📄 হিন্দু ধর্মে বিয়ে : নারী নিগ্রহ ও আত্মহত্যার পথঘাট
হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলোতে বিয়েকে একটি পবিত্র সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিয়ের জন্য তাদের যেতে হয় অগ্নি দেবতার মূর্তির কাছে। বিয়ের আগে পণ্ডিত নিশ্চিত করেন, পাত্র-পাত্রীর মাঝে রক্তের সম্পর্ক তো দূরের কথা: জ্ঞাতি সম্পর্কও যেন না থাকে। এরপর জ্যোতিষী ও পণ্ডিত মিলে কুষ্ঠি মিলিয়ে অনুসন্ধান করেন বিয়ের উৎকৃষ্ট লগ্ন। কেননা, তারা বিশ্বাস করে, বিবাহকার্য সম্পাদনের দিনক্ষণ উভয়ের দাম্পত্য ভাগ্যে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শ্রুত আছে, অনেক সময় পবিত্র ও সৌভাগ্যময় দিন নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে শাস্ত্রমতে হয় না; বরং বর ও কনেপক্ষের সুবিধামতো তারিখগুলোর মধ্য থেকে শুভ-অশুভলগ্ন বাছাই করা হয়। অথচ সবগুলো দিবসই আল্লাহর দিন। শুভ বা অশুভ বলতে কোনো নির্দিষ্ট কাল নেই। এটা স্রেফ আত্মপ্রসাদ।
লগ্ন বাছাই শেষে নির্দিষ্ট সময়ে গাছের পাতা, ফুল ও নারকেল প্রভৃতি দ্বারা বিয়ের মণ্ডপ সাজানো হয়। মণ্ডপের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে শ্লোক ও মন্ত্র পাঠ করতে করতে ঘি ঢালেন পণ্ডিত। তার পাঠযজ্ঞ শেষ হলে বরের পাগড়ির সঙ্গে কনের আঁচল বেঁধে দুজনকে সাত পাঁক ঘোরানো হয় এই 'পবিত্র' আগুনের চারপাশে। এ সময় মন্ত্রপাঠের পাশাপাশি তাদের দিকে বিভিন্ন সুগন্ধি ছিটানো হয়। তাদের ধর্মবিশ্বাস মতে-পবিত্র আগুনকে সাক্ষী রেখে শাস্ত্রের বরকত ও শুভাশীষসহ যে বিয়ে সম্পাদিত হয়, তা ভাঙার শক্তির কারও থাকে না।
স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতী সত্যরথ প্রকাশ-এ বিয়ের ১১টি প্রকার উল্লেখ করেছেন; যার মধ্যে আগুনকে সাক্ষী রেখে সম্পাদিত বিয়ে অন্যতম। কোনো মেয়েকে কেউ জবরদস্তিমূলকভাবে তুলে নিয়ে গেলে সেটাও একপ্রকার বিয়ে। এটাকে বলা হয়েছে রাক্ষস বিয়ে। কনৌজের রাজা পৃথ্বীরাজ জয়চান্দের কন্যা সংযুক্তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। হিন্দু ধর্মে এটাকে বিবাহ বলেই গণ্য করা হয়।
জঙ্গলে কোনো মেয়ে পাওয়া গেলে কোনোরকম সাক্ষী-সাবুত ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করেই তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকে গান্ধর্ব বিয়ে বলা হয়। যদিও হিন্দু ধর্মে বিয়ের একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা আছে, কিন্তু তাতে মেয়েদের কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়। অধিকন্তু বিয়ের আগে উপহারের নামে সামর্থ্যের বাইরে বরপক্ষকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের পণ বা যৌতুক। কখনো কখনো বরপক্ষের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে অপমান আত্মহত্যা করে অনেক নারী।
