📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 আদম ও হাওয়ার ঘটনা থেকে মানব প্রকৃতি অনুধাবন

📄 আদম ও হাওয়ার ঘটনা থেকে মানব প্রকৃতি অনুধাবন


মানব প্রকৃতির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য মানুষসৃষ্টির সূচনালগ্নে ফিরে যাওয়া জরুরী। কুরআনে সেই ঘটনা সবিস্তারে উল্লেখ আছে। সুপরিচিত এই ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে-যে শিক্ষা সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও হিসাব নিকাশ এর ঊর্ধ্বে। আল্লাহ বলেছেন,
• আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।
• আর আল্লাহ তাআলা শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।
• তারা বলল, আপনি পবিত্র! আমরা কোনোকিছুই জানি না, তবে আপনি যা আমাদিগকে শিখিয়েছেন (সেগুলো ব্যতীত) নিশ্চয় আপনিই প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, হেকমতওয়ালা।
• তিনি বললেন, হে আদম, ফেরেশতাদেরকে বলে দাও এসবের নাম। তারপর যখন তিনি বলে দিলেন সে সবের নাম, তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমান ও জমিনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর, আর যা তোমরা গোপন কর!
• এবং যখন আমি আদমকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করলে। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।
• এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাক, কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। অন্যথায় তোমরা জালিমদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়বে।
• অনন্তর শয়তান তাদের উভয়কে ওখান থেকে পদস্খলিত করেছিল। পরে তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল এবং আমি বললাম, তোমরা নেমে যাও। তোমরা পরস্পর একে অপরের শত্রু হবে এবং তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।
• অতঃপর হযরত আদম (আ.) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর প্রতি (করুণাভরে) লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা-ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।
• আমি হুকুম করলাম, তোমরা সবাই নীচে নেমে যাও। অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হিদায়াত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোনো ভয় আসবে, না (কোনো কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে।
• আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অন্তকাল সেখানে থাকবে।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:৩০-৩৯)
লক্ষ্য করুন, এখানে মানবসত্তার প্রকৃতি সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে, [২]
১। স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক নয়: মানুষ তার স্রষ্টা থেকে ভিন্ন। অন্যান্য সৃষ্টি থেকেও মানুষ পৃথক ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। দুনিয়াতে মানবজাতিকে রাখার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে, আর সেটা হলো আল্লাহর ইবাদাত করা।
২। মানুষ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি: দুনিয়ার সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষের ভূমিকাই প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রমাণ হলো, আদমের সামনে নত হবার জন্য ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহর আদেশ। দুনিয়াতে মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। এবং দুনিয়ার সকল উপায়- উপকরণকে করে দেওয়া হয়েছে মানুষের বশবর্তী।
৩। মানুষের যোগ্যতা: মানুষকে তার অনন্য মর্যাদার সঙ্গে মানানসই যোগ্যতাও প্রদান করা হয়েছে। যেমন: বোধশক্তি, ইচ্ছাশক্তি বা সংকল্প, নিজেকে আল্লাহমুখী করা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করা ও ভুলত্রুটি সংঘটিত হলে অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে সংশোধন করে নেওয়া। এসব সক্ষমতা ও যোগ্যতা তাকে দেয়া হয়েছে।
৪। দুর্বলতা: মানুষের অনেক দুর্বলতাও রয়েছে, যেমন- প্রবৃত্তির নিচু কামনা-বাসনা, অলসতা, ভুলে যাওয়া ইত্যাদি। যেগুলো যেকোনোসময় পথভ্রষ্ট করে দিতে পারে তাকে। কেননা, মানুষকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার প্রচেষ্টায় শয়তান ও তার সঙ্গীসাথীরা সদাতৎপর ও সর্বদা উপস্থিতই রয়েছে। মানবসত্তা ও এই অশুভ শক্তির মধ্যে সংগ্রাম সব সময়ই চলমান।
৫। উন্নতি-অবনতি: মানুষ নিজেকে মর্যাদায় উন্নীত করতে পারে আল্লাহর আনুগত্য ও নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে। অথবা আল্লাহর নির্দেশের প্রতি কর্ণপাত না করে এবং শয়তানকে বন্ধুত্বে বরণ করে নিয়ে নিজের মর্যাদার স্খলনও ঘটাতে পারে।
৬। মুক্তি: মানুষের মুক্তি ও প্রশান্তি রয়েছে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নির্দেশনার অনুসরণ ও বিশ্বাসের মাঝে। এই বিশ্বাস ও আনুগত্যই ঠিক করে দেবে তাদের দুনিয়ার জীবনে অর্জনের মূল্য এবং আখিরাতের মর্যাদাগত অবস্থান।

