📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 আত্মহত্যার আন্তর্জাতিক চিত্র

📄 আত্মহত্যার আন্তর্জাতিক চিত্র


যুগে যুগে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করে আসছে। কেন মানুষ আত্মহত্যা করে? এর পেছনে অনুঘটকগুলো কী? এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো জানতে চেয়েছেন তারা। পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছেন-আত্মহত্যা কারা করে? কেন করে এবং কখন করে? তাদের বয়স ও শারীরিক গঠনের সাথে এর সম্পর্কটাই-বা কী? ফ্রান্সের প্রতি এক লাখ সামরিক বাহিনীতে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, তরুণ ও যুবক সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। নিচের ছকে তা তুলে ধরা হলো-

বছর পদাতিক সৈন্য নৌবাহিনী সাধারণ লোকদের তুলনামূলক পরিসংখ্যান
১৮৯০ ৫৫ ২৭
১৯১৩ ৪৩ ৪৬ ২৩
১৯২৪ ১১০ ১৪১ ২১
১৯৩৪ ৩৮ ৩৯ ২৯
মোট ২৪৬ ১১৬ ১০০

জরিপটি থেকে স্পষ্ট, সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় দেশটির সেনাবাহিনীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এসব পরিসংখ্যান দেখলে অবাক হতে হয়। চারদিকে যখন যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মানুষের অবস্থা মারাত্মক বিপন্ন, তখন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে খুবই কম। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের দিনগুলোতে আত্মহত্যার কারণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সে সময় আত্মহত্যার ঘটনা নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যে যুদ্ধের সময়ে সেটা কমে হয়েছে ১৯%। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পরিসংখ্যান নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

দেশ শতকরা হার
ফ্রান্স ৩৯%
আমেরিকা ৩৬%
ইংল্যান্ড ২৫%
সুইডেন ৩০%
সুইজারল্যান্ড ৪৬%

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড সেই যুদ্ধে শামিল ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে দিলো অথবা জীবনের অনিশ্চিত অবস্থার মুখোমুখি হয়ে মানুষ টের পেল, তার অস্তিত্বের গুরুত্ব। ফলে মানুষ আত্মহত্যা ভুলে হয়ে উঠল জীবনধর্মী।

ইহুদি বংশ নিশ্চিহ্ন করার সেই কঠিন সময়ে 'ক্ল্যাস ম্যানান' নামক এক ইহুদি প্রথমে জার্মানিতে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে আবার পালিয়ে যায় ফ্রান্সে। ফ্রান্সের পরাজয়ের পরে প্রাণ নিয়ে কোনোমতে আমেরিকা পৌছে। কিন্তু সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত হয়ে সেখানে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার পরই সে আত্মহত্যা করে বসে। চিন্তা করুন, একজন ব্যক্তি দীর্ঘ ১২ বছর লাগাতার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করেছে; কিন্তু যখনই জীবনের নিরাপত্তা ফিরে পেল, ঠিক তখনই নিজেকে বধ করল সে।

অনুরূপ ঘটেছিল ইহুদি দখলকৃত ফিলিস্তিনে। ইহুদিরা জবরদখল করে আবাসন গড়তে শুরু করলে আরবরা এই তুফানের বিরুদ্ধে গড়ে তুলল দুর্বার প্রতিরোধ। ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতির নেতৃত্বে শুরু হলো সশস্ত্র আন্দোলন। বিপরীত দিকে ইহুদিদের রক্ষা করার চেষ্টা করতে লাগল বিটিশ সৈন্যরা। সেই যুদ্ধে 'ইয়াফা' অঞ্চলের বসবাসকারীদের মধ্যে পুরো এক বছর সময়কালে আত্মহত্যার একটা ঘটনাও ঘটেনি। জার্মানিতে যখন তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখনও জনবসতিতে আত্মহত্যার পরিমাণ কমে গিয়েছিল ১০%। ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের সব রাষ্ট্রে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান একত্র করে একটা ক্রোড়পত্র হিসেবে প্রকাশ করেছিল। নিচের পরিসংখ্যানে প্রতিটি দেশের প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মধ্যে পর্যালোচনা করে আত্মহত্যাকারীদের একটা সংখ্যা তুলে ধরা হলো-

