📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 মাদকাসক্তি : সমস্যা ও সমাধান

📄 মাদকাসক্তি : সমস্যা ও সমাধান


আধুনিক গবেষণায় অ্যালকোহল ও মাদকদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান আসক্তিকে উন্মাদনার একটি প্রকার সাব্যস্ত করে এর নাম দেওয়া হয়েছে ডিপসোমেনিয়া (DYPSOMANIA)। কিন্তু অল্প পরিমাণে কোমল পানীয়ের মতো মদ অথবা সিগারেটে ভরে গাঁজা সেবনকারীদের উন্মাদ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। গরিষ্ঠসংখ্যক বিশেষজ্ঞ মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প মদ সেবনকারীদের কোনো প্রকার মস্তিষ্কের রোগে অসুস্থ হিসেবে মানতে নারাজ। অথচ সেবনকারীদের অধিকাংশই নিজের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই তা পান করে! কখনো কখনো অনুষ্ঠান, উৎসবে কোনো পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে নিজেকে অন্যের তুলনায় দুর্বল ভাবার কারণেও এমনটি করে থাকে।
গালিবের আকাঙ্ক্ষা ছিল, চারপাশের শত ব্যস্ততা ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নির্জনতার অতল গহিনে ডুবে থাকা। তিনি স্বাভাবিক জীবনেও সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিত্য অবগাহন করতেন মাদকের ঘোর আবেশে। বানৈপুণ্যের সমান্তরালে মনস্তত্ত্বের ওপর গালিবের যে দখল ছিল, তার ফলে আজও তিনি পৃথিবীতে সর্বাধিক নন্দিত কবি। পণ্ডিত রত্ননাথ সরকার ফাসানায়ে আজাদ বইয়ে এক আফিমখোরের করুণ দশা বর্ণনা করেছেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মর্মান্তিক জীবনচিত্রের বাস্তব বয়ান ফুটে উঠেছে সেখানে। লোকটি গোসল করত কালেভদ্রে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, পরিপাটি হয়ে চলার সক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলেছিল পুরোপুরি।
চলচ্চিত্রে সচরাচর দেখা যায়, জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত ব্যক্তি বোতলের পর বোতল মদ গিলে রাস্তাঘাটে বেসামাল ও সংবিৎহীন অবস্থায় ঘুরছে। এই কষ্ট, বেদনা ও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার জন্য কী করতে হবে তাকে? এর কোনো উত্তর তার জানা নেই। ফলে সে আঘাত ভুলতে জড়িয়ে পড়ে মরণ নেশার ফাঁদে। এভাবে মাদকে আশ্রয় খুঁজতে থাকে সে। আত্মহত্যাকে মনে করে চূড়ান্ত মুক্তি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্রেফ কাপুরুষসুলভ ভীরুতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। কথিত আছে, বিপদ দেখলে উটপাখি বালুর নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। সংকট মোকাবিলার সাহস না থাকায় সে আড়ালে আশ্রয় নিয়ে মনকে সান্ত্বনা দিতে চায় যে, মূলত সামনে কোনো বিপদ নেই! সমস্যার মুখোমুখি হয়ে তার সমাধান খুঁজে বের করার পরিবর্তে মাদকের ঘোরে মুক্তি পেতে চায়। এতে যন্ত্রণা থেকে আপাত স্বস্তি হয়তো মেলে, কিন্তু তাতে তো সমস্যার কোনো হেরফের ঘটে না; বরং মূল জায়গায় মনোযোগ ও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যর্থতায় ক্রমাগত জটিল হতে থাকে সংকট।
