📄 মনোবিজ্ঞানের সাধারণ সংজ্ঞা
পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে রচিত সাইকোলজির যেকোনো পরিচিতিমূলক টেক্সট বইতে আপনি দেখতে পাবেন, মনোবিজ্ঞানের সাধারণ সংজ্ঞাটি অনেকটা এরকম:
The scientific study of behavior and mental processes; behavior is considered to be anything that an individual does or any action that can be observed by others. mental processes are the internal, subjective, unobservable components, such as thoughts, beliefs,
feelings, Sensations, perceptions Etc., that can be inferred from Behavior.[1]
আচার-আচরণ ও মানসিক কার্যপ্রণালীর বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নকে মনোবিজ্ঞান বলে। আচরণ হলো কোনো ব্যক্তির পর্যবেক্ষণযোগ্য কাজ যা অন্যরা দেখতে পায়। আর মানসিক কার্যপ্রণালী দেখা যায়না, অপর্যবেক্ষণযোগ্য; এগুলো আভ্যন্তরীণ, আপেক্ষিক ও অদৃশ্য উপাদানসমূহের সমষ্টি। যেমন- চিন্তা, বিশ্বাস, অনুভূতি, সংবেদনশীলতা, উপলব্ধি ইত্যাদি। আচরণ হতে মানসিক কার্যপ্রণালী অনুমান করা যায়।
বিজ্ঞানের একটি শাস্ত্র হিসেবে মনোবিজ্ঞানে যেসব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তার মধ্যে রয়েছে: আমরা কারা? আমাদের মৌলিক প্রকৃতি কিরূপ? আমাদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ ও আচার-আচরণে উৎস কি? কিভাবে আমরা নির্জেরাই সেসব উৎস পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি ইত্যাদি। নানাবিধ গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও পুনঃপুনঃ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রদানের প্রচেষ্টা করা হয় মনোবিজ্ঞান শাস্ত্রে। সাধারণ উদ্দেশ্য হলো, মানুষের আচরণ, মানসিক কার্যপ্রক্রিয়া ও আবেগ-অনুভূতিকে বর্ণনা করা, ব্যাখ্যা করা এবং পূর্বানুমান ও নিয়ন্ত্রণ করা।
আপাতদৃষ্টিতে তাদের এই প্রচেষ্টা মূল্যবান, সার্থক ও সমাজের জন্য উপকারী বলেই মনে হয়। কিন্তু নিবিড় নিরীক্ষণে (বিশেষত ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে) এর নানাবিধ ত্রুটি ও ঘাটতি চোখে পড়ে। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো, মানবসত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আত্মাকে (soul) উপেক্ষা করা। এক্ষেত্রে বর্তমানে কিছুটা অগ্রগতি অর্জিত হলেও মানুষের অস্তিত্বের জৈবিক, আচরণগত ও সামাজিক দিকগুলো সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানে খুব কমই আলোকপাত করা হয়েছে। ফলে মানব প্রকৃতির সার্বিক ও পরিপূর্ণ তত্ত্ব প্রদানে এখনো বেশ ঘাটতি রয়ে গেছে। এছাড়া ব্যক্তির মানসিক সুস্থতা ও 'ভালো থাকা'র পক্ষে কার্যকরী ও টেকসই পদ্ধতি বাতলানোতেও রয়ে গেছে কমতি।
মজার ব্যাপার হলো, 'সাইকোলজি' শব্দটি বুৎপত্তিগত অর্থেই আত্মা বা রূহ (soul or spirit) সম্পর্কিত অধ্যয়নকে বুঝিয়ে থাকে। ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর পৃথক হওয়ার আগে রূহ বা আত্মার আলোচনা মনোবিজ্ঞানের একটি বড় স্থান দখল করত। এমনকি আধুনিক সময়েও অনেক পেশাদার মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন যারা সেই বিশ্বাসগুলো আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। তারা মূলত ইহুদি-খ্রিস্টান পটভূমি থেকে এসেছেন, যদিও তাদের সংখ্যা (অন্যান্য মনোবিজ্ঞানীদের তুলনায়) খুবই অল্প। ফলে, মনোবিজ্ঞানের প্রধান প্রধান তত্ত্বগুলো রয়ে গেছে সেক্যুলার প্রকৃতিরই।
