তারা যাদেরকে শরীক সাব্যস্ত করে。
• বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।
• বল তো কে পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং তাকে স্থিত রাখার জন্যে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন। অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
• বল তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই ধ্যান কর।
• বল তো কে তোমাদেরকে জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তাঁর অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? অতএব, আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
• বল তো কে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদেরকে আকাশ ও জমিন থেকে রিযিক দান করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।' (সূরাহ নামল, ২৭:৫৯-৬৪)
যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর বা অন্য কারও ইবাদাত করে তারা নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। তারা নিজেদের উপর জুলুম করে, নিজেদের মর্যাদাহানি করে, অপমান করে নিজেকে। তাদের ব্যক্তিত্ব, অগ্রগতি তথা সামগ্রিক জীবন হয়ে যায় অপূর্ণ ও এলোমেলো। জীবনে প্রকৃত সুখ, শান্তি ও পরিতৃপ্তি যেহেতু তাদের মেলে না, যেমন করেই হোক সেই অধরা পূর্ণতা পেতে গিয়ে কেবল এদিকে সেদিকে ছোটাছুটি করাই সারা হয়।
টিকাঃ
[৬] al-Ashqar, U.S., 2003, Belief in Allah in the Light of the Qur'an and Sunnah, Riyadh, International Islamic Publishing House, p. 402.
📄 আকিদা, ঈমান ও মনোবিজ্ঞান (পারস্পরিক সম্পর্ক)
'আকিদাহ' শব্দটি দ্বারা বোঝায় একটি সামগ্রিক বিশ্বাস ব্যবস্থাপনা (belief system), যেখানে ঈমানের মৌলিক প্রত্যেকটি বিষয় ও আল্লাহর একত্ববাদকে দৃঢ় বিশ্বাস ( ইয়াকীন) এর মাধ্যমে ধারণ করা হয়। মানুষ যা কিছু বিশ্বাস করে, অন্তরে সাক্ষ্য দেয় এবং সত্য বলে মেনে নেয়, আকিদাহ হচ্ছে সেসব বিষয়ের সমষ্টি। যে বিষয়গুলোর উপর মুসলিমদের অবশ্যই মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখতে হবে, তা ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে এই আয়াতে:
'রসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২৮৫)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিশ্বাস তাওহিদ; যেমনটি পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি。[৭] রাজত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও কার্যাবলীতে কোনো শরীকানা ছাড়া আল্লাহ একক; গুণে-নামে- বৈশিষ্ট্যে কোনো জুড়ি ছাড়া আল্লাহ একক; উপাস্য হিসেবে ইবাদতের ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী বিহীন আল্লাহ একক— এই বিশ্বাসের নাম তাওহিদ。
আল্লাহ সবকিছুর অধিপতি ও মালিক, তিনিই সকল প্রয়োজন পূরণকারী ও প্রতিপালক। জীবন-মৃত্যু আল্লাহই ঘটান, তিনি সৃষ্টিজগতের সমস্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। সুতরাং যেকোনো ধরনের ইবাদাতের যোগ্য একমাত্র তিনিই; হোক সে ইবাদাত দৈহিক (সালাত, সিয়াম, হজ্ব, কুরবানী) কিংবা অন্তরের (ভয়, ভালোবাসা, ভরসা ইত্যাদি)। এই বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ় থাকতে হবে, কোনো সন্দেহ-সংশয় বা পরিবর্তন করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
'তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।' (সূরাহ হুজুরাত, ৪৯:১৫)
তাওহিদের ব্যাপারে অন্তরে কোনো সন্দেহ থাকার অর্থ ঈমানের অপরিপূর্ণতা।
মানব মনস্তত্ত্বের জন্য আকিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা, আকিদাই আমাদের জীবন পরিচালনার নির্দেশনা দেয়। যে পথে মেলে আত্ম-উপলব্ধি ও আত্মতুষ্টি, সেই সরল পথ আকিদা-ই আমাদেরকে দেখিয়ে দেয়। আকিদার ভিত্তির উপরেই আর সবকিছু দাঁড়িয়। শাইখ উমর আল আশকার মানবজাতির জন্য আকিদার গুরুত্ব আলোচনা করে বলেছেন,