| দেশ | পুরুষ | মহিলা | পুরুষ | মহিলা |
| --- | --- | --- | --- | --- |
| | ১৯৫২-৫৪ খ্রি. | ১৯৫২-৫৪ খ্রি. | ১৯৬১-৬৩ খ্রি. | ১৯৬১-৬৩ খ্রি. |
| অস্ট্রেলিয়া | ২১০৫ | ৭০৭ | ২৭০৫ | ১২০২ |
| অস্ট্রিয়া | ৪৩০৫ | ১৯০২ | ৪২০৫ | ১৬০৯ |
| যুগোস্লাভিয়া | -- | -- | ৪৫০৯ | ১৬০৫ |
| ডেনমার্ক | ৪৩০৬ | ২৫০৬ | ৩২০৪ | ১৬০২ |
| ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম | ১৮০৫ | ৯০৫ | ১৮০৩ | ১২০২ |
| ফিনল্যান্ড | ৪৩০৬ | ৯০৯ | ৪৭০৭ | ১২০৩ |
| ফ্রান্স | ৩২০৬ | ৯০৪ | ৩২০৩ | ১৫০৫ |
| জার্মানি | ৩৩০৭ | ১৫০১ | ৩৩০৩ | ১৬০২ |
| হাঙ্গেরি | -- | -- | ৪৮০৯ | ২৫০৩ |
| ইজরাইল | -- | -- | ১১০৯ | ৮০২ |
| ইতালি | ১১০৯ | ৪০৮ | ১৫০২ | ৪০২ |
| জাপান | ৩৮০৮ | ২৪০৫ | ২৯০৫ | ২৫০৬ |
| নরওয়ে | ১৫০১ | ৪০৬ | ১৫০৭ | ৪০৫ |
| স্কটল্যান্ড | ১৫০৭ | ৪০৬ | ১৫০২ | ৮০১ |
| সুইডেন | ৩৫০২ | ১৫০৭ | ৩২০৫ | ১১০৬ |
| সুইজারল্যান্ড | ৪৪০৯ | ১৪০৩ | ৩৩০৯ | ১৩০২ |
| আমেরিকা | ২২০৮ | ৫০৯ | ২৪০৫ | ৭০৭ |

পরিসংখ্যানটির লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে কেবল ১৭টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এমন কোনো দেশের কথা উল্লেখ করা হয়নি, যাকে মুসলিম দেশ বলা চলে। এসব দেশে জনসংখ্যার ৫০%-এর বেশি অমুসলিম। আর মুসলমানদের এমনও দেশ আছে, যেখানে ইসলাম আছে শুধু নামকাওয়াস্তে। অথবা যারা নিজেদের সেক্যুলার বলে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কিন্তু সেসব দেশেও উল্লেখযোগ্য কোনো আত্মহত্যার ঘটনা নেই। আর ইজরাইলের আত্মহত্যার যে পরিসংখ্যান দেওয়া হলো: তা শুধু সেসব অঞ্চলের, যেখানে মুসলমানদের জনবসতি নেই। অথচ ইজরাইলের দখলকৃত অঞ্চলের মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাস, রামাল্লা ও গাজা এলাকায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক। কিন্তু সেখানকার লোকেরা প্রায় কেউ-ই আত্মহত্যা করে না।

এই পরিসংখ্যানে পাকিস্তান, ইরান, সৌদি আরব ও আফগানিস্তানের নামও নেই। আত্মহত্যা পাকিস্তানেও হয়; কিন্তু তার হার এত কম যে, ১৯৮৯ সালে লাহোর ও এর আশেপাশের অঞ্চলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে মাত্র ৪৭টি। আর এসব ঘটনার প্রত্যেকটি যেহেতু আশ্চর্যজনক ও চাঞ্চল্যকর, তাই সবগুলো ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

সেসব ঘটনা গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসবে-এর মধ্যে অন্তত ২০টি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে হত্যা; কিন্তু মানুষ সেগুলোকে নিছক আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছে। আমি এমন কিছু ঘটনার কথা জানি, যেগুলো সম্পর্কে সবাই জানে-মৃত ব্যক্তি নিজেই গায়ে তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, পরিকল্পিতভাবে তেল ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে তার গায়ে। এমনকী এমন ঘটনাও আছে, এক মহিলার গায়ে শুধু তেল ঢালেনি, গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয়েছে শরীরে। তারপর আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কী ভয়ংকর কথা!