স্ত্রী স্বামীকে ভগবান বলে পূজা করে। স্বামীর আগে স্ত্রীর আহার করার অনুমতি নেই সেখানে। অল্পবয়সি স্ত্রী রেখে স্বামী মারা গেলে সে নারীকে মনে করা হয় অলক্ষুণে ও অপয়া। স্বামীর প্রাণবায়ু বের হওয়ার পরপরই পাথরের আঘাতে ভেঙে দেওয়া হয় স্ত্রীর চুড়ি, কপাল থেকে মুছে ফেলা হয় সিঁদুরের চিহ্ন। খুলে নেওয়া হয় রঙিন কাপড়, অলংকারাদি এবং জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। জীবনকে এত বেশি কোণঠাসা করে ফেলা হয় যে, বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে তার জন্য দুর্বিষহ। তখন মৃত্যু ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এমন কষ্টের জীবন বয়ে বেড়ানোর চাইতে স্বামীর সঙ্গে সহমরণে রাজি হয়ে গেলে তো সোনায় সোহাগা। পুরোহিত তখন সুন্দর পোশাক পরিয়ে নেচে গেয়ে, মদ পান করিয়ে তাকে নিক্ষেপ করে জ্বলন্ত চিতায়। একটা সময় ভারতজুড়ে এই সতীদাহ প্রথা ছিল বহুল প্রচলিত সংস্কৃতি। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলন এবং ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং-এর প্রচেষ্টায় এই ঘৃণ্য সতীদাহ উচ্ছেদ করা হয়। তখনও বিধবা বিবাহ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, যার স্বামী মারা গেছে, সে অপয়া!
নারীর ওপর অত্যাচার, সতীদাহ, বিধবা বিবাহে নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি বিষয়ে হিন্দু ধর্মের মেয়েরা স্বধর্মের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিদ্রোহ করা শুরু করেছে। তারা হিন্দু কোড নামে বিল পাশ করিয়েছে ভারতের পার্লামেন্টে। ফলে যৌতুক চাওয়াকে ইদানীং গণ্য করা হচ্ছে গর্হিত অপরাধ হিসেবে, কিন্তু এর সবকিছুই তাদের ধর্মের বিপরীত। ইসলামি আদর্শ ও নীতি ধার করেই এসব করা হচ্ছে; এমনকী বর্তমানে হিন্দু নারীরা স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেওয়ার অধিকারও পেয়েছে ইসলামি জীবনব্যবব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।
📄 শিখ ধর্মে বিয়ে
হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও শিখ ধর্মের প্রবক্তা বাবা নানক ছিলেন ইসলামের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। তার গ্রন্থ সাহেব* কুরআন ও হাদিসের প্রায় হুবহু অনুবাদ। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে তিনি সাদাসিধে রীতিই চর্চা করতেন। নিজের উপদেশমালা সম্পর্কে অবশ্য বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করেননি এই ধর্ম প্রবক্তা, কিন্তু তার অনুসারী লোকেরা সাধারণত হিন্দু ধর্মেরই কাছাকাছি থেকেছে সব সময়। ফলে শিখদের বিয়ে-শাদির রীতি মোটামুটি হিন্দু ধর্মের মতোই। তবে তাদের ধর্মে যৌতুক প্রথার প্রচলন নেই। প্রথমদিকে বিয়ের নিয়ম ছিল; বর ও কনে উভয়পক্ষই গুরুদুয়ারায় গ্রন্থির সামনে বসে যাবে। অতঃপর তাদের আশীর্বাদ করা হবে ইজাব ও কবুলের জন্য শ্লোক পাঠ করে। তবে তারাও রীতিমতো লগ্ন খোঁজে ও মণ্ডপ সাজায়; এমনকী আগুনের চারপাশে সাতটি চক্করও দেয়। শিখ ধর্মে দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই, তবে সাধারণত শিখ সমাজে এর প্রচলন খুব একটা দেখা যায় না।
টিকাঃ
*গুরুগ্রন্থ-সাহেবজি গুরু-বাণী অর্থাৎ পির মুর্শিদের মুখ থেকে নিঃসৃত শব্দ হিসেবে গণ্য।
📄 পারস্যে বিয়ে-শাদি
