📄 ইসলামে বিয়ে ও তালাকব্যবস্থা
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে বিয়ে-শাদির রীতিবিষয়ক আলোচনায় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এর কোনো পন্থাই সমাজের চাহিদা মোতাবেক পরিগঠিত নয়। ফলে মানুষ বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে নিজ ধর্মের বিপরীত দিকে হাঁটছে। ইসলাম মানুষের জীবনবিধান ও যুগের চাহিদার মাঝে বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় করতে পেরেছে বলেই তা বরাবরই কালোত্তীর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলাম সবার আগে নাকচ করে দিয়েছে অনুসারীদের দ্বারা পুরোনো ধর্মবিশ্বাসগুলোর বিকৃতি। হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মচারী, বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষু, সাধু ও খ্রিস্টান ধর্মের পাদরিরা বিয়ে করে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সকল নবি-রাসূল বিয়ে করেছেন, দুনিয়াতে তাঁদের সন্তানাদিও ছিল। আনাস (রা.) বলেন-
'এক মজলিশে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন। এর মধ্যে একজন বললেন-"আমি কখনো বিয়ে করব না।" আরেকজন বললেন-"আমি সব সময় সালাত পালন করতে থাকব, কখনো ঘুমাব না।" আরেকজন বললেন-"আমি সারা বছর রোজা রাখব।" এ ধরনের কথাবার্তা রাসূল -এর কান পর্যন্ত গেলে তিনি বললেন-"কী ব্যাপার! লোকেরা এগুলো কোন ধরনের কথা বলছে! আমি নিজে তো রোজাও রাখি, আবার রোজাবিহীনও দিন যাপন করি। নামাজও আদায় করি, ঘুমাই, বিশ্রামও করি-বিয়ে-শাদিও করি। মনে রেখ, যারা আমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
""শহ্মসি এ মুসলিম
সাহাবিদের মধ্যে যাদের বিয়ে হয়নি, তাঁদের বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন-
'তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন উচিত তাকে দেখা। এটা বিয়ের প্রতি ধাবিত করবে।' আবু দাউদ
এটা ছাড়াও আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে একটি হাদিস মুসলিম ও নাসায়িতে বর্ণিত হয়েছে-
'এক লোক ও এক আনসারি মহিলার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হলো, যেন ভালোভাবে দেখে নেয়। কারণ, আনসারি মহিলাদের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক ত্রুটি থাকে।'
মুগিরা (রা.)-এর সূত্রে অনুরূপ ভাবব্যঞ্জক আরেকটি হাদিস তিরমিজি ও নাসায়িতেও বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসে বিয়ে-শাদির চেষ্টায় আছে এমন এক ব্যক্তিকে বলা হয়েছে, বিয়ের আগে যেন পাত্রীকে দেখে নেয়। এটি পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে ভালোবাসা গড়ে উঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
পাত্রীকে বিয়ের আগে দেখা তখনই উপকারী হয়, যখন পরস্পর সম্পর্কে কোনোরূপ পূর্ব ধারণা না থাকে। ইউরোপে মেয়েদের সম্পর্কে পুরুষদের জানাশোনা থাকা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। অনুরূপভাবে পুরুষদের বিষয়ে জানাশোনাও মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের পছন্দ সাধারণত যথাযথই হওয়ার কথা। কারণ, তারা একে অন্যের সম্পর্কে এমনকী পরস্পরের ঘরবাড়ি, চলন-বলন ইত্যাদির ব্যাপারেও সম্যক অবগত। কাজেই পরস্পর সম্পর্কে তথ্য জেনে নেওয়া সহজ ও স্বাভাবিক হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবতা কখনো এতটা সরল হয় না। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে তৈরি হয় বড়ো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি। অবজ্ঞা করা, খোঁটা দেওয়া ছাড়াও প্রায়শই বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ ওঠে উভয়পক্ষ থেকে। প্রায় ৫০% বিয়ে এভাবে ভাঙনের কবলে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা গড়ায় কোর্ট-কাচারি অবধি। যাদের আনুষ্ঠানিক তালাক হয় না, তারা একই ছাদের নিচে দিনের পর দিন বাস করতে থাকে নিতান্তই অপরিচিতের মতো। আগেভাগে ভালোমতো পরস্পরের জীবনধারা, রুচি, মানসিকতা ইত্যাদি জেনে নেওয়া সম্বন্ধগুলোতেও বিয়ে টিকে যাওয়ার হার ২৫%-এর বেশি নয়।
ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীকে দেখে নেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু সেটা তো ওই সমাজের জন্য প্রযোজ্য-যেখানে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে সাধারণত উঠাবসা, যোগাযোগ ও সম্পর্ক থাকে। পন্থা তখনই সুফলদায়ক,
📄 ইসলামে বিয়ের আয়োজন ও অন্যান্য কাজ
যখন আপনি ইসলামি সমাজে অবস্থান করে পাত্রী নির্বাচন করবেন এবং বিরত থাকবেন গায়রে মাহরামের সংস্পর্শ থেকে। ইসলামে বিয়েসংক্রান্ত বিষয়াদি এতটাই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ যে, পাত্র-পাত্রীর সম্মতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার খোদ পিতারও থাকে না। বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রীর সম্মতি জেনে নেওয়া জরুরি। যদি এমনটি না হয়, তবে বিয়ে (فسخ) অকার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে স্বভাবজাত লাজুকতার কারণে আল্লাহর রাসূল মেয়েদের নীরবতাকে বিবেচনা করেছেন সম্মতির লক্ষণ হিসেবে। এর প্রায়োগিক দৃষ্টান্ত মেলে নবিজির জীবনপরিক্রমায়-
আল্লাহর রাসূল তাঁর কন্যাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে করলে পর্দার অন্তরাল থেকে তাঁদের সম্বোধন করে বলতেন-'অমুকের পুত্র অমুক তোমার ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে।' ওপাশ থেকে তাঁর কন্যা পর্দা নাড়িয়ে বা দরোজায় টোকা দিয়ে মতামত জানালে তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁকে বিয়ে দিতেন না। আর কন্যা নীরব থাকলে সেই প্রস্তাবে সায় দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। ১৬
আবদুল্লাহ ইবনে বারিদা (রা.) বর্ণনা করেন, নবিজির কাছে এক কুমারী মেয়ে এসে নালিশ করল-
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাবা তার ভাতিজার সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার সঙ্গে পরামর্শ করেনি। নিজের বিয়ের ক্ষেত্রে আমার কি কোনো এখতিয়ার আছে?' আল্লাহর রাসূল বললেন- 'হ্যাঁ, অবশ্যই তোমার এখতিয়ার আছে।' অতঃপর সেই মহীয়সী বললেন-'পিতার সিদ্ধান্তটি নাকচ করতে চাই না, কিন্তু নারীজাতির জন্য সেই অধিকার রয়েছে কি না, তা জেনে নিতে চেয়েছি।'
অনুরূপ একটি বর্ণনা পেশ করেছেন ইয়াহইয়া ইবনে কাসির। সে বর্ণনায় সম্মতি ছাড়া একটি কুমারী মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর তা মুলতবি করে দেওয়া হয়।
মুহাম্মাদ ইবনে হাতিব (রা.) বর্ণনা করেন-
'হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য কেবল ঢোল ও আওয়াজ।' তিরমিজি ও নাসায়ি
বিয়ে-শাদির আয়োজনে ঢোল বাজানো আর গান প্রসঙ্গটি ইসলামের মৌলিক বিধানের সঙ্গে যুক্ত। তখনকার যুগে ঢোলের একপাশে পর্দা অন্যপাশে খোলা থাকত। তৎকালে এর নাম ছিল 'দফ'। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ বর্ণনা করেছেন-
'তোমরা বিয়ের খবর ভালোমতো ছড়িয়ে দাও। বিয়ে পড়াবে মসজিদে, আর এ উপলক্ষ্যে ভালোমতো দফ বাজাও।' তিরমিজি
