📄 সম্পাদকের কথা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি বান্দাকে কাজে লাগান, অযোগ্য লোককে দিয়েও বড় বড় কাজ নেন। কোনো উপায়-উপকরণ-পদ্ধতি- যোগ্যতার মুখাপেক্ষী নন তিনি। আর দরুদ ও সালাম প্রাণের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরফে。
বিভিন্ন জায়গায় কথা বলার সুযোগ পেলে একটা কথা পাড়ার চেষ্টা করি। সব নবিকে নিজের দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য 'মু'জিযা' দিয়েছিলেন আল্লাহ। কোনো ফটোকপি গ্রহণযোগ্য হয়, যদি প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা সত্যায়িত করে দেন, যে এটা অরিজিনালটারই ফটোকপি, আমি স্বাক্ষরকারী অরিজিনালটা দেখেছি। তেমনি নবিদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য, সন্দেহ-সংশয় নিরসনের জন্য দেয়া হতো মু'জিযা, যে ইনিই আল্লাহর সত্যায়িত বার্তাবাহক। সত্যসন্ধানীরা আল্লাহর তাওফিকে বুঝে যেত যে ইনিই নবি। আর হতভাগারা তা বুঝেও হঠকারিতা করত। বলত কবি-জাদুকর-পাগল-জিনে পাওয়া। আমাদের নবিজি (সা.) মু'জিযা বা সত্যায়ন ছিল 'কুরআন', হাদিসে এসেছে।
মু'জিযা শব্দের অর্থ হলো, যা হয়রান করে দেয়, হতভম্ব করে দেয়—এতটাই যেন অবש হয়ে যায় দেহ-মন। তাহলে কুরআন হতভম্ব করে দেবে সংশয়ীকে বা অবিশ্বাসীকে, যে সত্যকে খোঁজে এমন কাউকে। এখন আসেন, হতবাক মানুষ কখন হয়? আকস্মিকতায় আর বিস্ময়ে। এখানে মূল কারণ হবে বিস্ময়। বিস্ময় তখনই আসে যখন কোনোকিছু আমার সাধ্য, অভিজ্ঞতা বা কল্পনার সীমাকে ছাপিয়ে যায়। আমার সামর্থ্যকে যা চ্যালেঞ্জ করে, তার প্রতি আমি বিস্মিত হই— বাহ! কী দারুণ। কুরআনের এই হয়রান-হতবাক করে দেয়া বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি যারা প্রথম হয়েছিল, তারা ছিল জাতিতে আরব। কাব্য ছিল তাদের রক্তে। কাব্য ছিল তাদের বিনোদন, তাদের গণমাধ্যম, তাদের ইতিহাস আর্কাইভ, তাদের মোটিভেশনাল স্পীচ। কাব্যই ছিল তাদের বংশগৌরবের বিষয়— 'অমুক কবি আমাদের বংশের'। যুদ্ধের কবিতা, প্রেমের কবিতা, আটপৌরে জীবনের কবিতা। কুরআন এসেই তাদের কবিমানস ধরে নাড়া দিল, ছুঁড়ে দিল চ্যালেঞ্জ— সামর্থ্য থাকে তো নিয়ে এসো এর কাছাকাছি কিছু; একটা কিতাব নিয়ে আসো এমন, না পারো তো একটা সূরাহ নিয়ে এসো এমন, তাও না পারো একটা আয়াতই বানিয়ে আনো এমন।
কাবার দরজায় টাঙানো ছিল বহুদিন ধরে শ্রেষ্ঠ ৭টি আরবি কবিতা, বলা হতো 'সাবআ মুয়াল্লাকাত' বা 'ঝুলন্ত সপ্তক'। যখন সূরাহ কাউসার অবতীর্ণ হয়, তখন এই ৭ জনের কেবল একজন বেঁচে আছে। আবু জেহেল তার কাছে নিয়ে গেল 'সূরাহ কাউসার'। সূরাহ দেখে কবি বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলল: 'সকল মহিমা প্রভুর জন্য, এটি কাউসার'।
'মানুষের কথা হতে পারে না'। সে তখন কাবায় গেল, নিজের কবিতা সেখান থেকে নামিয়ে দিল, সূরাহ কাউসার লেখা কাগজটা সেখানে টাঙিয়ে দিল, আর নিচে ছন্দ মিলিয়ে আরেকটি লাইন লিখে দিল: 'মা হাযা কালামুল বাশার'-এটা কোনো মানুষের কথা নয়'। কাব্যে excellence অর্জনকারী ডাকসাইটে কবি হয়রান হয়ে গেল নিজের সামর্থ্যের অতীত, কল্পনাতীত ভাষার কারুকাজ দেখে। এটাই মু'জিযা।
সেই নবি তো আজও নবি, কিয়ামত পর্যন্ত তিনি নবি, আরবভূমি ছাপিয়ে সারা বিশ্বের জন্য নবি। তার মু'জিযা তো কিয়ামত তক মু'জিযা। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো যুগের যেকোনো জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ সামর্থ্যকে, তাদের excellence-কে ছাপিয়ে তাদের হয়রান করে দেবার ক্ষমতা দিয়ে পাঠানো হয়েছে কুরআনকে।
