📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মনোবিজ্ঞানের সেক্যুলার পদ্ধতির প্রধান দুর্বলতাসমূহ

📄 মনোবিজ্ঞানের সেক্যুলার পদ্ধতির প্রধান দুর্বলতাসমূহ


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা নিজেদের বাতলানো তত্ত্বসমূহের সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করতে শুরু করেছেন। অনেকেই একমত হয়ে বলেছেন, “বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদ মানব প্রকৃতির একটি দুর্বল চিত্র উপস্থাপন করে। এবং জীবন ও মহাবিশ্বের জটিলতা ও রহস্যের পর্যাপ্ত বর্ণনা প্রদান করে না।"[৯] গ্রিফিন বলেছেন, 'বস্তুবাদ ও ইন্দ্রিয়বাদ (sensationalism) যখন নাস্তিকতার সাথে সমন্বিত হয় তখন একটি নিয়ন্ত্রণবাদী (জড়), আপেক্ষিক ও শূন্যবাদী (nihilistic) দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে যেখানে জীবনের কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই। [১০]
• বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদে মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয় তা 'বিহেভিয়ারাল সায়েন্টিস্ট'রাও* অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই মতবাদে মানবসত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয় বা খাটো করে দেখানো হয়। যেমন- মানব মন, সচেতনতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর উপর ঈমান। বিশেষত 'হেল্পিং প্রফেশনে'* কর্মরত ব্যক্তিদের ওপর এই থিওরি প্রয়োগ করা হলে এর অপর্যাপ্ততা ব্যাপকভাবে ফুটে ওঠে কেননা তাদের লক্ষ্য হলো অপরের নিরাময় ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা প্রদান করা। [১১]
* বিহেভিয়ারাল সায়েন্স: বিভিন্ন মানবিয় কার্যাবলী যেসব অনুষদে আলোচনা করা হয়, যেমন- সমাজ বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ববিজ্ঞান, সাইকোলজি, সাইকিয়াট্রি ইত্যাদি।
* হেল্পিং প্রফেশন: যেসব পেশায় একজন ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক কিংবা আধ্যাত্মিক সুস্থতার বিকাশ ও যত্ন নেয়া হয়; যেমন মেডিসিন, নার্সিং, সাইকোথেরাপি, কাউন্সিলিং, সামাজিক কাজ, শিক্ষা ইত্যাদি। (অনুবাদক)
ড. জামাল জারাবযো আত্মার পরিশুদ্ধি আলোচনা প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সেক্যুলার পদ্ধতির কিছু প্রধান দুর্বলতা তুলে ধরেছেন: [১২]
• ১। মানুষকে তার স্রষ্টা ও রবের উপর অনির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয় (পূর্বে আলোচিত)।
• ২। কেবল মানবিক বোধশক্তির ভিত্তিতে এর তত্ত্বসমূহ প্রতিষ্ঠিত অথচ আল্লাহর নাজিলকৃত ওহীকে প্রত্যাখ্যান এবং উপেক্ষা করা হয়েছে। (সপ্তম অধ্যায় দ্র.)।
• ৩। সেক্যুলার জ্ঞান ও গবেষণা কেবলমাত্র দৃশ্যমান মানবিক অনুষঙ্গের উপর আলোকপাত করেছে অথচ আধ্যাত্মিক এবং অদৃশ্য বিষয়গুলো অপেক্ষা করেছে।
• ৪। সাধারণত ধরে নেয়া হয়, মানবিক আচার-আচরণসমূহ কেবলমাত্র প্রবৃত্তির তাড়না, অভিব্যক্তি, প্রশিক্ষণ (অভিজ্ঞতা) ও সামাজিক প্রভাবের (পরিবেশ) মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
এরপর জারাবযো সেক্যুলার ও অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ তত্ত্বসমূহের বিপদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'মানবরচিত তত্ত্ব বা বিকৃত ধর্মগ্রন্থগুলো ব্যক্তির আধ্যাত্মিক সুস্থতার জন্য খুবই বিপদজনক। এসব তত্ত্ব কিংবা ধর্মগ্রন্থগুলো একজন ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের সরল পথ থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়। এই ক্ষতি আরো ব্যাপকতা লাভ করে যখন মিথ্যাচারিতা ও সুচতুর যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেগুলো সমর্থন করা হয় কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সেই ধর্মগ্রন্থগুলো প্রস্তুত করা হয়। এক্ষেত্রে বাকি লোকেরা তাদেরকে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে এবং সঠিক ও উপকারী মনে করে বিভ্রান্ত হয়। পরিশেষে লোকেরা এসব বিভ্রান্তির প্রতি অন্ধ হয়ে যায়।' [১৩]

