📄 মাদকের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
মাদক যে ক্ষতিকর, বর্তমানে এ সত্য পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত। মাদক সেবনের ফলে লিভারের হজমশক্তি নষ্ট, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষমতা হ্রাস ও মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা নিঃশেষ হতে থাকে। দেখা দেয় মানসিক অবসাদ, পুরুষত্বহীনতা ও স্নায়ু দুর্বলতা। জেনে-বুঝে মদ্যপান করার এই প্রবণতাকে সাইকোলজির পরিভাষায় Dypsomania বলা হলেও আত্মঘাতী এরূপ আচরণকে আমরা আত্মহত্যার প্রবণতা বলে অভিহিত করতে চাই। মির্জা গালিব (১৭৯৭) নেশা গ্রহণের সাফাই গেয়েছেন এভাবে-
'শরাবে স্বস্তি খোঁজে কোন পোড়াকপাল? আমার তো চাওয়া শুধু আমিহীন দিন-রাত!'
মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানুষের মুখোমুখি হতে কুণ্ঠিত বোধ করে। সে যেন সেই কবুতরের মতো, যে বিড়াল দেখলেও ভয়ে মুখ লুকায়। নেশাখোরদের অধিকাংশই এমন হীনম্মন্যতার শিকার। অনেকে তো জনসম্মুখে আসতেই ভয় পায়। এরা এক ঢোক গিললে বা গাঁজায় এক চুমুক দিলেই নিজের মধ্যে অন্যরকম আত্মবিশ্বাস জেগে ওঠে। অথচ নেশার মাঝে বোধ, অনুভূতি বিলীন করে দিয়ে সমস্যাকে উসকে দেওয়া যায়, সমাধান পাওয়া যায় না। নেশা জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার সেই সড়ঙ্গ যার শেষ গন্তব্য।
কবি-সাহিত্যিকদের আসরে এক পেয়ালা শরাব পরিবেশন না করা পর্যন্ত তারা কবিতা আবৃত্তিই করতেন না! একবার এ রকম এক আসরে বাজে ঘটনায় অসন্তুষ্ট হয়ে বেড়িয়ে যান তৎকালীন পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির একজন সুপরিচিত অধ্যাপক। সেদিন এক বিখ্যাত কবি মঞ্চে দাঁড়িয়ে লোকজনের দিকে ফিরে প্রস্রাব করে দেন। প্রকৃতপক্ষে এই মাদক আত্মবিশ্বাস নয়; সম্মান খোয়ানোর মোক্ষম ওষুধ!
গ্রামাঞ্চলে ঝগড়া ও মারামারির প্রস্তুতি হিসেবেও ভাং, মদ প্রভৃতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের যে অংশটি মন্দ কাজে বাধা দেয়, নেশার অবস্থায় তখন সেটি অকার্যকর হয়ে যায়। আর বিবেকের শাসন নিষ্ক্রিয় থাকলে মানুষকে দিয়ে যেকোনো কিছু করিয়ে নেওয়া সম্ভব। অন্য কেউ না করালেও সে নিজে নিজেই নৈতিকতার বাঁধ ভেঙে বোকামির্ণ কাজ করতে পারে নিঃসংকোচে। বেশি টাকা খসানোর মতলবে খদ্দেরদের যতদূর পারা যায় মদপান করায় দেহ ব্যবসায়ী মেয়েগুলো। জুয়ার আসরেও অংশগ্রহণকারীদের পকেট কাটার জন্য থাকে মদ পরিবেশনের ব্যবস্থা। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার ফলে নিজের লাভ-ক্ষতি বা আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপারটি তার পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব হয় না। কাজেই সে জীবনের শেষ পুঁজি পর্যন্ত বাজি ধরে। পরিণতি সম্পর্কে উদাসীন ও বেখবর করে দিতে পারাটাই মাদকের প্রধান কারিশমা।
এই কৌশল অবলম্বন করে অনেক চতুর লোক নিজের বন্ধুবান্ধব ও চাকরবাকরকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলগুলোতে খুনোখুনি, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, রাহাজানি করতে পাঠায়। এসব যতটুকু শত্রুতার কারণে হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি হয় অন্যের ক্রীড়নক-লাঠিয়াল ও মাস্তান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে। আর এ দুর্বৃত্তপনার বিশেষ চালিকাশক্তি হয়ে থাকে মাদক। নেশার প্রতিক্রিয়া কি চেহারায় আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে? এই জিজ্ঞাসা নতুন নয়; বরং এ বিষয়ে পৃথিবীর প্রথম মনোবিজ্ঞানী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর ভাষ্যে আবু দারদা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে- 'আমার প্রিয়তম উপদেশ দিয়েছেন, মদ পান করবে না। কারণ, এটি যাবতীয় অপকর্মের চাবি।' ইবনে মাজাহ
এই নোংরা বস্তুতে আসক্ত ব্যক্তি ভালো-মন্দের অনুভূতিহীন। ফলে যেকোনো বিষয়েই বেপরোয়া হয়ে যায় সে। নেশা গ্রহণ করলে হুঁশ হারিয়ে ফেলে, আর না করতে পারলে হাত-পা ছুড়তে থাকে এলোপাথাড়িভাবে। চলন ও বলনে তখন আর ভারসাম্য থাকে না। কথাবার্তা খিটখিটে হয়ে যায়। মানুষের প্রতি অকারণে বিরক্তিবোধ থেকে খারাপ লাগে তাদের কাছে।
স্মৃতিশক্তিটা খুব অল্প সময়ে হারিয়ে ফেলে। সবশেষে একজন সুস্থ, মেধাবী আর চৌকশ মানুষ পরিণত হয় অসুস্থ ও নির্বোধ সত্তায়।
কোকেনের নেশা হলো সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এটি দুভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইউরোপে এটা নাক দিয়ে টানা হয়, আর প্রাচ্যের দেশগুলোতে খাওয়া হয় পানের ভেতর মুড়িয়ে। শ্লেষ্মা ঝিল্লির (Mucous Membrances) সঙ্গে মিশে সরাসরি হজম হয়ে যাওয়ার ফলে এটি রক্তে মিশে স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত উত্তেজিত করে তোলে। প্রথমদিকে ক্লান্তি-অবসাদ দূর হয়ে প্রফুল্লবোধ হতে থাকে শরীরে। মনের ভেতর ডানা মেলতে থাকে রং-বেরঙের কল্পনা। মস্তিষ্কে তৈরি হয় উদ্যম ও উদ্দীপনা। ভুলে যাওয়া কথাও স্মরণে আসে। কারণ, এটি বস্তুত তাৎক্ষণিক স্নায়ু উদ্দীপক (Cereberal Stimulant)। এর সাময়িক প্রভাব শেষ হওয়ার পর মস্তিষ্কে ক্লান্তি আসা নিতান্তই স্বাভাবিক। চেরাগের সলতে তুলে দিলে আগুন বেশি জ্বলবে বটে, কিন্তু অল্পক্ষণ পরে তা নিভেও যাবে দপ করে। এতে তেলও যে তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাবে, সেটা তো চূড়ান্ত নিশ্চিত।
