📄 সভ্যতায় বিবাহব্যবস্থা ক্রমবিকাশের ধারা
পৃথিবীতে মানুষের অভিবাসের সূচনাকাল থেকেই মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মিলেমিশে বসবাস করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে আসছে। এমনকী জীবনযুদ্ধেও স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে জীবনযাপন করার বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। একসময় নারীরা উপলব্ধি করল- সে যদি একজন পুরুষের দায়িত্বে এবং একাঙ্ক্ষই একজনের হয়ে থাকে, তার সামগ্রিক নিরাপত্তা তখন নিশ্চিত হয় সবচেয়ে বেশি। এভাবে পুরুষ সঙ্গী উপার্জনের জন্য অধিক শ্রম দেওয়ার ফলে নারীর জীবন নির্বাহ হয়ে ওঠে অধিকতর নিরাপদ ও কম শ্রমসাধ্য।
কাজ ভাগাভাগির পাশাপাশি উভয়ের মধ্যে তীব্র বাসনা ছিল, সঙ্গী যেন তাকে ছেড়ে না যায়। কিন্তু নারীর জন্য এই অবকাশ বরাবরই ছিল, সে বেশি সুন্দর ও সম্পদশালী সঙ্গী পেলে আগের পুরুষ সঙ্গীকে ছেড়ে যাবে। একই আশা পুরুষদের ব্যাপারে নারীর মধ্যেও ছিল, সে আরও বেশি পুরুষ সঙ্গীকে ছেড়ে যেতে পারে। একই আশা পুরুষদের ব্যাপারে নারীর মধ্যেও ছিল, সে আরও বেশি সুন্দরী ও অধিকতর শ্রমসক্ষম নারী পেলে ছেড়ে যেতে পারে তাকে।
যৌবনের এসব রঙিন লালসার সঙ্গে ছিল বার্ধক্যের তিক্ত বাস্তবতা। পাখি যেভাবে বর্ষা মৌসুমের আগে নিজের বাসা মেরামত করে, দুঃসময়ের জন্য খাদ্য রসদ মজুদ করে খাদ্য রসদ; একইভাবে জীবনের শেষ সময়গুলোর নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। নারী চাইল, তার সঙ্গী ও সন্তানরা যেন বার্ধক্যে তার দেখাশোনা ও সেবা-যত্নের জন্য কাছে থাকে। একই প্রত্যাশা জেগেছে পুরুষের মনেও; এই সমস্যার একটা সমাধান হতে পারত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। যেমন: নারী-পুরুষ একে অন্যের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেবে - কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না কখনো। অথচ ইতিহাস বলে, এ ধরনের মৌখিক ওয়াদা অনাগত ভবিষ্যতের কোনো গ্যারান্টি বহন করে না।
দুজন নারী-পুরুষ পরস্পর আজীবন একসঙ্গে জীবনযাপনের এই সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতির নাম দেওয়া হলো বিবাহ। বিয়ের সংজ্ঞা মোতাবেক পরস্পরের সঙ্গে এই মেলামেশার ধরনটি আলাদা ও স্বতন্ত্র হওয়া চাই। এখানে তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ বিবাহের মৌলিক ধারণার বরখেলাপ। কাজেই, কেবল দুজনের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির নামই বিয়ে।
মানব ইতিহাসের যুগে যুগে মানুষ কারও না কারও ইবাদত করেছে। কখনো চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্রকে প্রভুর প্রতিচ্ছবি সাব্যস্ত করেছে, কখনো-বা ঘষেমেজে বার্নিশ করে উপাস্য তৈরি করে নিয়েছে কাঠ কিংবা পাথরের চাকতি। প্রাচীনকালে মানুষের অন্তরে উপাস্যের ব্যাপারে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা ছিল বেশি। কাজেই তারা যাবতীয় কাজ করত উপাস্যকে সামনে রেখে। পুরোহিতগণ সাধারণের সঙ্গে এই কাজে নিজেদেরও যুক্ত করে নেয়। ফলে বিয়ে-শাদির কাজ সম্পাদনা শুরু হলো প্রভুকে সাক্ষী রেখে অথবা উপাসনালয়ের পূজারির মাধ্যমে। পরিবারভিত্তিক সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই বিয়ে-শাদি আল্লাহ অথবা কোনো দেবতাকে হাজির-নাজির জেনে পূজারি ও পণ্ডিত-পাদরিদের হাতে হাত রেখে সম্পন্ন হয়ে চলেছে।
পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মে দুজন স্ত্রীর রেওয়াজ নেই; অথচ পুরাতন বাইবেলে একাধিক স্ত্রীর কথা ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোথাও নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞা অর্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। নতুন বাইবেলের বর্ণনাতেও দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ মর্মে কোনো বক্তব্য নেই। একই কথা প্রযোজ্য হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রেও। যেসব রাজাকে ভগবান বলা হয়, তাদের প্রত্যেকেরই ছিল একাধিক রানি। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় শর্তসাপেক্ষে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন বলছে-
'নারীদের মধ্যে যাকে পছন্দ হয় তোমরা বিয়ে করো-দুই, তিন কিংবা চারজন। যদি তোমাদের এই আশঙ্কাবোধ হয় যে তাদের মাঝে তোমরা ইনসাফ করতে ব্যর্থ হবে, তাহলে একজনই যথেষ্ট।' সূরা নিসা : ৩
এই আয়াতে পছন্দের নারীকে বিয়ের অনুমতির পাশাপাশি একাধিক বিয়ের অনুমোদন যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রত্যেক স্ত্রীর অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বিধানের শর্ত। একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ ও সমতা বিধানের প্রায়োগিক নমুনা আমরা মহানবি -এর জীবনে চমৎকারভাবে দেখতে পাই। তাঁর সহধর্মিণীগণ ভরণ-পোষণ, জীবনযাপনের যাবতীয় সুবিধা পেতেন একই হারে এবং অভিন্ন মানে। প্রত্যেক সহধর্মিণীর জন্য স্বামীসঙ্গ লাভের দিন সমানভাবে বরাদ্দ ছিল। কারও পক্ষে অবহেলা ও অবজ্ঞার অভিযোগ পেশ করা ছিল অসম্ভব। সফরের ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হতো, কে তাঁর স্বামীর সঙ্গে যাবেন। কখনো গুরুতর অসুস্থ হলে রাসূল -এর পক্ষে দৈনিক ঘর বদল ছিল কষ্টসাধ্য। ওই সময় আয়িশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থানের জন্য বাকি স্ত্রীদের কাছ থেকে রীতিমতো অনুমতি নিয়েছেন তিনি।
একজন থাকা সত্ত্বেও পুরুষের আরেক স্ত্রী গ্রহণ করার মতোই নারী সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে একাধিক স্বামী রাখার রীতিও প্রচলিত ছিল। এটাকে বলা হয় Polyandry বা বহুভুক্তি। প্রাচীন যুগের এই রীতি এখনও আফ্রিকা, তিব্বত, উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চল এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন গোত্রের দেখা যায়। এভাবে দুই স্বামীর সঙ্গে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই কঠিন। কারণ, এতে উভয়ের মাঝে পারস্পরিক দ্বন্ধ, হিংসা ছাড়াও সন্তানের পিতৃত্ব, লালন-পালনে দেখা দেয় মারাত্মক বিশৃঙ্খলা। কয়েক বছর আগে ভারতের এক টিভি চ্যানেল অনুন্নত এলাকার জীবনধারা সম্পর্কিত একটি নাটক প্রচার করে। নাটকে দেখা যায়, চাচা ও ভাতিজার একই স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানে অংশীদারত্ব রয়েছে! যদিও এ ধরনের নীতি অধিকাংশ সমাজে এখনও যথেষ্ট অপছন্দনীয়, কিন্তু তাদের ধর্ম স্পষ্টভাবে এটাকে নিষিদ্ধ করেনি। পক্ষান্তরে ভারতীয় সংস্কৃতির বিখ্যাত ও জনপ্রিয় পৌরাণিক গল্প হলো 'দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ'১৪। একই সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডব (পাঁচ ভাই) ছিল দ্রৌপদীর স্বামী। ইসলামই পৃথিবীর একমাত্র সমাজব্যবস্থা, যেখানে এমন সম্পর্ককে অস্বাভাবিক ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
টিকাঃ
১৪. ধ্রুপদী মহাভারত মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র। সে পঞ্চপাণ্ডবের সহধর্মিণী। মহাভারতের বীরাঙ্গনাদ্রৌপদী পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা। দ্রুপদের কন্যা বলে নাম দ্রৌপদী। সূত্র: উইকিপিডিয়া
📄 হিন্দু ধর্মে বিয়ে : নারী নিগ্রহ ও আত্মহত্যার পথঘাট
হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলোতে বিয়েকে একটি পবিত্র সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিয়ের জন্য তাদের যেতে হয় অগ্নি দেবতার মূর্তির কাছে। বিয়ের আগে পণ্ডিত নিশ্চিত করেন, পাত্র-পাত্রীর মাঝে রক্তের সম্পর্ক তো দূরের কথা: জ্ঞাতি সম্পর্কও যেন না থাকে। এরপর জ্যোতিষী ও পণ্ডিত মিলে কুষ্ঠি মিলিয়ে অনুসন্ধান করেন বিয়ের উৎকৃষ্ট লগ্ন। কেননা, তারা বিশ্বাস করে, বিবাহকার্য সম্পাদনের দিনক্ষণ উভয়ের দাম্পত্য ভাগ্যে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শ্রুত আছে, অনেক সময় পবিত্র ও সৌভাগ্যময় দিন নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে শাস্ত্রমতে হয় না; বরং বর ও কনেপক্ষের সুবিধামতো তারিখগুলোর মধ্য থেকে শুভ-অশুভলগ্ন বাছাই করা হয়। অথচ সবগুলো দিবসই আল্লাহর দিন। শুভ বা অশুভ বলতে কোনো নির্দিষ্ট কাল নেই। এটা স্রেফ আত্মপ্রসাদ।
লগ্ন বাছাই শেষে নির্দিষ্ট সময়ে গাছের পাতা, ফুল ও নারকেল প্রভৃতি দ্বারা বিয়ের মণ্ডপ সাজানো হয়। মণ্ডপের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে শ্লোক ও মন্ত্র পাঠ করতে করতে ঘি ঢালেন পণ্ডিত। তার পাঠযজ্ঞ শেষ হলে বরের পাগড়ির সঙ্গে কনের আঁচল বেঁধে দুজনকে সাত পাঁক ঘোরানো হয় এই 'পবিত্র' আগুনের চারপাশে। এ সময় মন্ত্রপাঠের পাশাপাশি তাদের দিকে বিভিন্ন সুগন্ধি ছিটানো হয়। তাদের ধর্মবিশ্বাস মতে-পবিত্র আগুনকে সাক্ষী রেখে শাস্ত্রের বরকত ও শুভাশীষসহ যে বিয়ে সম্পাদিত হয়, তা ভাঙার শক্তির কারও থাকে না।
স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতী সত্যরথ প্রকাশ-এ বিয়ের ১১টি প্রকার উল্লেখ করেছেন; যার মধ্যে আগুনকে সাক্ষী রেখে সম্পাদিত বিয়ে অন্যতম। কোনো মেয়েকে কেউ জবরদস্তিমূলকভাবে তুলে নিয়ে গেলে সেটাও একপ্রকার বিয়ে। এটাকে বলা হয়েছে রাক্ষস বিয়ে। কনৌজের রাজা পৃথ্বীরাজ জয়চান্দের কন্যা সংযুক্তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। হিন্দু ধর্মে এটাকে বিবাহ বলেই গণ্য করা হয়।
জঙ্গলে কোনো মেয়ে পাওয়া গেলে কোনোরকম সাক্ষী-সাবুত ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করেই তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকে গান্ধর্ব বিয়ে বলা হয়। যদিও হিন্দু ধর্মে বিয়ের একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা আছে, কিন্তু তাতে মেয়েদের কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়। অধিকন্তু বিয়ের আগে উপহারের নামে সামর্থ্যের বাইরে বরপক্ষকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের পণ বা যৌতুক। কখনো কখনো বরপক্ষের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে অপমান আত্মহত্যা করে অনেক নারী।
স্ত্রী স্বামীকে ভগবান বলে পূজা করে। স্বামীর আগে স্ত্রীর আহার করার অনুমতি নেই সেখানে। অল্পবয়সি স্ত্রী রেখে স্বামী মারা গেলে সে নারীকে মনে করা হয় অলক্ষুণে ও অপয়া। স্বামীর প্রাণবায়ু বের হওয়ার পরপরই পাথরের আঘাতে ভেঙে দেওয়া হয় স্ত্রীর চুড়ি, কপাল থেকে মুছে ফেলা হয় সিঁদুরের চিহ্ন। খুলে নেওয়া হয় রঙিন কাপড়, অলংকারাদি এবং জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। জীবনকে এত বেশি কোণঠাসা করে ফেলা হয় যে, বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে তার জন্য দুর্বিষহ। তখন মৃত্যু ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এমন কষ্টের জীবন বয়ে বেড়ানোর চাইতে স্বামীর সঙ্গে সহমরণে রাজি হয়ে গেলে তো সোনায় সোহাগা। পুরোহিত তখন সুন্দর পোশাক পরিয়ে নেচে গেয়ে, মদ পান করিয়ে তাকে নিক্ষেপ করে জ্বলন্ত চিতায়। একটা সময় ভারতজুড়ে এই সতীদাহ প্রথা ছিল বহুল প্রচলিত সংস্কৃতি। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলন এবং ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং-এর প্রচেষ্টায় এই ঘৃণ্য সতীদাহ উচ্ছেদ করা হয়। তখনও বিধবা বিবাহ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, যার স্বামী মারা গেছে, সে অপয়া!