টিকাঃ
[১] Richards and Bergin, 2005, p.37.
[১০] Griffin, D.R., 2000, Religion and Scientific Naturalism: Overcoming the Conflicts, Albany: State University of New York Press, p.14.
[১১] Richards and Bergin, 2005, p.45.
[১২] Zarabozo, J, 2002, Purification of the Soul: Process, Concept, and Means, Denver, CO: Al-Basheer Company for Publications and Translations, p.49.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

📄 ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা


মনোবিজ্ঞানের বিকল্প সংজ্ঞায়নে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যা যা অন্তর্ভুক্ত করা হয় তার মধ্যে রয়েছে: আত্মার আলোচনা; সম্ভাব্য আচরণ, আবেগ ও মানসিক কার্যপ্রণালী, এগুলোর ফলাফল; এবং উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রভাবকসমূহ (দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অনুষঙ্গ নির্বিশেষে)।
'আত্মা জীবনের মৌলিক উপাদান'-ইসলামি বর্ণনাগুলো উৎসারিত এই চিন্তাধারা থেকে। আত্মাই মানুষের আচরণ, আবেগ এবং মানসিক চিন্তাধারাকে উদ্দীপ্ত করে। মানুষের মনন সম্পূর্ণভাবে মনোবিজ্ঞানের ইন্দ্রিয়লব্ধ বস্তুগত আলোচনার উপর নির্ভরশীল নয়; এর সারনির্যাস আধ্যাত্মিক এবং মেটাফিজিকাল (পরবাস্তব, গায়েবের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি)। এবং এই প্রত্যেক মানবাত্মায় ফিতরাত ও তাওহিদের সাক্ষ্য খোদাই করে দেয়া-মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে। ফিতরাত হলো আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের সহজাত ঝোঁক ও বৈশিষ্ট্যসমূহ; এ সম্পর্কে সামনে আলোচনা আসছে।
মানবাত্মা প্রকৃতিগতভাবে আধ্যাত্মিক (স্পিরিচুয়াল)। ফলে মূল উৎস অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সাথে আত্মার একটি আধ্যাত্মিক সংযোগ বজায় রাখতে হয়, ঠিক যেভাবে দেহ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও পানীয়ের দরকার পড়ে। এই প্রধান 'পুষ্টি উপাদান' ব্যতীত মানবাত্মা আক্রান্ত হয় উদ্বিগ্নতায় (এংজাইটি), ডিপ্রেশনে এবং হতাশায়। যারা বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আজকাল আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অনেকেরই মূলত রোগটা মনের নয়, বরং আত্মার। তার আত্মা রুহানী খোরাকের জন্য আকুতি জানাচ্ছে। আর প্রকৃত রুহানী খোরাক রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্যের মাঝে। কিন্তু আসল খাবার না দিয়ে
তাকে দেয়া হচ্ছে সাইকোথেরাপি এবং মেডিকেশনের হরেক রকম 'জাঙ্ক ফুড'। এ কারণেই আত্মার আর্তচিৎকার অসুখ হিসেবে বেড়ে চলে।
ইসলামি মনোবিজ্ঞানের ধারণা মতে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় জগতের ঘটনা দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। সমসাময়িক সাইকোলজিক্যাল তত্ত্বগুলো সাধারণত কেবল দৃশ্যমান জগতকেই আলোচনায় আনে অর্থাৎ মনের উপর পিতামাতা, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, সাথী-বন্ধু, শিক্ষক, সমাজ, মিডিয়া ইত্যাদির প্রভাব নিয়েই আলোচনা করে। অপরদিকে ইসলামি মনোবিজ্ঞানে মানব প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা দেবার জন্য অদৃশ্য জগতের বিষয়গুলোও আলোচনায় আনা হয়। সেগুলো হলো; আল্লাহ, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা, ফেরেশতা ও জিনের আলোচনা। এখানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ভালো মন্দ বাছাইয়ের ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয় না বরং তা উপযুক্ত প্রসঙ্গে প্রযোজ্য।

টিকাঃ
[১৩] Ibid, p 44-45.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 জ্ঞানের উৎস