টিকাঃ
[২] Zarabozo, 2002, pp. 50-53.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ

📄 মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ


মানুষকে তার সৃষ্টিগত মর্যাদার কারণে আল্লাহ যে সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেছেন সেগুলো আলোচিত হয়েছে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে। আত্মশুদ্ধির সহজাত ক্ষমতা তিনি আমাদেরকে দান করেছেন, যেন আমরা এই জীবনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারি। তিনি আমাদেরকে করুণা করেছেন অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে। এবং জগতের সবকিছুকে আমাদের অধীনস্থ করে দিয়ে। যাতে করে আমাদের জীবন সহজ হয় ও 'আত্ম-উপলব্ধি' জাগ্রত হয়। এসব ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো-বান্দা যেন আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। তিনি বলেছেন,
'তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব, তোমরা তাতে বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিজিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১৫)
• অন্যত্র বলেছেন,
'তিনি আল্লাহ যিনি সমুদ্রকে তোমাদের উপকারার্থে আয়ত্বাধীন করে দিয়েছেন, যাতে তাঁর আদেশক্রমে তাতে জাহাজ চলাচল করে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ কর ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। এবং আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছেন তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তাঁর পক্ষ থেকে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।' (সূরাহ জাসিয়া, ৪৫:১২-১৩)
• অন্যত্র বলেছেন 'নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।' (সূরাহ ইসরা, ১৭:৭০)
• অন্যত্র বলেছেন 'তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃজন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্যে ফলের রিজিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে সমুদ্রে চলা ফেরা করে এবং নদ-নদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। এবং তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন সূর্যকে এবং চন্দ্রকে সর্বদা এক নিয়মে এবং রাত্রি ও দিবাকে তোমাদের কাজে লাগিয়েছেন। যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকেই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ।' (সূরাহ ইবরাহিম, ১৪:৩২-৩৪)
এসকল জীবনোপকরণ না থাকলে আমাদের দায়-দায়িত্বসমূহ পালন করা খুবই দুরূহ হতো; কঠিন হয়ে যেত নিজের, সমাজের ও উম্মাহর অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। উদাহরণস্বরুপ যেমন ধরুন, সূর্য থেকে আমরা প্রয়োজনীয় তাপ, উষ্ণতা ও আলো লাভ করি; চন্দ্রসূর্যের মাধ্যমে আমরা রাখতে পারি সময়ের হিসাব, জমিন থেকে উৎপন্ন করতে পারি বৃক্ষলতা, আর সমুদ্রে করতে পারি সফর, ইত্যাদি। এগুলো আমাদের নানাভাবে উপকৃত করে। দুনিয়াতে টিকে থাকার জন্য এসব উপকরণ নিঃসন্দেহে খাদ্য ও পানীয়ের মতো জরুরী। বিশেষ করে খাদ্য-পানীয়ের মতো নিয়ামতগুলো ছাড়া তো দুনিয়াতে আমাদের অস্তিত্বই ছিল অসম্ভব।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ফিতরাত