মস্তিষ্ক ও শরীরের অর্গানগুলো দ্রুত সঞ্চালিত হওয়ার পর তাতে ক্লান্তি-অবসাদ চলে আসা খুবই সাধারণ ব্যাপার। অন্য কথায়, কুদরতি সিস্টেম এমনই। আলোচ্য মাদক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রভৃতি দেখা দেবে। পিঁপড়া চলাচলের মতো শিরশির অনুভূতি হবে পুরো শরীরে। নাকে রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা কমে যাওয়ায় তৈরি হবে ছিদ্র। এ অবস্থায় রোগী সারাক্ষণ কল্পনা-বাতিকে ভুগতে থাকে। কল্পিত জগতেই সেসব কাজ-কারবার সেরে নেয়-যেগুলো বাস্তব জীবনে কখনো করেনি বা করার যোগ্যতাও রাখে না। মনোবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় মেন্টাল ইউফোরিয়া।
কোকেনের পর দক্ষিণ আমেরিকার বাগান থেকে আসা দ্বিতীয় উপহার হলো LSD। এটিও কোকেনের প্রায় অনুরূপ ক্ষতিকর উপাদানে ভরা। এটি গ্রহণের পর মনে সম্পূর্ণ অবাস্তব আতঙ্ক ভর করে। জাকুমের মূল রাসায়নিক উপাদান ১২টি ছাড়িয়ে গেছে-যেগুলোর মধ্যে একটি অন্যটি থেকে ভয়ংকর। এ কারণে মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটাকে হ্যালুসিনেশন নাম দেওয়া হয়েছে। জাকুম বৃক্ষ থেকে তৈরি হওয়া এই মাদকের ক্ষতিকর দিক মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়েছে মাত্র কয়েক যুগ আগে; অথচ কুরআন মাজিদ হাজার বছর আগে বলেছে- 'এই জাকুম বৃক্ষ পাপাচারীদের খাবার। মানুষের পেটে এটা গরম পানির মতো ফুটতে থাকে।' সূরা দুখান: ৪৩-৪৬
অন্যত্র জাহান্নামিদের আহার্য ও পানীয় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- 'তারা সেসব লোক, যারা জাক্কুম গাছ খাবে এবং এটা দিয়ে পেট ভর্তি করবে। এ ছাড়াও পান করার জন্য তাদের গরম পানি দেওয়া হবে।' সূরা ওয়াকিয়া: ৫২-৫৪
আরও বলা হয়েছে- 'অত্যাচারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আমি এ গাছটি রেখেছি। কারণ, গাছটি জাহান্নামের তলদেশ থেকে গজিয়ে ওঠা। তার ডালগুলো শয়তানের মাথার মতো।' সূরা সাফফাত : ৬৩-৬৯
জাক্কুম গাছের মূল উপাদানে তৈরি মাদকের ব্যাপক চাহিদার কারণে মার্কিন মাদকাসক্ত নাগরিকদের কাছে এটা প্রায় গণচাহিদার জায়গা দখল করেছে। অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান থেকে প্রমাণিত, কুরআন মাজিদে একে পাপাচারীদের খাদ্য বলে আখ্যায়িত করা বাস্তবতার সঙ্গে চমৎকারভাবে সংগতিপূর্ণ। যেসব মাদকাসক্ত এটি খায়, তাদের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে তৈরি হয়েছে মতভিন্নতা। ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে এটাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন চিকিৎসকরা প্রথমদিন থেকেই আসল ওষুধ বন্ধ করে দেন ঠিকই, তবে তার পরিবর্তে দিয়ে দেন আরেকটি ঘুমের ওষুধ। তাহলে ঘুরেফিরে ফ্রয়েডের কথাই সত্য। তিনি এটাকে নাম দিয়েছিলেন ট্রান্সফারেন্স (Transference); অর্থাৎ হেরোয়িন ছাড়ানোর জন্য রোগীকে Largactil & Diazepam-এ অভ্যস্ত করে তোলা।
এখন রোগী একটি মাদকদ্রব্য থেকে অন্য মাদকের দিকে ধাবমান। নেশার নাম আর ধরন বদলালেও তা ভিন্ন চেহারা নিয়ে থেকেই যাচ্ছে। সে আফিমের জাল থেকে বেরিয়ে জড়িয়ে পড়ছে অন্য কোনো নেশায়। এ কারণেই অনেক মাদকাসক্তকে পরবর্তী সময়ে আবারও নেশায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এটা যেন এক বিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য বিপদে ফেঁসে যাওয়া।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে স্নায়ু আর মানসিক রোগের চিকিৎসায় ডাক্তাররা ওষুধের ওপর অধিকতর নির্ভর করেন। অথচ এটি জটিল এক অসুস্থতা, যেখানে মনস্তত্ত্ববিদদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো প্রক্রিয়াই সফল হওয়া সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, এরূপ চিকিৎসায় স্থায়ীভাবে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা খুবই কম। কেননা, পশ্চিমা চিকিৎসাপদ্ধতি রোগীর ওপর জোর দেয় বেশি, যেন লোকটি হেরোয়িন ছেড়ে দেয়, বন্ধ করে দেয় কোকেন সেবন ইত্যাদি। এ ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতিতে রোগী ভাসাভাসা সুস্থ হয়ে ওঠে,
📄 মাদক নির্মূলে ইসলামের ব্যতিক্রমী মনস্তাত্ত্বিক কৌশল
প্রাক-ইসলামি যুগে বিদ্যমান ধর্ম বা মতবাদগুলোর কোনোটাতেই মাদকদ্রব্য সম্পর্কে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ছিল না। সে সময় নেশা জাতীয় দ্রব্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে খুব কম সংখ্যক চিকিৎসকই ছিলেন ওয়াকিবহাল। ফলে উপাসনালয়ে পর্যন্ত চলত অনাচার ও অবাধ মাদক সেবন। এরূপ অন্ধকারে নিমজ্জিত লোকদের নৈতিক চরিত্রের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তাদের অন্তরে প্রভাব সঞ্চারের যোগ্যতা রাখেন। দরকার ছিল এমন আদর্শ, যার মধ্যে মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে, সেইসঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষকে প্রভাবিত করার অসামান্য ক্ষমতা। এই মিশন বাস্তবায়নেই আল্লাহ তায়ালা আরবের বুকে পাঠিয়েছিলেন মহামানব মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ-কে। তাঁকে সমাজ পরিবর্তনের মূলনীতি বাতলে দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন-
'মানুষকে মমতাপূর্ণ পন্থা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তোমার রবের পথে আহ্বান করো।' সূরা নামল: ১২৫
