📄 কুরআন মাজিদ ও স্বপ্ন
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য কুরআন মাজিদ চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ গাইডলাইন।
কুরআন নাজিলের পর থেকে যুগ, সময় ও প্রজন্ম নির্বিশেষে তার নির্দেশনা যে সন্দেহাতীতভাবে প্রযোজ্য ও সঠিক-তা প্রমাণিত সত্য। স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআনের একাধিক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্নটি উপস্থাপন করা হয়েছে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনায়।
'আর যখন তিনি এতটুকু বেড়ে উঠেছেন যে, পিতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। ওই সময় কোনো একদিন পিতা তাঁকে বললেন-“হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, তোমাকে জবাই করছি। এ বিষয়ে ভেবে-চিন্তে তোমার মতামত জানাও।” তিনি বললেন-"হে আমার পিতা! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে হুকুম দিয়েছেন, আপনি ঠিক তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।"' সূরা সফফাত: ১০২
আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে পিতা-পুত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। ছেলেকে উপুড় করে মাটিতে শোয়ানো হলো। ঠিক এই সময় আমি ইবরাহিমকে ডাক দিলাম-"ব্যাস, থেমে যাও। আমি পুণ্যবানদের উত্তম বদলা দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে এটি আমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ছিল।" এরপর আমি তাঁর জায়গায় একটি বড়ো জন্তুকে রেখে দিলাম। আগামীর মানবজাতির জন্য এ হুকুমকে আমি একটি শিক্ষা হিসেবে বহাল রাখলাম। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই। কারণ, তিনি আমার অনুগত ও বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা সফফাত : ১১১
ইবরাহিম (আ.) নিজের ছেলেকে অল্প বয়সে আল্লাহর আদেশে জবাই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সন্তানকে উপুড় করে শোয়ালেন, যাতে সন্তানের চেহারা দেখে হৃদয়ে জেগে উঠা পিতৃস্নেহ কর্তব্যে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ঠিক এমন অবস্থায় আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ছুরি চালনা বন্ধ করার হুকুম দিয়ে সন্তানের স্থলে রেখে দিলেন একটি দুম্বা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতিফল হিসেবে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে যখন যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন। এমনকী বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন ইসহাক (আ.)-এর মতো এক নেককার সন্তান। আনুগত্যের এই দৃষ্টান্ত এরপর থেকে শাশ্বত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল। এরপর থেকে এই দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ইবরাহিমি আদর্শের অনুসরণে কুরবানি দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য কুরআন মাজিদ চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ গাইডলাইন।
কুরআন নাজিলের পর থেকে যুগ, সময় ও প্রজন্ম নির্বিশেষে তার নির্দেশনা যে সন্দেহাতীতভাবে প্রযোজ্য ও সঠিক-তা প্রমাণিত সত্য। স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআনের একাধিক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্নটি উপস্থাপন করা হয়েছে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনায়।
'আর যখন তিনি এতটুকু বেড়ে উঠেছেন যে, পিতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। ওই সময় কোনো একদিন পিতা তাঁকে বললেন-“হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, তোমাকে জবাই করছি। এ বিষয়ে ভেবে-চিন্তে তোমার মতামত জানাও।” তিনি বললেন-"হে আমার পিতা! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে হুকুম দিয়েছেন, আপনি ঠিক তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।"' সূরা সফফাত: ১০২
আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে পিতা-পুত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। ছেলেকে উপুড় করে মাটিতে শোয়ানো হলো। ঠিক এই সময় আমি ইবরাহিমকে ডাক দিলাম-"ব্যাস, থেমে যাও। আমি পুণ্যবানদের উত্তম বদলা দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে এটি আমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ছিল।" এরপর আমি তাঁর জায়গায় একটি বড়ো জন্তুকে রেখে দিলাম। আগামীর মানবজাতির জন্য এ হুকুমকে আমি একটি শিক্ষা হিসেবে বহাল রাখলাম। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই। কারণ, তিনি আমার অনুগত ও বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা সফফাত : ১১১
ইবরাহিম (আ.) নিজের ছেলেকে অল্প বয়সে আল্লাহর আদেশে জবাই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সন্তানকে উপুড় করে শোয়ালেন, যাতে সন্তানের চেহারা দেখে হৃদয়ে জেগে উঠা পিতৃস্নেহ কর্তব্যে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ঠিক এমন অবস্থায় আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ছুরি চালনা বন্ধ করার হুকুম দিয়ে সন্তানের স্থলে রেখে দিলেন একটি দুম্বা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতিফল হিসেবে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে যখন যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন। এমনকী বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন ইসহাক (আ.)-এর মতো এক নেককার সন্তান। আনুগত্যের এই দৃষ্টান্ত এরপর থেকে শাশ্বত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল। এরপর থেকে এই দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ইবরাহিমি আদর্শের অনুসরণে কুরবানি দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন।
📄 ইউসুফ (আ.) ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা
ইউসুফ (আ.)-এর প্রথম স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভাষ্য এরূপ- 'যখন ইউসুফ নিজের পিতা (ইয়াকুব)-কে বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি-১১টি তারকা, একটি সূর্য ও একটি চাঁদ আমাকে সিজদা করছে। তাঁর বাবা বললেন-প্রিয় বৎস! তুমি এই স্বপ্ন তোমার ভাইদের কখনো বলো না। হতে পারে, এটা শুনে তারা তোমার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার কোনো নীলনকশা করতে পারে। কারণ, শয়তান মানুষের পরিচিত শত্রু। এভাবে তোমার রব তোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, তাঁর করুণারাশি তোমার ও তোমার পিতার প্রতি পূর্ণ করবেন-যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের ওপর (পরিপূর্ণরূপে নিয়ামত প্রদান) করেছেন। কেননা, তিনি সর্বজ্ঞানী ও মহাপ্রজ্ঞাময়। বস্তুত, ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য শিক্ষার উপকরণ রয়েছে।' সূরা ইউসুফ: ৪-৭
পিতা ইয়াকুব (আ.) নিজ পুত্রের এমন আশ্চর্য স্বপ্ন অনুধাবন করে বললেন- 'তোমার ১১ জন ভাই ও পিতা-মাতা সম্মানে তোমার সামনে সিজদায় অবনত হবেন। আল্লাহ তোমাকে দান করবেন গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও অদ্বিতীয় বিশারদের যোগ্যতা। অনুরূপভাবে তোমাকে তিনি অনুগ্রহ করবেন নবুয়তের মর্যাদা দিয়ে, যেমনটি করেছিলেন পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি।'
ইউসুফ (আ.)-এর সেই স্বপ্নটিও পূরণ হয় মিশরে অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই পিতা-মাতা ও ভাইদের কাছ থেকে তিনি লাভ করেছিলেন বিশেষ সম্মান। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি এতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন যে, পৃথিবীতে কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম স্বপ্ন দেখার পরই ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে ঝড়-তুফান শুরু হয়ে যায়। মিশরের অধিপতির স্ত্রী তাঁকে কারাগারে পাঠায় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে। তিনি নিজেও অনিরাপদ পরিবেশে থাকার চেয়ে অধিকতর পছন্দ করেছেন কারাবাসকে। আর কারাবাসের পুরো সময় তিনি ব্যয় করেছেন জেলের কয়েদিদের মাঝে সদুপদেশ ও কল্যাণের শিক্ষা প্রচারের মধ্য দিয়ে।
