📄 ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্য
ইসলামি মানদণ্ডে জ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রাথমিক উৎস হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত ওহী। আল্লাহ আমাদের 'আমার আমি'কে আমাদের নিজেদের চেয়েও ভালোভাবে জানেন। কাজেই যদি ওহীর জ্ঞানকে অবজ্ঞা করা হয়, বিশেষত মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে; তাহলে সেটা সুস্পষ্ট ডাহা মূর্খতা। আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, 'যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১৪)
অন্যত্র বলেছেন, 'আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।' (সূরাহ ক্বাফ, ৫০:১৬)
অন্যত্র বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল অথবা প্রকাশ্যে বল, তিনি তো অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১৩)
ওহীই সেই ভিত্তি, যার উপর প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের সকল শাখাপ্রশাখা। যা নিখুঁত এবং পরিপূর্ণ। একে ভিত্তি করে আর সব বিষয়কে বোঝার দ্বারা প্রকাশ পায় কুরআনের উপর মুসলিমদের দৃঢ় ও অবিচল বিশ্বাস। যে, আল্লাহর নাজিলকৃত চূড়ান্ত বার্তা এটাই। এ বিষয়ে সন্দেহ ব্যতীত দৃঢ়বিশ্বাস ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য। কুরআনের শুরুতেই এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে, 'এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য।' (সূরাহ বাকারাহ, ২:২)
হাদিসকেও ওহীর অংশ গণ্য করা হয় এবং এটি কুরআনের পর জ্ঞানের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। হাদিস হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সে সকল কথা, কর্ম এবং অনুমোদন যা তাঁর সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। কেবলমাত্র ওহীর মাধ্যমে আমরা মানবাত্মার প্রকৃত ধরণ ও অদৃশ্য জগতকে বুঝতে পারি, আত্মশুদ্ধির পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পারি, এবং পদ্ধতিগুলোকে পূর্ণতায় বিকশিত করতে পারি। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন। ফলে গায়েবের বিষয়াদি অনুধাবনের জন্য আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী। এক্ষেত্রে কোনো ধারণা বা অনুমানের নির্ভরশীল হওয়ার অবকাশ নেই, বিশেষত মুসলিমদের জন্য কথাটি অধিকতর সত্য।
এ সম্পর্কে কামালি লিখেছেন, "শরিয়তের দলিলসমূহ পরবর্তীতে (দুইভাগে) বিভক্ত হয়েছে; ওহীর দলিল এবং যৌক্তিক দলিল। ওহীর কর্তৃত্ব সত্যায়নের প্রয়োজন নেই, এগুলো মানবিক যুক্তির মুখাপেক্ষী নয়, যদিও অধিকাংশ ওহী যৌক্তিকভাবে সঠিক প্রমাণও করা যায়। তবে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমারা。[২১] কর্তৃত্ব ও বাধ্যবাধকতা যেকোনো ধরনের যৌক্তিক প্রমাণের অমুখাপেক্ষী। অপরদিকে, যৌক্তিক প্রমাণসমূহ মানবিক বোধশক্তির উপর নির্ভরশীল এবং সেগুলোর ন্যায্যতা মানবিক বোধশক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। এগুলো কেবলমাত্র যৌক্তিকতার নিরিখেই গ্রহণ করা যায়, (তবে) যুক্তি ইসলামের কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ দলীল নয়, ফলে যৌক্তিক প্রমাণসমূহকে ওহীর দলীল থেকে পৃথক করে এককভাবে গ্রহণ করা যায় না। শরয়ি দলীলসমূহ (আদিল্লাহ শার'ইয়াহ) মোটের উপর যুক্তির সাথে সমন্বিত করাই রয়েছে।”[২৩]