পারস্য ধর্মের প্রবর্তক ইবরাহিম জরথুস্ত্রের বিষয়ে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন। এমনকী হাদিসবিশারদগণ এ পর্যন্ত প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, কুরআন মাজিদে বর্ণিত জুলকারনাইনই হলো এ জরথুস্ত্র। উত্তর মেরু থেকে এসে লুটেরা দস্যুদের রুখে দেওয়ার জন্য লোহা গলিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তিনি। যদিও মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারভির অভিমত, জুলকারনাইন অন্য কেউ। তবে পারস্যের জরথুস্ত্র ধর্মে ইসলামের প্রভাব এখনও বিদ্যমান।
এই ধর্মে বিয়ের জন্য কেবল উভয়পক্ষের পারস্পরিক পছন্দই যথেষ্ট নয়; বরং দুপক্ষের ঘনিষ্ঠ কারও বাড়িতে বর-কনে দুজনকে আলাপ ও একান্তে বোঝাপড়ার সুযোগও করে দেওয়া হয়। এ সময় নিজ নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে মানসিক সমর্থন দেওয়া হয় তাদের। ছোটোখাটো বিষয়ে অমিল দেখা গেলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে উভয়ের মাঝে বন্ধন স্থাপনের অন্তরিক চেষ্টা করা হয়। এরপর বাকি থাকে বৈবাহিক কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত। অ্যানগেজমেন্ট উপলক্ষ্যে দুপক্ষের অল্প লোকজন একত্র হয়ে বিয়ের তারিখ ও অন্যান্য বিষয়াদি ঠিক করে। বিয়ের দিন আপ্যায়নের আয়োজন থাকে। উভয়পক্ষ সমানভাবে বহন করে বিয়ের যাবতীয় খরচ। ধর্মগুরু দস্তুর এখানে বিয়ে পড়ান। সংশ্লিষ্ট ধর্মগ্রন্থের শ্লোক পাঠ শেষে পাত্র-পাত্রীর জন্য কল্যাণের জন্য দুআ ও আশীর্বাদ করা হয়। এরপর বর-কনে কয়েকদিন ধরে উপাসনার জন্য অগ্নিমণ্ডপে যায়। এ সময়টাতে বিয়ের আপ্যায়ন চলমান থাকে। অল্প কদিন পর দম্পতি এসে শামিল হয় সেখানে। এভাবে উপাসনালয় থেকে বরকত হাসিলের পর তারা দাম্পত্যজীবন আরম্ভ করে। পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি নেই, তবে তালাকের সুযোগ আছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো-লাহোরের পারসিয়ান সমাজে কখনো তালাকের ঘটনাই ঘটেনি!
📄 খ্রিষ্টান ধর্মে বিয়ে ও বৈরাগ্য
নতুন-পুরাতন মিলিয়ে বাইবেলের ২১ জায়গায় বিয়ে প্রসঙ্গের আলোচনা এসেছে। তন্মধ্যে নিউ টেস্টামেন্টে এসেছে তিনবার। তবে বিয়ে শব্দটি স্পষ্টভাবে মাত্র একবারই উল্লেখিত হয়েছে। উক্ত জায়গাগুলোতে বিয়ের আপ্যায়ন-উৎসব সম্পর্কে আলোচনা থাকলেও এর বিধিবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বর্ণিত হয়নি। ঈসা (আ.) নিজে বিয়ে করেননি এবং তাঁর জীবৎকালে কোনো সাথিরও বিয়ে হয়নি। ফলে বাস্তবতা হলো-খ্রিষ্টান ধর্মে বিয়ে-শাদি সম্পর্কিত কাঠামোবদ্ধ কোনো আলোচনা নেই। প্রকৃত ঈসায়িগণ ঈসা (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে সারাজীবন চিরকুমার থাকেন। অন্যদিকে, ঈসা (আ.)-এর জীবনচরিত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ বৈরাগ্যবাদকে সম্পূর্ণ নাকচ করে-
'আমি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কোমলতা ও ভালোবাসা শামিল করে দিয়েছি, কিন্তু তাদের ওপর বৈরাগ্য আরোপ করিনি। এটা তারাই বানিয়েছে।' সূরা হাদিদ: ২৭