কারাগারে তাঁর সময়ে কয়েদি হিসেবে প্রবেশ করে দুই তরুণ। তাদের একজন বলল-'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মুনিবের জন্য ফলের রস নিংড়ে নিচ্ছি।' অপরজন বলল-'আমি দেখেছি, আমার মাথার ওপর রুটির বোঝা। আর তা থেকে পাখির দল ছোঁ মেরে একেকটি রুটি খাচ্ছে। মেহেরবানি করে আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যাটি বয়ান করুন। আপনাকে আমরা একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে দেখছি।' ইউসুফ (আ.) জবাবে বললেন-'তোমাদের জন্য খাবার হাজির হওয়ার পরপরই আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পারব। কারণ, আল্লাহ আমাকে স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন। আর যারা আল্লাহর ওপর ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে না, আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।'
এরপর তিনি কয়েদিদের ইসলামের পয়গাম শোনালেন। দ্বীনে হানিফের১২ বার্তা দিতে গিয়ে বললেন-
'হে আমার কারাবন্ধুদ্বয়! তোমাদের মধ্যে একজন অচিরেই তার মুনিবকে পানীয় পান করানোর সুযোগ পাবে। আর দ্বিতীয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। আর পাখিরা তার মস্তক ঠুকরে খাবে। তোমরা আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করলে, এর ব্যাখ্যা এরূপ।'
তাদের মধ্যে যে ব্যক্তির মুক্তি আসন্ন, ইউসুফ (আ.) তাকে বললেন-'তুমি চাকরিতে পুনর্বহাল হলে তোমার মুনিবকে আমার কথাও বলবে।' কিন্তু শয়তান তাকে বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তিনি আরও কয়েক বছর কারাবাস যাপন করেন।
একবার বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন-সাতটি মোটাতাজা গাভিকে অপরটি সাতটি শীর্ণকায় দুর্বল গাভি খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সুপুষ্ট সবুজ শস্য গোছাকে গিলে ফেলছে অপর সাতটি জীর্ণ ও শুষ্ক গোছা। অতঃপর তিনি বললেন-'হে আমার লোকেরা! আমাকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাও।' তারা বলল-'এটি অনর্থক স্বপ্ন, এর কোনো ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই।' এই কথা শুনে কারামুক্ত সেই রাজকর্মচারী বললেন-'আমাকে জেলের অভ্যন্তরে পাঠাতে সম্মত হলে আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানানোর ব্যবস্থা করতে পারি।' এরপর জেলে গিয়ে তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বললেন-'বন্ধু আমার! স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন। আপনি বর্ণনা করলে ব্যাখ্যাটি তাদের কাছে পৌঁছে দেবো।'
তিনি ব্যাখ্যায় বললেন-
'তোমরা সাত বছর পর্যন্ত ফসল ফলাবে এবং রোজকার খাবারের অতিরিক্ত শস্য মজুদ রাখবে পরবর্তী সময়ের জন্য। কারণ, এরপর এমন সাতটি বছর আসবে, যখন খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করবে। আগের উৎপাদিত ফসলই হবে তখন একমাত্র সম্বল। এরপর পুরো এক বছর বন্ধ থাকবে বৃষ্টিপাত।' বাদশাহর প্রতিনিধি তাঁকে রাজদরবারে নিয়ে এলে তিনি বললেন-'আমার সেই বিষয়টির সুরাহা করা হোক, যে ঘটনায় মহিলারা নিজেদের হাত কেটেছিল। আর মেয়েদের কৌশল তো মারাত্মক কুটিল হয়ে থাকে।' সূরা ইউসুফ: ৪১-৫৬
বাদশাহ সংশ্লিষ্ট মহিলাদের কাছ থেকে বিষয়টির প্রকৃত রহস্য জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন-'ইউসুফকে ফুসলানোর ব্যাপারে তোমরা আসলে কী করেছিলে?' সকলেই সাক্ষ্য দিলো-'লোকটির মধ্যে আমরা কোনো মন্দ আচরণ দেখিনি।' মিশরের রানি বললেন-'সব সত্য যখন বেরিয়েই এসেছে, তবে আমিও আসল কথাটা বলি। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমিই তাঁকে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়েছিলাম-যাতে স্বামীর রোষানলে পড়ে না যাই। বস্তুত অপরাধ আমারই। আর নৈতিকতার সীমালঙ্ঘন থেকে সে পরিপূর্ণ মুক্ত।'
