📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 ইস্তেখারা কী

📄 ইস্তেখারা কী


আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এটা প্রমাণিত, কেউ নিজের পছন্দমতো স্বপ্ন দেখতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে নবিজি নিজের পছন্দমতো স্বপ্ন দেখার ফর্মুলা প্রদান করেছেন। হাদিস বিশারদগণ এটাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘ইস্তেখারা’ নামে। এর নিয়ম হলো-এশার নামাজের পর দুই রাকাত نفل নামাজ পড়ে নির্দিষ্ট দুআগুলো পাঠ করতে হবে। এরপর কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে প্রার্থনা করতে হবে আল্লাহর কাছে। ইস্তেখারায় মূলত কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে রবের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়। এর ফলে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে মেহেরবানি করে স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দেন, কাজটি তার জন্য উপকারী হবে কি না। উপকারী না হলে আল্লাহ যে তাকে এটা শুধু জানিয়ে দেবেন, এমন নয়; বরং বান্দার মন থেকে বিষয়টির প্রতি আগ্রহও তুলে নেবেন তিনি।

এই পদ্ধতিতে দুআ করে আল্লাহর নির্দেশনা কামনা করার পর অবশ্যই স্বপ্নে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একদিনে না পেলে ধারাবাহিকভাবে তিন রাত এ আমল জারি রাখতে হয়। ৯৫ শতাংশ মানুষই সুস্পষ্ট ইশারা পেয়ে থাকে। যারা স্বপ্নে কিছু দেখেন না, তাদের দুআও বৃথা যায় না একেবারে; বরং আল্লাহ তাদের মনে বিষয়টির প্রতি অনীহা জাগিয়ে তোলেন অথবা মনকে ধাবিত করে দেন কোনো ইতিবাচক দিকে। শর্ত হলো, ইস্তেখারার বিষয়টি নিষিদ্ধ কাজ না হওয়া। যেমন: জুয়া, ব্যভিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তেখারা হারাম। কারণ, জুয়া কিংবা সকল প্রকার বাজির শর্তসাপেক্ষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাজেই জুয়াভিত্তিক রেস বা ঘোড়দৌড় প্রভৃতি খেলার বাজিতে ইস্তেখারা করে কোনো ফায়দা নেই।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 মস্তিষ্কের জানালা

📄 মস্তিষ্কের জানালা


স্বপ্ন প্রকৃতপক্ষে অবচেতনের রাজ্যে গমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা। এই পথ ধরেই আমরা ওই জগৎটির খবরাখবর জানতে পারি। এমনকী সেই জগতের প্রত্যক্ষ করা ঘটনাবলির সূত্র ধরে কিছু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করাও অসম্ভব নয়। এজন্যই স্বপ্নকে কেউ কেউ সাব্যস্ত করেছেন মস্তিষ্কের জানালা হিসেবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য তারা প্রণয়ন করেছেন বিধিবদ্ধ নীতিমালা।

চেতন অবস্থায় আমাদের মনের একাংশে নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় বিধানের একটি চিত্র এমন এক রূপে প্রতিফলিত হয়, আমরা নিজেরাও তার ভেতরকার খবর জানতে পারি না। স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা সেই সুপ্ত পথটির হদিস পেয়ে যাই। যেমন: হিংস্রতা, জিঘাংসা, জৈবিক চাহিদার লালসা প্রভৃতি নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নের রূপে বেরিয়ে আসে। ফ্রয়েডের তথ্যজ্ঞান অনুযায়ী-রোগীর ধারণক্ষমতা, মূত্রথলিতে প্রশ্রাবের বেগ, শৈশবের কষ্টদায়ক স্মৃতি, প্রাত্যহিক জীবনের ঘটনাবলি ও তার প্রভাবের সম্মিলনে স্বপ্নের অবয়বটি পরিগঠিত। স্বপ্নে যা কিছুই পরিদৃষ্ট হয়, তা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।
এক. বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং কারও সঙ্গে শত্রুতা-মিত্রতা স্পষ্ট ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশ।

দুই. মনের গভীরে লালিত ব্যক্তির গোপন আকাঙ্ক্ষা, সুপ্ত মনোবাসনার প্রতিফলন। মনোবিজ্ঞানীরা পারদর্শিতার সাথে রোগীর ব্যক্তিত্বের গঠন ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেন। এই ধরনের কেস স্টাডিতে স্বপ্নের বিবরণ শোনার আগে রোগীকে সাধারণত কিছু প্রশ্ন করা হয়। দেখা যায়, অতীতের অনেক কিছুই রোগীর স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। বিষয়টি এমন হলে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বোধগম্য হয়ে ওঠে। এটাকে বলা হয় Symbolism বা সাংকেতিক ভাষা।