পরিসংখ্যানভিত্তিক এই তুলনামূলক পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: যেসব দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীদের সংখ্যা অক্ষশক্তির রাষ্ট্রগুলোর লোকদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। তবে জাপানের অবস্থা ব্যতিক্রম। কারণ, জাপানে আত্মহত্যা একটি সম্মানজনক কর্ম। অবশ্য, এই সম্মান শুধু উচ্চস্তরের লোকদের জন্যই নির্দিষ্ট। পরাজিত হওয়ার পর যদি কোনো জেনারেল সেখানে আত্মহত্যা করে, তাহলে মনে করা হয়-সে নিজের মান-সম্মানকে রক্ষা করল। তবে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর কারণে ৫০০ লোক মরে যেতে চাইলে অথবা লজ্জাজনক সন্ধিচক্তির পরে কেউ আগুনে আত্মহুতি দিলে সম্মান বাড়ানোর এমন কর্ম প্রয়ো ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিসে গুপ্তহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় নাজি বাহিনী একটা গ্রাম ঘেরাও করে। তখন গ্রামের লোকেরা নাজি বাহিনীর হাতে না মরার জন্য গ্রামের এক জায়গায় একত্র হয়ে অনেক মদ পান করল। তারপর অশ্লীল কাজে লিপ্ত হলো সবাই। সবশেষে আগুনে আত্মহুতি দিয়ে পুড়ে মারা গেল সদলবলে। ১২২০ খ্রিষ্টাব্দে চেঙ্গিস খান বোখারা দখল করে গণহত্যা শুরু করে, লাঞ্ছিত করতে থাকে নারীদের। চারদিকে হত্যা, লুটতরাজ আর ধর্ষণের এক বিভীষিকাময় অবস্থা। তখন সামাজিক সম্মান হারানোর লজ্জায় শহরপ্রধানদের মধ্যে রুকুন উদ্দিন ইমামজাদাহ ও সদরুদ্দিন খান ছাড়া উচ্চস্তরের সবাই আত্মহত্যা করে। আর যুদ্ধোত্তর এ ধরনের ভয়ংকর ও বর্বরতম পরিস্থিতি সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

'রাজা বাদশাহরা কোনো জনপদে প্রবেশ করলে, তাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। অধিকন্তু অপদস্থ করে সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকে। তারাও এরূপই করবে।' সূরা নামল: ৩৪

ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত আছে- 'তখন কোনো এক মহিলা আটা পেষণের চাক্কির একটা অংশ রাজার মাথায় নিক্ষেপ করল। ফলে মাথার খুলি ভেঙে গেল তার। তখন রাজার অস্ত্রবাহক ও দেহরক্ষী ছিল এক যুবক। রাজা তাকে ডেকে বললেন- "তলোয়ার দিয়ে আমার মাথা দ্বিখণ্ডিত করে দাও; যেন মানুষ বলতে না পারে, কোনো মহিলা আমাকে হত্যা করেছে।” অতঃপর যুবক তরবারি দিয়ে তার মাথা পৃথক করে দিলো।'²¹

একই অবস্থা ছিল সাউল বাদশাহ ও অন্যান্য রাজা-বাদশাহদের। প্রতিপক্ষ একই দিনে বাদশাহর তিন ছেলেকে হত্যা করে ফেললে তিনি সাহস হারিয়ে ফেলেন। রাজা তার অস্ত্রবাহককে বলল-'তোমার অস্ত্র দ্বারা আমাকে হত্যা করো। কারণ, ওই অসভ্যরা এসে লাঞ্ছিত ও হত্যা করবে আমায়।' কিন্তু অস্ত্রবাহক তা করতে চাইল না; বরং ভয় পেয়ে ইতস্তত করতে লাগল সে। তখন রাজা সাউল অস্ত্রবাহকের কাছ থেকে তলোয়ার টেনে নিল। একপর্যায়ে তলোয়ারের ওপর উপুড় হয়ে হত্যা করল নিজেকে। এটা দেখে তার অস্ত্রবাহকও নিজের তলোয়ারের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে এবং একইভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিল।'²²