টিকাঃ
১২. পূর্ববর্তী সময়ে প্রেরিত রাসূলের অবিকৃত ধর্ম যা শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন মানবসমাজের জন্য নানীত ও ভারসাম্য পর্ণ। -অনুবাদর
ইউসুফ (আ.)-এর প্রথম স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভাষ্য এরূপ- 'যখন ইউসুফ নিজের পিতা (ইয়াকুব)-কে বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি-১১টি তারকা, একটি সূর্য ও একটি চাঁদ আমাকে সিজদা করছে। তাঁর বাবা বললেন-প্রিয় বৎস! তুমি এই স্বপ্ন তোমার ভাইদের কখনো বলো না। হতে পারে, এটা শুনে তারা তোমার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার কোনো নীলনকশা করতে পারে। কারণ, শয়তান মানুষের পরিচিত শত্রু। এভাবে তোমার রব তোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, তাঁর করুণারাশি তোমার ও তোমার পিতার প্রতি পূর্ণ করবেন-যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের ওপর (পরিপূর্ণরূপে নিয়ামত প্রদান) করেছেন। কেননা, তিনি সর্বজ্ঞানী ও মহাপ্রজ্ঞাময়। বস্তুত, ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য শিক্ষার উপকরণ রয়েছে।' সূরা ইউসুফ: ৪-৭
পিতা ইয়াকুব (আ.) নিজ পুত্রের এমন আশ্চর্য স্বপ্ন অনুধাবন করে বললেন- 'তোমার ১১ জন ভাই ও পিতা-মাতা সম্মানে তোমার সামনে সিজদায় অবনত হবেন। আল্লাহ তোমাকে দান করবেন গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও অদ্বিতীয় বিশারদের যোগ্যতা। অনুরূপভাবে তোমাকে তিনি অনুগ্রহ করবেন নবুয়তের মর্যাদা দিয়ে, যেমনটি করেছিলেন পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি।'
ইউসুফ (আ.)-এর সেই স্বপ্নটিও পূরণ হয় মিশরে অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই পিতা-মাতা ও ভাইদের কাছ থেকে তিনি লাভ করেছিলেন বিশেষ সম্মান। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি এতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন যে, পৃথিবীতে কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম স্বপ্ন দেখার পরই ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে ঝড়-তুফান শুরু হয়ে যায়। মিশরের অধিপতির স্ত্রী তাঁকে কারাগারে পাঠায় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে। তিনি নিজেও অনিরাপদ পরিবেশে থাকার চেয়ে অধিকতর পছন্দ করেছেন কারাবাসকে। আর কারাবাসের পুরো সময় তিনি ব্যয় করেছেন জেলের কয়েদিদের মাঝে সদুপদেশ ও কল্যাণের শিক্ষা প্রচারের মধ্য দিয়ে।
কারাগারে তাঁর সময়ে কয়েদি হিসেবে প্রবেশ করে দুই তরুণ। তাদের একজন বলল-'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মুনিবের জন্য ফলের রস নিংড়ে নিচ্ছি।' অপরজন বলল-'আমি দেখেছি, আমার মাথার ওপর রুটির বোঝা। আর তা থেকে পাখির দল ছোঁ মেরে একেকটি রুটি খাচ্ছে। মেহেরবানি করে আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যাটি বয়ান করুন। আপনাকে আমরা একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে দেখছি।' ইউসুফ (আ.) জবাবে বললেন-'তোমাদের জন্য খাবার হাজির হওয়ার পরপরই আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পারব। কারণ, আল্লাহ আমাকে স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন। আর যারা আল্লাহর ওপর ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে না, আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।'
এরপর তিনি কয়েদিদের ইসলামের পয়গাম শোনালেন। দ্বীনে হানিফের১২ বার্তা দিতে গিয়ে বললেন-
'হে আমার কারাবন্ধুদ্বয়! তোমাদের মধ্যে একজন অচিরেই তার মুনিবকে পানীয় পান করানোর সুযোগ পাবে। আর দ্বিতীয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। আর পাখিরা তার মস্তক ঠুকরে খাবে। তোমরা আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করলে, এর ব্যাখ্যা এরূপ।'
তাদের মধ্যে যে ব্যক্তির মুক্তি আসন্ন, ইউসুফ (আ.) তাকে বললেন-'তুমি চাকরিতে পুনর্বহাল হলে তোমার মুনিবকে আমার কথাও বলবে।' কিন্তু শয়তান তাকে বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তিনি আরও কয়েক বছর কারাবাস যাপন করেন।