বাস্তবে মনোবিজ্ঞানীরা কম ধর্মপরায়ণ হন সাধারণ মানুষের চেয়ে। এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে নিয়ের তথ্য উঠে এসেছে:
ক্রম সূচক সাধারণ মানুষ মনোবিজ্ঞানী
১ নিজেকে কোনো ধর্মের অনুসারী দাবী করেন না ৬% ১৬%
২ জীবনে ধর্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না ১৫% ৪৮%
৩ নাস্তিকতা অনুসরণ করেন ৫% ২৫%
৪ 'আমার জীবনের গতিপথ ধর্মের উপর নির্ভরশীল' হ্যাঁ বলেছেন ৭২% হ্যাঁ বলেছেন ৩৫%
৫ আল্লাহকে (গড) বিশ্বাস করেন? হ্যাঁ বলেছেন ৯৫% হ্যাঁ বলেছেন ৬৬%
অর্থাৎ অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাধারণ মানুষ ও মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে,
১। শতকরা প্রায় দ্বিগুণের বেশি মনোবিজ্ঞানী (যথাক্রমে ৬% বনাম ১৬%) নিজেকে কোনো ধর্মের অনুসারী দাবি করেন না।
২। জীবনে ধর্মের ভূমিকা অগুরুত্বপূর্ণ মনে করার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য তিনগুণের অধিক (১৫% বনাম ৪৮%),
৩। আর নাস্তিকতা অনুসরণের ক্ষেত্রে, সাধারণ মানুষের তুলনায় মনোবিজ্ঞানীদের শতকরা হার পাঁচগুণ বেশি (৫% বনাম ২৫%)।
৪। নিয়মিত প্রার্থনা করা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া কিংবা ধর্মীয় কাজে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষদের থেকে সাইকোলজিস্টরা পিছিয়ে।
৫। 'আমার জীবনের গতিপথ ধর্মের উপর নির্ভরশীল'এই বক্তব্যের সাথে ৩৫% মনোবিজ্ঞানী একমত হয়েছেন অথচ সাধারণ মানুষদের মধ্যে ৭২% একমত হয়েছেন।
৬। আল্লাহ (তাদের ভাষ্যমতে 'গড') বিশ্বাস করেন কিনা এই প্রশ্নের জবাবে ৬৬% মনোবিজ্ঞানী এবং ৯৫% সাধারণ মানুষ হ্যাঁ বলেছেন।
গবেষকরা (গবেষণাপত্রটি যারা লিখেছে) এই পরিসমাপ্তিতে পৌঁছেছেন যে, সাইকোলজিস্টরা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক কম ধর্মপরায়ণ, যদিও জরিপে অংশগ্রহণকারীরা (ধর্মের বদলে) আধ্যাত্মিকতাকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এবং এক্ষেত্রে তারা আধ্যাত্মিকতাকে নিতান্তই ব্যক্তিগত বিষয় বলে ইঙ্গিত করেছেন; যার সংজ্ঞা এতই
হালকা বানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ধর্মও এর জন্য খুব একটা জরুরি না। এ কারণে কিছু মানুষ নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক বলে মানলেও ধার্মিক মানতে চান না, তারা বলেন, 'আমরা আধ্যাত্মিক তবে ধার্মিক নই।[৩]
টিকাঃ
[১] Myers, D.G., 2007, Psychology (8th ed.), New York: Worth Publishers, p. 2.
[২] Delaney, H.D., Miller, W.R & Bisono, A.M., 2007, Religiosity and spirituality among psychologists: A survey of clinician members of the American Psychological Association, Professional Psychology: Research and Practice, 38(5), p.542.