ইসলামের লক্ষ্য এমন নীতিমালা ও উপায় নির্দেশ করা-যাতে মানুষ মর্যাদাপূর্ণ, সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারে। মানুষের অধিবাস, আবাসন, পারস্পরিক উঠাবসা ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিতে গিয়ে দেখা গেল; মানবজীবনে নেশা ও মাদকের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। তখন কুরআন মাজিদ একেবারে গোড়াতেই নির্দেশনা দিলো-
'লোকেরা আপনার কাছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জানতে চাইবে, আপনি তাদের বলুন-এতে অনেক রকমের ক্ষতির পাশাপাশি সামান্য উপকারিতাও আছে।' সূরা বাকারা: ২১৯
এটা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কথা, যে কারণে আয়াতের স্বরভঙ্গি অনেকটা পরামর্শের মতো। এরপর দেখা গেল, লোকেরা এমনভাবে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে যে, ছোটোখাটো বিষয় ঝগড়া-ফ্যাসাদ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন-
'তোমরা মাদকদ্রব্য থেকে দূরে থাকো। কারণ, এটি নষ্টের মূল।' জুহরি
মানুষ তাঁর কথায় গুরুত্ব দেওয়া ও বিষয়টি বোঝার পর্যায়ে এলে মহান আল্লাহ কুরআন মাজিদে ঘোষণা করলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকো। এ নিষেধাজ্ঞা সে পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের কথাবার্তা ও কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাও।' সূরা নিসা : ৪৩
প্রথম শর্ত এই মর্মে দেওয়া হয়েছে যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছেও যাওয়া চলবে না। কেননা, মাদকের ভেতর এমনসব প্রতিক্রিয়া আছে, যা নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একাগ্রচিত্তে আল্লাহর জিকির ও ইবাদত করাও সম্ভব নয়। বিষয়টি জানতে পেরে মদ্যপায়ীরা নড়েচড়ে বসল। এর পরের ধাপে সামনে আনা হলো নেশার কারণে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়। ইরশাদ হলো-
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদের জানিয়ে দেওয়া হলো-মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা (ভাস্কর্য বা এ উদ্দেশ্যে যা কিছু স্থাপন করা হয়), ভাগ্য নির্ণায়ক বস্তু অপবিত্র ও শয়তানি কর্ম। শয়তান মানুষকে এসবের প্ররোচনা দেয়। কারণ, এর ফলে ঝগড়া-ফ্যাসাদ ও পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি হয়। এসব আল্লাহর স্মরণের প্রতিবন্ধক। কারণ, নেশার অবস্থায় মুখ দিয়ে ভালো কথা বের হয় না।' সূরা মায়েদা: ৯০-৯১
প্রত্যেক প্রকার নেশারই সাধারণত দুটি প্রভাব থাকে-
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: হেরোয়িন, ভাং, হুইস্কি প্রভৃতি গলাধঃকরণের পরপরই মানুষ আবোল-তাবোল ও অনর্থক কথা বলতে থাকবে। রোজকার অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা যায়, মদপান করার পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব পর্যন্ত পরস্পর ঝগড়ায় জড়িয়ে শত্রুতে পরিণত হয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব : পাশাপাশি এর কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও সূদূরপ্রসারী ক্ষতিও রয়েছে। এর মধ্যে হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়া অন্যতম। এ সময় হিন্দু মহিলারা বিধবা হলে স্বামীর লাশের সঙ্গে সহমরণে যেতে হতো তাকে। সাধারণত এটি হতো তার সম্মতি ও ইচ্ছার বিপরীতে। সেজন্য তাদের ঘর থেকে সাজগোজ করিয়ে বের করার আগে তাকে জোরপূর্বক পান করানো হতো প্রচুর পরিমাণে ভাং ও মদজাতীয় দ্রব্য-যাতে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নির্দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বামীর।
প্রচলিত ধারণায় কেবল মদকেই নেশাদ্রব্য বলা হয়, কিন্তু যেকোনো নেশার দ্রব্যই মনস্তাত্ত্বিক, শারীরিক ও সামাজিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। ব্যাপারটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন-
'মাদকতা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তুই মাদক। আর নেশা আনে এমন সবকিছুই হারাম।' আবু দাউদ
একই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও আয়িশা (রা.)-এর পৃথক পৃথক বর্ণনা রয়েছে-যা উক্ত হাদিসের মর্মার্থকে সমর্থন করে।
ফ্রান্সে মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসক এক মনস্তত্ত্ববিদ বলেন-অল্প পরিমাণ মাদক গ্রহণে ছোটোদের আসক্তি তৈরি হয়; কিন্তু তার বয়স যতই বাড়তে থাকে, নেশার চাহিদাও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। অথবা বলা যায়, তখন শরীর অভ্যস্ত হয়ে উঠায় অল্পে আর তৃপ্তি আসে না। কাজেই ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়াতে হয়। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
'যে বস্তু বেশি পরিমাণে নেশা আনে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।' ইবনে মাজাহ
নেশাজাতীয় বস্তুর ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় নিয়ে আল্লাহর রাসূল এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি এখানে থামেননি; বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন। তবে সোজাসাপ্টা হুকুম জারি না করে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন-এটা আদৌ চিকিৎসা নয়; বরং তা নিজেই একটি ব্যাধি অথবা ব্যাধির বীজ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-
'মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল -এর এক বন্ধু তাঁর জন্য উপহার হিসেবে বেশি পরিমাণে মদ নিয়ে হাজির হন। তিনি ছিলেন সাকিফ গোত্রের লোক। তাকে সম্বোধন করে রাসূলে আকরাম বলেন-“ওহে অমুক! তোমার কি জানা নেই যে, আল্লাহ মদকে নিষিদ্ধ করেছেন?” লোকটি নিচু স্বরে তার ক্রীতদাসকে বলল-মদগুলো যেন বাজারে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। এটা শুনে রাসূল বললেন-"যিনি এটা পান করা নিষিদ্ধ করেছেন, তিনি এর বেচা-বিক্রিও নিষিদ্ধ করেছেন।” এ কথা শোনার পর লোকটি সমস্ত মদ নালায় ঢেলে দেন।' আহমদ, মুসলিম, নাসায়ি
আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর পিতা একটি ইয়াতিম বাচ্চার লালন-পালন করছিলেন। বাজারে সুবিধাজনক দাম দেখে তিনি এই ইয়াতিম বালকের সম্পদ থেকে মদ কিনে মজুদ করলেন। ঠিক তখনই এলো মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কী করব?' তাকে বলা হলো- 'জ্বালিয়ে দাও।' তিনি নিবেদন করলেন—'এটা তো ইয়াতিমের সম্পদ! সে এই ক্ষতি বহন করার সামর্থ্য রাখে না!' আরজ করলেন, 'এটাকে আমি সিরকা অথবা ভিনেগার বানিয়ে নিতে পারি না?' জবাবে বলা হলো—'না।' এ প্রসঙ্গে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন—'আল্লাহর রাসূল মদ দিয়ে সিরকা বানাতেও বারণ করেছেন।' মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ
নেশা এক আত্মঘাতী ভয়াবহ বদভ্যাস। কেউ এতে জড়িয়ে পড়ার পর, আশেপাশের মানুষকে তাতে আসক্ত দেখে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে সে। নোংরা ও ক্ষতিকর বলে নেশার বস্তু সম্পর্কে তার মনে ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা তৈরি করা গেলেই কেবল সে তা ছাড়তে বাধ্য হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন—
'মহানবি প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারকে অভিসম্পাত করেছেন। এর ওপর অভিশাপ দশ দিক থেকে। মদ প্রস্তুতকারী, মদ প্রস্তুতের হুকুমদাতা ও ব্যবস্থাপক, মাদকদ্রব্য বিক্রেতা, গ্রাহক, বহনকারী, যার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যারা নেশার উপার্জন ভোগ করে, মদ পরিবেশনকারী ও পানকারী সকলেই অভিশপ্ত।' ইবনে মাজাহ
মদের উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সকলকে অভিশপ্ত সাব্যস্ত করার মাধ্যমে মাদক-বাণিজ্যের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া ইসলামের অনন্য ও ব্যতিক্রমী মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। ইসলাম বারংবার মাদকের কারবার সম্পর্কে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার দিকে বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন—
'নবি করিম জানতে পারলেন, মদিনায় এক লোক পুরোদস্তুর মদের ব্যাবসা খুলে বসে আছেন, তখন তার জন্য রীতিমতো সুনির্দিষ্টভাবে বদদুআ করেন তিনি।'
অন্য বর্ণনামতে, মদের উপার্জনকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন দেহ ব্যাবসার মতো ঘৃণ্য পেশার সাথে। আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
'যে ব্যক্তি মদ পান করে, প্রত্যেকবার মদ্যপানের পর আল্লাহ তার ওপর ৪০ রাত অসন্তুষ্ট থাকেন। ওই লোক মারা গেলে কাফির হিসেবে মারা যাবে। তবে তওবা করে থাকলে, আল্লাহ তা কবুল করবে। এরপরও পূর্বের পাপে ফিরে গেলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে জাহান্নামিদের সঙ্গে রাখবেন, যেখানে তাকে পান করানো হবে পুঁজ ও ঘাম।' মুসনাদে আহমদ
যেকোনো মুসলমানকে মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থাই প্রণীত হয়েছে ইসলামি জীবনব্যবব্যবস্থায়। মাদকসেবী যে পর্যন্ত তওবা করে ফিরে না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ইসলামের চৌহদ্দির বাইরে চূড়ান্ত অভিশপ্ত বলে গণ্য হবে। তার কোনো ইবাদতই মহান আল্লাহর দরবারে মোটের ওপর গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার ঠিকানা জাহান্নাম। একজন মুসলমানের জন্য এর চেয়ে কঠোর বার্তা ও কার্যকর মোটিভেশন আর কী হতে পারে! আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে- "হাশরের দিন মূর্তিপূজকের সঙ্গে যেরূপ আচরণ করা হবে, মদ্যপায়ীর সঙ্গেও অনুরূপ করা হবে।' ইবনে মাজাহ : ৩৩৭৫
ইসলামের মূলনীতি হলো-যা কিছু মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিষিদ্ধ। কুরআন মাজিদের হারামসংক্রান্ত আয়াতে বলা হয়েছে-
'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে জবেহকৃত পশু, শ্বাসরোধে, আঘাতে, ওপর থেকে পতিত হয়ে মৃত জন্তু আর হিংস্র জন্তুর খাওয়া পশু- তবে জীবিত পেয়ে যা তোমরা জবেহ করেছ, তা বাদে এবং যা কোনো বেদিতে জবেহ করা হয়েছে আর জুয়ার তির দ্বারা ভাগ্য নির্ণয়-এ সবগুলোই পাপের কাজ। আজ কাফিরগণ তোমাদের দ্বীনের বিরোধিতা করার ব্যাপারে পুরোপুরি নিরাশ হয়ে গেছে। কাজেই ভয় করো না, কেবল আমাকেই ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনব্যবব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম। তবে কেউ পাপের প্রবণতা ব্যতীত ক্ষুধার জ্বালায় খেতে বাধ্য হলে, আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।' সূরা মায়েদা : ০৩
অনেক আধুনিক শিক্ষিত মানুষ ইসলামের হারাম-হালাল সম্পর্কিত বিধানকে সাইকোলজিক্যাল ট্যাবু বা মনস্তাত্তিক সংকোচ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।
