📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 খ্রিষ্টান ধর্মে বিয়ে ও বৈরাগ্য

📄 খ্রিষ্টান ধর্মে বিয়ে ও বৈরাগ্য


নতুন-পুরাতন মিলিয়ে বাইবেলের ২১ জায়গায় বিয়ে প্রসঙ্গের আলোচনা এসেছে। তন্মধ্যে নিউ টেস্টামেন্টে এসেছে তিনবার। তবে বিয়ে শব্দটি স্পষ্টভাবে মাত্র একবারই উল্লেখিত হয়েছে। উক্ত জায়গাগুলোতে বিয়ের আপ্যায়ন-উৎসব সম্পর্কে আলোচনা থাকলেও এর বিধিবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বর্ণিত হয়নি। ঈসা (আ.) নিজে বিয়ে করেননি এবং তাঁর জীবৎকালে কোনো সাথিরও বিয়ে হয়নি। ফলে বাস্তবতা হলো-খ্রিষ্টান ধর্মে বিয়ে-শাদি সম্পর্কিত কাঠামোবদ্ধ কোনো আলোচনা নেই। প্রকৃত ঈসায়িগণ ঈসা (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে সারাজীবন চিরকুমার থাকেন। অন্যদিকে, ঈসা (আ.)-এর জীবনচরিত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ বৈরাগ্যবাদকে সম্পূর্ণ নাকচ করে-
'আমি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কোমলতা ও ভালোবাসা শামিল করে দিয়েছি, কিন্তু তাদের ওপর বৈরাগ্য আরোপ করিনি। এটা তারাই বানিয়েছে।' সূরা হাদিদ: ২৭
নিউ টেস্টামেন্টের কোথাও সংসার-বিচ্ছিন্নতা ও বৈরাগ্যের কথা উল্লেখ নেই। কুরআন মাজিদের নির্দেশনা মোতাবেক ঈসা (আ.)-এর পর তাঁর কতিপয় অনুসারী এসব শুরু করে। কথিত আছে, বৈরাগ্যবাদের প্রবর্তক হলেন সেন্ট পল। অথচ নীতিগত সূত্র বিচারে ঈসা (আ.) বলেননি-এমন বিষয় তাঁর নির্দেশনা বলে চালানোর কোনো সুযোগ সেন্ট পলের নেই। বৈরাগ্য অবলম্বনকারী গির্জার সেবক-সেবিকাগণ গির্জাসংলগ্ন হোস্টেলেই থাকেন। শুরু থেকেই পার্থিব জৌলুস, সৌখিনতা ও বিলাসিতা প্রভৃতি বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয় তাদের। মহিলাদের মাথা মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব লোক বছরের পর বছর শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার না করেই কাটিয়ে দেয়। এমন পুরোহিতও পৃথিবীতে ছিলেন, যিনি ২০ বছর পর্যন্ত গোসল করেননি। শরীরের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য উদ্ভাবিত হয় বিশেষ ধরনের পারফিউম।
বৈরাগ্যবাদী পুরোহিত বিয়ে-শাদি করেন না। বিয়ে না করায় তাদের মনন ও মূল্যবোধটা কী ধরনের হবে, সে আলোচনায় আমরা যাব না; তবে জৈবিক চাহিদা মানুষের প্রকৃতির অংশ। একজন ব্রিটিশ গবেষকের মতে-বিয়ে হলো জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ। সুতরাং, কেউ বিয়ে না করলে জীবনরক্ষার বিষয়টিকেই অবজ্ঞা করা হবে। এর ফলে বিকৃত ও কলুষিত হবে তার মন, মস্তিষ্ক ও জীবনাচরণ। অতএব, সুস্থ থাকা জরুরি।
ইসলামের যুদ্ধকালীন এক প্রেক্ষাপটে কতিপয় সাহাবি আল্লাহর রাসূল কাছে বিয়ে-শাদি না করে চিরকুমার অবস্থায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবিজি সেটা নাকচ করে দিয়ে বলেন-'ইসলাম বৈরাগ্যবাদ শিক্ষা দেয়নি।' আমরা সমাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন নির্বাহ করব, মানুষের সামনে তুলে ধরব সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার সর্বোত্তম জীবনাদর্শ।
বৈরাগ্যবাদ মনুষ্যস্বভাব ও মানবীয় চাহিদার (Biological Necessities) পরিপন্থি। ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই এটা সফল হতে পারেনি; বরং খ্রিষ্টান সমাজেও এটি কেবল রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কানাডার বিখ্যাত চিকিৎসক উইলিয়াম বায়েড তার চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থে লিখেছেন- 'রাতে গির্জাগুলো থেকে যেসব গোঙানি আর আর্তনাদ ভেসে আসে, তা উপাসনা আর প্রার্থনার নয়; বরং পাদরিরা শরীরে যেসব জৈবিক রোগ পুষে রেখেছে, তার যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট চিৎকার।'