এখানে দফ শব্দের বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, তোমরা বিভিন্ন রকমের ঢোল বাজাও। খোলা মজলিশে বিয়ে পড়ানো হলে ঢাকঢোল পিটিয়ে যে বিয়ে হবে, স্বাভাবিকভাবে তা সব মানুষ জানবে। এত লোকের জানাজানির মাধ্যমে যে বিয়ে হবে-তা অস্বীকার করা বা ভেঙে দেওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়।
বিয়ের মজলিশে কনের সম্মতি পাওয়ার পর খুতবা পাঠ করা হয়। খুতবায় উচ্চারিত হয় আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর তাওহিদের ঘোষণা। এরপর পাঠ করা হয় কুরআন মাজিদের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ। সেসব আয়াতে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নারীদের প্রতি সদাচরণের ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুরুষদের। বরের কাছ থেকে তিনবার স্বীকৃতি নেওয়ার পর উপস্থিত লোকেরা তাদের অভিনন্দন জানায়, দুআ করে। শরিয়তের উক্ত কার্যাবলি সম্পাদনের পর মিষ্টি ও খেজুর বিতরণ ও বিবিধ আপ্যায়নের মাধ্যমে শেষ হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।
ইসলামে বিয়ে উপলক্ষ্যে খাবারের আয়োজন সম্পর্কিত বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। কনের পিতা তার কন্যার নতুন সংসারজীবন শুরুর প্রেক্ষাপটে কোনো জিনিসপত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে চাইলে সেটা ঐচ্ছিক এবং বৈধ। এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে যে হাদিয়া দিয়েছিলেন, তা অনুকরণীয় আদর্শ। সেই উপঢৌকনের মধ্যে সংসারের ব্যবহার্য আসবাবের প্রায় সবই ছিল। যেমন: আটা পেষণের জাঁতা, কলসি, পানি রাখার মশক ইত্যাদি।
এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে নগদে/রকেটে/বিকাশে কনের হাতে কিছু অর্থসম্পদ দেওয়া বরের জন্য জরুরি। আলি (রা.)-এর কাছে কোনো নগদ অর্থ না থাকায় তাঁর বর্মটি পেশ করা হয় মোহর হিসেবে। আবার আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন অভিজাত এবং বিত্তবান। তিনি স্ত্রীকে মোহরানা দিয়েছিলেন এক কাঁদি খেজুর সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে। আরেক ব্যক্তি যিনি একেবারে শূন্য ছিলেন, তাঁর মোহরানা ছিল স্ত্রীকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া। কেননা, ইসলামে শিক্ষার মূল্যমান সব সময়ই যেকোনো অর্থকড়ি ও সম্পদের চাইতে বেশি।
বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দিদের মুক্তিপণ নির্ধারিত হওয়ার পর যাদের কাছে পরিশোধের মতো কোনো অর্থকড়ি ছিল না, তাদের জন্য মুক্তিপণ সাব্যস্ত করা হয়েছিল মুসলমানদের সন্তানদের শিক্ষাদান। বিয়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হলো সুন্নাহসম্মত ওলিমা অনুষ্ঠান। সাফিয়া (রা.)-এর ওলিমা উপলক্ষ্যে রাসূল লোকজনকে আপ্যায়ন করান পনির (Cheese) দিয়ে। এরপর পরিবেশন করা হয় ঘি আর হালুয়ার মিশ্রণে সুস্বাদু এক বিশেষ ধরনের খাবার। জয়নাব (রা.)-এর বিয়েতেও মানুষকে পেটপুরে খাওয়ানো হয়। নবিজি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে নির্দেশনা দিয়েছেন-তিনি যেন অবশ্যই ওলিমা করেন; নিদেনপক্ষে একটি ছাগল দিয়ে হলেও। মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নগরীর আগামীদিনের গভর্নর আবু উসাইদ (রা.)-এর ওলিমায় আল্লাহর রাসূল নিজে শরিক হয়েছেন। তাঁর খেদমতে দুলহান প্রথমে খেজুর আর পানি পাঠিয়ে দেন, এরপর পরিবেশন করা হয় সুস্বাদু খাদ্যসম্ভার।
📄 নবিজির ম্যারেজ কাউন্সিলিং ও নারী অধিকার প্রসঙ্গ
স্ত্রীকে ভালোমানের ভরণ-পোষণ দেওয়া প্রত্যেক স্বামীর একান্ত কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে আয়িশা (রা.)-এর কাছে কয়েকজন মহিলার অভিযোগ বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