কোনো হিন্দু যখন নিরামিষভোজী হওয়ার কারণে ডিম ও গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকেন অথবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কোনো ইহুদি মাছ কিংবা উটের গোশত থেকে খাওয়া থেকে দূরে থাকেন, তাহলে সেটা স্রেফ তাদের ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে। যদিও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এটা অনুমোদন করে না। অথচ ইসলামে কেবল ধর্মীয় কারণে নয়; বরং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বস্তুই কেবল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা ছাড়ুন, মৃত প্রাণী বা রক্ত খেলে যেকোনো মানুষের হজমশক্তি ও লিভার নষ্ট হওয়ার মতো পরিণতি নিশ্চিত।
পুরাতন বাইবেলের আহ্বার অধ্যায়ে ময়ূর, সামুদ্রিক জন্তু, ইগল, চিল, বাজপাখি, কোটারিয়েন্টস (ফ্যালিকন জাতীয় পাখি), শকুন, ফড়িং, সান্ডা, গিরগিটি প্রভৃতিকে কেবল হারামই সাব্যস্ত করেনি; বরং এসবকে স্পর্শ করা পর্যন্ত অপবিত্রতা বলে ঘোষণা করেছে। এসব প্রাণী যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয়, নির্দেশনা রয়েছে সেই পাত্র ভেঙে ফেলার। এই তালিকাটিতে চোখ বোলালে আপনি দেখবেন, এর অধিকাংশই চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনুমোদিত খাদ্য নয়। একই সমান্তরালে ইসলাম কর্তৃক নিষিদ্ধ খাদ্যতালিকাতেও নোংরা বস্তু, খাদক জন্তু, বিষাক্ত প্রাণী, থাবার সাহায্যে শিকার করে এমন জীবজন্তু, খচ্চর, গাধা, পিঁপড়া, মৌমাছি, বেজি, শিয়াল, কাক, ব্যাঙ ও বিড়াল প্রভৃতিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সকল প্রকার মাদকদ্রব্য। যেহেতু এর সবই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; সুতরাং এর পরিমাণ যা-ই হোক, সর্বাবস্থায় তা হারাম। আবার কোনো সংশয়বিদ্ধ হারাম বস্তু বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বলে কারও অমূলক ধারণা থাকলে চিকিৎসার জন্য তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে পবিত্র কুরআন-
'আর যদি তোমাদের কেউ অপারগতার পরিস্থিতিতে পড়ো এবং আল্লাহর হুকুমের বরখেলাপ করা তোমাদের উদ্দেশ্য না হয় আর আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ তোমাদের অভ্যাসও নয়, তবে (সেক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বস্তু ব্যবহার করা) তোমাদের জন্য বৈধ। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।' সূরা বাকারা: ১৭৩
এ কথাটি কুরআন মাজিদের সূরা মায়েদা, আনআম ও নাহলেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। কারণ, নিষিদ্ধ বস্তুর ব্যবহার না করাকে ইসলাম কেবল নিজের আত্মমর্যাদার বিষয়ই মনে করে না; বরং ইসলাম চায় এর ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ যেন তার শরীর-স্বাস্থ্য নষ্ট করে না বসে। কাজেই, মুফাসসিরগণ আয়াতটির মর্ম সামনে রেখে এসব জিনিসের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্তসমূহ আরোপ করেছেন-
১. হারাম বস্তুকে ব্যবহার করা যাবে কেবল অপারগ অবস্থায়।
২. নিষিদ্ধ বস্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর খেয়ালখুশি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নয়; বরং প্রাধান্য দিতে হবে নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের সুচিন্তিত মতামতকে।
৩. হারাম বস্তুর ব্যবহার্য মাত্রা আর সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেবেন চিকিৎসক। এখানে রোগীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত মোটেই প্রযোজ্য নয়।
৪. এই শৈথিল্যকে ইসলামের বিধানে ফাঁকফোকর খোঁজার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যাবে না। কোনো ডাক্তার যদি মনে করেন, রোগীর অস্থিরতা, হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া বন্ধ ও অবনতিশীল অবস্থা এমন স্তরে গিয়ে ঠেকেছে যে, তাকে চিকিৎসার জন্য অন্য উপায় নেই; কেবল তখনই রোগীকে প্যাথেডিনের টিকা দিতে পারেন। নিঃসন্দেহে ততক্ষণ পর্যন্ত ডাক্তার এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন, যতক্ষণ হৃদ্যন্ত্রের অবস্থা স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত না হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর নিজে নিজে এর স্বাদ নেওয়ার অধিকার রোগীর থাকবে না। কেননা, এটাই পরবর্তী সময়ে আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নবি এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মূলনীতি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। আর তা হলো-হারাম বস্তুতে প্রকৃতপক্ষে কোনো আরোগ্য নেই। এ কথাই আবু হুরায়রা (রা.) আরও বিশদভাবে তাঁর ভাষ্যে বর্ণনা করেন-'যে ব্যক্তি হারাম জিনিস দ্বারা চিকিৎসা নেয়, আল্লাহ এতে তার জন্য আরোগ্য রাখেন না।' (আবু নুআইম)
নবি করিম -এর ঘোষণার সারবস্তু হলো-কেউ মনের সান্ত্বনার জন্য নিজের ডাক্তারের পরামর্শের ভিত্তিতে চিকিৎসা নিতে পারে। তবে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ ঘোষিত হারামের মধ্যে কোনোরূপ আরোগ্য বা কল্যাণ থাকা অসম্ভব।
আমরা আল্লাহর কথায় আস্থা রেখে বিষয়টি পরীক্ষা করেও দেখলাম, রক্ত পান করলে আদৌ দুর্বলতা কাটে না। শূকরের চর্বি দিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন ডায়াবেটিস হ্রাসে কোনো ভূমিকাই রাখে না। হিংস্র প্রাণীর মুখের লালায় থাকে মস্তিষ্ক বিকৃতির জীবাণু। এসব প্রাণীর মুখ দেওয়া পাত্রে মানুষ খেলে দেখা দিতে পারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া। হিংস্র প্রাণীর গোশত বিস্বাদ এবং নানান রোগের বীজবাহী হয়ে থাকে। স্ট্রোকের রোগীকে হুইস্কি দেওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো লাগে বটে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে রোগ বেড়ে যায়। এমনকী বন্ধ হয়ে যেতে পারে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ও রক্ত চলাচল। নিউমোনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি রোগের কারণে না মরলেও, মারা যেতে পারে ব্রান্ডি পান করে।