'মানুষের জন্য ইসলামি আকিদার প্রয়োজনীয়তা ঠিক যেন পানি ও বাতাসের মতোই। আকিদা ব্যতীত মানুষ পথহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। মানুষ যুগে যুগে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে হয়রান হয়েছে, সেগুলোর সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করেছে একমাত্র ইসলামি আকিদা। এই প্রশ্নগুলো বর্তমান যুগেও মানুষকে হয়রান করে যাচ্ছে; যেমন- আমি কোথা থেকে এসেছি? এই বিশ্ব জগৎ কিভাবে সৃষ্টি হলো? এর স্রষ্টা কে? তাঁর গুণ ও বৈশিষ্ট্য কী? তাঁর নাম কী কী? কেন তিনি আমাদেরকে ও বিশ্বজগতকে সৃষ্টি করলেন? এই মহাবিশ্বে আমাদের ভূমিকা কী? যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক কী?'[৮]
'ঈমান' শব্দটিকে অনেক সময় 'বিশ্বাস' শব্দের মাধ্যমে অনুবাদ করা হয়; (এর সংজ্ঞা হলো) অন্তর, কথা ও কাজের ভিতর দিয়ে আকিদার সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ। ঈমানের গভীর প্রভাব-কে শাইখ আল আশকার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:
'ঈমান, বিশ্বাস হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষের বিবেকের গভীরে অনুরণিত হয়। ফলে অন্তরে সেটা নিয়ে আর কোনো দ্বিধা বা সন্দেহ অনুভূত হয় না বরং ইয়াকিনের প্রশান্তিতে অন্তর ভরে যায় নিশ্চিন্ত নির্ভরতায়। ঈমান মানুষের অনুভূতি ও বিবেক নিয়ে কাজ করে। যে অনুভূতি গড়ে ওঠে হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত যুক্তি ও বিবেচনাবোধ থেকে। আর এই বোধটাই খাদ্য ও পানীয়ের মতো মৌলিক রসদ যোগায় আত্মাকে। ফলে এই বোধ মূলত জীবনের অন্যতম একটা মৌলিক চাহিদা। আর ঈমানের কাজ হলো মানুষের এই বোধকে একটি প্রভাবশালী চালিকা শক্তিতে পরিণত করা, যাকে কোনোকিছু রুখতে পারে না। এটাই হচ্ছে দ্বীন ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য। দর্শনশাস্ত্রের উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা, আর দ্বীনের উদ্দেশ্য ঈমানচর্চা। দর্শনের উদ্দেশ্য যে জ্ঞান, তা নিরস- নিষ্প্রাণ। আর দ্বীনের উদ্দেশ্য একটি প্রাণবন্ত ও কর্মোদ্দীপ্ত আত্মা। [১]
সুতরাং ঈমান আত্মিক শক্তির উৎস। ঈমান একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্য প্রদান করে, যার মাধ্যমে সে দৈনন্দিন জরুরি দায়-দায়িত্ব পুরা করতে পারে; এবং সমাজ, পরিবার এবং নিজের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যেতে পারে। ঈমান না থাকলে, মানুষ জড় রোবটের মত নিষ্প্রাণ নির্জীব হয়ে পড়ে। জীবনের নিয়মে জীবন চলতে থাকে কিন্তু সে জীবনে থাকে না কোনো আবেগ বা সংকল্প। ইসলামি মনোবিজ্ঞান অনুসারে, ঈমান ও আকিদা মানব আত্মার অপরিহার্য চালিকাশক্তি; এটি সমগ্র মানব সত্তার জন্যই অপরিহার্য। ঈমানের ভিত্তি হলো আল্লাহ ও তাঁর একত্ববাদে সুদৃঢ় বিশ্বাস, বিচার দিবসে জবাবদিহিতার প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের জীবনের উপর বিশ্বাস। মানব সত্তার অন্যান্য দিকগুলোর সাথেও ঈমান জড়িত, যেমন ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি এবং অনুপ্রেরণা। এছাড়াও রয়েছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা ও কল্যাণ। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে যে ঈমান গড়ে ওঠে, তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব-প্রকৃতির সাথে। ফলে এই ঈমান আত্মাকেও এনে দেয় সুসামঞ্জস্য ও প্রশান্তি।
টিকাঃ
[৭] Philips, A.A.B., 2005, The Fundamentals of Tawheed, Riyadh, Saudi Arabia: International Islamic Publishing House, p. 17.