'মহিলারা গোমরা মুখে এবং জীর্ণশীর্ণ পোশাকে হাজির হয়ে বলল- “আমাদের স্বামীরা সব সময় আপনার স্বামীর দরবারে বসে থাকে। তাঁদের নিজেদের আয়-রোজগার ও নামাজ-কালামের ব্যস্ততায় এটুকুন ফুরসত মেলে না যে, আমাদের দিকে মনোযোগ দেবেন।" কথাটি রাসূলের কানে যাওয়ার পর তিনি একান্ত বৈঠকে পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন-স্ত্রীদের প্রয়োজন ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে যেন যথাযথ দায়িত্বশীল আচরণ করা হয়। অল্প কিছুদিন পর সেই মহিলাগণ বেশ দামি পোশাক ও অলংকারাদিতে সজ্জিত অবস্থায় আয়িশা (রা.)-এর কাছে আসেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে রুপার কাঁকন পরিয়ে দেন।'
স্ত্রীদের প্রতি যত্নবান হওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ চূড়ান্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এমনকী মৃত্যুকালেও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন স্ত্রীদের প্রতি দায়িত্বশীলতার কথা। উমর (রা.) একবার তাঁর কাছে অনুযোগ করলেন- 'আগে তো আমরা স্ত্রীদের ডান্ডার দাপটে সোজা রাখতাম! এখন আপনার নির্দেশের ফলে তাঁরা এত সাহসী হয়ে উঠেছে যে, আমার স্ত্রী পর্যন্ত আমার কাছে তাঁর প্রাপ্য ও দাবি-দাও করে!'
অসদাচরণ ছাড়া স্বামীর জন্য স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার অনুমতি নেই। নবিজি -এর কাছে যখনই কোনো মেয়ে অভিযোগ নিয়ে আসত, তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতেন তিনি; বরং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় বললে-রাসূল সর্বোত্তম পন্থায় ম্যারেজ কাউন্সিলিং করতেন। এর মধ্যে এমনসব শিক্ষা ও নির্দেশনা থাকত, যা অনাগত প্রজন্মের দাম্পত্যজীবনকে করে তুলবে আনন্দঘন ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। বর্ণিত আছে-
'এক মহিলা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্য থেকে কাকে বিয়ে করবেন, সে বিষয়ে রাসূলের পরামর্শ চাইলেন। তিনি বলেন-“আবু জাহাম কাঁধ থেকে লাঠিই নামায় না। আর মুয়াবিয়া হতদরিদ্র, কাজেই তুমি উসামা ইবনে জায়েদকে বিয়ে করে নাও।' কদিয়াতুর-রাসূল
পৃথিবীর ইতিহাসে ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবব্যবস্থা, যেখানে নারীকে নির্দ্বিধায় তার ইচ্ছে পেশ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বামীর সম্পদের ওপর নির্ধারিত করা হয়েছে তার হক এবং উত্তরাধিকার। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তান আছে এমন স্ত্রী উত্তরাধিকার হিসেবে মোট সম্পদের এক-অষ্টমাংশ পাবে। আর সন্তান না থাকলে পাবে এক-চতুর্থাংশ।
📄 ইসলামে তালাকের বিধান
নবিজি বলেন-আল্লাহর পক্ষ থেকে বৈধকৃত বস্তুসমূহের মধ্যে তালাক এমন এক জিনিস, যাতে তিনি সন্তুষ্ট নন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি অভিশপ্ত; এমনকী এ পর্যন্ত বলা হয়েছে-দম্পতির মধ্যে সমঝোতা, প্রীতি ও হৃদ্যতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা পর্যন্ত বৈধ। স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের প্রতি সঠিকভাবে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে, বিপথগামিতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়, সারাজীবন কখনো উভয়ের মাঝে ঝগড়া হওয়ার আশঙ্কাই নেই। প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক কর্তব্য হলো-স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সমঝোতা স্থাপনে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করা। এমনকী দম্পতির মাঝে ফাটল সৃষ্টিকারী ব্যক্তি খারিজ হয়ে যেতে পারে ইসলামের গণ্ডি থেকে।