📄 মাদকাসক্তি : সমস্যা ও সমাধান
আধুনিক গবেষণায় অ্যালকোহল ও মাদকদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান আসক্তিকে উন্মাদনার একটি প্রকার সাব্যস্ত করে এর নাম দেওয়া হয়েছে ডিপসোমেনিয়া (DYPSOMANIA)। কিন্তু অল্প পরিমাণে কোমল পানীয়ের মতো মদ অথবা সিগারেটে ভরে গাঁজা সেবনকারীদের উন্মাদ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। গরিষ্ঠসংখ্যক বিশেষজ্ঞ মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প মদ সেবনকারীদের কোনো প্রকার মস্তিষ্কের রোগে অসুস্থ হিসেবে মানতে নারাজ। অথচ সেবনকারীদের অধিকাংশই নিজের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই তা পান করে! কখনো কখনো অনুষ্ঠান, উৎসবে কোনো পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে নিজেকে অন্যের তুলনায় দুর্বল ভাবার কারণেও এমনটি করে থাকে।
গালিবের আকাঙ্ক্ষা ছিল, চারপাশের শত ব্যস্ততা ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নির্জনতার অতল গহিনে ডুবে থাকা। তিনি স্বাভাবিক জীবনেও সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিত্য অবগাহন করতেন মাদকের ঘোর আবেশে। বানৈপুণ্যের সমান্তরালে মনস্তত্ত্বের ওপর গালিবের যে দখল ছিল, তার ফলে আজও তিনি পৃথিবীতে সর্বাধিক নন্দিত কবি। পণ্ডিত রত্ননাথ সরকার ফাসানায়ে আজাদ বইয়ে এক আফিমখোরের করুণ দশা বর্ণনা করেছেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মর্মান্তিক জীবনচিত্রের বাস্তব বয়ান ফুটে উঠেছে সেখানে। লোকটি গোসল করত কালেভদ্রে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, পরিপাটি হয়ে চলার সক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলেছিল পুরোপুরি।
চলচ্চিত্রে সচরাচর দেখা যায়, জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত ব্যক্তি বোতলের পর বোতল মদ গিলে রাস্তাঘাটে বেসামাল ও সংবিৎহীন অবস্থায় ঘুরছে। এই কষ্ট, বেদনা ও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার জন্য কী করতে হবে তাকে? এর কোনো উত্তর তার জানা নেই। ফলে সে আঘাত ভুলতে জড়িয়ে পড়ে মরণ নেশার ফাঁদে। এভাবে মাদকে আশ্রয় খুঁজতে থাকে সে। আত্মহত্যাকে মনে করে চূড়ান্ত মুক্তি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্রেফ কাপুরুষসুলভ ভীরুতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। কথিত আছে, বিপদ দেখলে উটপাখি বালুর নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। সংকট মোকাবিলার সাহস না থাকায় সে আড়ালে আশ্রয় নিয়ে মনকে সান্ত্বনা দিতে চায় যে, মূলত সামনে কোনো বিপদ নেই! সমস্যার মুখোমুখি হয়ে তার সমাধান খুঁজে বের করার পরিবর্তে মাদকের ঘোরে মুক্তি পেতে চায়। এতে যন্ত্রণা থেকে আপাত স্বস্তি হয়তো মেলে, কিন্তু তাতে তো সমস্যার কোনো হেরফের ঘটে না; বরং মূল জায়গায় মনোযোগ ও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যর্থতায় ক্রমাগত জটিল হতে থাকে সংকট।
অলসতা, উদাসীনতা, গাফিলতি ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতায় নিষ্ক্রিয়তা, কাজ ও কর্তব্য থেকে পলায়ন মাদকাসক্তির প্রাথমিক উপসর্গ। এর পরের ধাপে দেখা দেয় ক্রমাগত দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা, পরিস্থিতি সম্পর্কে বেপরোয়া ভাব, ক্লান্তি-অবসাদ, অত্যধিক তন্দ্রা ইত্যাদি। নেশার জিনিস হাতে পেলে আনন্দে নেচে ওঠে, না পেলেই শুরু হয় হাত-পা ছোড়াছুড়ি আর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। তীব্র জ্বরে আক্রান্ত রোগীর প্রলাপের মতোই ওদের অবস্থা। কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়া লেগেই থাকে। এভাবে মাদকাসক্ত রোগীর এই দুর্ভোগ দিন দিন বাড়তেই থাকে। কিছুদিন মাদক না পেলে তার ক্ষুধা ও চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে, প্রয়োজন ও পরিমিতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই থাকে না। এ অবস্থায় রোগী প্রায়শই জ্ঞান হারায়।
এক উচ্চশিক্ষিতা মেয়ের প্যাথেডিনের টিকা নিয়মিত পুশ করার নেশা ধরে যায়। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে দীর্ঘসময় সে হাসপাতালে ছিল। ছাড়া পেয়ে আবারও প্যাথেডিন নেওয়া শুরু! একদিন হাতে অর্থকড়ি না থাকায় সারাদিন সে ইনজেকশন নিতে পারেনি। এরপর কাউকে ধোঁকা দিয়ে টাকা জোগাড় করে। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, একদিনের ঘাটতি মেটাতে সে এক ঘণ্টায় পাঁচটি ইনজেকশন নেয় এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে টানা ১৬ ঘণ্টা।
যে মাদকাসক্ত রোগীর সঙ্গেই আপনি কথা বলুন; সে স্বীকার করবে, কাজটি ভালো নয়। এমনকী এটাও স্বীকার করে নেবে যে, শুধু নেশার কারণেই পরিবারে তার সম্মান নেই, চাকরি চলে গেছে এবং যত্রতত্র অপমানিত হতে হয় তাকে। আন্তরিকভাবে এ বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সে; কিন্তু তার ইচ্ছে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সমস্ত অঙ্গীকার মুখ থুবড়ে পড়েছে লজ্জাজনক পরিণতির কাছে।
📄 মাদকাসক্তি নিরাময়