স্বপ্ন দেখার সময় মানুষ চায়-সেটি যেন টুটে না যায়, যেন সময়পর্বটা যথাসাধ্য দীর্ঘায়িত হয়। এর কারণ এমন নয় যে স্বপটি মনোমুগ্ধকর ও মোহনীয়। আসল কারণ হলো-স্বপ্নের চোরাপথে মস্তিষ্কের অবচেতন অবস্থাটাকে বাইরে নিয়ে আসার সুযোগ মিলেছে। এর মাধ্যমেই ব্যক্তি সেসব দেখার ও করার সুযোগ পেয়ে যায়, যা সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এবং স্পষ্টভাবে কখনোই সম্ভব নয়। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নের স্পষ্ট অংশেও প্রচ্ছন্ন অংশের ইতিবাচক অথবা বিপ্রতীপ ইঙ্গিত থাকে। যেমন: আপনার সঙ্গে এমন কোনো ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, যিনি চশমা পরেন। এক দীর্ঘ ও জটিল কাহিনির স্বপ্নপ্রবাহের কোনো অংশে চশমাকে এমন দৃশ্যে দেখতে পাবেন, যা মন্দ কিছু ইঙ্গিত করে। এখানে ওই ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট আলামত তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করছে।

স্বপ্ন দেখার পর কাউকে এর বিস্তারিত বলার জন্য অনুরোধ করে দেখা গেছে, স্বপ্নের বেশিরভাগ অংশ তিনি ভুলে গেছেন। এরপর তিনি আনুষঙ্গিক ভাবনা ও জুতসই কোনো টুকরো জোড়াতালি দিয়ে ঘটনাটিকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রায়শই স্বপ্নে দেখাই যায়নি-এমন একাধিক টুকরো জুড়ে দিয়ে গল্পটিকে পূর্ণাঙ্গতা দেওয়া হয়, যাতে শ্রোতার কাছে কাহিনিটি হয়ে উঠে অধিকতর পরিচ্ছন্ন।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ প্রায়শই Free Association পদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় রোগীর দ্বিধাহীন ও সচেতন সম্মতির মাধ্যমে তার অবচেতনে পৌঁছার চেষ্টা করেন চিকিৎসক। যেমন: রোগীকে কুকুরের আওয়াজ শুনিয়ে প্রশ্ন করা হবে, তার মনে প্রথম কোন ভাবনার উদয় হয়েছে। সেটাকে সূত্র হিসেবে ধরে রোগী বাড়াতে থাকবেন তার ভাবনার পরিধি। এভাবে কোনো একটি ধাপে গিয়ে মন থেকে সেই আসল বিষয়টি বাইরে নিয়ে আসবে, যেদিকে ইঙ্গিত করার জন্য স্বপ্নে কুকুর দেখা গেছে।

সাধারণত মুসলিম সমাজে কুকুরকে নাপাক, নোংরা ও হিংস্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন ভালো মুসলমান নিজের ঘরে কুকুর রাখা পছন্দ করেন না। কাজেই স্বপ্নে কুকুর দেখলে তার মনে হয়-নিশ্চয়ই এটি কোনো ঘৃণ্য ব্যক্তির প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, যে তার ঘরের লোক বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ইউরোপে কুকুর খুবই আকর্ষণীয়, প্রিয় ও পাহারাদার বন্ধু। তাদের স্বপ্নে কুকুর দেখার ব্যাখ্যা হবে, কোনো তোষামোদকারী ব্যক্তির প্রতি ইশারাব্যঞ্জক।

স্বপ্ন প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছায়া হয়ে থাকে। এটা বললেও ভুল হবে না যে, স্বপ্নে ব্যক্তির মস্তিষ্ক অন্য মানুষের আকৃতিতে তাকে গোপন কোনো বার্তা সরবরাহ করছে। স্বপ্নের কাহিনি শোনার জন্য আপনি খুব ভোরে কারও বাড়িতে গিয়ে হাজির হলে সে সময়কার বর্ণনা, আর একজন মানসিক চিকিৎসকের কাছে পরবর্তী মাঝে দেখা যাবে বিস্তর তফাত। কারণ, স্থান-কাল পরিবর্তনের ফলে মানুষের মনের অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। বিশেষত, যেসব বিষয়ে আবেগ-অনুভূতির সংশ্লিষ্টতা থাকবে, সেসব ক্ষেত্রে রূপান্তর খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কাউকে তার দেখা স্বপ্নের বিবরণ লিখতে বলা হলে অধিকাংশ বর্ণনা ১৫০ শব্দের বেশি এগোয় না, কিন্তু লেখাটি পড়ার পর তাকে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা হলে হু হু করে বাড়তে থাকে বর্ণনার কলেবর। এমনকী অনেক সময় দেখা গেছে, দ্বিতীয়বারের জিজ্ঞাসার জবাবে যে বিবরণ মিলেছে-তা প্রথমবারের তুলনায় তিনগুণ দীর্ঘ।