অলসতা, উদাসীনতা, গাফিলতি ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতায় নিষ্ক্রিয়তা, কাজ ও কর্তব্য থেকে পলায়ন মাদকাসক্তির প্রাথমিক উপসর্গ। এর পরের ধাপে দেখা দেয় ক্রমাগত দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা, পরিস্থিতি সম্পর্কে বেপরোয়া ভাব, ক্লান্তি-অবসাদ, অত্যধিক তন্দ্রা ইত্যাদি। নেশার জিনিস হাতে পেলে আনন্দে নেচে ওঠে, না পেলেই শুরু হয় হাত-পা ছোড়াছুড়ি আর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। তীব্র জ্বরে আক্রান্ত রোগীর প্রলাপের মতোই ওদের অবস্থা। কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়া লেগেই থাকে। এভাবে মাদকাসক্ত রোগীর এই দুর্ভোগ দিন দিন বাড়তেই থাকে। কিছুদিন মাদক না পেলে তার ক্ষুধা ও চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে, প্রয়োজন ও পরিমিতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই থাকে না। এ অবস্থায় রোগী প্রায়শই জ্ঞান হারায়।
এক উচ্চশিক্ষিতা মেয়ের প্যাথেডিনের টিকা নিয়মিত পুশ করার নেশা ধরে যায়। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে দীর্ঘসময় সে হাসপাতালে ছিল। ছাড়া পেয়ে আবারও প্যাথেডিন নেওয়া শুরু! একদিন হাতে অর্থকড়ি না থাকায় সারাদিন সে ইনজেকশন নিতে পারেনি। এরপর কাউকে ধোঁকা দিয়ে টাকা জোগাড় করে। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, একদিনের ঘাটতি মেটাতে সে এক ঘণ্টায় পাঁচটি ইনজেকশন নেয় এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে টানা ১৬ ঘণ্টা।
যে মাদকাসক্ত রোগীর সঙ্গেই আপনি কথা বলুন; সে স্বীকার করবে, কাজটি ভালো নয়। এমনকী এটাও স্বীকার করে নেবে যে, শুধু নেশার কারণেই পরিবারে তার সম্মান নেই, চাকরি চলে গেছে এবং যত্রতত্র অপমানিত হতে হয় তাকে। আন্তরিকভাবে এ বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সে; কিন্তু তার ইচ্ছে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সমস্ত অঙ্গীকার মুখ থুবড়ে পড়েছে লজ্জাজনক পরিণতির কাছে।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 মাদকাসক্তি নিরাময়

📄 মাদকাসক্তি নিরাময়


যেসব কারণ ও অবস্থা কোনো ব্যক্তিকে মাদকাসক্তির দিকে ধাবিত করে, তার কোনোটাই নতুন নয়। মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে মনোবিদ, সকলেরই দাবি হলো-আমরা এর চিকিৎসা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। সম্প্রতি পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রসার ব্যাপক হারে দৃশ্যমান। কিন্তু অর্ধশিক্ষিত ও প্রচারসর্বস্ব হাতুড়ে ডাক্তার থেকে শুরু করে প্রাইভেট হাসপাতাল পর্যন্ত প্রত্যেকের দাবি অভিন্ন। এর চিকিৎসা নাকি তাদের হাতেই আছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে অনবরত মাদকাসক্তি চিকিৎসা সম্পর্কে চটকদার ভিডিও প্রতিবেদন দেখানো হয়-'মাদক নিরাময়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানই সেরা।'
কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো নিরাময় হাসপাতালে ভর্তি হলে, তার এই প্রত্যয় কাজ করে যে, সে এই অভিশপ্ত বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। হাসপাতালে অবস্থানকালে সামান্য সহযোগিতা পেলেও এটা তার জন্য কার্যকর ও সুফলদায়ক প্রমাণিত হবে। আফিম আর মদের বোতল ছেড়ে দেওয়া সহজ হবে তার জন্য। কারণ, চিকিৎসার অংশ হিসেবে সাধারণত যেসব ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, সেগুলো নেশাযুক্ত উপাদানেই তৈরি।