খ্রিষ্টধর্মে বিয়ের বিধিবদ্ধ রীতিতে সাধারণত গির্জার আঙিনায় পুরোহিতের সামনে দাঁড়িয়ে পাত্রকে অঙ্গীকার পাঠ করানো হয়। তাতে পোপের নিকট শপথ করতে হয়-
'আমি অমুকের পুত্র অমুক এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করছ যে, সুস্থতায়-অসুস্থতায়, সুসময়ে-দুঃসময়ে, আনন্দে-বিষাদে, সর্বাবস্থায় অমুককে স্ত্রী হিসেবে কবুল করছি।'
বর তিন দফা এই প্রতিজ্ঞা পাঠ করার পর অনুরূপ প্রশ্ন কনেকেও তিনবার জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর পাদরি ঘোষণা করেন-'আমি আল্লাহ, তাঁর পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে তোমাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি। এখন থেকে কেবল মৃত্যুই তোমাদের এই পবিত্র বন্ধন ছিন্ন করতে পারে।' এ পর্যায়ে বর ও কনে পরস্পরকে আংটি পরায়। চার্চ অব ইংল্যান্ডের রেওয়াজ মতে, বিয়ে পড়ানোর আগে পুরোহিত তিনবার এ কথা ঘোষণা করেন-'এই বর-কনের বিয়ের ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকলে এখনই জানিয়ে দিন, না হয় ভবিষ্যতে চুপ থাকতে হবে; অর্থাৎ-আপত্তি গ্রাহ্য হবে না।
যে পর্যন্ত নিকাহ রেজিস্টারের কাছে নিবন্ধন করে সার্টিফিকেট নেওয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সভ্য খ্রিষ্টানদের কাছে বিয়ে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। খ্রিষ্টান সমাজ বিয়ের বিবিধ প্রক্রিয়ার ঝঞ্ঝাট এড়াতে একবারে রেজিস্টারের অফিসে চলে যায়। এ পদ্ধতিতে জাহাজের কাপ্তান থেকে সৈনিকদের কমান্ডার পর্যন্ত বিয়ে পড়ানোর সুযোগ একই রকম। এই দৃশ্যপট থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, মুসলমানদের রীতি-রেওয়াজ থেকে ধার করে বিকৃতি সাধন সত্ত্বেও বিয়ে-শাদির বেলায় তারা ধর্মগুরুদের যথাসাধ্য এড়িয়ে চলতে চায়।
খ্রিষ্টীয় রীতি মতে বহুবিবাহ অবৈধ। তাদের বিশ্বাস; যে বিয়ে মিম্বারের ছায়ায় ঈশ্বর, তাঁর পুত্র ও পবিত্র আত্মাকে সাক্ষী রেখে সম্পাদিত হয়েছে-তা তালাকের মাধ্যমে ভাঙতে পারে না। তবে পৃথিবীতে প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে কারও তালাক কার্যকর বা দ্বিতীয় বিয়ে অনুমোদন দিতে পারেন পোপ। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি একবার তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার অনুমতি চাইলে পোপ তা নাকচ করে দেন। হেনরি রোমের ফাদারের সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ ক্যান্ট্রিবেরিকে মসিহের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন এবং বিশপ হেনরি দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেন। এরপর থেকে তিনি বিয়ে করতেই থাকেন।
ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী মিসেস স্যামসান ওয়েলস-এর সঙ্গে পরিণয়ে আবদ্ধ হতে চাইলে পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী আপত্তি তুলে বলেন-'খ্রিষ্টান ধর্মে যেহেতু তালাকের অনুমতি নেই, কাজেই মিসেস স্যামসান এখনও মিস্টার স্যামসানের স্ত্রী। একজন রাজা ধর্মীয় বিধানমতে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন না। তবে রাজা চাইলে তাকে রক্ষিতা হিসেবে রাখতে পারেন। এতে কারও আপত্তি থাকবে না।'
প্রেমের কাছে রাজত্ব হেরে যায়। তিনি রাজার পদ ছেড়ে দিয়ে সেই মহিলাকে বিয়ে করেন। ব্রিটেন ও আমেরিকায় ৫০% (শতাংশ)-এর বেশি বিয়ে তালাকের পরিণতিতে গড়ায়। আবার তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ হররোজ বিয়ে-শাদিতে আবদ্ধ হয়। এ বিষয়ে চার্চ উচ্চবাচ্য করে না; বরং আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায়, কোনো পাদরি তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের বিয়ে প্রসঙ্গে কোনো আপত্তি তোলেনি। তালাক যদি অবৈধ হয়, তাহলে তো মসিহের আকিদা-বিশ্বাস মতে দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা নিরুপায়, তাদের ধর্ম তাদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। মানুষ তাদের এই হারাম-হালাল মানতে অস্বীকার করছে।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 বিয়ের নতুন রীতি