📄 মনোবিজ্ঞান ও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস
সেক্যুলার সংজ্ঞানুসারে ধারণা করা হয়, আমাদেরকে দুনিয়াতে নিজের খেয়াল-খুশীমত চলার স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, 'ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ' বা জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই। এই মতে ধরে নেয়া হয়, আমাদের জীবনে আল্লাহর কোনো প্রভাব নেই। এমনকি অনেকে এটাও অস্বীকার করেন যে, কোনো উচ্চতর সত্তা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। ফলে সেক্যুলার ধারণায় আমরা নিছক একটি দৈহিক সত্তার সাথে সংযুক্ত কিছু আবেগ, চিন্তা ও আচরণের সমষ্টি ছাড়া কিছুই নই। মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্ব নিঃশেষ বলে ধরে নেয়া হয়।
অধিকাংশ আচরণবিদ (Behavioural scientists) বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদকে (সায়েন্টিফিক ন্যাচারালিজম) স্বতঃসিদ্ধ মনে করে তাদের তত্ত্ব ও গবেষণাসমূহ দাঁড় করিয়েছেন। এই দর্শন অনুসারে বলা হয়:
'মহাবিশ্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ, এখানে কোনো অতিপ্রাকৃত প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ নেই। আর সকল সম্ভাব্যতা অনুসারে, বিজ্ঞান এই বিশ্বজগতের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছে সেটাই বাস্তবতার একমাত্র সন্তোষজনক ব্যাখ্যা।'[৪]
এই মতে ধরে নেয়া হয়, কোনো ঐশ্বরিক প্রভাব বা আল্লাহর (God) দিকে প্রত্যর্পণ ব্যতীতই মানব সত্তা ও মহাবিশ্বকে অনুধাবন ও ব্যাখা করা যায়।[৫]
বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদের শেকড় প্রোথিত 'দৃষ্টবাদ' ও 'অভিজ্ঞতাবাদ' নামক দুটি মতবাদের উপর।
দৃষ্টবাদ (positivism) অনুসারে, 'দৃশ্যমান ঘটনাসমূহ ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর জ্ঞান সীমাবদ্ধ। ফলে একমাত্র বিজ্ঞানের মাধ্যমেই নির্ভরযোগ্য জ্ঞান লাভ করা যায়।[৬] এভাবে দলীলের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টবাদ (positivism): অগাস্ট কোঁৎ তার 'Course de Positive Philosophy' গ্রন্থে মানবসমাজের ক্রমবিকাশের ধারাকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। এগুলোর মধ্যে 'দৃষ্টবাদ' অন্যতম। অগাস্ট কোঁৎ জ্ঞানের সমগ্র বিকাশের ধারাকে তত্ত্বসমূহকে প্রমাণ করা হয় এবং সেগুলো বাস্তবতার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করে।[৭] অভিজ্ঞতাবাদ (empiricism) একটি তুলনামূলক বা আপেক্ষিক ধারণা; এই মতবাদে ধরে নেওয়া হয় যে জ্ঞানের চূড়ান্ত এবং প্রকৃত উৎস হল অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞতা লব্ধ যুক্তি।[৮] সহজ কথায় যদি কোনো কিছু ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা লব্ধ না হয় তাহলে সেটাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হবে না। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব অনুসারে এটি সুস্পষ্ট যে আধুনিক বিজ্ঞানীরা যতটুকু স্বীকার করেন বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক জটিল। গায়েব বা অদৃশ্য জগৎকে মানবিক বোধশক্তি ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করা যায় না; গায়েবের জগত দৃশ্যমান জগত অপেক্ষা ব্যাপক। উপরন্তু দৃশ্যমান জগতে অদৃশ্য জগতের নানা মিথস্ক্রিয়া ও প্রভাব বিদ্যমান।