এই দুই ক্ষেত্রে আঘাতের কষ্ট ও পরাজয়ের অনুভূতি বড়ো বড়ো দাপুটে শাসককেও অক্ষম করে দিয়েছে। ফলে বিপদ মোকাবিলার পরিবর্তে তারা বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার চোরাগলি। সেই সব ভীরু লোকদের সাহস দেওয়ার জন্য, মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য আত্মশক্তির একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। কুরআনুল কারিমে তিনি বলেন-

'সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় জয়ী হয়েছে আল্লাহর হুকুমে।' সূরা বাকারা : ২৪৯

এই আয়াতের যথার্থতার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ হলো স্বয়ং আল্লাহর নবি মুহাম্মাদ। শত্রুদের কষ্ট ও নির্যাতনের জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে রাসূল কোনো ধরনের আসবাবপত্রবিহীন একেবারে খালি হাতে মক্কা থেকে মদিনায় ফেরেন; কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সাহস হারিয়ে ফেলেননি। অবশেষে এমন একদিন এলো, যখন তিনি বিজয়ীর বেশে সেই নগরে প্রবেশ করেন। অথচ সেই নির্যাতনকারীদের থেকে অত্যাচারের বদলা নেওয়ার পরিবর্তে ঘোষণা করেন-'আজ তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিশোধ নেওয়া হবে না।'

রাসূল-এর সারাজীবনের কর্মসূচি হলো-ভালোবাসা, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ়করণ ও মানুষের মাঝে ক্ষমার সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেওয়া। মানুষকে সুবাসিত সুন্দর জীবন উপহার দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। যারা হত্যা ও লুটতরাজ করে মানুষকে কষ্ট দেয়, মারামারি-রাহাজানি আর ভয়াবহ জুলুমে জনজীবনকে করে তোলে বিপন্ন, তাদের বিনাশ করার জন্যই এই ধরাধামে রাসূল-এর আগমন। তাঁর ওপর কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে জয়-পরাজয়ের কথা না ভেবে তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে নেমে পড়েন। শত্রুদের সংখ্যাধিক্যে তিনি কখনো বিচলিত হননি। ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত রাজা আবি মালেক ও শাহ সাউলের মতো অবস্থার মুখোমুখি হয়েও নবিজির সিদ্ধান্ত ছিল সাহসিকতাপূর্ণ ও বিরোচিত।

এক মুসলমান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এক যুদ্ধে লড়াই করছিলেন। তাঁর সাহসিকতা দেখে বাহবা দিচ্ছিল লোকেরা। হঠাৎ গুরুতর আহত হয়ে ভীষণভাবে ঘাবড়ে যান তিনি। তারপর আঘাতের প্রচণ্ড যন্ত্রণা ও ভয়ে নিজের পেটে তরবারি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেন। ওই ব্যক্তির কাছে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার, আত্মহত্যা করার যুক্তি ছিল। অথচ রাসূল সেই মৃত্যুকেও হারাম মৃত্যু বলে ঘোষণা করেছেন। কারণ, জীবনের মতো অত্যন্ত মূল্যবান জিনিসকে নষ্ট করার কোনো অধিকার আমাদের নেই। এর বিপরীতে আরেকটি ঘটনা দেখুন-আবু জাহেলের হত্যাকারী এক কিশোরের হাতের অর্ধেক কেটে গেছে। একেবারে কেটে পড়ে যায়নি; ঝুলে আছে খানিকটা। এই ঝুলে থাকা হাত নিয়ে যুদ্ধ করতে কষ্ট হচ্ছিল তার। এজন্য হাতটি পায়ের নিচে চেপে এক কোপে কেটে ফেলে সে। তারপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধের ময়দানে।