📄 বিয়ের নতুন রীতি


স্ক্যান্ডিনেভিয়ার স্টেটগুলো জৈবিক স্বাধীনতা ও বিপথগামিতার জন্য খুবই পরিচিত। অশ্লীল চলচ্চিত্র ও গর্ভপাতের বিধিনিষেধ নেই। ফলে এখানকার লোকেরা অনাচারের দিক থেকে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশি অগ্রসর। ইদানীং সুইডেনের শিক্ষিত শ্রেণির মাঝে নতুন একধরনের বিয়ে চালু হয়েছে। তাদের নিজস্ব পরিভাষায় এর নাম দেওয়া হয়েছে ম্যারেজ বাই কনসেন্ট। এ বিয়ের মূলকথা হলো-নারী ও পুরুষ পরস্পরকে পছন্দ করে একত্রে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেবে। এই সিদ্ধান্তের পর তারা না কোনো গির্জায় যাবে, আর না যাবে নিবন্ধনের জন্য রেজিস্ট্রারের কাছে। যাদের সুযোগ ও সামর্থ্য আছে, তারা নিজেদের এই 'গোপন বিয়ে' সংবাদপত্রে প্রচার করে এবং বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়ন করতে পারে-এটুকুই যথেষ্ট।
সম্প্রতি এ ধরনের বিয়ে আইনি সিদ্ধতাও পেয়ে গেছে। দুজন নারী-পুরুষ একটানা বছর দুয়েক একসঙ্গে বসবাস করলেই তাদের বিয়ে আইনত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তাদের সন্তানকে সাব্যস্ত করা হবে আইনত উত্তরাধিকারের হকদার হিসেবে।
গ্রিকের ৬৫ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রী সব সময় ৩০ বছর বয়সি এক তরুণীকে সঙ্গে রাখতেন; অথচ ঘরে তার সুস্থ, সবল ও ভালো স্ত্রী ছিলেন। যেহেতু গ্রিকের গির্জার বিধানমতে একটি স্ত্রী ঘরে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণের বৈধতা নেই এবং প্রথম স্ত্রী তালাকও দিতে পারবেন না, তাই যথানিয়মে বিয়ের পরিবর্তে বিয়ে ছাড়াই এক তরুণীর সঙ্গ উপভোগ করেছেন তিনি। পত্রিকায় উভয়ের ছবি ছাপার সময় ক্যাপশন দেওয়া হতো- 'প্রধানমন্ত্রী ও তার গার্লফ্রেন্ড'। অনুরূপ নিজের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সব সময় পেট্টা নামের এক তরুণীকে সঙ্গে রাখতেন ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনি। মুসোলিনির প্রাণদণ্ডের পরপরই কেবল রক্ষিতা হওয়ার কারণে গুলির মুখে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয় তাকে। ইউরোপের মতো আমেরিকাতেও এখন বিয়েকে ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না; অথচ বিয়েবহির্ভূত যৌনজীবন খ্রিষ্টধর্মমতেও নিষিদ্ধ।
নিয়মমাফিক বিয়ে ও তার নিবন্ধনের সবচেয়ে বেশি সুফল ভোগ করেন নারী। কারণ, বিয়ের কিছুদিন পরই নারীর শরীরে, রূপ-লাবণ্যে ভাটির টান শুরু হয়। বয়স ও সন্তানাদির কারণে ক্রমেই আবেদনহীন হয়ে পড়া সেই নারীর পক্ষে আরেকজন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া মোটেই সহজসাধ্য নয়। নিবন্ধনসহ বিয়ে সম্পন্ন হলে সন্তানদের প্রতিপালন ও ভরণ-পোষণ ইত্যাদি স্বামীর আইনি দায়িত্ব হয়ে পড়ে। এটা ঠিক যে সুইডেনসহ অনেক দেশে একসঙ্গে বসবাস করাকেই বিয়ের সমতুল্য গণ্য করা হয়, কিন্তু লিখিত অঙ্গীকার বা কাবিননামা না থাকায় আদালতে অনেক কিছু প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে পারে না তারা। কারণ, দিন-তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ না থাকায় সকল অভিযোগ প্রমাণের দায় বর্তায় মামলার বাদীর ওপর। এই দুর্বলতার অনেক ফাঁকফোকর দিয়ে বিবাদী স্বামীর বেরিয়ে যাওয়ার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। স্বামী বলে ফেলতে পারেন, এই মহিলা আমার বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করত। কাজেই তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমি নিতে পারি না।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 ইসলামে বিয়ে ও তালাকব্যবস্থা