ধরুন, আপনি একজন আফিমে আসক্ত রোগীকে আফিমের পরিবর্তে মদ খেতে দিলেন! মজার ব্যাপার হলো-সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি প্রসিদ্ধ ওষুধ কোম্পানির 'আফিম নিরোধক' ট্যাবলেট পরীক্ষা করে দেখেছে, এর উপাদানেই রয়েছে আফিমের অস্তিত্ব। এ যেন সর্ষের ভেতরেই ভূত! এসব ট্যাবলেট সেবনকারী হয়তো এই ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে, আমি তো আফিম ছেড়েই দিয়েছি। আফিমের পরিবর্তে এখন মাত্র দুটি ট্যাবলেটই যথেষ্ট। একইভাবে অধিকাংশ হাসপাতালে 'প্রশান্তিদায়ক' মেডিসিনকে বলা হচ্ছে ঘুমের ওষুধ। অথচ এটি রোগীকে স্রেফ একটি নেশা থেকে আরেকটি নেশায় স্থানান্তরিত করার নামান্তর মাত্র। যাকে সাবস্টিটিউশন থেরাপিও বলা যেতে পারে। এ কারণে এর কার্যকারিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
উর্দু ভাষার একজন বিখ্যাত কবি মদ্যপানের জন্য নিজের অর্থকড়ি সবকিছু উজাড় করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। প্রথমে তিনি কঠিন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। অতঃপর মদের অভ্যাস ছাড়ার জন্য লাহোরের একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন। এক মাস পর সেখান থেকে বের হয়ে তিনি প্রথমেই যে কাজটি করছেন, তা হলো-পানশালায় গমন। শরাব জিন্দাবাদ! মানে আগের জায়গাতেই বহাল তবিয়তে ছিল, মাঝখানে কিছু ট্যাবলেট যুক্ত হয়েছে এই যা!
আমেরিকার মাদকাসক্তি কেন্দ্রগুলো রীতিমতো কারাগারসদৃশ। ওখানে রোগীদের সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রার্থীদেরও তল্লাশি করা হয়, যাতে আদর বেশে কেউ ওদের মাদক সরবরাহ করতে না পারে। যদিও এসব নিরাময়কেন্দ্রের চিকিৎসাপদ্ধতি ফ্রয়েডের সূত্রের আলোকেই পরিচালিত হয়, কিন্তু রোগীকে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি মাদক পরিহারে তার ইচ্ছেশক্তি দৃঢ় করতে মানসিক কিছু পদ্ধতিও তারা প্রয়োগ করে। ছয় মাস পর্যন্ত লাগাতার নিরাময়কেন্দ্রে রেখে রোগীকে ছেড়ে দেয়, তবে কিছুদিন পরপর ডেকে পাঠাতে থাকে উন্নতি পর্যবেক্ষণের জন্য। এভাবে অব্যাহত চেষ্টার ফলে রোগীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়।
একটি বাচ্চা অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর মরফিয়া২০ সেবনকারী এক ব্যক্তি পাঁচ বছর কারাগারে বন্দি থাকে। সে কারাগারে অনেক ভালো আচরণ করেছে। সেখানে নিয়মিত নামাজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে সে, নেশা করাও ছেড়ে দেয় পুরোপুরি। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর আস্তে আস্তে নামাজে গাফলতি বাড়তে থাকে, ছোটো হতে থাকে দাড়ি, একপর্যায়ে মাথা চাড়া দেয় পুরোনো নেশার অভ্যাস। অবশেষে পুরোদমে মরফিয়া সেবন শুরু হয়ে যায়। একবার অত্যধিক পরিমাণে ভাং সেবনের পর মরফিয়ার টিকা নেয় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে।