জীবন ও মৃত্যুর চাবি একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার হাতে। কে জানে কখন কার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, জীবনের পথযাত্রা সাঙ্গ করে পাড়ি জমাতে হয় পরপারে! আবার এমনও তো হতে পারে-কারও হৃৎকম্পন বন্ধ হয়ে গেছে, চিকিৎসক আশা ছেড়ে দিয়েছেন, এই বুঝি প্রাণ যায়-এমন পরিস্থিতি থেকে আল্লাহ তায়ালা পুনরায় তাকে সুস্থ করে দিলেন। মৃত্যুর বিছানা থেকে উঠে আবার সুন্দর জীবনযাপন করেতে লাগল সে। আল্লাহর রহমত তো অফুরান, তাঁর অসাধ্য কী আছে আর! সেই পরম করুণাময় প্রভুর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ে পড়ার কোনো মানেই হয় না।

আত্মহত্যার বিরুদ্ধে ইসলামি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। ইসলামের ইতিহাসে দেখুন-যখন বিলাল (রা.)-কে প্রচণ্ড গরমে তপ্ত বালিতে শুইয়ে রাখা হতো, শরীরের ওপর চালানো হতো নির্যাতনের স্টিমরোলার, তখনও নিজের অবস্থানের ওপর অনড় ও অটল থাকতেন তিনি। কোনো জুলুমই ঈমানের দৃঢ় অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি তাঁকে। স্মরণ করুন খুবাইব (রা.)-এর কথা। পাশবিক নির্যাতনের পরে যখন তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছিল, তখনও তিনি নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাননি। সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন সে সময়ের সকল সংকট। ইসলামের শিক্ষাই এটি, সিনার ভেতর যেকোনো অবস্থা মোকাবিলার হিম্মত রাখা। হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া কোনো মুসলমানদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে বিজয়ী সৈন্যরা বিজিত রাষ্ট্রের ওপর ত্রাস ও বর্বরতার রাজত্ব কায়েম করেছে। মানব ইতিহাসের বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; জার্মানদের নিঃশেষ করে দেওয়া সভ্যতার ধ্বজাধারীদের দেখুন। চেঙ্গিস ও হালাকু খানদের বর্বরতার খতিয়ান খুঁজে দেখুন। অসহায় নরনারীর ওপর কী নারকীয় নির্যাতনটাই না তারা চালিয়েছে! অসহায় মা-বোনদের ব্যভিচারে রাজি করানোর জন্য তারা হত্যা করত ছোটো ছোটো নিষ্পাপ শিশুদের। শিশু হত্যার এই বীভৎস উৎসব জার্মানিতে যেমন হয়েছিল, তেমনি সংঘটিত হয়েছিল জাপানেও। কেউ কারও থেকে এক কদম পিছিয়ে ছিল না।

দখলকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্যরা অসহায় জনগণের সাথে যে আচরণ করেছে, তা অতীতের দখলদারদের চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না; বরং আরও বেশি নিষ্ঠুর ও বর্বর ছিল সেই তাণ্ডবলীলা। সেখানে তো সংঘটিত হয়েছিল গণহত্যা। নামকাওয়াস্তে এক আদালত কায়েম করে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যাদের মনে সামান্য সংশয় ছিল, তারাও শত্রুদের হাতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অপমান থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করে বসে। যেমন: ফিল্ড মার্শাল হরিমন গৌরাঙ্গ ফাঁসির রশিতে ঝুলে অপমানিত হওয়ার ভয়ে বিষপান করে নিশ্চিত করেন নিজের মৃত্যু।

চূড়ান্ত হতাশায় জীবন বিষিয়ে উঠলেই মানুষ নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবে। প্রিয় জীবনটাই তার কাছে বড়ো অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন। মনে হয়, এই যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। আর বিপন্ন দশা ও অসহায়ত্বের কাছে হার মেনে এরূপ আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়াটা আজকের সমস্যা নয়; এটা শত-সহস্রাব্দ ধরে চলে আসা ব্যাপার। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় এটাকে ভালো চোখে দেখা হয়। যেমন: কোনো হিন্দু মহিলা বিধবা হয়ে জীবনযাপন না করে স্বামীর সাথে চিতায় সহমরণ করলে, তাকে বর্ণনা করা হয় প্রশংসিত শব্দমালায়। আবার জাপানি কোনো জেনারেল যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সামুরাই তরবারিটা নিজের পেটে ঢুকিয়ে দিলে, তার মান-সম্মান পূর্বাপেক্ষা বেড়ে যায়। এই লোকেরা বিপদে পড়লে অথবা লড়াই করার সময় একা হয়ে পড়লে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবে।