* এজন্যই কখনো আপনি দেখবেন এনাটমির প্রোফেসর Tejatat Tejasen কে বলতে—
From my study and what I have learned from this conference, I believe that everything that has been recorded in the Quran fourteen hundred years ago must be the truth, that can be proved by the scientific means. Since the Prophet Muhammad could neither read nor write, Muhammad must be a messenger who relayed this truth, which was revealed to him as an enlightenment by the one who is eligible [as the] creator. This creator must be God.
* কখনো দেখবেন ভ্রূণতত্ত্ববিদ প্রোফেসর Keith L. Moore-কে বলতে— the description of embryo in quran cannot be based on the scientific knowledge available in 7th century. কুরআনে ভ্রূণবিকাশের যে বর্ণনা, তা সপ্তম শতাব্দীর জ্ঞান হতে পারে না।
* দেখবেন সমুদ্রতত্ত্ববিদ William Hay-কে বলতে:
I find it very interesting that this sort of information is in the ancient scriptures of the Holy Quran, and I have no way of knowing where they would come from, but I think it is extremely interesting that they are there and that this work is going on to discover it, the meaning of some of the passages. Well, I would think it must be the divine being.
নেট ঘাঁটলে এমন বহু সাক্ষাতকারের ভিডিও ক্লিপ আপনি পাবেন। এরা সবাই নিজ নিজ ফিল্ডে excellence অর্জন করেছেন, হয়রান হয়ে তারা ঘোষণা করেছেন— 'এটা কোনো মানুষের জ্ঞান না'। ইসলাম কবুল করুক বা না করুক, বিবেকের কাছে যে পরিষ্কার, সে স্বীকার করেছে, এবং এরা সবাই সেই আরব কবির মতো নিজ বিষয়ে পারদর্শী। আল্লাহ যাকে চাইবেন, যার মনের সন্ধানী শুদ্ধতা তাঁর পছন্দ হবে, সে বুঝে মেনে নিবে। আবার কেউ কেউ বুঝে অস্বীকার করবে, ইনিয়ে বিনিয়ে ব্যাখ্যা করবে— হয়তো মুহাম্মদ বাইরে থেকে জেনেছে, হয়তো তিনি অসামান্য প্রতিভাধর ছিলেন, হয়তো... ইত্যাদি ইত্যাদি। যেমন আরবেও তারা করেছিল। কেন করেছিল? পদ, নেতৃত্ব,
সামাজিক অবস্থান, লাইফস্টাইল, পরিবার, খাহেশ পূরণে বাধার ভয়ে। এমন আজও পাবেন, মুসলিমদের ভিতরেই পাবেন, এগুলোর ভয়ে ইসলাম মানছে না।
বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান স্রেফ 'পর্যবেক্ষণ', স্রেফ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের পাওয়ার বিভিন্ন যন্ত্রের দ্বারা বেড়েছে। দূরবীন, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড, রেকর্ডিং, ইসিজি, বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া ইত্যাদি বহুকিছু। আগে মানুষ যা দেখতে পেত না, তা দেখতে পাচ্ছে। যা শুনতে পেত না, তা ভিন্নভাবে বুঝছে। যা বুঝত না, তা বুঝে নিচ্ছে। ইসিজির গ্রাফ দেখে হার্টের ভোল্টেজ বুঝে নিচ্ছে, এক্স-রে দেখে ভিতরের হাড় দেখে নিচ্ছে, সাউন্ড দিয়ে দেখছে গর্ভের সন্তান, ডপলার দিয়ে দেখছে হার্টের ছিদ্র। মানে বিজ্ঞানের কারণে মানুষের ইন্দ্রিয় ক্ষমতা আল্লাহ বাড়িয়ে দিয়েছেন বহুগুণে। ফলে যা আগে বোঝা কঠিন অসম্ভব ছিল, তা আজ চোখে দেখা যায়। আসলে তো কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, যে এখানে বিজ্ঞানের বিষয় স্পষ্ট থাকবে। এখানেই কুরআনের মু'জিযা যে, কুরআন সে যুগের কবিদের কাছেও মু'জিযা ছিল, যদিও কুরআন কোনো কবিতার বই না। এ যুগেও বিজ্ঞানীদের কাছে কুরআন মু'জিযা, যদিও এটা বিজ্ঞানের বই না। কুরআনের উদ্দেশ্য আমাদের সতর্ক করা, কিন্তু আমাদের সতর্ককারী বিষয়ের মধ্যেই এমন মু'জিযা আল্লাহ রেখে দিয়েছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের excellence-কে চ্যালেঞ্জ করবে, তাদের expert-দেরকে হয়রান করবে। বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের সত্যতার সম্পর্ক নেই, এসব expert-রা সবাই যোগসাজশ করে কুরআনকে 'ভুল' বললেও কুরআন ভুল হয়ে যাবে না। কিন্তু এটাও আল্লাহই করবেন, যুগে যুগে কিছু এক্সপার্টদেরকে দিয়ে তাঁর কালামের মু'জিযা প্রকাশ করে দেবেন। কিয়ামত তক করবেন। বিজ্ঞান কুরআনকে প্রমাণ করে না, জাস্ট অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় ক্ষমতা দিয়ে কুরআনের মু'জিযা প্রকাশ করে। মনে রাখার বিষয় এতটুকুই-বিজ্ঞানকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, তাই এটা ঈমানের ভিত্তি নয়। আমরা বিশ্বাস করি গায়েবে, বিজ্ঞানে না। তবে কুরআনের মু'জিযা প্রকাশ মুমিনকে তৃপ্তি দেয়, এই তৃপ্তি আল্লাহরই নিয়ামত, যেমনটি তিনি পিতা ইবরাহিম (আ.)-কে দিয়েছিলেন।
ড. আইশা উটজ হামদান আমেরিকান বংশোদ্ভূত নওমুসলিম। পেশায় ছিলেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন একাডেমিক টপিককে তিনি ইসলামের নজরে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। সেক্যুলার বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিবাদ যে মানবসত্তা ও মনের ব্যখ্যায় এবং মনোচিকিৎসার জন্য যথেষ্ট নয়, তা একাডেমিকভাবে তুলে ধরেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসুরক্ষা, প্রশান্তিময় জীবন এবং যেকোনো মানসিক ট্রমা-য় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার যে একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে, এবং সেটা সেক্যুলার বিজ্ঞানও এখন এসে মেনে নিচ্ছে, কীভাবে সাইকোথেরাপিতে ধর্মীয় আচারের উপর জোর দেয়া হচ্ছে-সে বিষয়গুলো চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। তবে প্রচলিত বিজ্ঞানের সাথে তুলনা এই বইয়ের মূল উপজীব্যও নয়, মূল সার্থকতাও নয়। লেখিকার মূল সার্থকতা হলো: তিনি এখানে মনোবিজ্ঞানের ইসলামি বয়ান হাজির করতে পেরেছেন অত্যন্ত সার্থকভাবে।
একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের স্বতন্ত্র ভিউপয়েন্ট রয়েছে সব ব্যাপারেই। আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় মানুষকে কেবল সামাজিক জীব মনে করা হয়। ইসলাম মানুষকে বলছে আধ্যাত্মিক জীব। যার আধ্যাত্বা শক্তি যত মজবুত, সে তত ভালো মানুষ। তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবক্ষেত্রে উৎকর্ষ লাভ করবে। ইসলাম মানবতা, ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতা প্রভৃতির সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাখ্যা দেয়। এবং এমন একটা জীবন কাঠামোর কথা বলে, যা মানবসত্তার 'ভাল থাকা'র নিশ্চয়তা দেয়। ধর্মীয় আচার, অন্তরের চর্চা, বিশ্বাস, আন্তঃসম্পর্ক, আত্মনিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সমন্বয়ে ইসলাম এমন এক জীবনের কথা বলে যা অর্থপূর্ণ, স্বচ্ছন্দ, এবং মানবসত্তার মনোদৈহিক সহজাত স্বভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অবশ্যই মানুষের মন, মনের নানান অংশ, মনের নানান মিথষ্ক্রিয়া, ভাঙা মন, মন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয় ইসলাম বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে, কেননা পরকালের কনসেপ্টটাই মনের সাথে জড়িত। ইসলাম এমন একটা ব্যবস্থা যা পরকালের সাথে সাথে ইহকালীন কল্যাণের উপরেও জোর দেয়, এবং ইহকালের সাথে পরকালের সম্পর্ক নির্দেশ করে। এভাবে মানুষের সহজাত স্বভাবের অনুকূল এক জীবনাচার ইসলাম নিরূপণ করে দেয়, যা নিশ্চিত করে মানবসত্তার 'ভালো থাকা'। মন, মনোবিজ্ঞান ও মনোচিকিৎসার ব্যাপারে ইসলামের নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিত উঠে এসেছে একাডেমিক ধাঁচে।