📄 জ্ঞানের উৎস


মনোবিজ্ঞান বিষয়ে সমকালীন জ্ঞানচর্চার অন্যতম দুর্বলতা হলো এখানে মানবসত্তা সম্পর্কে জানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে প্রত্যাখ্যান করা হয়; আর সেটা হলো আল্লাহর নাজিলকৃত বার্তা বা ওহী। এর দৃষ্টান্ত হলো ম্যানুয়াল ছাড়াই একটি দামি 'ব্র্যান্ড-নিউ' গাড়ি খরিদ করার মত—কীভাবে এর যন্ত্রপাতিগুলো কাজ করে, তা জানার জন্য সে ম্যানুয়ালটাই পড়ার প্রয়োজন মনে করছে না! প্রফেসর হক (১৯৯৮) 'ইউএস ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস' (১৯৮৪, পৃ ৬) এর একটি বক্তব্যের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে সম্পর্কের 'আধুনিক' ধারণাটা ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে, 'বিজ্ঞান ও ধর্ম মানবিক চিন্তাধারার পরস্পর সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র দুইটি জগৎ। একই প্রসঙ্গে দুটোকেই একত্রে উপস্থাপনের চেষ্টা করলে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও ধর্মীয় বিশ্বাস উভয় ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। 'চূড়ান্ত সত্য' (আলটিমেট ট্রুথ) আবিষ্কারের জন্য জ্ঞানকে ধর্মনিরপেক্ষীকরণ করা হয়েছে এবং 'অভিজ্ঞতাবাদ' (empiricism) ও পরীক্ষণের (এক্সপেরিমেন্টেশন) উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হলোঃ বিজ্ঞান এমন সব ঘটনা (fact) উপর প্রতিষ্ঠিত যা যাচাই করা সম্ভব। কিন্তু ধর্ম আপেক্ষিক (সাবজেক্টিভ) বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত বিধায় তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে (অবজেক্টিভ পদ্ধতিতে) প্রতিপাদন করা যায় না।'[১৪]

টিকাঃ
[১৪] Haque, A., 1998, Psychology and religion: Their relationship and integration from an Islamic Perspective, The American Journal of Islamic Social Sciences, 15, p.99.