স্বপ্ন আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত অবচেতন প্রকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম। কাজেই এতে ক্ষোভ, ঘৃণা, অতিরঞ্জন-সবকিছুর মিশেল থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে এখানে যতটুকু আসল রূপ থাকবে, বেশিরভাগ সময় নাটকীয়তার পরিমাণ থাকবে তার চেয়ে বেশি। ধরুন, স্বপ্নে কেউ একটি স্টেডিয়ামে বসে বক্সিং লড়াই দেখছেন; কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখল, সে শুয়ে আছে বিছানা ছাড়া একটি শক্ত খাটে। এক্ষেত্রে বক্সিংটা তার মনের রাগ প্রকাশের প্রতীক। দর্শক হিসেবে একপক্ষের ভক্ত হয়ে সে তার বিজয় কামনা করে। নিজের পক্ষের বক্সার যত আঘাত পেতে থাকে, প্রতিটি আঘাত যেন অনুভূত হয় তার শরীর জুড়ে। মনে হয় সে নিজেই মার খাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলবেন, মূলত খাটের শক্ত পাটাতন তার শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি করেছে, সেই পীড়াকেই অবচেতনে সে প্রত্যক্ষ করেছে বক্সারের রূপকে।

ফ্রয়েডের এই ব্যাখ্যা আমরা কেবল সেসব স্বপ্নের ক্ষেত্রেই সঠিক বলে মানতে পারি, যেসব স্বপ্নের জন্য আমরা দায় চাপাই পেটের অসুখের ওপর অথবা যেসব স্বপ্ন মানুষ দেখে থাকে আধো, ঘুম আধো জাগরণে। এই ধরনেরই একটি স্বপ্ন একবার আল্লাহর রাসূল -এর সামনে পেশ করা হয়। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত-
'এক ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূল -কে বললেন, সে স্বপ্নে দেখেছে-তার মাথা কেটে ফেলা হয়েছে আর মাথাটির পেছনে পেছনে সে দৌড়াচ্ছে। আল্লাহর রাসূল তাকে ধমক দিয়ে বললেন, এই ধরনের স্বপ্ন ভবিষ্যতে কাউকে বর্ণনা করতে আসবে না। এগুলো শয়তানের ভেলকিবাজি।' বুখারি ও মুসলিম

এই হাদিস শিক্ষা দেয়, মন্দ ও ভয়ানক স্বপ্ন কাউকে বলতে নেই। এরূপ স্বপ্ন দেখলে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে শয়তানের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করবে আর তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে নিজের বামদিকে, তাহলেই স্বপ্নের ক্ষতিকর যেকোনো পরিণতি থেকে আল্লাহ তাকে হেফাজত করবেন।

স্বপ্ন প্রকৃতপক্ষে অবচেতনের রাজ্যে গমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা। এই পথ ধরেই আমরা ওই জগৎটির খবরাখবর জানতে পারি। এমনকী সেই জগতের প্রত্যক্ষ করা ঘটনাবলির সূত্র ধরে কিছু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করাও অসম্ভব নয়। এজন্যই স্বপ্নকে কেউ কেউ সাব্যস্ত করেছেন মস্তিষ্কের জানালা হিসেবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য তারা প্রণয়ন করেছেন বিধিবদ্ধ নীতিমালা।

চেতন অবস্থায় আমাদের মনের একাংশে নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় বিধানের একটি চিত্র এমন এক রূপে প্রতিফলিত হয়, আমরা নিজেরাও তার ভেতরকার খবর জানতে পারি না। স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা সেই সুপ্ত পথটির হদিস পেয়ে যাই। যেমন: হিংস্রতা, জিঘাংসা, জৈবিক চাহিদার লালসা প্রভৃতি নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নের রূপে বেরিয়ে আসে। ফ্রয়েডের তথ্যজ্ঞান অনুযায়ী-রোগীর ধারণক্ষমতা, মূত্রথলিতে প্রশ্রাবের বেগ, শৈশবের কষ্টদায়ক স্মৃতি, প্রাত্যহিক জীবনের ঘটনাবলি ও তার প্রভাবের সম্মিলনে স্বপ্নের অবয়বটি পরিগঠিত। স্বপ্নে যা কিছুই পরিদৃষ্ট হয়, তা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।

এক. বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং কারও সঙ্গে শত্রুতা-মিত্রতা স্পষ্ট ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশ।