তবে যারা আমরা একাডেমিক নই, আমাদের প্রত্যেকের বইটি পড়া দরকার। এই জন্য যে, নিজের মনকে চেনা আর সবকিছু চেনার চেয়ে বেশি দাবি রাখে। পুরো একটা জীবন কেটে যায় নিজেকে জানা হয় না। সবার জন্য সময় বের করা যায়, নিজের জন্য সময় বের হয় না। আমার মন কী, কী চায়, মনের কী কী জিনিস প্রশ্রয় দেব, কী কী নিয়ন্ত্রণ করব, ভাঙা মন কীভাবে সামলাব, কেন 'আমি ভালো নেই' অনুভূতি হয়, উত্থানপতনে মনকে কীভাবে সামলাতে হয়—এগুলো তো জীবনের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা হওয়া উচিত। একেকটা পাবলিক পরীক্ষার পর আত্মহত্যার হিড়িক পড়ে যাচ্ছে, কী শিক্ষা দিচ্ছি আমরা আমাদের বাচ্চাদের? বাবা-মা হিসেবে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ। এজন্য প্রত্যেকের বইটা পড়া উচিত নিজের মনের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য। আমার মনের স্বভাব জানলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা আমার জন্য সহজ। মনের হাতে নিজের নাটাই তুলে না দিয়ে আমার হাতে আমার মনের নাটাই থাকবে, এটাই কাম্য।
'মানসাঙ্ক' লেখার সময় মনোবিজ্ঞানের অনার্স লেভেলের বেশকিছু বই পড়তে হয়েছিল। মেডিক্যালে এমবিবিএস কোর্সে সাইকিয়াট্রিও কিছু পড়তে হয় আমাদের। সেই বিদ্যাটুকু কাজে লেগে গেল এখানে। সকলকে পড়ার আহ্বান। চর্চা করার আহ্বান। ইহকাল ও পরকালে ভালো থাকাই হোক আমাদের জীবনদর্শন।
ডা. শামসুল আরেফীন চিকিৎসক, লেখক
📄 মুখবন্ধ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, তাঁর কাছে হিদায়াত চাই। আল্লাহর কাছে আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করি আমাদের নফসের অনিষ্ট হতে এবং মন্দ আমলের অনিষ্ট হতে। যাকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ব্যতীত ইবাদাতের যোগ্য কেউ নেই, তিনি শরিক বিহীন। আমি আরো সাক্ষ্য প্রদান করছি যে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিভাগে আন্ডারগ্রাজুয়েট ও পরবর্তীতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও আমি কোনো সন্তোষজনক সাইকোলজিক্যাল থিওরি খুঁজে পাইনি যা বিস্তারিত ও নিখুঁতভাবে মানব মনের প্রকৃতি ব্যাখা করতে পেরেছে। যদিও বিভিন্ন সেক্যুলার সাইকোলজিস্টদের প্রায় ২৫০ এর অধিক তত্ত্ব আমি অধ্যয়ন করেছি, এর একটিও আমাকে মানব মনের সঠিক ব্যাখা প্রদান করতে পারেনি। কিছু থিওরিকে অন্য থিওরির থেকে অধিক আকর্ষণীয় মনে হলেও, সব সময় মনে হতো কী যেন নেই, কী যেন নেই। খণ্ড খণ্ড টুকরোগুলো মিলে একত্রে যেন কোনো ছবি তৈরি করতে পারেনি।
ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনের পর আমি আলোচ্য বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য খুঁজতে শুরু করলাম। (যদিও পিএইচডি অর্জনের বহু আগেই আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি)। শুরুতে এই অনুসন্ধান কিছুটা কঠিন ছিল। কেননা, বিভিন্ন ভ্রান্ত সুফিবাদী মতামত ও দার্শনিক চিন্তাধারা থেকে বিশুদ্ধ ইসলামি সাইকোলজিকে পৃথক করতে হয়েছে। অবশেষে আমি আল্লাহর অনুগ্রহে ইংরেজি ভাষাতে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিশুদ্ধ উৎসের সন্ধান পাই। আমি সেগুলো পড়তে শুরু করি এবং যতই পড়েছি ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে সত্যটা। আমি অবাক হয়ে দেখেছি ইসলামি পদ্ধতি কত জটিলতামুক্ত! সবশেষে আমি তৃপ্ত হয়েছি। আমি যে তত্ত্ব অনুসন্ধান করছিলাম তা মিলেছে ইসলামের মধ্যেই। ইসলাম সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ চিত্রের মাধ্যমে মানুষের জীবনের সোজাসাপ্টা ব্যাখা প্রদান করে। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য, মানুষের আধ্যাত্বিক সত্তার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব কিংবা জীবনে কোনো বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া উচিত ইত্যাদি সবকিছু ইসলামে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিভাবে আমরা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারি, কিভাবে শয়তান থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারি এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে পারি।
ইত্যাদি ধাপগুলোর আলোচনা ইসলামে রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের পক্ষেই এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব। এই পথে দৃঢ়পদ থাকা সহজ না হতে পারে, তবে লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব নিশ্চিতভাবেই।
যখন আমি জানলাম যে আমরা সবকিছুতে নিছক আমাদের জেনেটিক গঠনের ভিকটিম নই কিংবা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বা বর্তমান পরিবেশ দ্বারা সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নই, তখন আমার মনে শান্তির সুবাতাস বয়ে গেল। কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। সেই স্বাধীন সিদ্ধান্তের অর্থ আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং রব আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে আত্মসমর্পণ করা। এবং এই আত্মসমর্পণ হতে হবে তাঁরই দেখানো পথনির্দেশ মোতাবেক। এই পথই হলো একমাত্র পথ, যা দুনিয়া ও আখিরাতে সত্যিকারের সুখ-শান্তি দিতে পারে। আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা যেন এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করি। যা আমাদের নিরাপত্তা দেয় জীবনের নানাবিধ চড়াই-উতরাই, পরীক্ষা, বাধা-বিপত্তি, মানসিক চাপ এবং প্রবৃত্তির হীন কামনাবাসনা থেকে।
আমি মূলতঃ আগ্রহ পেয়েছি এতদিন নানান সেক্যুলার তত্ত্ব প্রচারকারী পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা থেকে। তাদের করা রিসার্চগুলোই এখন মানবজীবনে আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করছে। ধার্মিক ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিক সুস্বাস্থ্যের উপর ধর্মের যে গভীর প্রভাব রয়েছে, আধুনিক গবেষণার ইশারা এখন সেদিকেই। এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যতই আগ্রহী হচ্ছেন, ততই আরো বেশি প্রমাণ মিলছে। বিভিন্ন আবেগিক, মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা নিরাময় ও প্রতিরোধে ধার্মিকতা বা আধ্যাত্মিকতা অত্যন্ত উপকারী হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে। এসকল গবেষণা বাস্তবিকই নির্দেশ করছে ইসলামের সত্যতা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ (কুরআন) সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?" (সূরাহ ফুসসিলাত ৪১ : ৫৩)।[১]
টিকাঃ
[১] কুরআনের আয়াতসমূহের অনুবাদ গ্রহণ করা হয়েছে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত 'আকুরআনুল করীম-' থেকে।
📄 সারাংশ ও উপসংহার
মানবপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খুবই সীমিত জ্ঞান দান করেছেন। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে যতটুকু জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট। বস্তুত আমাদেরকে যথাযথ ও বাহুল্যবর্জিত জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের জন্য।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এমন এক সৃষ্টি যাদের দেহ, মন ও আবেগ রয়েছে। আরও রয়েছে একটি আত্মা যা এগুলোকে প্রভাবিত করে ও পরিচালিত করে। নিজেকে ও নিজের আত্মাকে জানার একমাত্র সঠিক উপায় হচ্ছে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে জানা। একমাত্র আল্লাহকে জানার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের আত্মা সম্পর্কে জানতে পারে। এটিই কুরআন ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত মানব মনস্তত্বের মৌলিক ভিত্তি।
সমকালীন মনোবিজ্ঞানের অসংখ্য তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে কেবল জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে পথভ্রষ্ট ও বিচ্যুত করা হয়। মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আন্তরিকভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা, জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গ এই প্রধান লক্ষ্যের বিপরীতে একেবারেই গৌণ।
জার্নালে প্রকাশিত গাদা গাদা আর্টিকেল, বই পুস্তকের অসংখ্য অধ্যায়, নানাবিধ বিশদ তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত কনফারেন্সের কার্যবিবরণী কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামতসমূহ হাশরের দিনে তাদের কোনো কাজেই আসবে না, যদি সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নাজিলকৃত মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করা হয়। বাস্তবে তাদের গবেষণাগুলোও ইসলামের সত্যতার দিকেই ইঙ্গিত করে, কিন্তু তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। আল্লাহ বলেছেন,
• 'তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলা কে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আত্ন বিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য।' (সূরাহ হাশর, ৫৯:১৯)
ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি, সুখ-শান্তি ও 'ভালো থাকা'র পরিপূর্ণতা দানের জন্য দ্বীন ইসলাম বিস্তারিত এবং পদ্ধতিগত সহযোগিতা প্রস্তাব করে। এই পরিপূর্ণতা অর্জন করা যাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত উপায়ে তাঁর ইবাদাতের মাধ্যমে। কার্যতঃ ইসলাম নিজেই সকল অসুস্থতার সমাধান, হোক সেটা আত্মিক, আধ্যাত্বিক, মানসিক, আবেগিক, শারীরিক কিংবা সামাজিক। মানুষের এখন প্রয়োজন কেবল আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে চলা।
তিনি বলেছেন,
• 'আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে। অতঃপর তাকে অধঃপতিত করেছি নীচ থেকে আরও নীচে। কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে অশেষ পুরস্কার।' (সূরাহ তীন, ৯৫:৪-৬)
এই আয়াতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ হতে মানুষের মনস্তত্ত্বের সারাংশ ফুটে উঠেছে। চাইলে আমরা বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে উন্নত করতে পারি, অথবা নির্দেশনা অস্বীকারের মাধ্যমে নিজেদের মর্যাদাহানি ঘটাতে পারি।
প্রথম ক্ষেত্রে আমরা পাব আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হবে শাস্তি ও আল্লাহর ক্রোধ। এটাই মানব জীবনের সারকথা। শেষ কথাটি মনে থাকবে তো? যে পথ আমরা বেছে নেব, তা কেবল দুনিয়াতে আমাদের ভালো থাকা মন্দ থাকাকেই নির্ধারণ করবে না শুধু; বরং ঠিক করে দেবে আমাদের অনন্তকালের চূড়ান্ত ঠিকানাও!