যেসব কারণ ও অবস্থা কোনো ব্যক্তিকে মাদকাসক্তির দিকে ধাবিত করে, তার কোনোটাই নতুন নয়। মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে মনোবিদ, সকলেরই দাবি হলো-আমরা এর চিকিৎসা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। সম্প্রতি পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রসার ব্যাপক হারে দৃশ্যমান। কিন্তু অর্ধশিক্ষিত ও প্রচারসর্বস্ব হাতুড়ে ডাক্তার থেকে শুরু করে প্রাইভেট হাসপাতাল পর্যন্ত প্রত্যেকের দাবি অভিন্ন। এর চিকিৎসা নাকি তাদের হাতেই আছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে অনবরত মাদকাসক্তি চিকিৎসা সম্পর্কে চটকদার ভিডিও প্রতিবেদন দেখানো হয়-'মাদক নিরাময়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানই সেরা।'
কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো নিরাময় হাসপাতালে ভর্তি হলে, তার এই প্রত্যয় কাজ করে যে, সে এই অভিশপ্ত বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। হাসপাতালে অবস্থানকালে সামান্য সহযোগিতা পেলেও এটা তার জন্য কার্যকর ও সুফলদায়ক প্রমাণিত হবে। আফিম আর মদের বোতল ছেড়ে দেওয়া সহজ হবে তার জন্য। কারণ, চিকিৎসার অংশ হিসেবে সাধারণত যেসব ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, সেগুলো নেশাযুক্ত উপাদানেই তৈরি।
ধরুন, আপনি একজন আফিমে আসক্ত রোগীকে আফিমের পরিবর্তে মদ খেতে দিলেন! মজার ব্যাপার হলো-সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি প্রসিদ্ধ ওষুধ কোম্পানির 'আফিম নিরোধক' ট্যাবলেট পরীক্ষা করে দেখেছে, এর উপাদানেই রয়েছে আফিমের অস্তিত্ব। এ যেন সর্ষের ভেতরেই ভূত! এসব ট্যাবলেট সেবনকারী হয়তো এই ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে, আমি তো আফিম ছেড়েই দিয়েছি। আফিমের পরিবর্তে এখন মাত্র দুটি ট্যাবলেটই যথেষ্ট। একইভাবে অধিকাংশ হাসপাতালে 'প্রশান্তিদায়ক' মেডিসিনকে বলা হচ্ছে ঘুমের ওষুধ। অথচ এটি রোগীকে স্রেফ একটি নেশা থেকে আরেকটি নেশায় স্থানান্তরিত করার নামান্তর মাত্র। যাকে সাবস্টিটিউশন থেরাপিও বলা যেতে পারে। এ কারণে এর কার্যকারিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
উর্দু ভাষার একজন বিখ্যাত কবি মদ্যপানের জন্য নিজের অর্থকড়ি সবকিছু উজাড় করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। প্রথমে তিনি কঠিন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। অতঃপর মদের অভ্যাস ছাড়ার জন্য লাহোরের একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন। এক মাস পর সেখান থেকে বের হয়ে তিনি প্রথমেই যে কাজটি করছেন, তা হলো-পানশালায় গমন। শরাব জিন্দাবাদ! মানে আগের জায়গাতেই বহাল তবিয়তে ছিল, মাঝখানে কিছু ট্যাবলেট যুক্ত হয়েছে এই যা!
আমেরিকার মাদকাসক্তি কেন্দ্রগুলো রীতিমতো কারাগারসদৃশ। ওখানে রোগীদের সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রার্থীদেরও তল্লাশি করা হয়, যাতে আদর বেশে কেউ ওদের মাদক সরবরাহ করতে না পারে। যদিও এসব নিরাময়কেন্দ্রের চিকিৎসাপদ্ধতি ফ্রয়েডের সূত্রের আলোকেই পরিচালিত হয়, কিন্তু রোগীকে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি মাদক পরিহারে তার ইচ্ছেশক্তি দৃঢ় করতে মানসিক কিছু পদ্ধতিও তারা প্রয়োগ করে। ছয় মাস পর্যন্ত লাগাতার নিরাময়কেন্দ্রে রেখে রোগীকে ছেড়ে দেয়, তবে কিছুদিন পরপর ডেকে পাঠাতে থাকে উন্নতি পর্যবেক্ষণের জন্য। এভাবে অব্যাহত চেষ্টার ফলে রোগীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়।
একটি বাচ্চা অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর মরফিয়া২০ সেবনকারী এক ব্যক্তি পাঁচ বছর কারাগারে বন্দি থাকে। সে কারাগারে অনেক ভালো আচরণ করেছে। সেখানে নিয়মিত নামাজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে সে, নেশা করাও ছেড়ে দেয় পুরোপুরি। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর আস্তে আস্তে নামাজে গাফলতি বাড়তে থাকে, ছোটো হতে থাকে দাড়ি, একপর্যায়ে মাথা চাড়া দেয় পুরোনো নেশার অভ্যাস। অবশেষে পুরোদমে মরফিয়া সেবন শুরু হয়ে যায়। একবার অত্যধিক পরিমাণে ভাং সেবনের পর মরফিয়ার টিকা নেয় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে।
এ তরুণ তার মামলার শুনানি থেকে সাজা ঘোষণা পর্যন্ত সময়ে নেশা করেনি। কিন্তু যখনই মুক্তি পেল, মিলিত হলো পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে, পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেতে একদমই অসুবিধা হয়নি তার! কারণ, মাদকদ্রব্যের বিষয়ে ইসলামের অবস্থান সম্পর্কে কেউ তাকে সতর্ক করেনি। এটা সত্য যে, ইবাদতে সে প্রশান্তি খুঁজে পেত। কিন্তু দ্বীন-ধর্মের সঙ্গে তার যেটুকু সম্পর্ক, ইবাদতের প্রতি যতটা নিষ্ঠা-তা ইসলাম সম্পর্কে একদম না জেনেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে তার যে বিষয়টি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো-যতদিন সে নামাজ পড়েছে, ইসলামের প্রতীক দাড়ি রেখেছে, ততদিন সে মাদকের টিকা নেয়নি। কিন্তু বিপথগামী বন্ধুদের সংশ্রবে পুনরায় পথভ্রষ্ট হওয়ার আগে প্রথমেই ইসলামের বিধানগুলো ছেড়ে দেয় সে।