[৮] al-Ashqar, 2003a, p. 35.
[১] Ibid., p. 74.
📄 আল্লাহর উপর ঈমান ও ভালোবাসা
ঈমানের ভিত্তি হলো তাওহিদ, আর তাওহিদের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো—পার্থিব যেকোনো কিছু ও যেকারো চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসা। কার্যত এভাবে আল্লাহকে ভালোবাসাই ইসলামের সারনির্যাস। আল্লাহ বলেন,
'আর কোনো লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হতো যদি এ জালিমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:১৬৫)
কারো অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা যখন পরিপূর্ণ হয় তখনই ঈমান পরিপূর্ণ হয়। আর যখন সে ভালোবাসায় খাদ থাকে তখন আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসও হয়ে যায় ত্রুটিপূর্ণ。[১০] ইবনুল কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহ বলেছেন,
'অন্তর পরিশুদ্ধ হয় দুইটি জিনিসের মাধ্যমে। প্রথমটি হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাকে দুনিয়ার সকল ভালোবাসা থেকে প্রাধান্য দেয়া। অর্থাৎ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং অন্য কিছুর প্রতি ভালোবাসা যদি কারো সামনে একসাথে চলে আসে, তবে সে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দেবে এবং তার আমলও সেই ক্রমানুযায়ীই হবে。[১১]
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়।
১। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছুর থেকে প্রিয় হওয়া; ২। কাউকে খালিস আল্লাহর জন্যই মুহব্বত করা; ৩। কুফরিতেতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা। (বুখারি ও মুসলিম)।
এই হাদিস অনুসারে, যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্যান্য সকল প্রিয়বস্তু ও প্রিয় মানুষ থেকে প্রিয়তর হবে, সে ঈমানের মিষ্ট স্বাদ অনুভব করবে ও ইবাদাতে আনন্দ অনুভব করবে।
টিকাঃ
[১০] al-Fozan, S., 1997, Concise Commentary on 'The Book of Tawheed', Riyadh, Saudi Arabia: Darussalam Publishers and Distributors, p. 249.
[১১] al-Jawziyyah, I.Q., 2000, The Invocation of God (Al-Wabil al-Sayyib min al-Kalim al-Tayyib), Cambridge, UK: Islamic Texts Society, pp. 5-6.
📄 আখিরাতের প্রতি ঈমান
আখিরাত গায়েব বা অদৃশ্য জগতের বিষয়। এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত। পরকালীন জগতের আনন্দ ও শান্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে আখিরাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা আমাদের সাধ্যাতীত। কিন্তু আমরা যেন কিছুটা হলেও মেলাতে পারি, সেই উদ্দেশ্যে সদৃশ বিভিন্ন উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তু তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান তার বর্ণনা কখনো শুনেনি। আর কোনো মানুষ কোনো দিন তার ধারণা বা কল্পনাও করতে সক্ষম নয়। এ কথার সমর্থনে তোমরা এ আয়াত পাঠ করতে পার, "কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কী কী নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।” (সূরাহ আস সাজদাহ ৩২:১৭)' (বুখারি ও মুসলিম)
সমগ্র কুরআনে বারবার জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনার উদ্দেশ্য অনিবার্য গন্তব্যটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেই দুই গন্তব্যের একটিতে অবশ্যই আমাদেরকে পৌঁছানো হবে। উভয় বিষয়ের আলোচনা কুরআনে এসেছে সমসংখ্যক বার। এর দ্বারা, দুটোর যেকোনো একটা স্থানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা যে সমান সমান, সেই সতর্কবাণীই যেন ফুটে উঠেছে। এসব স্মরণিকার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তর ও আচরণে প্রভাব পড়ে। তাকে উত্তম আমল ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে, কেননা প্রত্যেকেই পুরস্কারের আশা রাখে ও শান্তি থেকে বাঁচতে চায়। [১১২]
টিকাঃ
[১৯] al-Fozan, 1997, p. 253.