📄 ফিতরাত


আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করাটা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। এই সহজাত বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ফিতরাত। এটি প্রত্যেক মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে সে আল্লাহর অস্তিত্বের বাস্তবতা স্বীকার করে ও আল্লাহর নির্দেশ পালন করে। যিনি আমাদেরকে, চারপাশের এই পৃথিবীটাকে এবং পৃথিবীর ভিতরে যা কিছু আছে সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন, এমন একজন সুমহান সত্তার অস্তিত্বের ব্যাপারে অটল সাক্ষ্য দেবার সহজাত প্রবণতা এই ফিতরাত। এটা একটা উপহার, যা খোদাই করা মানুষের আত্মায় আত্মায়। ফলে যারা আল্লাহর হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের মাঝেও এই জন্মগত বৈশিষ্ট্যটা রয়েই যায়। সূরাহ রুমে আল্লাহ এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন,
'তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি (ফিতরাত), যার উপর তিনি মানব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' (সূরাহ রুম, ৩০:৩০)
ফিতরাতের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের উপর ঈমান, তাঁর সঙ্গে কাউকে অংশীদার বা সমকক্ষ সাব্যস্ত না করা। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দেয় এবং ক্রমাগত তাঁর নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং একমাত্র তাঁর ইবাদাত করে, তারা নিজেদের সহজাত মানবসত্তাটির সাথে সঙ্গতি স্থাপন করে, সহজাত বৈশিষ্ট্যের অনুকূল আচরণ করে। আর যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনেনা, অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনা করে, তারা নিজেদের সহজাত মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে। ইসলামকে ফিতরাতের ধর্ম বলা হয়, কারণ এই ধর্ম মানবজাতিকে আল্লাহর প্রতি সত্যিকার বিশ্বাসী করে তোলে এবং মানবসত্তার বিকাশের ক্ষমতাকে সম্পন্ন করে। সমস্ত নবি-রাসূলগণ এসেছিলেন মানুষকে (ফিতরাতের) এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্মরণ করিয়ে দিতে এবং শরিয়াহ শিক্ষা দিতে। শরিয়াহ হলো আল্লাহর আনুগত্যে জীবন কাটানোর সবিস্তার দিকনির্দেশনা। নবি-রাসূলগণ নিজেরা এই দিকনির্দেশনা মেনে মানবজাতির সামনে নিজেদেরকে অনুকরণীয় নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই নমুনা উপস্থাপন করাটা নিঃসন্দেহে আল্লাহর আরেক বড় নিয়ামত।
ফিতরাত হতে বিচ্যুতি: বিভিন্ন বাহ্যিক প্রভাবে মানুষ সহজাত ধর্ম (ফিতরাত) থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে। যেমন- পিতামাতার প্রভাব, সমাজের প্রভাব ইত্যাদি।
ফিতরাতের উপর পিতামাতার প্রভাব: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 'প্রতিটি নবজাতকই জন্মলাভ করে ফিতরাতের উপর। এরপর তা মা-বাপ তাকে ইহুদি বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু যখন একটি (পূর্ণাংগ) বাচ্চা জন্ম দেয় তখন কি তোমরা তার কানকাটা দেখতে পাও? এরপর আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তিলাওয়াত করলেন- 'আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ কর, যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, এটাই সরল সুদৃঢ় দ্বীন' (সূরাহ রূম: ৩০)। (বুখারি, মুসলিম)
পরিবেশের প্রভাব: এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা) হাদিসে জানিয়েছেন যে পরিবেশের প্রভাব একজন ব্যক্তিকে সরল পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত করতে পারে, এমনকি পথভ্রষ্ট বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠানের অনুসারী বানাতে পারে।
শয়তানের প্রভাব: শয়তানও মানুষকে সহজাত বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
'সাবধান, আমার প্রতিপালক আজ আমাকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে তোমাদেরকে এমন বিষয়ের শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা সম্পর্কে তোমরা সম্পূর্ণরুপে অজ্ঞ। তা হলো এই যে, (আল্লাহ বলেন), 'আমি আমার বান্দাদেরকে যে ধন-সম্পদ দেব তা পরিপূর্ণরুপে হালাল। আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যে সমস্ত জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছিলাম সে তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু সে তাদেরকে আমার সাথে এমন বিষয়ে শিরক করার জন্য নির্দেশ দিল, যে বিষয়ে আমি কোনো সনদ পাঠাইনি।' (মুসলিম)