নারীর ওপর অত্যাচার, সতীদাহ, বিধবা বিবাহে নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি বিষয়ে হিন্দু ধর্মের মেয়েরা স্বধর্মের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিদ্রোহ করা শুরু করেছে। তারা হিন্দু কোড নামে বিল পাশ করিয়েছে ভারতের পার্লামেন্টে। ফলে যৌতুক চাওয়াকে ইদানীং গণ্য করা হচ্ছে গর্হিত অপরাধ হিসেবে, কিন্তু এর সবকিছুই তাদের ধর্মের বিপরীত। ইসলামি আদর্শ ও নীতি ধার করেই এসব করা হচ্ছে; এমনকী বর্তমানে হিন্দু নারীরা স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেওয়ার অধিকারও পেয়েছে ইসলামি জীবনব্যবব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।
📄 শিখ ধর্মে বিয়ে
হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও শিখ ধর্মের প্রবক্তা বাবা নানক ছিলেন ইসলামের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। তার গ্রন্থ সাহেব* কুরআন ও হাদিসের প্রায় হুবহু অনুবাদ। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে তিনি সাদাসিধে রীতিই চর্চা করতেন। নিজের উপদেশমালা সম্পর্কে অবশ্য বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করেননি এই ধর্ম প্রবক্তা, কিন্তু তার অনুসারী লোকেরা সাধারণত হিন্দু ধর্মেরই কাছাকাছি থেকেছে সব সময়। ফলে শিখদের বিয়ে-শাদির রীতি মোটামুটি হিন্দু ধর্মের মতোই। তবে তাদের ধর্মে যৌতুক প্রথার প্রচলন নেই। প্রথমদিকে বিয়ের নিয়ম ছিল; বর ও কনে উভয়পক্ষই গুরুদুয়ারায় গ্রন্থির সামনে বসে যাবে। অতঃপর তাদের আশীর্বাদ করা হবে ইজাব ও কবুলের জন্য শ্লোক পাঠ করে। তবে তারাও রীতিমতো লগ্ন খোঁজে ও মণ্ডপ সাজায়; এমনকী আগুনের চারপাশে সাতটি চক্করও দেয়। শিখ ধর্মে দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই, তবে সাধারণত শিখ সমাজে এর প্রচলন খুব একটা দেখা যায় না।
টিকাঃ
*গুরুগ্রন্থ-সাহেবজি গুরু-বাণী অর্থাৎ পির মুর্শিদের মুখ থেকে নিঃসৃত শব্দ হিসেবে গণ্য।
📄 পারস্যে বিয়ে-শাদি
পারস্য ধর্মের প্রবর্তক ইবরাহিম জরথুস্ত্রের বিষয়ে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন। এমনকী হাদিসবিশারদগণ এ পর্যন্ত প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, কুরআন মাজিদে বর্ণিত জুলকারনাইনই হলো এ জরথুস্ত্র। উত্তর মেরু থেকে এসে লুটেরা দস্যুদের রুখে দেওয়ার জন্য লোহা গলিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তিনি। যদিও মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারভির অভিমত, জুলকারনাইন অন্য কেউ। তবে পারস্যের জরথুস্ত্র ধর্মে ইসলামের প্রভাব এখনও বিদ্যমান।
এই ধর্মে বিয়ের জন্য কেবল উভয়পক্ষের পারস্পরিক পছন্দই যথেষ্ট নয়; বরং দুপক্ষের ঘনিষ্ঠ কারও বাড়িতে বর-কনে দুজনকে আলাপ ও একান্তে বোঝাপড়ার সুযোগও করে দেওয়া হয়। এ সময় নিজ নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে মানসিক সমর্থন দেওয়া হয় তাদের। ছোটোখাটো বিষয়ে অমিল দেখা গেলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে উভয়ের মাঝে বন্ধন স্থাপনের অন্তরিক চেষ্টা করা হয়। এরপর বাকি থাকে বৈবাহিক কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত। অ্যানগেজমেন্ট উপলক্ষ্যে দুপক্ষের অল্প লোকজন একত্র হয়ে বিয়ের তারিখ ও অন্যান্য বিষয়াদি ঠিক করে। বিয়ের দিন আপ্যায়নের আয়োজন থাকে। উভয়পক্ষ সমানভাবে বহন করে বিয়ের যাবতীয় খরচ। ধর্মগুরু দস্তুর এখানে বিয়ে পড়ান। সংশ্লিষ্ট ধর্মগ্রন্থের শ্লোক পাঠ শেষে পাত্র-পাত্রীর জন্য কল্যাণের জন্য দুআ ও আশীর্বাদ করা হয়। এরপর বর-কনে কয়েকদিন ধরে উপাসনার জন্য অগ্নিমণ্ডপে যায়। এ সময়টাতে বিয়ের আপ্যায়ন চলমান থাকে। অল্প কদিন পর দম্পতি এসে শামিল হয় সেখানে। এভাবে উপাসনালয় থেকে বরকত হাসিলের পর তারা দাম্পত্যজীবন আরম্ভ করে। পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি নেই, তবে তালাকের সুযোগ আছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো-লাহোরের পারসিয়ান সমাজে কখনো তালাকের ঘটনাই ঘটেনি!