তিনটি স্তরে ভাগ করেন। তাঁর মতে, জ্ঞানের বিকাশের তৃতীয় বা চূড়ান্ত যুগ হচ্ছে পজিটিভিজম বা দৃষ্টবাদ। এ যুগে বিজ্ঞানের মাধ্যমে দৃশ্যমান প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রকৃতির বাইরে ঈশ্বর বা অন্য কোনো চরম সত্তাকে অস্বীকার করা হয়। বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা এবং দৃশ্যমান প্রকৃতিই এখানে চরম সত্য এবং একে অতিক্রম করে যাওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। কোঁতের দৃষ্টবাদের মূলকথা হচ্ছে, এ স্তরে বিজ্ঞান শুধু বাস্তব জগতের দৃষ্ট দৃশ্যমান বিষয়ের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করবে এবং এর বাইরে অন্য কিছু অনুসন্ধান করবে না। অভিজ্ঞতাবাদ (empiricism): সাধারণত অভিজ্ঞতাবাদ বলতে এরূপ তত্ত্বকে বোঝায় যেখানে মানুষের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাকেই জ্ঞানের একমাত্র উৎস গণ্য করা হয়। (অনুবাদক)
আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে একটি আত্মা প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের আত্মা ও দেহ, এবং সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক ও নিয়ন্ত্রক। এই বিষয়টি কুরআনে বারবার উল্লেখ হয়েছে। এবং এটাই আল্লাহর একত্ববাদ ও প্রভৃত্বে (লর্ডশিপ) বিশ্বাসের ভিত্তি। আল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহ সর্বকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আসমান ও জমিনের চাবি তাঁরই নিকট। যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।' (সূরাহ যুমার, ৩৯;৬২-৬৩) • অন্যত্র বলেছেন,
'পূণ্যময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।' (সূরাহ মুলক, ৬৭:১)
• অন্যত্র বলেছেন, 'বলুনঃ তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না?' (সূরাহ মুমিনুন, ২৩: ৮৮)
• অন্যত্র বলেছেন, 'অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।' (সূরাহ সাফফাত, ৩৭:৯৬)
এই আয়াতসমূহে বিশ্বজগতের সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ ও রাজত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে নির্দেশিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাই মহাবিশ্বের একমাত্র স্বত্বাধিকারী এবং মনিব, কর্তা ও প্রভু (রব)। তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, রিজিক প্রদান করেন, জীবন-মৃত্যু ঘটান, এবং কবর থেকে আমাদের পুনরুত্থিত করবেন। কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে তিনি প্রতিটি সৃষ্টবস্তুর কার্যকলাপ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানে মনোবিজ্ঞানের আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, তাঁর এই নিয়ন্ত্রণ জেনেটিক্স (জিনতত্ত্ববিদ্যা), অভিজ্ঞতা, চিন্তা, আবেগ ও আচার-আচরণের উপরেও বিস্তৃত।
মানুষ হিসেবে আমাদের কোনো কিছু বেছে নেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। আমরাও কিছু কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি কিন্তু এটা আল্লাহর রাজত্বের বিপরীতে মোটেও তুলনীয় নয়। বস্তুত বিভিন্ন ঘটনার উপর মানবিক প্রভাবশক্তি খুবই সীমিত। মূলত মানুষ কেবল তার সামনে থাকা 'অপশন' থেকেই কোনো একটিকে বেছে নিতে পারে। তবে মানুষের এই ইচ্ছাশক্তি বা বাছাই থেকেও চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, একজন তরুণ সিদ্ধান্ত নিল যে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। এরপর সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আবেদনপত্র পূরণ করল এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক উৎসাহিত বোধ করল। এমতাবস্থায় যদি আল্লাহ তাআলা ছেলেটির তাকদীরে ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন নির্ধারণ করে থাকেন, কেবলমাত্র তখনই সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ লাভ করবে। কিন্তু যদি সেটা তাকদীরে লিপিবদ্ধ না থাকে তাহলে সে কখনো সুযোগ পাবে না। এ কারণে মুসলিমরা ভবিষ্যতের ঘটনার ব্যাপারে বলেন, 'ইনশাআল্লাহ' (যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন)! সূরাহ কাহাফে আল্লাহ বলেছেন, 'আপনি কোনো কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামীকাল করব। 