📄 ইসলামে তালাকের বিধান
নবিজি বলেন-আল্লাহর পক্ষ থেকে বৈধকৃত বস্তুসমূহের মধ্যে তালাক এমন এক জিনিস, যাতে তিনি সন্তুষ্ট নন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি অভিশপ্ত; এমনকী এ পর্যন্ত বলা হয়েছে-দম্পতির মধ্যে সমঝোতা, প্রীতি ও হৃদ্যতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা পর্যন্ত বৈধ। স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের প্রতি সঠিকভাবে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে, বিপথগামিতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়, সারাজীবন কখনো উভয়ের মাঝে ঝগড়া হওয়ার আশঙ্কাই নেই। প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক কর্তব্য হলো-স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সমঝোতা স্থাপনে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করা। এমনকী দম্পতির মাঝে ফাটল সৃষ্টিকারী ব্যক্তি খারিজ হয়ে যেতে পারে ইসলামের গণ্ডি থেকে।
তালাকের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন যেসব শর্তারোপ করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো-একটি তালাক দিয়ে স্বামী এক মাস অপেক্ষা করবে। এরপর দ্বিতীয় তালাক দেবে। এভাবে পরবর্তী এক মাসের ব্যবধানে তৃতীয় তালাক দেবে। তালাকগুলোর মাঝখানে এভাবে কিছুদিনের বিরতি নেওয়ার কারণ হলো- প্রকৃতপক্ষে শয়তান তাদের উভয়ের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে থাকলে ঠান্ডা মাথায় ভাবনার একটা অবকাশ পেয়ে যাবে। সূরা বাকারা, সূরা নিসা, সূরা আহজাব ও সূরা আন-নূরে এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ বিধান বর্ণিত হয়েছে। এর সারকথা হলো-
ক. তালাক সময়ের বিরতি নিয়ে দিতে হবে।
খ. এ বিরতি নির্ধারিত হবে মাসের হিসাবে।
গ. অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে স্ত্রীর ঋতুস্রাব বন্ধ থাকলে তালাক কার্যকর হবে না।
ঘ. তালাকের সঙ্গে অনাদায়ী মোহরানা পরিশোধ করে দিতে হবে।
ঙ. সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় স্বামী তার স্ত্রীকে যা দিয়েছে, তা ফেরত নেওয়ার বৈধতা নেই।
চ. তালাকের পর কিছুদিন স্বামীর ঘরে স্ত্রী অপেক্ষা করবে, যাতে সে অন্তঃসত্ত্বা কি না তা নির্ণয় করা যায়।
হ. চূড়ান্তভাবে তালাক পতিত হওয়ার পর সেই স্ত্রীকে উক্ত স্বামী কেবল তখনই পুনর্বার বিয়ে করতে পারবে, যদি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে এই মহিলার বিয়ে হওয়ার পর সেই স্বামী তাকে স্বেচ্ছায় তালাক দেয়। কিছু লোক এই কঠিন শর্ত এড়ানোর জন্য নানাবিধ ছলচাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে। ইসলামে সেসবের ন্যূনতম স্থান নেই।
স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মাঝে অবিশ্বাস ও অনাস্থা জন্ম নিলে তা দূর করা সহজ নয়। নবি -এর যুগে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগ পেশ করে। তার কাছে সাক্ষী ছিল না, কিন্তু সে কয়েকবার শপথ করে। একইভাবে তার স্ত্রীও শপথ করে তা অস্বীকার করে। আল্লাহর রাসূল উভয়পক্ষের এই শপথকে তালাক হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং দুজনের বিচ্ছেদ অনুমোদন করেন।
এ ধরনের ঘটনা মানুষের পারস্পরিক বৈরী সম্পর্ক ও সন্দেহের চূড়ান্ত রূপ। স্বামী তার স্ত্রীর ওপর আস্থার বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, অভিযোগটি প্রমাণিত হলে ইসলামি দণ্ডবিধি মতে তার প্রাণদণ্ডের ফয়সালা হতে পারে। স্ত্রী শপথ করে সেই অপরাধ অস্বীকার করেছে এমন এক কোর্টে, যেখানে সত্য ও মিথ্যা জানার ব্যবস্থা আছে-সে আদালত মানুষের সঙ্গে আচরণে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ আদালতের বিচারকের সঙ্গে আসমানের সুপ্রিম জাজ-এর এমন সংযোগ রয়েছে, চাইলে তিনি দুপক্ষের মধ্যে কে মিথ্যা শপথ করল তা প্রকাশ করে দিতে পারেন। তারা যেন মিথ্যা শপথ না করে, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। কারণ, তার পরবর্তী যুগের আদালতগুলোর তো সেই সুযোগ থাকবে না! তাই সেই মামলায় রায়ে অন্যান্য সাধারণ আদালতের মতোই।
