📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 মুখবন্ধ

📄 মুখবন্ধ


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, তাঁর কাছে হিদায়াত চাই। আল্লাহর কাছে আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করি আমাদের নফসের অনিষ্ট হতে এবং মন্দ আমলের অনিষ্ট হতে। যাকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ব্যতীত ইবাদাতের যোগ্য কেউ নেই, তিনি শরিক বিহীন। আমি আরো সাক্ষ্য প্রদান করছি যে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিভাগে আন্ডারগ্রাজুয়েট ও পরবর্তীতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও আমি কোনো সন্তোষজনক সাইকোলজিক্যাল থিওরি খুঁজে পাইনি যা বিস্তারিত ও নিখুঁতভাবে মানব মনের প্রকৃতি ব্যাখা করতে পেরেছে। যদিও বিভিন্ন সেক্যুলার সাইকোলজিস্টদের প্রায় ২৫০ এর অধিক তত্ত্ব আমি অধ্যয়ন করেছি, এর একটিও আমাকে মানব মনের সঠিক ব্যাখা প্রদান করতে পারেনি। কিছু থিওরিকে অন্য থিওরির থেকে অধিক আকর্ষণীয় মনে হলেও, সব সময় মনে হতো কী যেন নেই, কী যেন নেই। খণ্ড খণ্ড টুকরোগুলো মিলে একত্রে যেন কোনো ছবি তৈরি করতে পারেনি।
ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনের পর আমি আলোচ্য বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য খুঁজতে শুরু করলাম। (যদিও পিএইচডি অর্জনের বহু আগেই আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি)। শুরুতে এই অনুসন্ধান কিছুটা কঠিন ছিল। কেননা, বিভিন্ন ভ্রান্ত সুফিবাদী মতামত ও দার্শনিক চিন্তাধারা থেকে বিশুদ্ধ ইসলামি সাইকোলজিকে পৃথক করতে হয়েছে। অবশেষে আমি আল্লাহর অনুগ্রহে ইংরেজি ভাষাতে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিশুদ্ধ উৎসের সন্ধান পাই। আমি সেগুলো পড়তে শুরু করি এবং যতই পড়েছি ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে সত্যটা। আমি অবাক হয়ে দেখেছি ইসলামি পদ্ধতি কত জটিলতামুক্ত! সবশেষে আমি তৃপ্ত হয়েছি। আমি যে তত্ত্ব অনুসন্ধান করছিলাম তা মিলেছে ইসলামের মধ্যেই। ইসলাম সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ চিত্রের মাধ্যমে মানুষের জীবনের সোজাসাপ্টা ব্যাখা প্রদান করে। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য, মানুষের আধ্যাত্বিক সত্তার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব কিংবা জীবনে কোনো বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া উচিত ইত্যাদি সবকিছু ইসলামে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিভাবে আমরা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারি, কিভাবে শয়তান থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারি এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে পারি।
ইত্যাদি ধাপগুলোর আলোচনা ইসলামে রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের পক্ষেই এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব। এই পথে দৃঢ়পদ থাকা সহজ না হতে পারে, তবে লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব নিশ্চিতভাবেই।
যখন আমি জানলাম যে আমরা সবকিছুতে নিছক আমাদের জেনেটিক গঠনের ভিকটিম নই কিংবা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বা বর্তমান পরিবেশ দ্বারা সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নই, তখন আমার মনে শান্তির সুবাতাস বয়ে গেল। কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। সেই স্বাধীন সিদ্ধান্তের অর্থ আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং রব আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে আত্মসমর্পণ করা। এবং এই আত্মসমর্পণ হতে হবে তাঁরই দেখানো পথনির্দেশ মোতাবেক। এই পথই হলো একমাত্র পথ, যা দুনিয়া ও আখিরাতে সত্যিকারের সুখ-শান্তি দিতে পারে। আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা যেন এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করি। যা আমাদের নিরাপত্তা দেয় জীবনের নানাবিধ চড়াই-উতরাই, পরীক্ষা, বাধা-বিপত্তি, মানসিক চাপ এবং প্রবৃত্তির হীন কামনাবাসনা থেকে।
আমি মূলতঃ আগ্রহ পেয়েছি এতদিন নানান সেক্যুলার তত্ত্ব প্রচারকারী পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা থেকে। তাদের করা রিসার্চগুলোই এখন মানবজীবনে আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করছে। ধার্মিক ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিক সুস্বাস্থ্যের উপর ধর্মের যে গভীর প্রভাব রয়েছে, আধুনিক গবেষণার ইশারা এখন সেদিকেই। এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যতই আগ্রহী হচ্ছেন, ততই আরো বেশি প্রমাণ মিলছে। বিভিন্ন আবেগিক, মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা নিরাময় ও প্রতিরোধে ধার্মিকতা বা আধ্যাত্মিকতা অত্যন্ত উপকারী হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে। এসকল গবেষণা বাস্তবিকই নির্দেশ করছে ইসলামের সত্যতা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ (কুরআন) সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?" (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১ : ৫৩)।[১]