একবার বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন-সাতটি মোটাতাজা গাভিকে অপরটি সাতটি শীর্ণকায় দুর্বল গাভি খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সুপুষ্ট সবুজ শস্য গোছাকে গিলে ফেলছে অপর সাতটি জীর্ণ ও শুষ্ক গোছা। অতঃপর তিনি বললেন-'হে আমার লোকেরা! আমাকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাও।' তারা বলল-'এটি অনর্থক স্বপ্ন, এর কোনো ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই।' এই কথা শুনে কারামুক্ত সেই রাজকর্মচারী বললেন-'আমাকে জেলের অভ্যন্তরে পাঠাতে সম্মত হলে আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানানোর ব্যবস্থা করতে পারি।' এরপর জেলে গিয়ে তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বললেন-'বন্ধু আমার! স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন। আপনি বর্ণনা করলে ব্যাখ্যাটি তাদের কাছে পৌঁছে দেবো।'
তিনি ব্যাখ্যায় বললেন-
'তোমরা সাত বছর পর্যন্ত ফসল ফলাবে এবং রোজকার খাবারের অতিরিক্ত শস্য মজুদ রাখবে পরবর্তী সময়ের জন্য। কারণ, এরপর এমন সাতটি বছর আসবে, যখন খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করবে। আগের উৎপাদিত ফসলই হবে তখন একমাত্র সম্বল। এরপর পুরো এক বছর বন্ধ থাকবে বৃষ্টিপাত।' বাদশাহর প্রতিনিধি তাঁকে রাজদরবারে নিয়ে এলে তিনি বললেন-'আমার সেই বিষয়টির সুরাহা করা হোক, যে ঘটনায় মহিলারা নিজেদের হাত কেটেছিল। আর মেয়েদের কৌশল তো মারাত্মক কুটিল হয়ে থাকে।' সূরা ইউসুফ: ৪১-৫৬
বাদশাহ সংশ্লিষ্ট মহিলাদের কাছ থেকে বিষয়টির প্রকৃত রহস্য জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন-'ইউসুফকে ফুসলানোর ব্যাপারে তোমরা আসলে কী করেছিলে?' সকলেই সাক্ষ্য দিলো-'লোকটির মধ্যে আমরা কোনো মন্দ আচরণ দেখিনি।' মিশরের রানি বললেন-'সব সত্য যখন বেরিয়েই এসেছে, তবে আমিও আসল কথাটা বলি। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমিই তাঁকে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়েছিলাম-যাতে স্বামীর রোষানলে পড়ে না যাই। বস্তুত অপরাধ আমারই। আর নৈতিকতার সীমালঙ্ঘন থেকে সে পরিপূর্ণ মুক্ত।'
টিকাঃ
১২. পূর্ববর্তী সময়ে প্রেরিত রাসূলের অবিকৃত ধর্ম যা শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন মানবসমাজের জন্য নানীত ও ভারসাম্য পর্ণ। -অনুবাদর
📄 মহানবি ﷺ ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা
মহানবি মুহাম্মাদ স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান পেয়েছেন সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর, দিনের শুরুতেই উপস্থিত লোকজনকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত রাখতেন তিনি। এর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ভোরের আলো ফোটার আগেই স্বপ্নের বিবরণ শোনা হতো। কেননা, সবেমাত্র দেখা স্বপ্নের স্মৃতি মানুষের মনে তখনও থাকত তাজা, ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল কম। কখনো কখনো অন্যদের বর্ণনা শুনে নিজের স্বপ্নের একটু-আধটু ভুলে যাওয়া অংশও স্মরণ হয়ে যেত। সাহাবাদের স্বপ্নের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য নবিজি প্রথমে নিজের স্বপ্নের বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিতেন। এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, সে প্রসঙ্গে গুরুত্বারোপ করতেন সবথেকে বেশি। তাঁর স্বপ্ন একদিকে ছিল মানুষের জন্য উত্তম শিক্ষা, অন্যদিকে ছিল অনাগত দিনের ভবিষ্যদ্বাণী। তাঁর কোনো কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুখারির কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত। এমন একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমরা এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পরিবর্তে সারাংশটি শুধু উদ্ধৃত করব-
সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল প্রতিদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন, আজকে কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি না? এরপর লোকেরা যে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন, তা বর্ণনা করত তাঁর কাছে। একদিন ফজরের পর তিনি বললেন-
'রাতে দুজন ফেরেশতা এসে আমাকে তাঁদের সাথে করে নিয়ে যায়। এক জায়গায় গিয়ে দেখা গেল, এক লোক কাত হয়ে শুয়ে আছে আর তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা ভারী পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাথরের আঘাতে লোকটির মাথা বিচূর্ণ করে দিচ্ছে ফেরেশতা। যেই মাত্র লোকটি পাশ ফেরে, আবার আগের মতো ভালো হয়ে যায়। ফেরেশতা পুনরায় তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত হানে। জানা গেল-লোকটি কুরআনের জ্ঞান অর্জন করে তা স্মরণ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফরজ নামাজের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে আরামদায়ক নিদ্রাকে।
দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দেখলাম, ফেরেশতা তার মুখের ভেতর কাঁচি ঢুকিয়ে তার দুই প্রান্ত অর্থাৎ দুই কান ও চোখ পর্যন্ত চিরে ফেলছে। একপাশ চিড়ে শেষ করতে না করতেই অপর পাশ ফিরে যাচ্ছে আগের অবয়বে। এভাবে অব্যাহতভাবে চলছে তাকে শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া। এরপর দেখতে পাই বিশাল এক গর্ত। তাতে অসংখ্য বিবস্ত্র নরনারী। তাদের নিচে প্রজ্বলিত হচ্ছে প্রকাণ্ড আগুনের হাড়ি। সেখান থেকে অবিরাম আগুনের লেলিহান শিখা উত্থিত হয়ে তাদের দগ্ধ করছে। জানা গেল-তারা সকলেই ছিল পাপাচারী।
এরপর একটি নদী দেখতে পেলাম, যার পানি রক্তের মতো লাল। এক লোক সেখানে সাঁতার কাটছে। বারবার সে এগিয়ে আসছে তীরে বসা অন্য একজন লোকের দিকে। আর প্রতিবার সে পাথর ছুড়ে মারছে সন্তরণরত লোকটির দিকে। জানা গেল-লোকটি সুদের কারবারি করত। এরপর লম্বা, কুৎসিত ও ভয়ানক অবয়বের এক মানুষকে দেখলাম। সে ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে আগুন জ্বালানোর কাজ করছে। বলা হলো-এই লোকটি জাহান্নামের প্রধান দারোগা "মালেক"।
এরপর আমরা নয়নাভিরাম ও অনিন্দ্যসুন্দর এক বাগানে প্রবেশ করলাম। সেখানেও অনেক লম্বা এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তিনি এত দীর্ঘকায় যে, ভালোমতো তার মাথা দেখতে পাওয়া কঠিন। চারপাশে তাঁর একদল ছোটো ছোটো শিশু। জানা গেল-তিনি ইবরাহিম (আ.) আর বাচ্চাগুলো হলো তাঁরা, শৈশবে যারা জন্মগতভাবে ইসলামের স্বাভাবিক অনুসারী হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছে। এরপর এক বর্ণনাতীত ও অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত পুষ্পোদ্যানে এলাম, যার গাছ-গাছালি অত্যধিক সুন্দর ও মনোরম। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখা গেল, রুপার ইটে গড়া চমৎকার এক শহর। ভেতরে গিয়ে দেখি, সেখানে মানুষের দেহ অর্ধেক সুন্দর আর বাকি অর্ধেক কুৎসিত। তাদের বলা হলো-তোমরা নদীতে ঝাঁপ দাও। নদীর স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাদের পুরো শরীর সুন্দর হয়ে উঠল। জানা গেল-এটি বেহেশতের ল আদন। এই লোকগুলো মূলত
'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর রাসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত (বাস্তবায়িত) করেছেন। আর বাস্তবতা হলো-নিঃসন্দেহে তোমরা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে সম্মানিত মসজিদে প্রবেশ করবে। কেউ মাথা মুণ্ডানো অবস্থায়, আবার কেউ মাথার চুল ছোটো করা অবস্থায়। প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। এ ছাড়াও তিনি তোমাদের সদ্য বিজয় দান করেছেন।' সূরা ফাতাহ: ২৭