দুপক্ষের সম্পর্কের অবনতি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। উভয়ের মাঝে সমঝোতা করে দিলেও পারস্পরিক অনাস্থা ও তিক্ততা তাদের মনে ঘুরপাক খেতে থাকত। এভাবে অনাগত দিনগুলো ঝগড়া ও বৈরিতার মধ্য দিয়েই অতিক্রমণের আশঙ্কা ছিল প্রবল। আজকের আধুনিক দুনিয়ার বিচারেও উক্ত সমস্যা ভালো সমাধান হিসেবে বিচ্ছেদের ফয়সালাকে বেছে নেওয়া হয়।
📄 বিয়েকেন্দ্রিক জটিলতার সমাধান
বিবাহের পর যে দম্পতিদের মানসিকতা, স্বভাব-রুচি মিলে যায়, তাদের ঘরটি ছোট্ট জান্নাতে পরিণত হয়। এর বিপরীত হলে জাহান্নাম! আগেকার সময়ে স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা না হওয়ার কারণ ছিল দুজনের স্বভাব-রুচির বৈপরীত্য। আর আধুনিক যুগে বৈরিতার অনুঘটক ব্যাপক-আলাদা আলাদা উদ্দীপকের সংখ্যা প্রচুর। মানুষ এখন বিয়ের সময় পাত্রীর মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তে তার সম্পদের খোঁজখবর নেয়।
একটি নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল নারী। তার সঙ্গে যেই দুই-চারটে কথা বলার সুযোগ পায়, ইনিয়ে-বিনিয়ে কেবল তার রূপৈশ্বর্য ও পোশাকের প্রশংসা শুরু করে দেয়। প্রশংসায় বিরক্ত হয়ে তাদের থামিয়ে দিয়ে সে বলে ওঠে-'আমার রূপ, উন্নত চরিত্র প্রভৃতি বিষয়ে আমি ওয়াকিবহাল; নতুন কিছু বলার থাকলে বলো।' আরেক ব্যক্তি বলল-'আমি এসবে আকৃষ্ট নই; বরং পত্রপত্রিকায় সম্পদের পরিসংখ্যান জেনেছি। আপনার প্রাসাদোত্তম বাড়ির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এখানে এসেছি।' এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং অনেক মানুষ বয়স্ক মহিলাদের সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য বিয়ে করে। তারা গোপনে অনৈতিক জীবনযাপনের পাশাপাশি স্ত্রীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার অপচেষ্টায় এমন এক জীবনযাপন করে যাকে 'বিয়ে' অভিহিত করাও অনুচিত।
আজকাল দাম্পত্যকলহ এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, সংসার টিকবে কি না, সেটাই চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বহু মানব উন্নয়ন সংস্থা ও ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগ দম্পতিদের কাউন্সিলিংয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দাম্পত্যকলহ ও তার সমাধান বিষয়ে একটি বই লিখেছেন ভিয়েনা ইউনিভার্সিটির বিয়ে ও তদসংক্রান্ত বিষয়াদির গবেষণা কেন্দ্রের কনসালটেন্ট সনি লিজার্ড। সেখানে তিনি সমস্যা চিহ্নিত করে নিজের মতো সমাধান পেশ করেছেন বটে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে তাতে গুঁজে তিনি রগরগে সব শিরোনাম।
নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই নিজের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার। তবে অধিকারের সঙ্গে যে দায়িত্বও যুক্ত থাকে, সে কথা বলাই বাহুল্য। এসব দায়িত্বের বিষয়ে কোনো নীতিমালা নির্ধারিত নেই। প্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচলিত রীতি হলো- স্বামী আয়-উপার্জন এবং নারীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত। অন্যদিকে মহিলাদের কাজ ঘর সামলানো, সেলাই, রান্নাবান্না, সন্তানের প্রতিপালন ও মেহমানদারির বিষয়গুলো আঞ্জাম দেওয়া।