মাদকাসক্তি নিরাময়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম বড়ো কারণ, মদ্যপানকে মানুষের খারাপ দৃষ্টিতে না দেখা। তাদের নীতি অনুসারে কেবল হিরোইন, ডাং, আফিমই হলো খারাপ জিনিস। এই ধরনের দ্বিমুখী নীতি কোনোভাবেই সফল হতে পারে না। এমন প্রতারণামূলক দ্বিমুখী নীতির উজ্জ্বল উদাহরণ ব্রিটেন ও ফ্রান্স। তারা চীনকে বাধ্য করেছে তাদের কাছ থেকে আফিম কিনতে। অথচ চীনে সরকারিভাবে আফিমের চাষাবাদ, বিপণন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! কিন্তু ব্রিটিশ ও ফরাসি মাদক ব্যবসায়ী আর মাফিয়া সিন্ডিকেট ভারত ও তিব্বত থেকে আফিম আমদানি করে চীনে জবরদস্তিমূলক পন্থায় বিক্রয়-বিপণন করতে চায়। এই নোংরা উদ্দেশ্য সফল করতে তারা ১৮৩৯-৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিন বছরব্যাপী রীতিমতো যুদ্ধ করে গোটা চীনকে পরিণত করে আফিমরাজ্যে। এখনও তারা পাকিস্তানে বিভিন্ন মাদকের উৎপাদন বন্ধে চাপ প্রয়োগ করে, কিন্তু আজ পর্যন্ত নিজেদের দেশে হেরোয়িন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেনি।
একবার আমেরিকায় মদ নিষিদ্ধ করার পর লোকেরা গ্রামে মদ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে কানাডা থেকে আমদানি শুরু করে। ভারতে মুম্বাইয়ের প্রাদেশিক সরকারও একবার এমন ব্যর্থ পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রশ্ন হলো-একজন সাধারণ মানুষকে আপনি কোন কারণে মাদক থেকে বিরত থাকার কথা বলবেন? তার ভাং সেবনের ইচ্ছে হলে আপনি তাকে বিরত রাখতে চাইছেন কোন যুক্তিতে? স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার বিষয়টি বলতে চাইলে সিগারেটের ঘটনা ঘটবে। সরকার একদিকে সিগারেটের প্যাকেটে তার ক্ষতির ব্যাপারে সতর্কবাণী উল্লেখ করবে, আবার গণমাধ্যমসহ সর্বত্র দিয়ে রাখবে সেই সিগারেটেরই বিজ্ঞাপন প্রচারের অবাধ অনুমতি ও সুযোগ। সরকারের এমন দ্বিচারী আচরণই তামাকবিরোধী সকল তৎপরতায় পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মাদকের অপকারিতাকে পৃথিবীতে সবার আগে গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র জীবনাদর্শ, যা ১৪০০ বছর আগে অসামান্য দূরদর্শিতায় দেখতে পেয়েছে-মাদকাসক্ত কোনো লোক সমাজের একজন কল্যাণসহায়ক সদস্য হতে পারে না। কাজেই সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই মানুষকে মাদক থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। মানবমনের সবচেয়ে বড়ো বিশেষজ্ঞ মহানবি মুহাম্মাদ -এর মাদক প্রতিরোধের ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলোর সারবস্তু হলো-
• প্রত্যেক নেশার বস্তুই হারাম।
• যে জিনিস বেশি পরিমাণ খেলে নেশা হয়, তার অল্প পরিমাণও নিষিদ্ধ।
• মাদক পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও শত্রুতার জন্ম দেয়।
• মাদকসেবী বস্তুপূজারির মতোই কাফির।
• যে ব্যক্তি মাদকাসক্ত অবস্থায় তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করল, কিয়ামতের দিন মুসলমানদের সঙ্গে তার হাশর হবে না। যে ব্যক্তি তওবা ভঙ্গ করে পুনর্বার মাদক সেবন করেছে, আল্লাহ্ তার পুঁঁজ পান করাবেন।
• মাদকদ্রব্য কখনো ওষুধ হতে পারে না। এর মাধ্যমে চিকিৎসা তো হয়-ই না: বরং এটি নিজেই একটি রোগ।
• মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি প্রতিটি ধাপে যারা কাজ করে, তারা প্রত্যেকেই অভিশপ্ত।
• মাদকদ্রব্য বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগকারী যেন গণিকার উপার্জিত অর্থসম্পদ ভোগ করছে।
ইসলাম একটি বাস্তব ও জীবনমুখী ধর্ম। তার শিক্ষা ও দাবিসমূহ সরল, স্পষ্ট এবং কল্যাণকর। ইসলাম কাউকে কোনো মন্দ বিষয়ে বারণ করার পরিবর্তে তার মনোজগতে সেই বস্তুর কুফল সম্পর্কে মৌলিক ধারণা গেঁথে দিতে চায়। ইসলাম চায়, বছরে এক মাস রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ ধৈর্য ও সংযমের দীক্ষা লাভ করুক। একজন মানুষ যদি রমজানের চাঁদ দেখেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পুরো দিন ক্ষুধার্ত থাকতে পারে, তাহলে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে সে নেশাদ্রব্য ছাড়তে পারবে না কেন?
আসক্তি ছাড়ানোর জন্য কোনো মুসলমানকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে রাখা ও ঘুমের ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। মন্দ অভ্যাসের ক্ষতি সম্পর্কে তার মানসিকতা গড়ে উঠলে বাড়তি পরিশ্রম ছাড়াই সে সেটা ছাড়তে পারে। কোনো মুসলমান মনে-প্রাণে আল্লাহর ভালোবাসায় মন্দ অভ্যাস, এমনকী নেশা পরিত্যাগ করতে চাইলে তা সহজেই সম্ভব। Withdrawl Symptoms তাদের হয়, যাদের হৃদয় ঈমানশূন্য।
নিজের প্রভু ও তাঁর রাসূলের বিধান ও নির্দেশনা শোনার পরও কেউ মাদক না ছাড়লে, আল্লাহর জিকিরে তার অন্তরে প্রশান্তি অনুভূত না হলে, নামাজের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস গড়ে না উঠলে বুঝতে হবে, তার নিয়্যাত ও ইচ্ছাতে গোলমাল আছে। এমন লোকের ক্ষেত্রে সাফল্য আসবে শারীরিক শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। রাসূলের যুগে মদ্যপানের শাস্তি ছিল ২০-৪০টি দোররার আঘাত। আলি (রা.)-এর আমলে বিষয়টি অন্যভাবে পুনর্বিবেচনা করা হয়। মাদক সেবনের পর নেশার ঘোরে গালিগালাজ করা ও আবোল-তাবোল বকাঝকা অনিবার্য বিষয়। ফলে মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে না বলে অন্যকে গালি দেওয়া ও অশোভন আচরণের দায়ে অপরাধীকে দোররা মারার শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এতে তার বিশাল বিস্তৃত রাজ্যে মদ্যপানের মামলা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
টিকাঃ
২০. মরফিয়া (Morphia): আফিম থেকে প্রস্তুত বেদনা নাশক ও নিদ্রাকারক একটি ওষুধ।