নিউ টেস্টামেন্টের কোথাও সংসার-বিচ্ছিন্নতা ও বৈরাগ্যের কথা উল্লেখ নেই। কুরআন মাজিদের নির্দেশনা মোতাবেক ঈসা (আ.)-এর পর তাঁর কতিপয় অনুসারী এসব শুরু করে। কথিত আছে, বৈরাগ্যবাদের প্রবর্তক হলেন সেন্ট পল। অথচ নীতিগত সূত্র বিচারে ঈসা (আ.) বলেননি-এমন বিষয় তাঁর নির্দেশনা বলে চালানোর কোনো সুযোগ সেন্ট পলের নেই। বৈরাগ্য অবলম্বনকারী গির্জার সেবক-সেবিকাগণ গির্জাসংলগ্ন হোস্টেলেই থাকেন। শুরু থেকেই পার্থিব জৌলুস, সৌখিনতা ও বিলাসিতা প্রভৃতি বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয় তাদের। মহিলাদের মাথা মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব লোক বছরের পর বছর শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার না করেই কাটিয়ে দেয়। এমন পুরোহিতও পৃথিবীতে ছিলেন, যিনি ২০ বছর পর্যন্ত গোসল করেননি। শরীরের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য উদ্ভাবিত হয় বিশেষ ধরনের পারফিউম।
বৈরাগ্যবাদী পুরোহিত বিয়ে-শাদি করেন না। বিয়ে না করায় তাদের মনন ও মূল্যবোধটা কী ধরনের হবে, সে আলোচনায় আমরা যাব না; তবে জৈবিক চাহিদা মানুষের প্রকৃতির অংশ। একজন ব্রিটিশ গবেষকের মতে-বিয়ে হলো জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ। সুতরাং, কেউ বিয়ে না করলে জীবনরক্ষার বিষয়টিকেই অবজ্ঞা করা হবে। এর ফলে বিকৃত ও কলুষিত হবে তার মন, মস্তিষ্ক ও জীবনাচরণ। অতএব, সুস্থ থাকা জরুরি।
ইসলামের যুদ্ধকালীন এক প্রেক্ষাপটে কতিপয় সাহাবি আল্লাহর রাসূল কাছে বিয়ে-শাদি না করে চিরকুমার অবস্থায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবিজি সেটা নাকচ করে দিয়ে বলেন-'ইসলাম বৈরাগ্যবাদ শিক্ষা দেয়নি।' আমরা সমাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন নির্বাহ করব, মানুষের সামনে তুলে ধরব সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার সর্বোত্তম জীবনাদর্শ।
বৈরাগ্যবাদ মনুষ্যস্বভাব ও মানবীয় চাহিদার (Biological Necessities) পরিপন্থি। ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই এটা সফল হতে পারেনি; বরং খ্রিষ্টান সমাজেও এটি কেবল রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কানাডার বিখ্যাত চিকিৎসক উইলিয়াম বায়েড তার চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থে লিখেছেন- 'রাতে গির্জাগুলো থেকে যেসব গোঙানি আর আর্তনাদ ভেসে আসে, তা উপাসনা আর প্রার্থনার নয়; বরং পাদরিরা শরীরে যেসব জৈবিক রোগ পুষে রেখেছে, তার যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট চিৎকার।'
খ্রিষ্টধর্মে বিয়ের বিধিবদ্ধ রীতিতে সাধারণত গির্জার আঙিনায় পুরোহিতের সামনে দাঁড়িয়ে পাত্রকে অঙ্গীকার পাঠ করানো হয়। তাতে পোপের নিকট শপথ করতে হয়-
'আমি অমুকের পুত্র অমুক এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করছ যে, সুস্থতায়-অসুস্থতায়, সুসময়ে-দুঃসময়ে, আনন্দে-বিষাদে, সর্বাবস্থায় অমুককে স্ত্রী হিসেবে কবুল করছি।'
বর তিন দফা এই প্রতিজ্ঞা পাঠ করার পর অনুরূপ প্রশ্ন কনেকেও তিনবার জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর পাদরি ঘোষণা করেন-'আমি আল্লাহ, তাঁর পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে তোমাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি। এখন থেকে কেবল মৃত্যুই তোমাদের এই পবিত্র বন্ধন ছিন্ন করতে পারে।' এ পর্যায়ে বর ও কনে পরস্পরকে আংটি পরায়। চার্চ অব ইংল্যান্ডের রেওয়াজ মতে, বিয়ে পড়ানোর আগে পুরোহিত তিনবার এ কথা ঘোষণা করেন-'এই বর-কনের বিয়ের ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকলে এখনই জানিয়ে দিন, না হয় ভবিষ্যতে চুপ থাকতে হবে; অর্থাৎ-আপত্তি গ্রাহ্য হবে না।