এর বিপরীতে ইসলামের শিক্ষা দেখুন-ইসলামি শিক্ষা কখনো নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলে না। উৎসাহ দেওয়া তো অনেক দূরের কথা, এমন জঘন্য কাজ একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইসলাম। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)- এর ঘটনাটি লক্ষ করুন-

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কা অবরোধ ফেলল। তাঁকে একা ফেলে চলে গেল সঙ্গী-সাথিদের সবাই। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কেউ-ই অবশিষ্ট থাকল না তাঁর সাথে। চূড়ান্ত যুদ্ধে যাওয়ার আগে তখন শেষবারের মতো মায়ের সাক্ষাতে গেলেন তিনি। তাঁর মা হলেন আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)। পুত্রের সাথে গলা মেলানোর সময় তিনি অনুভব করলেন, জামার নিচে বর্ম পরিধান করেছে তাঁর ছেলে। মা বললেন- 'আবদুল্লাহ, এটা কী? শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যাচ্ছ, অথচ মরতে এত ভয় পাচ্ছ? তুমি সত্যের ওপর থাকলে সঙ্গী-সাথিদের সংখ্যার কোনো গুরুত্ব নেই।' আবদুল্লাহ (রা.) উত্তর দিলো-'আমি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি না। তবে এখন আমি একা। তাই আমার ভয় হচ্ছে, শত্রুরা আমাকে একা পেয়ে আমার লাশ ছিন্নভিন্ন করে বিকৃত করে ফেলে কি না!' মা বললেন- 'আবদুল্লাহ, ছাগলকে জবাই করা হলে সেটা দিয়ে হয়তো শুধু কাবাব বানানো হবে অথবা রান্না করা হবে। আর তাতে ছাগলের কিচুই যায় আসে না।'

আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে চলে গেলেন। পুরোপুরি একা, সঙ্গে কেউ নেই। লড়াই করতে করতে শহিদ হলেন তিনি। তারপর তাঁকে কাবা ঘরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি না এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, আর না আত্মসমর্পণ করলেন শত্রুদের সামনে। জালিমের হাতে মৃত্যুর ভয়ে আত্মহত্যার চিন্তাও তাঁর মাথায় আসেনি।

ইসলামের শিক্ষা হলো-বিজিত অঞ্চলের কোনো মুসলিম নারীর ঘরে শত্রু ঢুকে তাঁর সম্মানহানির চেষ্টা করলেও সে ফাঁসিতে ঝুলে পরবে না। কূপে ঝাঁপ দিয়েও আত্মহত্যা করবে না; বরং ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে শত্রুর ওপর। কারণ, অস্তিত্বের প্রশ্নে কিংবা ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে যদি মরতেই হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত শত্রুকে আঘাত করতে করতে শহিদ হওয়াই শ্রেয়। এই মৃত্যু গৌরবের ও আত্মমর্যাদার। মুসলিমমাত্রই আমৃত্যু শত্রুর কাছে মাথানত না করার মধ্য দিয়ে বার্তা দিতে চায়, তারা এক আল্লাহ ব্যতীত কাউকে পরোয়া করে না। রবের দেওয়া মূল্যবান জীবনকে তারা গুরুত্ব দেয় সর্বাগ্রে। এজন্য মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও তারা প্রাণপণ লড়ে যায়।