📄 ইসলামে বিয়ে ও তালাকব্যবস্থা


পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে বিয়ে-শাদির রীতিবিষয়ক আলোচনায় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এর কোনো পন্থাই সমাজের চাহিদা মোতাবেক পরিগঠিত নয়। ফলে মানুষ বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে নিজ ধর্মের বিপরীত দিকে হাঁটছে। ইসলাম মানুষের জীবনবিধান ও যুগের চাহিদার মাঝে বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় করতে পেরেছে বলেই তা বরাবরই কালোত্তীর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলাম সবার আগে নাকচ করে দিয়েছে অনুসারীদের দ্বারা পুরোনো ধর্মবিশ্বাসগুলোর বিকৃতি। হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মচারী, বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষু, সাধু ও খ্রিস্টান ধর্মের পাদরিরা বিয়ে করে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সকল নবি-রাসূল বিয়ে করেছেন, দুনিয়াতে তাঁদের সন্তানাদিও ছিল। আনাস (রা.) বলেন-
'এক মজলিশে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন। এর মধ্যে একজন বললেন-"আমি কখনো বিয়ে করব না।" আরেকজন বললেন-"আমি সব সময় সালাত পালন করতে থাকব, কখনো ঘুমাব না।" আরেকজন বললেন-"আমি সারা বছর রোজা রাখব।" এ ধরনের কথাবার্তা রাসূল -এর কান পর্যন্ত গেলে তিনি বললেন-"কী ব্যাপার! লোকেরা এগুলো কোন ধরনের কথা বলছে! আমি নিজে তো রোজাও রাখি, আবার রোজাবিহীনও দিন যাপন করি। নামাজও আদায় করি, ঘুমাই, বিশ্রামও করি-বিয়ে-শাদিও করি। মনে রেখ, যারা আমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
""শহ্মসি এ মুসলিম
সাহাবিদের মধ্যে যাদের বিয়ে হয়নি, তাঁদের বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন-
'তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন উচিত তাকে দেখা। এটা বিয়ের প্রতি ধাবিত করবে।' আবু দাউদ
এটা ছাড়াও আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে একটি হাদিস মুসলিম ও নাসায়িতে বর্ণিত হয়েছে-
'এক লোক ও এক আনসারি মহিলার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হলো, যেন ভালোভাবে দেখে নেয়। কারণ, আনসারি মহিলাদের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক ত্রুটি থাকে।'
মুগিরা (রা.)-এর সূত্রে অনুরূপ ভাবব্যঞ্জক আরেকটি হাদিস তিরমিজি ও নাসায়িতেও বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসে বিয়ে-শাদির চেষ্টায় আছে এমন এক ব্যক্তিকে বলা হয়েছে, বিয়ের আগে যেন পাত্রীকে দেখে নেয়। এটি পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে ভালোবাসা গড়ে উঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
পাত্রীকে বিয়ের আগে দেখা তখনই উপকারী হয়, যখন পরস্পর সম্পর্কে কোনোরূপ পূর্ব ধারণা না থাকে। ইউরোপে মেয়েদের সম্পর্কে পুরুষদের জানাশোনা থাকা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। অনুরূপভাবে পুরুষদের বিষয়ে জানাশোনাও মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের পছন্দ সাধারণত যথাযথই হওয়ার কথা। কারণ, তারা একে অন্যের সম্পর্কে এমনকী পরস্পরের ঘরবাড়ি, চলন-বলন ইত্যাদির ব্যাপারেও সম্যক অবগত। কাজেই পরস্পর সম্পর্কে তথ্য জেনে নেওয়া সহজ ও স্বাভাবিক হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবতা কখনো এতটা সরল হয় না। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে তৈরি হয় বড়ো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি। অবজ্ঞা করা, খোঁটা দেওয়া ছাড়াও প্রায়শই বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ ওঠে উভয়পক্ষ থেকে। প্রায় ৫০% বিয়ে এভাবে ভাঙনের কবলে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা গড়ায় কোর্ট-কাচারি অবধি। যাদের আনুষ্ঠানিক তালাক হয় না, তারা একই ছাদের নিচে দিনের পর দিন বাস করতে থাকে নিতান্তই অপরিচিতের মতো। আগেভাগে ভালোমতো পরস্পরের জীবনধারা, রুচি, মানসিকতা ইত্যাদি জেনে নেওয়া সম্বন্ধগুলোতেও বিয়ে টিকে যাওয়ার হার ২৫%-এর বেশি নয়।
ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীকে দেখে নেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু সেটা তো ওই সমাজের জন্য প্রযোজ্য-যেখানে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে সাধারণত উঠাবসা, যোগাযোগ ও সম্পর্ক থাকে। পন্থা তখনই সুফলদায়ক,

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 ইসলামে বিয়ের আয়োজন ও অন্যান্য কাজ

📄 ইসলামে বিয়ের আয়োজন ও অন্যান্য কাজ


যখন আপনি ইসলামি সমাজে অবস্থান করে পাত্রী নির্বাচন করবেন এবং বিরত থাকবেন গায়রে মাহরামের সংস্পর্শ থেকে। ইসলামে বিয়েসংক্রান্ত বিষয়াদি এতটাই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ যে, পাত্র-পাত্রীর সম্মতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার খোদ পিতারও থাকে না। বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রীর সম্মতি জেনে নেওয়া জরুরি। যদি এমনটি না হয়, তবে বিয়ে (فسخ) অকার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে স্বভাবজাত লাজুকতার কারণে আল্লাহর রাসূল মেয়েদের নীরবতাকে বিবেচনা করেছেন সম্মতির লক্ষণ হিসেবে। এর প্রায়োগিক দৃষ্টান্ত মেলে নবিজির জীবনপরিক্রমায়-
আল্লাহর রাসূল তাঁর কন্যাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে করলে পর্দার অন্তরাল থেকে তাঁদের সম্বোধন করে বলতেন-'অমুকের পুত্র অমুক তোমার ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে।' ওপাশ থেকে তাঁর কন্যা পর্দা নাড়িয়ে বা দরোজায় টোকা দিয়ে মতামত জানালে তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁকে বিয়ে দিতেন না। আর কন্যা নীরব থাকলে সেই প্রস্তাবে সায় দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। ১৬
আবদুল্লাহ ইবনে বারিদা (রা.) বর্ণনা করেন, নবিজির কাছে এক কুমারী মেয়ে এসে নালিশ করল-
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাবা তার ভাতিজার সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার সঙ্গে পরামর্শ করেনি। নিজের বিয়ের ক্ষেত্রে আমার কি কোনো এখতিয়ার আছে?' আল্লাহর রাসূল বললেন- 'হ্যাঁ, অবশ্যই তোমার এখতিয়ার আছে।' অতঃপর সেই মহীয়সী বললেন-'পিতার সিদ্ধান্তটি নাকচ করতে চাই না, কিন্তু নারীজাতির জন্য সেই অধিকার রয়েছে কি না, তা জেনে নিতে চেয়েছি।'
অনুরূপ একটি বর্ণনা পেশ করেছেন ইয়াহইয়া ইবনে কাসির। সে বর্ণনায় সম্মতি ছাড়া একটি কুমারী মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর তা মুলতবি করে দেওয়া হয়।
মুহাম্মাদ ইবনে হাতিব (রা.) বর্ণনা করেন-
'হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য কেবল ঢোল ও আওয়াজ।' তিরমিজি ও নাসায়ি
বিয়ে-শাদির আয়োজনে ঢোল বাজানো আর গান প্রসঙ্গটি ইসলামের মৌলিক বিধানের সঙ্গে যুক্ত। তখনকার যুগে ঢোলের একপাশে পর্দা অন্যপাশে খোলা থাকত। তৎকালে এর নাম ছিল 'দফ'। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ বর্ণনা করেছেন-