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে' বলা ব্যতিরেকে...' (সূরাহ কাহাফ, ১৮:২৩-২৪)
সুতরাং, তাকদির ও আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানার মাধ্যমে আপনি যেভাবে মানবসত্তার স্বরূপ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, ঠিক তেমনিভাবে দৈনন্দিন নানাবিধ কার্যক্রমেও অনেক নির্ভার থাকবেন।
একমাত্র আল্লাহই আমাদের ক্ষতি কিংবা উপকার করতে সক্ষম, এই বিশ্বাসের মাধ্যমে আমরা দৈনন্দিন কার্যক্রমের অনেক মর্মপীড়া থেকে মুক্তি পাই। সেই 'কাঙ্খিত' চাকরি বা জীবনসঙ্গী অথবা দৈনন্দিন জীবনের ঝঞ্ঝা ও সংগ্রাম নিয়ে আমাদের পেরেশান থাকতে হয় না, বরং আমরা বলি 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ', (আল্লাহ ব্যতীত কোনো শক্তি বা সাহায্য নেই)। সূরাহ যুমারে আল্লাহ বলেছেন,
'যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে-আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৩৮)
যারা আল্লাহর শক্তি, সক্ষমতা ও গুণবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহ অস্বীকার করে, তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিকে ইলাহ বানিয়ে নেয়। মনোবিজ্ঞানের অনেক তত্ত্ববিদ ঠিক এই কাজটিই করেছেন! আল্লাহ বলেছেন,
'আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশিকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে।' (সূরাহ জাসিয়াহ, ৪৫:২৩-২৪)
তারা নিজেদের কামনা-বাসনা, প্রবৃত্তি এবং খেয়াল-খুশিকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। তাদের প্রবৃত্তি ভুল-শুদ্ধ নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডকেই তারা প্রত্যাখ্যান করেছে, আর সেটি হলো আল্লাহর নাজিলকৃত ওহী। তারা যথার্থভাবে আল্লাহর কদর করতে পারেনি, ফলে তিনি তাদেরকে পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দিয়েছেন। তারা যত বেশি সত্যকে উপেক্ষা ও অপছন্দ করে, তত বেশি পথভ্রষ্ট হয়। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো তারা কেবল নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েই ক্ষান্ত হয় না বরং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করতে থাকে। আল্লাহ বলেছেন,
'তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমান সমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক উর্ধ্বে।' (সূরাহ যুমার, ৩৯:৬৭)
টিকাঃ
[e] Ibid, p 542.।(S.B.N.R = spiritual but not religious)
[৪] Honer, S.M., and Hunt, T.C., 1987, Invitation to Philosophy: Issues and Options (5th ed.) Belmont, CA: Wadsworth, p.225.
[e] Richards, P.S., 2005, Theistic psychotherapy, Psychology of Religion Newsletter 31(1), p.1.
[৬] Honer and Hunt, 1987, p.226.
[৭] Richards, P.S., and Bergin, A.E., 2005, A Spiritual Strategy for Counseling and Psychotherapy (2nd ed.), Washington, DC: American Psychological Association, pp. 33-34.
[৮] Honer and Hunt, 1987, p.220; Richards and Bergin, 2005, p.34.