যে পর্যন্ত নিকাহ রেজিস্টারের কাছে নিবন্ধন করে সার্টিফিকেট নেওয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সভ্য খ্রিষ্টানদের কাছে বিয়ে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। খ্রিষ্টান সমাজ বিয়ের বিবিধ প্রক্রিয়ার ঝঞ্ঝাট এড়াতে একবারে রেজিস্টারের অফিসে চলে যায়। এ পদ্ধতিতে জাহাজের কাপ্তান থেকে সৈনিকদের কমান্ডার পর্যন্ত বিয়ে পড়ানোর সুযোগ একই রকম। এই দৃশ্যপট থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, মুসলমানদের রীতি-রেওয়াজ থেকে ধার করে বিকৃতি সাধন সত্ত্বেও বিয়ে-শাদির বেলায় তারা ধর্মগুরুদের যথাসাধ্য এড়িয়ে চলতে চায়।
খ্রিষ্টীয় রীতি মতে বহুবিবাহ অবৈধ। তাদের বিশ্বাস; যে বিয়ে মিম্বারের ছায়ায় ঈশ্বর, তাঁর পুত্র ও পবিত্র আত্মাকে সাক্ষী রেখে সম্পাদিত হয়েছে-তা তালাকের মাধ্যমে ভাঙতে পারে না। তবে পৃথিবীতে প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে কারও তালাক কার্যকর বা দ্বিতীয় বিয়ে অনুমোদন দিতে পারেন পোপ। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি একবার তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার অনুমতি চাইলে পোপ তা নাকচ করে দেন। হেনরি রোমের ফাদারের সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ ক্যান্ট্রিবেরিকে মসিহের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন এবং বিশপ হেনরি দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেন। এরপর থেকে তিনি বিয়ে করতেই থাকেন।
ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী মিসেস স্যামসান ওয়েলস-এর সঙ্গে পরিণয়ে আবদ্ধ হতে চাইলে পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী আপত্তি তুলে বলেন-'খ্রিষ্টান ধর্মে যেহেতু তালাকের অনুমতি নেই, কাজেই মিসেস স্যামসান এখনও মিস্টার স্যামসানের স্ত্রী। একজন রাজা ধর্মীয় বিধানমতে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন না। তবে রাজা চাইলে তাকে রক্ষিতা হিসেবে রাখতে পারেন। এতে কারও আপত্তি থাকবে না।'
প্রেমের কাছে রাজত্ব হেরে যায়। তিনি রাজার পদ ছেড়ে দিয়ে সেই মহিলাকে বিয়ে করেন। ব্রিটেন ও আমেরিকায় ৫০% (শতাংশ)-এর বেশি বিয়ে তালাকের পরিণতিতে গড়ায়। আবার তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ হররোজ বিয়ে-শাদিতে আবদ্ধ হয়। এ বিষয়ে চার্চ উচ্চবাচ্য করে না; বরং আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায়, কোনো পাদরি তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের বিয়ে প্রসঙ্গে কোনো আপত্তি তোলেনি। তালাক যদি অবৈধ হয়, তাহলে তো মসিহের আকিদা-বিশ্বাস মতে দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা নিরুপায়, তাদের ধর্ম তাদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। মানুষ তাদের এই হারাম-হালাল মানতে অস্বীকার করছে।