এরপর তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ইসলামি আইনগুলো তাদের উপর প্রযোজ্য যাদের বোধশক্তি রয়েছে। শরিয়াহ মানুষের উপর এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না যা বিবেক-বুদ্ধি বা যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক।[২৪]
ওহীকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে, মুসলিমরা বিজ্ঞান ও যুক্তিকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করে বরং পূর্বের আলোচনা হতে ইসলামি আইনে যুক্তির অবস্থান সুস্পষ্ট। স্বয়ং কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে মানুষকে সৃষ্টি জগত নিয়ে ভাবতে, চিন্তা করতে ও জ্ঞান অর্জন করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে ওহী হবে সেই জ্ঞানের মানদণ্ড যার মাধ্যমে আমরা অন্যান্য বিকাশমান বিজ্ঞানকে (developing science) বিচার করব। এই দুটি প্রাথমিক উৎসের পর অন্যান্য গৌণ উৎসের মধ্যে যুক্তির স্থান রয়েছে। যখন আমরা মানবিক বোধশক্তিকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করি তখন বিভ্রান্তি অত্যাসন্ন। এটি সেসব দার্শনিকদের রচনা হতে সুস্পষ্ট যারা (ওহীর) প্রমাণ হতে বিচ্যুত হয়ে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছেন।
ধর্মীয় ও সেক্যুলার—এ জাতীয় কোনো পৃথকীকরণ ইসলামে নেই, যেমনটা অন্যান্য সিস্টেমে রয়েছে। জ্ঞানকে মনে করতে হবে আমানত, এবং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি হতে একে যাচাই করতে হবে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহও কেবলমাত্র আল্লাহরই অনুগ্রহ ও রহমত। গবেষণা, আবিষ্কার ও বিকাশ ঘটানোর জন্য দরকারী চিন্তাশীল মনন, কাঁচামাল ও উপকরণ ইত্যাদি নিয়ামত তিনিই আমাদেরকে দান করেছেন। কোনো কিছু আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা অনুধাবন করতে পারি আল্লাহর শক্তি, ক্ষমতা ও অপার মহিমা। জ্ঞানের মাধ্যমে আরও প্রতিষ্ঠিত হয় যে, এই বিশ্বজগৎ সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে সুশৃংখলভাবে পরিচালিত হয়। এখানে বিশৃঙ্খলা বা কাকতালীয় ঘটনা বলে কিছু নেই। বিজ্ঞান সঠিক হলে আল্লাহর নাজিলকৃত জ্ঞানের সাথে মিলে যাবে। আধুনিক সাইকোলজিক্যাল গবেষণায় অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে ঘটনা এমনটাই ঘটেছে।
যদি কোথাও সংঘর্ষ দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা বিশ্লেষণের মধ্যেই ত্রুটি রয়েছে।
ড. জামাল জারাবযো উল্লেখ করেছেন,
কুরআন ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা রয়েছে, এর একটি মহাবিশ্বের বাহ্যিক ও ভৌত বিষয়াদির সাথে সংশ্লিষ্ট। অস্তিত্বশীল জগতের এই জ্ঞান অবশ্যই মানুষকে সৃষ্টিজগতের বাস্তবতা সম্পর্কে সত্য ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির দিকে পরিচালিত করবে, স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকার করাবে, তাঁর বড়ত্ব ও ক্ষমতা বুঝতে সাহায্য করবে। এর বিপরীতে আল্লাহকে মানতে অনীহা বা অক্ষমতা দেখা দিলে বুঝতে হবে, সেই জ্ঞান অর্জনকারীদের মনোজগতে ত্রুটি রয়েছে।[২৫]
টিকাঃ
[২১] ইজমা: (ঐকমত) ফিকহের একটি পরিভাষা, ইসলামী বিধি নির্ণয়ের একটি পদ্ধতি।
[২২] শরীয়তের দলীলসমূহ।
[২৩] Kamali, M.H., 1991, Principles of Islamic Jurisprudence, Cambridge, Cambridge: Islamic Texts Society, pp.10-11.
[২৪] প্রাগুক্ত।
[২৫] Zarabozo, 2002, pp. 33.