📄 মনোবিজ্ঞানের সেক্যুলার পদ্ধতির প্রধান দুর্বলতাসমূহ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা নিজেদের বাতলানো তত্ত্বসমূহের সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করতে শুরু করেছেন। অনেকেই একমত হয়ে বলেছেন, “বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদ মানব প্রকৃতির একটি দুর্বল চিত্র উপস্থাপন করে। এবং জীবন ও মহাবিশ্বের জটিলতা ও রহস্যের পর্যাপ্ত বর্ণনা প্রদান করে না।"[৯] গ্রিফিন বলেছেন, 'বস্তুবাদ ও ইন্দ্রিয়বাদ (sensationalism) যখন নাস্তিকতার সাথে সমন্বিত হয় তখন একটি নিয়ন্ত্রণবাদী (জড়), আপেক্ষিক ও শূন্যবাদী (nihilistic) দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে যেখানে জীবনের কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই। [১০]
• বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদে মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয় তা 'বিহেভিয়ারাল সায়েন্টিস্ট'রাও* অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই মতবাদে মানবসত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয় বা খাটো করে দেখানো হয়। যেমন- মানব মন, সচেতনতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর উপর ঈমান। বিশেষত 'হেল্পিং প্রফেশনে'* কর্মরত ব্যক্তিদের ওপর এই থিওরি প্রয়োগ করা হলে এর অপর্যাপ্ততা ব্যাপকভাবে ফুটে ওঠে কেননা তাদের লক্ষ্য হলো অপরের নিরাময় ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা প্রদান করা। [১১]
* বিহেভিয়ারাল সায়েন্স: বিভিন্ন মানবিয় কার্যাবলী যেসব অনুষদে আলোচনা করা হয়, যেমন- সমাজ বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ববিজ্ঞান, সাইকোলজি, সাইকিয়াট্রি ইত্যাদি।
* হেল্পিং প্রফেশন: যেসব পেশায় একজন ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক কিংবা আধ্যাত্মিক সুস্থতার বিকাশ ও যত্ন নেয়া হয়; যেমন মেডিসিন, নার্সিং, সাইকোথেরাপি, কাউন্সিলিং, সামাজিক কাজ, শিক্ষা ইত্যাদি। (অনুবাদক)
ড. জামাল জারাবযো আত্মার পরিশুদ্ধি আলোচনা প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সেক্যুলার পদ্ধতির কিছু প্রধান দুর্বলতা তুলে ধরেছেন: [১২]
• ১। মানুষকে তার স্রষ্টা ও রবের উপর অনির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয় (পূর্বে আলোচিত)।
• ২। কেবল মানবিক বোধশক্তির ভিত্তিতে এর তত্ত্বসমূহ প্রতিষ্ঠিত অথচ আল্লাহর নাজিলকৃত ওহীকে প্রত্যাখ্যান এবং উপেক্ষা করা হয়েছে। (সপ্তম অধ্যায় দ্র.)।
• ৩। সেক্যুলার জ্ঞান ও গবেষণা কেবলমাত্র দৃশ্যমান মানবিক অনুষঙ্গের উপর আলোকপাত করেছে অথচ আধ্যাত্মিক এবং অদৃশ্য বিষয়গুলো অপেক্ষা করেছে।
• ৪। সাধারণত ধরে নেয়া হয়, মানবিক আচার-আচরণসমূহ কেবলমাত্র প্রবৃত্তির তাড়না, অভিব্যক্তি, প্রশিক্ষণ (অভিজ্ঞতা) ও সামাজিক প্রভাবের (পরিবেশ) মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
এরপর জারাবযো সেক্যুলার ও অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ তত্ত্বসমূহের বিপদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'মানবরচিত তত্ত্ব বা বিকৃত ধর্মগ্রন্থগুলো ব্যক্তির আধ্যাত্মিক সুস্থতার জন্য খুবই বিপদজনক। এসব তত্ত্ব কিংবা ধর্মগ্রন্থগুলো একজন ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের সরল পথ থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়। এই ক্ষতি আরো ব্যাপকতা লাভ করে যখন মিথ্যাচারিতা ও সুচতুর যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেগুলো সমর্থন করা হয় কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সেই ধর্মগ্রন্থগুলো প্রস্তুত করা হয়। এক্ষেত্রে বাকি লোকেরা তাদেরকে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে এবং সঠিক ও উপকারী মনে করে বিভ্রান্ত হয়। পরিশেষে লোকেরা এসব বিভ্রান্তির প্রতি অন্ধ হয়ে যায়।' [১৩]
টিকাঃ
[১] Richards and Bergin, 2005, p.37.