টিকাঃ
[১] কুরআনের আয়াতসমূহের অনুবাদ গ্রহণ করা হয়েছে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত 'আকুরআনুল করীম-' থেকে।

📘 সাইকোলজি ইসলামি দৃষ্টিকোণ > 📄 সারাংশ ও উপসংহার

📄 সারাংশ ও উপসংহার


মানবপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খুবই সীমিত জ্ঞান দান করেছেন। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে যতটুকু জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট। বস্তুত আমাদেরকে যথাযথ ও বাহুল্যবর্জিত জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের জন্য।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এমন এক সৃষ্টি যাদের দেহ, মন ও আবেগ রয়েছে। আরও রয়েছে একটি আত্মা যা এগুলোকে প্রভাবিত করে ও পরিচালিত করে। নিজেকে ও নিজের আত্মাকে জানার একমাত্র সঠিক উপায় হচ্ছে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে জানা। একমাত্র আল্লাহকে জানার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের আত্মা সম্পর্কে জানতে পারে। এটিই কুরআন ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত মানব মনস্তত্বের মৌলিক ভিত্তি।

সমকালীন মনোবিজ্ঞানের অসংখ্য তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে কেবল জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে পথভ্রষ্ট ও বিচ্যুত করা হয়। মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আন্তরিকভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা, জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গ এই প্রধান লক্ষ্যের বিপরীতে একেবারেই গৌণ।

জার্নালে প্রকাশিত গাদা গাদা আর্টিকেল, বই পুস্তকের অসংখ্য অধ্যায়, নানাবিধ বিশদ তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত কনফারেন্সের কার্যবিবরণী কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামতসমূহ হাশরের দিনে তাদের কোনো কাজেই আসবে না, যদি সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নাজিলকৃত মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করা হয়। বাস্তবে তাদের গবেষণাগুলোও ইসলামের সত্যতার দিকেই ইঙ্গিত করে, কিন্তু তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। আল্লাহ বলেছেন,

• 'তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলা কে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আত্ন বিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য।' (সূরাহ হাশর, ৫৯:১৯)

ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি, সুখ-শান্তি ও 'ভালো থাকা'র পরিপূর্ণতা দানের জন্য দ্বীন ইসলাম বিস্তারিত এবং পদ্ধতিগত সহযোগিতা প্রস্তাব করে। এই পরিপূর্ণতা অর্জন করা যাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত উপায়ে তাঁর ইবাদাতের মাধ্যমে। কার্যতঃ ইসলাম নিজেই সকল অসুস্থতার সমাধান, হোক সেটা আত্মিক, আধ্যাত্বিক, মানসিক, আবেগিক, শারীরিক কিংবা সামাজিক। মানুষের এখন প্রয়োজন কেবল আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে চলা।

তিনি বলেছেন,

• 'আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে। অতঃপর তাকে অধঃপতিত করেছি নীচ থেকে আরও নীচে। কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে অশেষ পুরস্কার।' (সূরাহ তীন, ৯৫:৪-৬)

এই আয়াতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মানুষের মনস্তত্ত্বের সারাংশ ফুটে উঠেছে। চাইলে আমরা বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে উন্নত করতে পারি, অথবা নির্দেশনা অস্বীকারের মাধ্যমে নিজেদের মর্যাদাহানি ঘটাতে পারি।

প্রথম ক্ষেত্রে আমরা পাব আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হবে শাস্তি ও আল্লাহর ক্রোধ। এটাই মানব জীবনের সারকথা। শেষ কথাটি মনে থাকবে তো? যে পথ আমরা বেছে নেব, তা কেবল দুনিয়াতে আমাদের ভালো থাকা মন্দ থাকাকেই নির্ধারণ করবে না শুধু; বরং ঠিক করে দেবে আমাদের অনন্তকালের চূড়ান্ত ঠিকানাও!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00