এই স্বপ্নের কারণ হলো-হুদাইবিয়া এলাকায় অবস্থানকালে আল্লাহর রাসূল স্বপ্নে দেখেছিলেন, সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় প্রবেশ করেছে। সেখানে তাঁরা কেউ পশু কুরবানি দিচ্ছেন, কেউ-বা ব্যস্ত মাথা মুণ্ডনের কাজে। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলা হলো-তাঁরা পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করবেন, কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে সে সময় তাঁদের মক্কায় প্রবেশ সম্ভবপর হয়নি। এমতাবস্থায় লোকজনের ধারণা হতে পারে, স্বপ্ন তো আর বাস্তবে রূপ নিল না; এজন্য এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, পয়গম্বরের স্বপ্ন তো দুদিন আগে-পরে বাস্তবায়ন হবেই। অবশেষে এ স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল খায়বার বিজয়ের মধ্য দিয়ে। অনুরূপভাবে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের আগে তিনি খেজুরের উপত্যকা স্বপ্নে দেখেন। এটি ছিল সাহাবিদের নিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, আগামী দিনে তাঁদের ঠিকানা হবে খর্জুরবীথিকার দেশে।
মহানবি মুহাম্মাদ স্বপ্নের ব্যাখ্যার জ্ঞান পেয়েছেন সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর, দিনের শুরুতেই উপস্থিত লোকজনকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত রাখতেন তিনি। এর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ভোরের আলো ফোটার আগেই স্বপ্নের বিবরণ শোনা হতো। কেননা, সবেমাত্র দেখা স্বপ্নের স্মৃতি মানুষের মনে তখনও থাকত তাজা, ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল কম। কখনো কখনো অন্যদের বর্ণনা শুনে নিজের স্বপ্নের একটু-আধটু ভুলে যাওয়া অংশও স্মরণ হয়ে যেত। সাহাবাদের স্বপ্নের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য নবিজি প্রথমে নিজের স্বপ্নের বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিতেন। এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, সে প্রসঙ্গে গুরুত্বারোপ করতেন সবথেকে বেশি। তাঁর স্বপ্ন একদিকে ছিল মানুষের জন্য উত্তম শিক্ষা, অন্যদিকে ছিল অনাগত দিনের ভবিষ্যদ্বাণী। তাঁর কোনো কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুখারির কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত। এমন একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমরা এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার পরিবর্তে সারাংশটি শুধু উদ্ধৃত করব-
সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল প্রতিদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করতেন, আজকে কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি না? এরপর লোকেরা যে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন, তা বর্ণনা করত তাঁর কাছে। একদিন ফজরের পর তিনি বললেন-
'রাতে দুজন ফেরেশতা এসে আমাকে তাঁদের সাথে করে নিয়ে যায়। এক জায়গায় গিয়ে দেখা গেল, এক লোক কাত হয়ে শুয়ে আছে আর তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা ভারী পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাথরের আঘাতে লোকটির মাথা বিচূর্ণ করে দিচ্ছে ফেরেশতা। যেই মাত্র লোকটি পাশ ফেরে, আবার আগের মতো ভালো হয়ে যায়। ফেরেশতা পুনরায় তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত হানে। জানা গেল-লোকটি কুরআনের জ্ঞান অর্জন করে তা স্মরণ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফরজ নামাজের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে আরামদায়ক নিদ্রাকে।
দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দেখলাম, ফেরেশতা তার মুখের ভেতর কাঁচি ঢুকিয়ে তার দুই প্রান্ত অর্থাৎ দুই কান ও চোখ পর্যন্ত চিরে ফেলছে। একপাশ চিড়ে শেষ করতে না করতেই অপর পাশ ফিরে যাচ্ছে আগের অবয়বে। এভাবে অব্যাহতভাবে চলছে তাকে শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া। এরপর দেখতে পাই বিশাল এক গর্ত। তাতে অসংখ্য বিবস্ত্র নরনারী। তাদের নিচে প্রজ্বলিত হচ্ছে প্রকাণ্ড আগুনের হাড়ি। সেখান থেকে অবিরাম আগুনের লেলিহান শিখা উত্থিত হয়ে তাদের দগ্ধ করছে। জানা গেল-তারা সকলেই ছিল পাপাচারী।