[১০] Griffin, D.R., 2000, Religion and Scientific Naturalism: Overcoming the Conflicts, Albany: State University of New York Press, p.14.
[১১] Richards and Bergin, 2005, p.45.
[১২] Zarabozo, J, 2002, Purification of the Soul: Process, Concept, and Means, Denver, CO: Al-Basheer Company for Publications and Translations, p.49.
📄 ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
মনোবিজ্ঞানের বিকল্প সংজ্ঞায়নে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যা যা অন্তর্ভুক্ত করা হয় তার মধ্যে রয়েছে: আত্মার আলোচনা; সম্ভাব্য আচরণ, আবেগ ও মানসিক কার্যপ্রণালী, এগুলোর ফলাফল; এবং উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রভাবকসমূহ (দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অনুষঙ্গ নির্বিশেষে)।
'আত্মা জীবনের মৌলিক উপাদান'-ইসলামি বর্ণনাগুলো উৎসারিত এই চিন্তাধারা থেকে। আত্মাই মানুষের আচরণ, আবেগ এবং মানসিক চিন্তাধারাকে উদ্দীপ্ত করে। মানুষের মনন সম্পূর্ণভাবে মনোবিজ্ঞানের ইন্দ্রিয়লব্ধ বস্তুগত আলোচনার উপর নির্ভরশীল নয়; এর সারনির্যাস আধ্যাত্মিক এবং মেটাফিজিকাল (পরবাস্তব, গায়েবের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি)। এবং এই প্রত্যেক মানবাত্মায় ফিতরাত ও তাওহিদের সাক্ষ্য খোদাই করে দেয়া-মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে। ফিতরাত হলো আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের সহজাত ঝোঁক ও বৈশিষ্ট্যসমূহ; এ সম্পর্কে সামনে আলোচনা আসছে।
মানবাত্মা প্রকৃতিগতভাবে আধ্যাত্মিক (স্পিরিচুয়াল)। ফলে মূল উৎস অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সাথে আত্মার একটি আধ্যাত্মিক সংযোগ বজায় রাখতে হয়, ঠিক যেভাবে দেহ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও পানীয়ের দরকার পড়ে। এই প্রধান 'পুষ্টি উপাদান' ব্যতীত মানবাত্মা আক্রান্ত হয় উদ্বিগ্নতায় (এংজাইটি), ডিপ্রেশনে এবং হতাশায়। যারা বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আজকাল আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অনেকেরই মূলত রোগটা মনের নয়, বরং আত্মার। তার আত্মা রুহানী খোরাকের জন্য আকুতি জানাচ্ছে। আর প্রকৃত রুহানী খোরাক রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্যের মাঝে। কিন্তু আসল খাবার না দিয়ে
তাকে দেয়া হচ্ছে সাইকোথেরাপি এবং মেডিকেশনের হরেক রকম 'জাঙ্ক ফুড'। এ কারণেই আত্মার আর্তচিৎকার অসুখ হিসেবে বেড়ে চলে।
ইসলামি মনোবিজ্ঞানের ধারণা মতে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় জগতের ঘটনা দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। সমসাময়িক সাইকোলজিক্যাল তত্ত্বগুলো সাধারণত কেবল দৃশ্যমান জগতকেই আলোচনায় আনে অর্থাৎ মনের উপর পিতামাতা, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, সাথী-বন্ধু, শিক্ষক, সমাজ, মিডিয়া ইত্যাদির প্রভাব নিয়েই আলোচনা করে। অপরদিকে ইসলামি মনোবিজ্ঞানে মানব প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা দেবার জন্য অদৃশ্য জগতের বিষয়গুলোও আলোচনায় আনা হয়। সেগুলো হলো; আল্লাহ, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা, ফেরেশতা ও জিনের আলোচনা। এখানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ভালো মন্দ বাছাইয়ের ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয় না বরং তা উপযুক্ত প্রসঙ্গে প্রযোজ্য।
টিকাঃ
[১৩] Ibid, p 44-45.