'তোমরা বিয়ের খবর ভালোমতো ছড়িয়ে দাও। বিয়ে পড়াবে মসজিদে, আর এ উপলক্ষ্যে ভালোমতো দফ বাজাও।' তিরমিজি
এখানে দফ শব্দের বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, তোমরা বিভিন্ন রকমের ঢোল বাজাও। খোলা মজলিশে বিয়ে পড়ানো হলে ঢাকঢোল পিটিয়ে যে বিয়ে হবে, স্বাভাবিকভাবে তা সব মানুষ জানবে। এত লোকের জানাজানির মাধ্যমে যে বিয়ে হবে-তা অস্বীকার করা বা ভেঙে দেওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়।
বিয়ের মজলিশে কনের সম্মতি পাওয়ার পর খুতবা পাঠ করা হয়। খুতবায় উচ্চারিত হয় আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর তাওহিদের ঘোষণা। এরপর পাঠ করা হয় কুরআন মাজিদের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ। সেসব আয়াতে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নারীদের প্রতি সদাচরণের ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুরুষদের। বরের কাছ থেকে তিনবার স্বীকৃতি নেওয়ার পর উপস্থিত লোকেরা তাদের অভিনন্দন জানায়, দুআ করে। শরিয়তের উক্ত কার্যাবলি সম্পাদনের পর মিষ্টি ও খেজুর বিতরণ ও বিবিধ আপ্যায়নের মাধ্যমে শেষ হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।
ইসলামে বিয়ে উপলক্ষ্যে খাবারের আয়োজন সম্পর্কিত বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। কনের পিতা তার কন্যার নতুন সংসারজীবন শুরুর প্রেক্ষাপটে কোনো জিনিসপত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে চাইলে সেটা ঐচ্ছিক এবং বৈধ। এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহর রাসূল তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে যে হাদিয়া দিয়েছিলেন, তা অনুকরণীয় আদর্শ। সেই উপঢৌকনের মধ্যে সংসারের ব্যবহার্য আসবাবের প্রায় সবই ছিল। যেমন: আটা পেষণের জাঁতা, কলসি, পানি রাখার মশক ইত্যাদি।
এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে নগদে/রকেটে/বিকাশে কনের হাতে কিছু অর্থসম্পদ দেওয়া বরের জন্য জরুরি। আলি (রা.)-এর কাছে কোনো নগদ অর্থ না থাকায় তাঁর বর্মটি পেশ করা হয় মোহর হিসেবে। আবার আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন অভিজাত এবং বিত্তবান। তিনি স্ত্রীকে মোহরানা দিয়েছিলেন এক কাঁদি খেজুর সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে। আরেক ব্যক্তি যিনি একেবারে শূন্য ছিলেন, তাঁর মোহরানা ছিল স্ত্রীকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া। কেননা, ইসলামে শিক্ষার মূল্যমান সব সময়ই যেকোনো অর্থকড়ি ও সম্পদের চাইতে বেশি।
বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দিদের মুক্তিপণ নির্ধারিত হওয়ার পর যাদের কাছে পরিশোধের মতো কোনো অর্থকড়ি ছিল না, তাদের জন্য মুক্তিপণ সাব্যস্ত করা হয়েছিল মুসলমানদের সন্তানদের শিক্ষাদান। বিয়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হলো সুন্নাহসম্মত ওলিমা অনুষ্ঠান। সাফিয়া (রা.)-এর ওলিমা উপলক্ষ্যে রাসূল লোকজনকে আপ্যায়ন করান পনির (Cheese) দিয়ে। এরপর পরিবেশন করা হয় ঘি আর হালুয়ার মিশ্রণে সুস্বাদু এক বিশেষ ধরনের খাবার। জয়নাব (রা.)-এর বিয়েতেও মানুষকে পেটপুরে খাওয়ানো হয়। নবিজি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে নির্দেশনা দিয়েছেন-তিনি যেন অবশ্যই ওলিমা করেন; নিদেনপক্ষে একটি ছাগল দিয়ে হলেও। মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নগরীর আগামীদিনের গভর্নর আবু উসাইদ (রা.)-এর ওলিমায় আল্লাহর রাসূল নিজে শরিক হয়েছেন। তাঁর খেদমতে দুলহান প্রথমে খেজুর আর পানি পাঠিয়ে দেন, এরপর পরিবেশন করা হয় সুস্বাদু খাদ্যসম্ভার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00