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ফিতরাতের প্রমাণ

📄 ফিতরাতের প্রমাণ


পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ বা 'গড' এর উপর ঈমানের দাবী করে (যদিও গত শতাব্দীতে আবিষ্কৃত নাস্তিকতার ধারণাটি দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে)। অধিকাংশ ধর্মেই একটি 'ঊর্ধ্বতন সত্তা'র ধারণা রয়েছে বা 'গড' সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা করে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, 'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তবে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ, অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:৮৭)
আল্লাহ আরও বলেন,
'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে-আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৩৮)
Gallup International কর্তৃক ৬০টি দেশে পরিচালিত (millennium worldwide survey) (মানে হলো, সহস্রাব্দে একবার হয় এমন যুগান্তকারী দুনিয়াজোড়া ব্যাপক কোনো জরিপকে এই নামে ডাকা হয়) এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী মতামত দিয়েছেন যে 'গড' তাদের ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ৮৭% অংশগ্রহণকারী নিজেদেরকে কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী বলে স্বীকার করেছেন। দারুণ ব্যাপার হলো, পশ্চিম আফ্রিকায়, যেখানে সংখ্যাগুরু মুসলিমরা নিজ ধর্মচর্চায় বেশ এগিয়ে, সেখানে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে ৯৭% বলেছেন তাদের জীবনে আল্লাহর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষনীয় বিষয় পশ্চিম আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষ মুসলিম এবং তারা ইসলাম অনুশীলন করেন, পশ্চিম আফ্রিকার সেখানকার ৯৯% ব্যক্তিই স্বীকার করেছেন জানিয়েছেন যে, তারা কোনো না কোনো ধর্ম অনুসরণ করেন। এই পরিসংখ্যান হতে আরও দেখা গেছে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অধিক ধর্মানুরাগী (৬৯% থেকে ৫৭%)। যুবক (৬৩% থেকে ৫৯%) এবং মধ্য বয়স্কদের (৫৬%) তুলনায় বৃদ্ধ ব্যক্তিরা অধিক ধর্মানুরাগী। [৩]
Gallup Poll (২০০৭-২০০৮) কর্তৃক পরিচালিত আরেকটি স্টাডিতে নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়েছিল পৃথিবীর কোনো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ধর্মপরায়ণ কিংবা সর্বনিম্ন ধর্মপরায়ণ। ১১টি শীর্ষ ধর্মপরায়ণ দেশের মধ্যে ৮টি দেশ ছিল মুসলিম সংখ্যাপ্রধান (মিশর, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সিয়েরালিওন, সেনেগাল, জিবুতি, মরক্কো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত)। অপরদিকে সবচেয়ে কম ধর্মপরায়ণ দেশগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র একটি মুসলিমপ্রধান দেশ (আজারবাইজান) স্থান পেয়েছে। (উল্লেখ্য, আজারবাইজান শিয়া সংখ্যাগুরু দেশ)। [৪]
Pew forum কর্তৃক পরিচালিত 'Religion and public life' শীর্ষক আরেকটি জরিপ পরিচালিত হয়েছিল ৩৬,০০০ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানের উপর। এটি ছিল একটি জাতীয় জরিপ এবং আমেরিকানদের ধর্মবিশ্বাসের উপর এ যাবত অন্যতম বৃহৎ জরিপ; সেখানে দেখা গেছে ৮৭% ব্যক্তি 'গড' বা 'ইউনিভার্সাল স্পিরিট' এ বিশ্বাস রাখেন, যাদের মধ্যে ৭১% সুনিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেন, ১৭% মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেন। ৮২% বলেছেন যে ধর্ম তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে ৫৬% অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ২৬% মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। যারা নিজেদেরকে নাস্তিক হিসেবে শনাক্ত করেছেন তাদের ২১% 'গড' বা 'ইউনিভার্সাল স্পিরিট' এ বিশ্বাসের কথা স্বীকার করেছেন এবং যারা নিজেদেরকে এগনোস্টিক (সংশয়বাদী) বলেছেন তাদের মধ্যেও অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন অনুরুপ মতামতই।[৫]
ফিতরাতের বাস্তবতার আরেকটি প্রমাণ হলো, যখন মানুষ বিভিন্ন উত্থানপতনের কারণে দুর্দশাগ্রস্থ হয় এবং কষ্টভোগ করে, তখন সহজাতভাবেই আল্লাহর কাছে চায়। এ বিষয়টি কুরআনের অনেক আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া, প্রত্যেকে নিজের জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতা থেকেও এই বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, 'মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে, এরপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো আমি পূর্বের জানা মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৪৯)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘যখন মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার পালনকর্তাকে ডাকে, অতঃপর তিনি যখন তাকে নিয়ামত দান করেন, তখন সে কষ্টের কথা বিস্মৃত হয়ে যায়, যার জন্যে পূর্বে ডেকেছিল এবং আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করে; যাতে করে অপরকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে। বলুন, তুমি তোমার কুফর সহকারে কিছুকাল জীবনোপভোগ করে নাও। নিশ্চয় তুমি জাহান্নামীদের অন্তর্ভূক্ত।’ (সূরাহ যুমার, ৩৯:৮)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করে। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সুদীর্ঘ দোয়া করতে থাকে।’ (সূরাহ ফুসসিলাত, ৪১:৫১)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে বসে, দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দেই, সে কষ্ট যখন চলে যায় তখন মনে হয় কখনো কোন কষ্টেরই সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি। এমনিভাবে মনঃপুত হয়েছে নির্ভয় লোকদের যা তারা করেছে।’ (সূরাহ ইউনুস, ১০:১২)