এ তরুণ তার মামলার শুনানি থেকে সাজা ঘোষণা পর্যন্ত সময়ে নেশা করেনি। কিন্তু যখনই মুক্তি পেল, মিলিত হলো পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে, পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেতে একদমই অসুবিধা হয়নি তার! কারণ, মাদকদ্রব্যের বিষয়ে ইসলামের অবস্থান সম্পর্কে কেউ তাকে সতর্ক করেনি। এটা সত্য যে, ইবাদতে সে প্রশান্তি খুঁজে পেত। কিন্তু দ্বীন-ধর্মের সঙ্গে তার যেটুকু সম্পর্ক, ইবাদতের প্রতি যতটা নিষ্ঠা-তা ইসলাম সম্পর্কে একদম না জেনেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে তার যে বিষয়টি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো-যতদিন সে নামাজ পড়েছে, ইসলামের প্রতীক দাড়ি রেখেছে, ততদিন সে মাদকের টিকা নেয়নি। কিন্তু বিপথগামী বন্ধুদের সংশ্রবে পুনরায় পথভ্রষ্ট হওয়ার আগে প্রথমেই ইসলামের বিধানগুলো ছেড়ে দেয় সে।
মাদকাসক্তি নিরাময়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম বড়ো কারণ, মদ্যপানকে মানুষের খারাপ দৃষ্টিতে না দেখা। তাদের নীতি অনুসারে কেবল হিরোইন, ডাং, আফিমই হলো খারাপ জিনিস। এই ধরনের দ্বিমুখী নীতি কোনোভাবেই সফল হতে পারে না। এমন প্রতারণামূলক দ্বিমুখী নীতির উজ্জ্বল উদাহরণ ব্রিটেন ও ফ্রান্স। তারা চীনকে বাধ্য করেছে তাদের কাছ থেকে আফিম কিনতে। অথচ চীনে সরকারিভাবে আফিমের চাষাবাদ, বিপণন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! কিন্তু ব্রিটিশ ও ফরাসি মাদক ব্যবসায়ী আর মাফিয়া সিন্ডিকেট ভারত ও তিব্বত থেকে আফিম আমদানি করে চীনে জবরদস্তিমূলক পন্থায় বিক্রয়-বিপণন করতে চায়। এই নোংরা উদ্দেশ্য সফল করতে তারা ১৮৩৯-৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছরব্যাপী রীতিমতো যুদ্ধ করে গোটা চীনকে পরিণত করে আফিমরাজ্যে। এখনও তারা পাকিস্তানে বিভিন্ন মাদকের উৎপাদন বন্ধে চাপ প্রয়োগ করে, কিন্তু আজ পর্যন্ত নিজেদের দেশে হেরোয়িন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেনি।
একবার আমেরিকায় মদ নিষিদ্ধ করার পর লোকেরা গ্রামে মদ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে কানাডা থেকে আমদানি শুরু করে। ভারতে মুম্বাইয়ের প্রাদেশিক সরকারও একবার এমন ব্যর্থ পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রশ্ন হলো-একজন সাধারণ মানুষকে আপনি কোন কারণে মাদক থেকে বিরত থাকার কথা বলবেন? তার ভাং সেবনের ইচ্ছে হলে আপনি তাকে বিরত রাখতে চাইছেন কোন যুক্তিতে? স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার বিষয়টি বলতে চাইলে সিগারেটের ঘটনা ঘটবে। সরকার একদিকে সিগারেটের প্যাকেটে তার ক্ষতির ব্যাপারে সতর্কবাণী উল্লেখ করবে, আবার গণমাধ্যমসহ সর্বত্র দিয়ে রাখবে সেই সিগারেটেরই বিজ্ঞাপন প্রচারের অবাধ অনুমতি ও সুযোগ। সরকারের এমন দ্বিচারী আচরণই তামাকবিরোধী সকল তৎপরতায় পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মাদকের অপকারিতাকে পৃথিবীতে সবার আগে গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র জীবনাদর্শ, যা ১৪০০ বছর আগে অসামান্য দূরদর্শিতায় দেখতে পেয়েছে-মাদকাসক্ত কোনো লোক সমাজের একজন কল্যাণসহায়ক সদস্য হতে পারে না। কাজেই সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই মানুষকে মাদক থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। মানবমনের সবচেয়ে বড়ো বিশেষজ্ঞ মহানবি মুহাম্মাদ -এর মাদক প্রতিরোধের ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোর সারবস্তু হলো-