এরপর একটি নদী দেখতে পেলাম, যার পানি রক্তের মতো লাল। এক লোক সেখানে সাঁতার কাটছে। বারবার সে এগিয়ে আসছে তীরে বসা অন্য একজন লোকের দিকে। আর প্রতিবার সে পাথর ছুড়ে মারছে সন্তরণরত লোকটির দিকে। জানা গেল-লোকটি সুদের কারবারি করত। এরপর লম্বা, কুৎসিত ও ভয়ানক অবয়বের এক মানুষকে দেখলাম। সে ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে আগুন জ্বালানোর কাজ করছে। বলা হলো-এই লোকটি জাহান্নামের প্রধান দারোগা "মালেক"।
এরপর আমরা নয়নাভিরাম ও অনিন্দ্যসুন্দর এক বাগানে প্রবেশ করলাম। সেখানেও অনেক লম্বা এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তিনি এত দীর্ঘকায় যে, ভালোমতো তার মাথা দেখতে পাওয়া কঠিন। চারপাশে তাঁর একদল ছোটো ছোটো শিশু। জানা গেল-তিনি ইবরাহিম (আ.) আর বাচ্চাগুলো হলো তাঁরা, শৈশবে যারা জন্মগতভাবে ইসলামের স্বাভাবিক অনুসারী হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছে। এরপর এক বর্ণনাতীত ও অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত পুষ্পোদ্যানে এলাম, যার গাছ-গাছালি অত্যধিক সুন্দর ও মনোরম। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখা গেল, রুপার ইটে গড়া চমৎকার এক শহর। ভেতরে গিয়ে দেখি, সেখানে মানুষের দেহ অর্ধেক সুন্দর আর বাকি অর্ধেক কুৎসিত। তাদের বলা হলো-তোমরা নদীতে ঝাঁপ দাও। নদীর স্বচ্ছ পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাদের পুরো শরীর সুন্দর হয়ে উঠল। জানা গেল-এটি বেহেশতের ল আদন। এই লোকগুলো মূলত
'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর রাসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত (বাস্তবায়িত) করেছেন। আর বাস্তবতা হলো-নিঃসন্দেহে তোমরা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে সম্মানিত মসজিদে প্রবেশ করবে। কেউ মাথা মুণ্ডানো অবস্থায়, আবার কেউ মাথার চুল ছোটো করা অবস্থায়। প্রকৃত ব্যাপার আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। এ ছাড়াও তিনি তোমাদের সদ্য বিজয় দান করেছেন।' সূরা ফাতাহ: ২৭
এই স্বপ্নের কারণ হলো-হুদাইবিয়া এলাকায় অবস্থানকালে আল্লাহর রাসূল স্বপ্নে দেখেছিলেন, সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় প্রবেশ করেছে। সেখানে তাঁরা কেউ পশু কুরবানি দিচ্ছেন, কেউ-বা ব্যস্ত মাথা মুণ্ডনের কাজে। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলা হলো-তাঁরা পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করবেন, কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে সে সময় তাঁদের মক্কায় প্রবেশ সম্ভবপর হয়নি। এমতাবস্থায় লোকজনের ধারণা হতে পারে, স্বপ্ন তো আর বাস্তবে রূপ নিল না; এজন্য এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, পয়গম্বরের স্বপ্ন তো দুদিন আগে-পরে বাস্তবায়ন হবেই। অবশেষে এ স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল খায়বার বিজয়ের মধ্য দিয়ে। অনুরূপভাবে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের আগে তিনি খেজুরের উপত্যকা স্বপ্নে দেখেন। এটি ছিল সাহাবিদের নিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, আগামী দিনে তাঁদের ঠিকানা হবে খর্জুরবীথিকার দেশে।
📄 বিষণ্ণ নারী
আলাদা তিনটি সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত-
'আল্লাহর রাসূল স্বপ্নে দেখেন, বিষণ্ণবদন মহিলা মদিনা থেকে বের হয়ে জুহফা এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। নবিজি এর ব্যাখ্যা করলেন-মহামারি মদিনা থেকে বেরিয়ে জুহফা এলাকায় স্থানান্তরিত হয়ে গেছে।'
আলাদা তিনটি সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত-
'আল্লাহর রাসূল স্বপ্নে দেখেন, বিষণ্ণবদন মহিলা মদিনা থেকে বের হয়ে জুহফা এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। নবিজি এর ব্যাখ্যা করলেন-মহামারি মদিনা থেকে বেরিয়ে জুহফা এলাকায় স্থানান্তরিত হয়ে গেছে।'