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

📄 বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি


বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মনোবিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এর তত্ত্বগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রমাণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে। গবেষকরা প্রথমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, এরপর নানাবিধ তত্ত্ব প্রদান করেন। বিন্যাস ও পূর্বানুমান করতে পারে এমন সুবিন্যস্ত বিভিন্ন মূলনীতির সাহায্যে এসব থিওরিগুলোতে আচরণ (বিহেভিয়ার) ও মানসিক কার্যপদ্ধতিগুলোকে (মেন্টাল প্রসেস) ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ১৫। 'থিওরি' থেকে তারা যেসব অনুমান বা হাইপোথিসিস প্রদান করেন সেগুলোকে পরীক্ষা (test) করা যায়। সবশেষে, গবেষকরা সেসব হাইপোথিসিস পরীক্ষা করে সেগুলোর শুদ্ধতা যাচাই করেন, সংশোধন করেন কিংবা বাতিল হিসেবে প্রত্যাখান করেন。[১৬]
আগেই আলোচনা করেছি, 'সায়েন্টিফিক মেথড'এর অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো ভৌত (physical) জগতের প্রতি সীমিত ফোকাস ও মানুষের আধ্যাত্মিক ব্যাপারগুলোকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা। বাস্তবে বিজ্ঞানীরা 'আস্ত মানুষ'-কে অধ্যয়নের বদলে মানবসত্তার কেবল কিছু অংশ স্টাডি করেন। এর অনেক উদাহরণ আছে, তবে 'বিহেভিয়ারিজম' চিন্তাধারাটা 'বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি'র এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। বাদরি ব্যাখা করে বলেছেন,
"আচরণবাদী চিন্তাধারা (behaviorist school) একটি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তন করেছে। এখানে কিছু দিয়ে উদ্দীপিত করে (stimuli) সেটার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার (observable response) মাধ্যমে প্রাণীর শিক্ষণ (learning) প্রক্রিয়াকে স্টাডি করা যায়। রীতিমত মনোবিজ্ঞানের বুনিয়াদে পরিণত হয়েছে এই পদ্ধতিটি। অনুভূতি, মনের উপাদানসমূহ ও চিন্তাধারা ইত্যাদি সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য নয় বলে মনে করা হতো। এগুলো নিয়ে গবেষণার জন্য অনুসৃত পদ্ধতিগুলোকে (যেমন ইন্ট্রোস্পেকশন, অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাপর্যবেক্ষণ ও জানানো ইত্যাদি) অস্পষ্ট এবং অনির্ভরযোগ্য বলে সমালোচনা করা হতো। পদ্ধতিগুলোকে এক্সপেরিমেন্টের সময় নিয়ন্ত্রণও করা যায় না সেভাবে। ফলে যেসব আচরণবিদ মনোবিজ্ঞানকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো একটি 'এক্সপেরিমেন্টাল সাইন্স' হিসেবে দেখাতে চান; তারা তাদের কাজকে ল্যাবরেটরীতে পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনার মধ্যেই রাখতে চেয়েছেন। যেন সেগুলো পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিভিন্ন ঘটনার পরিমাপ ও 'নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রতিক্রিয়া' এখন এটাই তাদের সব এক্সপেরিমেন্ট ও সকল বৈজ্ঞানিক চেষ্টাপ্রচেষ্টার প্রধান ফোকাসে পরিণত হয়েছে। [১৭]
বাদরি এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আরও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি চিহ্নিত করেছেন যে আচরণবাদ মানুষের ফিতরাতগত (সহজাত) ভালো-মন্দের সংজ্ঞাকে অস্বীকার করে এবং মানুষের বিশ্বাসকে সত্য বা মিথ্যা কোনোটিই মানে না। আচরণবাদীরা দাবি করেন; মানবিক বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস পুরোপুরি পরিবেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এখানে নৈতিক মূল্যবোধ বা সার্বজনীন সত্যের কোনো স্থান নেই। এই তত্ত্বে ব্যক্তির পছন্দের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অফ চয়েস) ও সচেতন নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল ধারণা বর্জন করা হয়。[১৮]
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভরশীলতার কারণে ত্রুটিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ এবং পরস্পর বিরোধী তথ্য ও সিদ্ধান্ত এসেছে। এগুলোর মাধ্যমে 'মানব প্রকৃতি' বুঝতে গিয়ে বহু মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে। জাফরি বলেছেন,
“সামাজিক ও মানবিক ঘটনাসমূহ অধ্যয়নে সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ পদ্ধতিগুলো (এম্পিরিক্যাল মেথডলজি) আরোপ করার ফলে যতটা না কার্যকর ও যুক্তিসংগত প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। মানবিক বুদ্ধিমত্তা, বিবেকবোধ, আচরণ ও আন্তঃব্যক্তি সম্পর্ক ইত্যাদি অধ্যয়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। মানুষের অভ্যাস, আধ্যাত্মিকতা, আবেগ ও মানসিকতাকে বস্তুবাদী প্রচেষ্টার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও পরিমাপযোগ্য পদ্ধতিতে বেঁধে ফেলে খুব বেশি সুবিধা করা যায়নি। বৈজ্ঞানিক উদাহরণ ও নমুনাগুলো পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্রের মত বিষয় ব্যাখ্যার জন্য পর্যাপ্ত হলেও সামাজিক বিজ্ঞান অধ্যয়নে এগুলো খুবই সীমাবদ্ধ।”[১৯]
মনোবিজ্ঞানের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো,
এর অধিকাংশ গবেষণা এবং তত্ত্ব গড়ে উঠেছে পুরো মানবজাতির মধ্য থেকে কেবল অল্প কিছু মানুষের নমুনার (স্যাম্পল) ভিত্তিতে; যারা মূলত আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান। অবশ্য বর্তমানে এই প্রবণতায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা মানুষদের আচার-আচরণ, চিন্তাধারা ও আবেগ অনুভূতি থেকে প্রতিফলিত হয় যে, তারা আল্লাহ ও ধর্মের প্রতি কম বিশ্বাসপ্রবণ। ফলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কাদের নমুনাকে স্বাভাবিক (নরমাল) ধরা হবে? মনোবিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছেন, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের 'সমষ্টিগত আচার-আচরণ' 'স্বাভাবিক' (নরমাল) বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিফলন; কিন্তু এই অনুমান কতটুকু সঠিক?[২০]
কার্যত যে বিষয়টিকে স্বতঃসিদ্ধ ধরা হচ্ছে, সেটি আরেকটি নতুন বিষয়ের মাধ্যমে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, যার নাম 'ক্রস-কালচারাল' বা 'কালচারাল সাইকোলজি'। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এই বাস্তবতা মানতে শুরু করেছেন যে, এক সমাজে যা স্বাভাবিক (নরমাল) তা অন্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এই বিষয়টি আমলে আনা খুব জরুরী, বিশেষত যখন পশ্চিমা সমাজের গবেষণালব্ধ ফল থেকে ইসলামি সমাজ সম্পর্কে পূর্বানুমানের চেষ্টা করা হয়। গবেষণালব্ধ সকল সিদ্ধান্ত খারিজ করা জরুরী নয়, তবে অবশ্যই সেগুলোকে সমালোচনা ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

টিকাঃ
[১৫] Myers, 2007, p.24.
[১৬] Ibid, p 25-26.
[১৭] Badri, M.B., 2000, Contemplation: An Islamic Psychospiritual Study, Herndon, VA: International Institute of Islamic Thought, p.2.
[১৮] Ibid, p 3-4.
[১৯] Jafari, M.F., 1993, Counseling values and objectives: A comparison of Western and Islamic perspectives, The American Journal of Islamic Social Sciences, 10, p.238.
[২০] Zarabozo, 2002, pp. 37-38.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00