তালাকের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন যেসব শর্তারোপ করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো-একটি তালাক দিয়ে স্বামী এক মাস অপেক্ষা করবে। এরপর দ্বিতীয় তালাক দেবে। এভাবে পরবর্তী এক মাসের ব্যবধানে তৃতীয় তালাক দেবে। তালাকগুলোর মাঝখানে এভাবে কিছুদিনের বিরতি নেওয়ার কারণ হলো- প্রকৃতপক্ষে শয়তান তাদের উভয়ের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে থাকলে ঠান্ডা মাথায় ভাবনার একটা অবকাশ পেয়ে যাবে। সূরা বাকারা, সূরা নিসা, সূরা আহজাব ও সূরা আন-নূরে এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ বিধান বর্ণিত হয়েছে। এর সারকথা হলো-
ক. তালাক সময়ের বিরতি নিয়ে দিতে হবে।
খ. এ বিরতি নির্ধারিত হবে মাসের হিসাবে।
গ. অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে স্ত্রীর ঋতুস্রাব বন্ধ থাকলে তালাক কার্যকর হবে না।
ঘ. তালাকের সঙ্গে অনাদায়ী মোহরানা পরিশোধ করে দিতে হবে।
ঙ. সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় স্বামী তার স্ত্রীকে যা দিয়েছে, তা ফেরত নেওয়ার বৈধতা নেই।
চ. তালাকের পর কিছুদিন স্বামীর ঘরে স্ত্রী অপেক্ষা করবে, যাতে সে অন্তঃসত্ত্বা কি না তা নির্ণয় করা যায়।
হ. চূড়ান্তভাবে তালাক পতিত হওয়ার পর সেই স্ত্রীকে উক্ত স্বামী কেবল তখনই পুনর্বার বিয়ে করতে পারবে, যদি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে এই মহিলার বিয়ে হওয়ার পর সেই স্বামী তাকে স্বেচ্ছায় তালাক দেয়। কিছু লোক এই কঠিন শর্ত এড়ানোর জন্য নানাবিধ ছলচাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে। ইসলামে সেসবের ন্যূনতম স্থান নেই।
স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মাঝে অবিশ্বাস ও অনাস্থা জন্ম নিলে তা দূর করা সহজ নয়। নবি -এর যুগে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগ পেশ করে। তার কাছে সাক্ষী ছিল না, কিন্তু সে কয়েকবার শপথ করে। একইভাবে তার স্ত্রীও শপথ করে তা অস্বীকার করে। আল্লাহর রাসূল উভয়পক্ষের এই শপথকে তালাক হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং দুজনের বিচ্ছেদ অনুমোদন করেন।
এ ধরনের ঘটনা মানুষের পারস্পরিক বৈরী সম্পর্ক ও সন্দেহের চূড়ান্ত রূপ। স্বামী তার স্ত্রীর ওপর আস্থার বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, অভিযোগটি প্রমাণিত হলে ইসলামি দণ্ডবিধি মতে তার প্রাণদণ্ডের ফয়সালা হতে পারে। স্ত্রী শপথ করে সেই অপরাধ অস্বীকার করেছে এমন এক কোর্টে, যেখানে সত্য ও মিথ্যা জানার ব্যবস্থা আছে-সে আদালত মানুষের সঙ্গে আচরণে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ আদালতের বিচারকের সঙ্গে আসমানের সুপ্রিম জাজ-এর এমন সংযোগ রয়েছে, চাইলে তিনি দুপক্ষের মধ্যে কে মিথ্যা শপথ করল তা প্রকাশ করে দিতে পারেন। তারা যেন মিথ্যা শপথ না করে, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। কারণ, তার পরবর্তী যুগের আদালতগুলোর তো সেই সুযোগ থাকবে না! তাই সেই মামলায় রায়ে অন্যান্য সাধারণ আদালতের মতোই।
দুপক্ষের সম্পর্কের অবনতি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। উভয়ের মাঝে সমঝোতা করে দিলেও পারস্পরিক অনাস্থা ও তিক্ততা তাদের মনে ঘুরপাক খেতে থাকত। এভাবে অনাগত দিনগুলো ঝগড়া ও বৈরিতার মধ্য দিয়েই অতিক্রমণের আশঙ্কা ছিল প্রবল। আজকের আধুনিক দুনিয়ার বিচারেও উক্ত সমস্যা ভালো সমাধান হিসেবে বিচ্ছেদের ফয়সালাকে বেছে নেওয়া হয়।