• অন্যত্র বলেছেন, ‘তিনিই তোমাদের ভ্রমন করান স্থলে ও সাগরে। এমনকি যখন তোমরা নৌকাসমূহে আরোহণ করলে আর তা লোকজনকে অনুকূল হাওয়ায় বয়ে নিয়ে চলল এবং তাতে তারা আনন্দিত হল, নৌকাগুলোর উপর এল তীব্র বাতাস, আর সর্বদিক থেকে সেগুলোর উপর ঢেউ আসতে লাগল এবং তারা জানতে পারল যে, তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখন ডাকতে লাগল আল্লাহকে তাঁর ইবাদাতে নিঃস্বার্থ হয়ে যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করে তোল, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। তারপর যখন তাদেরকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন, তখনই তারা পৃথিবীতে অনাচার করতে লাগল অন্যায় ভাবে। হে মানুষ! শোন, তোমাদের অনাচার তোমাদেরই উপর পড়বে। পার্থিব জীবনের সুফল ভোগ করে নাও-অতঃপর আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি বাতলে দেব, যা কিছু তোমরা করতে।’ (সূরাহ ইউনুস, ১০:২২-২৩)
দুঃখ-দুর্দশায় আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন হিকমত রয়েছে। মানুষের জীবনে নানা পরিস্থিতির কারণে বিশুদ্ধ ফিতরাতের উপর প্রলেপ জমতে থাকে। কষ্ট-মুসিবতের দ্বারা দূরীভূত হয়ে যায় এই জমে থাকা কুফর ও বিভ্রান্তির আবরণ। কখনও কখনো এসবের অনেক গভীরে তলিয়ে যায় ফিতরাত। অথচ এই মানুষটিও যখন বিপদে পড়ে, তখন এমন এক সত্তার কাছে আকুতি জানায়, যার সম্পর্কে সে মনেপ্রাণে জানে যে এই কঠিন বিপদে একমাত্র তিনিই সাহায্য প্রদান করতে সক্ষম! বিপদে পড়লে সাহায্য কামনা মানুষের একটি স্বয়ংক্রিয় সহজাত বৈশিষ্ট্য। যদি আমরা কোনো বাস্তব ভিডিওচিত্রে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পতিত মানুষের অবস্থা দেখি, তাহলে সেখানেও দেখা যায় অধিকাংশ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি (যদিও বা তারা অমুসলিম) 'গড' এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে কোনো না কোনোভাবে!
আত্মায় আত্মায় খোদিত তাওহিদের চুক্তিনামা সৃষ্টির প্রাক্কালে, প্রত্যেক রূহ আল্লাহকে রব মেনে সাক্ষ্য দিয়েছিল এবং কেবল আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদাত করার অঙ্গীকার করেছিল। এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো, যেন বিচার দিবসে মানুষ কোনো অজুহাত পেশ করতে না পারে। যারা দুনিয়াতে ঈমান আনতে অস্বীকার করবে এবং সত্যের পথ থেকে বিমুখ থাকবে, এই স্বীকারোক্তি তাদের বিরুদ্ধে একটি দলীল। আল্লাহ বলেন,
'আর যখন তোমার পালনকর্তা বনি আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।' (সূরাহ আরাফ, ৭:১৭২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যারা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করবে তিনি তাদেরকে জান্নাতের মাধ্যমে পুরস্কৃত করবেন,
'জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে খোদাভীরুদের অদূরে। তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারীকে এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। যে না দেখে দয়াময় আল্লাহ তাআলাকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হতো।' (সূরাহ কাফ, ৫০:৩১-৩৩)
আল্লাহর সাথে আমাদের ওয়াদা ও ফিতরাতের পারস্পরিক সম্পর্ক হতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন, তাঁর পরিচয় লাভ ও ইবাদাত বন্দেগী করা মানব আত্মার সহজাত বৈশিষ্ট্য। সকল মানুষ বিশুদ্ধ ফিতরাত সহকারে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করা, তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করা, উত্তম আমল করা এবং মহাবিশ্বে আমাদের অনন্য দায়িত্বসমূহ অনুধাবন করার যোগ্যতা সকলেই সহজাতভাবে লালন করে। যদি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করে সহজাতভাবে ফিতরাতের বিকাশ ঘটানো হয়, তবে মানবাত্মা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকে যাবে আল্লাহর দিকে এবং পালন করবে তাঁর আদেশ। ফিতরাতের উপর গড়ে ওঠা আল্লাহ সম্পর্কে এই জ্ঞান ও সংযোগ আমাদেরকে দেয় সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দের প্রকৃত বুঝ, পুরোটা জীবন ধরে।

টিকাঃ
[৩] Gallup International Association, 2000, Religion in the World at the End of the Millennium, retrieved May 6, 2009 from http://www.gallup-international.com/ContentFiles/millenniuml5.asp.
[৪] Crabtree, S. and Pelham, B., (2007-2008), What Alabamians and Iranians have in common, retrieved May 5, 2010 from www.gallup.com/poll/ 1 142 1 1/alabamians-iranians-common.aspx.
[৫] Pew Forum on Religion and Public Life, 2007, U. S. Religious Landscape Survey, http://religions.pewforum.org/sid=ST2008062300818, accessed 06/05/09.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00