• প্রত্যেক নেশার বস্তুই হারাম।
• যে জিনিস বেশি পরিমাণ খেলে নেশা হয়, তার অল্প পরিমাণও নিষিদ্ধ।
• মাদক পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও শত্রুতার জন্ম দেয়।
• মাদকসেবী বস্তুপূজারির মতোই কাফির।
• যে ব্যক্তি মাদকাসক্ত অবস্থায় তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করল, কিয়ামতের দিন মুসলমানদের সঙ্গে তার হাশর হবে না। যে ব্যক্তি তওবা ভঙ্গ করে পুনর্বার মাদক সেবন করেছে, আল্লাহ্ তার পুঁঁজ পান করাবেন।
• মাদকদ্রব্য কখনো ওষুধ হতে পারে না। এর মাধ্যমে চিকিৎসা তো হয়-ই না: বরং এটি নিজেই একটি রোগ।
• মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি প্রতিটি ধাপে যারা কাজ করে, তারা প্রত্যেকেই অভিশপ্ত।
• মাদকদ্রব্য বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগকারী যেন গণিকার উপার্জিত অর্থসম্পদ ভোগ করছে।
ইসলাম একটি বাস্তব ও জীবনমুখী ধর্ম। তার শিক্ষা ও দাবিসমূহ সরল, স্পষ্ট এবং কল্যাণকর। ইসলাম কাউকে কোনো মন্দ বিষয়ে বারণ করার পরিবর্তে তার মনোজগতে সেই বস্তুর কুফল সম্পর্কে মৌলিক ধারণা গেঁথে দিতে চায়। ইসলাম চায়, বছরে এক মাস রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ ধৈর্য ও সংযমের দীক্ষা লাভ করুক। একজন মানুষ যদি রমজানের চাঁদ দেখেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পুরো দিন ক্ষুধার্ত থাকতে পারে, তাহলে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে সে নেশাদ্রব্য ছাড়তে পারবে না কেন?
আসক্তি ছাড়ানোর জন্য কোনো মুসলমানকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে রাখা ও ঘুমের ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। মন্দ অভ্যাসের ক্ষতি সম্পর্কে তার মানসিকতা গড়ে উঠলে বাড়তি পরিশ্রম ছাড়াই সে সেটা ছাড়তে পারে। কোনো মুসলমান মনে-প্রাণে আল্লাহর ভালোবাসায় মন্দ অভ্যাস, এমনকী নেশা পরিত্যাগ করতে চাইলে তা সহজেই সম্ভব। Withdrawl Symptoms তাদের হয়, যাদের হৃদয় ঈমানশূন্য।
নিজের প্রভু ও তাঁর রাসূলের বিধান ও নির্দেশনা শোনার পরও কেউ মাদক না ছাড়লে, আল্লাহর জিকিরে তার অন্তরে প্রশান্তি অনুভূত না হলে, নামাজের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস গড়ে না উঠলে বুঝতে হবে, তার নিয়্যাত ও ইচ্ছাতে গোলমাল আছে। এমন লোকের ক্ষেত্রে সাফল্য আসবে শারীরিক শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। রাসূলের যুগে মদ্যপানের শাস্তি ছিল ২০-৪০টি দোররার আঘাত। আলি (রা.)-এর আমলে বিষয়টি অন্যভাবে পুনর্বিবেচনা করা হয়। মাদক সেবনের পর নেশার ঘোরে গালিগালাজ করা ও আবোল-তাবোল বকাঝকা অনিবার্য বিষয়। ফলে মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে না বলে অন্যকে গালি দেওয়া ও অশোভন আচরণের দায়ে অপরাধীকে দোররা মারার শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এতে তার বিশাল বিস্তৃত রাজ্যে মদ্যপানের মামলা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

টিকাঃ
২০. মরফিয়া (Morphia): আফিম থেকে প্রস্তুত বেদনা নাশক ও নিদ্রাকারক একটি ওষুধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00