সামাজিক প্রয়োজন ও জীবনাযাত্রার নানাবিধ সংকট মোকাবিলায় মেয়েরাও এখন চাকরি করছে। সকালে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বেরিয়ে যাচ্ছে কাজের উদ্দেশে। আর তাদের অবর্তমানে ঘরের কাজ ও বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য থাকে একজন পরিচারিকা। এভাবে দিনভর কাজ করে পরিশ্রান্ত শরীরে বাড়িতে আসার পর কোনো কাজে ব্যবহারিকভাবে মনোনিবেশ সম্ভব হয় না। চাকরিজীবী দম্পতির বাচ্চারা কাজের লোক ও গৃহপরিচারিকার তত্ত্বাবধানে বড়ো হতে থাকে। এরপর বড়ো হয়ে ছেলেমেয়েরা নৈতিকভাবে বিপথগামী হলে, অপরাধে জড়িয়ে পড়লে, মা-বাবাকে সম্মান না করলে তার জন্য সন্তানদের কতটুকুই-বা দায়ী করা চলে! কারণ, তারা সুসন্তান হিসেবে গড়ে উঠার জন্য না মায়ের কাছে শিক্ষা পেয়েছে, না পেয়েছে বাবার স্নেহ।
ব্রিটেনের লোকদের সাধারণত একটি শখ ও বাসনা থাকে, তাদের বিয়ে যেন হয় ক্যাক্সটন হলে। দিনে কয়েক ডজন বিয়ে হয় এ কমিউনিটি সেন্টারের মধ্যে। বিবাহ বিচ্ছেদের আধিক্যে কোণঠাসা হয়ে Poval commission on marriage & divorce নামে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করেছে ব্রিটিশ সরকার। দেশটির লর্ড চিফ জাস্টিস গোডরিড-এর নেতৃত্বে গঠিত এ কমিশনে আইনজীবী, মনোবিদ, মানব উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের একদল শীর্ষ ব্যক্তি দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই কমিশন দীর্ঘ সময় যাবৎ ক্যাক্সটন হলে বসে বিভিন্ন বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানকালে সংশ্লিষ্ট লোকদের কাছ থেকে তাদের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া নিতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে তাদের জিজ্ঞাসার জবাবে ডা. খালেদ গজনভি তাদের পরামর্শ দেন, তারা যেন এতৎসংক্রান্ত সবগুলো সমস্যাকে ইসলামি দৃষ্টিকোণে বিচার করেন। কমিশন ডা. গজনভির সাথে ইসলামি নীতিমালার ধরন, বৈশিষ্ট্য, উপকারিতা প্রসঙ্গে টানা দুই দিন আলোচনা করেন। তাদের জানানো হয়েছে-
১. বিয়ে যেন ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পন্ন করা হয়, যাতে উভয়ের মনে এ উপলব্ধি কাজ করে যে, বিয়ের বন্ধনটি আইন ও বিধানের আলোকে সম্পাদিত কাজ।
২. স্ত্রীর অধিকারগুলো চিহ্নিত
৩. স্বামীর জন্য সংসারের পরিচালনা ও ব্যবস্থাগত নেতৃত্ব স্বীকৃত থাকবে।
৪. বাড়িতে পরপুরুষ ও পরনারীর অবাধ আনাগোনা ও আড্ডা অপরাধ বলে গণ্য হবে।
৫. তালাক আদালতে না হয়ে নিষ্পত্তি হবে নিজেদের পারিবারিক বৈঠকে। এরপর কোনো জটিলতা তৈরি হলে তার জন্য বিশেষ আদালত কাজ করবে। সৌদি আরবে ইসলামি আইনের আলোকে পারিবারিক বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য আদালতের বিচারক এজলাসের বাইরে আলাদাভাবে বসেন। সেখানকার আদালতে পারিবারিক বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করার জন্য কোনো দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন পড়ে না। সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখে অভিযোগ পেশ করা যায় অনায়াসেই। আদালতের পেশকার দরখাস্ত গ্রহণ করার পরপরই ফোন করে বা থানার মাধ্যমে হাজির করা হয় বামদিকে। দুই পক্ষের কথা শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে ফয়সালা দেওয়া হয়।
নবি -এর নির্দেশিত বিয়ের রীতি-পদ্ধতি, আচার-অনুষ্ঠান, অধিকার, কর্তব্য প্রসঙ্গে প্রত্যেকটি বিষয় এত স্পষ্ট যে, দাম্পত্যজীবনের জন্য তা কেবল উপকারী আর সহজতর নয়; বরং আজকের আধুনিক জীবনধারার ক্ষেত্রেও তা একই রকম কল্যাণকর। মানুষের সাইকোলজি ও মনস্তত্ত্বকে সামনে রেখে তিনি এমনভাবে সমান কল্যাণবহ নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যাতে কোনো পক্ষেরই আপত্তি থাকার সুযোগ নেই।