একসময় ইউরোপে একটা নিয়ম ছিল। কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি নিজেকে বারবার নিরপরাধ দাবি করলে সে আদালতে আবেদন করতে পারত যে, সে আমৃত্যু লড়াই করবে। আবেদনের পর অপরাধীর সাথে মল্লযুদ্ধ করার জন্য একজনকে নির্ধারণ করে দিত আদালত। CANNON LAW মতে, এই লড়াই শেষ হবে মৃত্যুর মাধ্যমে। লড়াইয়ে যদি অপরাধী বেঁচে যায়, তাহলে সে মুক্তি পেত যাবতীয় শাস্তি থেকে। মনোবিজ্ঞানীগণ বলেছেন-এটাও একধরনের আত্মহত্যা। সুদূর অতীতে যখন কেউ মনে করত-সমাজ তার সাথে অন্যায় আচরণ ও জুলুম করছে, তখন সে হতাশার বশে কিংবা মানুষের কাছে তার সত্যতা ও ন্যায়নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত নিত স্বেচ্ছামৃত্যুর। মৃত্যুর আগে একটা চিরকুটে লিখে যেত নিজের অভিব্যক্তি, আত্মহত্যার কারণ ইত্যাদি। তারপর বিষ পান করে অথবা ফাঁসিতে ঝুলে দুনিয়া থেকে বিদায় নিত সে।

ইংল্যান্ডের শেফিল্ড শহরের ডাক্তারদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, প্রকৃতপক্ষে কতজন মানুষ আত্মহত্যার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। কারণ, যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তারা প্রাণে বেঁচে গেলে আত্মহত্যা করতে চাওয়ার কারণ বলবে না। যেমন: একবার অনেকগুলো ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল লাহোরের এক প্রসিদ্ধ অভিনেতা, কিন্তু তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ফলে সে বেঁচে যায়। পরবর্তী সময়ে কোনো মামলা করা যায়নি। কারণ, সে প্রকৃত সত্যটা আর কাউকেই বলেনি। উলটো একের পর এক অজুহাত খাড়া করে ফেলে মামলা থেকে বাঁচার জন্য।

শেফিল্ডের অনুসন্ধানী জরিপে এসব ঘটনা সংকলন করার পর জানা গেল-পাঁচ লাখ অধিবাসীদের মধ্যে আত্মহত্যার যত মামলা থানায় রেকর্ড হয়েছে, আত্মহত্যা চেষ্টাকারীর সংখ্যা ছিল তার চেয়ে দশগুণ বেশি। লসএঞ্জেলস ও জেনেভায় এ ধরনের জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে আত্মহত্যা চেষ্টাকারীদের সংখ্যা আরও বেশি। অনেক সময় সাথে সাথে চিকিৎসা করার ফলে ব্যক্তি বেঁচে যায়। এজন্য পরিসংখ্যানে তা আসে না। কেউ কেউ আবার আত্মহত্যার উদ্যোগ নেয় এই আশায় যে, এরূপ দেখলে অন্যরা তাকে বাঁচাতে আসবে, আত্মীয়স্বজন ও আশেপাশের লোকেরা ভালো আচরণ করবে তার সাথে। এক্ষেত্রে অনেকে সফল হয়, আবার অনেকের সাঙ্গ হয় দুনিয়াবি জিন্দেগি।

আমেরিকার প্রখ্যাত অভিনেতা মারলিন মনরো মাঝেমধ্যেই একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করতেন। বড়ি খাওয়ার পর আশেপাশের লোকদের ডাকাডাকি করতেন তিনি। যথারীতি প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করে তুলত তাকে। এভাবে একদিন তিনি ফাঁকা বাড়িতে বেশ কিছু ঘুমের বড়ি খেয়ে নেন। তবে এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। টলতে টলতে টেলিফোনের রিসিভারটা হাতে তুলে নিলেও কাউকে ফোন করার সুযোগই হয়নি তার। এর আগেই ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।

আত্মহত্যা করতে চাওয়া অনেকের সাথে আমি কথা বলে জেনেছি-তাদের মধ্যকার ৮/১০ পার্সেন্ট এমন ছিল, যারা সত্যি সত্যি নিজেদের শেষ করে দিয়ে জীবনের ইতি টানতে চায়। নইলে অধিকাংশ লোকই মূলত এটা করে স্রেফ নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য অথবা অন্যদের কাছে নিজেকে শেষ করার ইচ্ছেটা জানান দেওয়ার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। তবে মারলিন মনরোর মতো কেউ যদি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করে বসে, তখন সেটা আলাদা বিষয়।

টিকাঃ
২১. কুজাত: ৯; ৫৩/৫৬
২২ সামুয়েল, ১-৪-১৬: ৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00