দুই. মনের গভীরে লালিত ব্যক্তির গোপন আকাঙ্ক্ষা, সুপ্ত মনোবাসনার প্রতিফলন। মনোবিজ্ঞানীরা পারদর্শিতার সাথে রোগীর ব্যক্তিত্বের গঠন ও বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেন। এই ধরনের কেস স্টাডিতে স্বপ্নের বিবরণ শোনার আগে রোগীকে সাধারণত কিছু প্রশ্ন করা হয়। দেখা যায়, অতীতের অনেক কিছুই রোগীর স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। বিষয়টি এমন হলে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বোধগম্য হয়ে ওঠে। এটাকে বলা হয় Symbolism বা সাংকেতিক ভাষা।

স্বপ্ন দেখার সময় মানুষ চায়-সেটি যেন টুটে না যায়, যেন সময়পর্বটা যথাসাধ্য দীর্ঘায়িত হয়। এর কারণ এমন নয় যে স্বপটি মনোমুগ্ধকর ও মোহনীয়। আসল কারণ হলো-স্বপ্নের চোরাপথে মস্তিষ্কের অবচেতন অবস্থাটাকে বাইরে নিয়ে আসার সুযোগ মিলেছে। এর মাধ্যমেই ব্যক্তি সেসব দেখার ও করার সুযোগ পেয়ে যায়, যা সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এবং স্পষ্টভাবে কখনোই সম্ভব নয়। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নের স্পষ্ট অংশেও প্রচ্ছন্ন অংশের ইতিবাচক অথবা বিপ্রতীপ ইঙ্গিত থাকে। যেমন: আপনার সঙ্গে এমন কোনো ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, যিনি চশমা পরেন। এক দীর্ঘ ও জটিল কাহিনির স্বপ্নপ্রবাহের কোনো অংশে চশমাকে এমন দৃশ্যে দেখতে পাবেন, যা মন্দ কিছু ইঙ্গিত করে। এখানে ওই ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট আলামত তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করছে।

স্বপ্ন দেখার পর কাউকে এর বিস্তারিত বলার জন্য অনুরোধ করে দেখা গেছে, স্বপ্নের বেশিরভাগ অংশ তিনি ভুলে গেছেন। এরপর তিনি আনুষঙ্গিক ভাবনা ও জুতসই কোনো টুকরো জোড়াতালি দিয়ে ঘটনাটিকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রায়শই স্বপ্নে দেখাই যায়নি-এমন একাধিক টুকরো জুড়ে দিয়ে গল্পটিকে পূর্ণাঙ্গতা দেওয়া হয়, যাতে শ্রোতার কাছে কাহিনিটি হয়ে উঠে অধিকতর পরিচ্ছন্ন।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য মনোবিজ্ঞানীগণ প্রায়শই Free Association পদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় রোগীর দ্বিধাহীন ও সচেতন সম্মতির মাধ্যমে তার অবচেতনে পৌঁছার চেষ্টা করেন চিকিৎসক। যেমন: রোগীকে কুকুরের আওয়াজ শুনিয়ে প্রশ্ন করা হবে, তার মনে প্রথম কোন ভাবনার উদয় হয়েছে। সেটাকে সূত্র হিসেবে ধরে রোগী বাড়াতে থাকবেন তার ভাবনার পরিধি। এভাবে কোনো একটি ধাপে গিয়ে মন থেকে সেই আসল বিষয়টি বাইরে নিয়ে আসবে, যেদিকে ইঙ্গিত করার জন্য স্বপ্নে কুকুর দেখা গেছে।

সাধারণত মুসলিম সমাজে কুকুরকে নাপাক, নোংরা ও হিংস্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন ভালো মুসলমান নিজের ঘরে কুকুর রাখা পছন্দ করেন না। কাজেই স্বপ্নে কুকুর দেখলে তার মনে হয়-নিশ্চয়ই এটি কোনো ঘৃণ্য ব্যক্তির প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, যে তার ঘরের লোক বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ইউরোপে কুকুর খুবই আকর্ষণীয়, প্রিয় ও পাহারাদার বন্ধু। তাদের স্বপ্নে কুকুর দেখার ব্যাখ্যা হবে, কোনো তোষামোদকারী ব্যক্তির প্রতি ইশারাব্যঞ্জক।

স্বপ্ন প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছায়া হয়ে থাকে। এটা বললেও ভুল হবে না যে, স্বপ্নে ব্যক্তির মস্তিষ্ক অন্য মানুষের আকৃতিতে তাকে গোপন কোনো বার্তা সরবরাহ করছে। স্বপ্নের কাহিনি শোনার জন্য আপনি খুব ভোরে কারও বাড়িতে গিয়ে হাজির হলে সে সময়কার বর্ণনা, আর একজন মানসিক চিকিৎসকের কাছে পরবর্তী মাঝে দেখা যাবে বিস্তর তফাত। কারণ, স্থান-কাল পরিবর্তনের ফলে মানুষের মনের অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। বিশেষত, যেসব বিষয়ে আবেগ-অনুভূতির সংশ্লিষ্টতা থাকবে, সেসব ক্ষেত্রে রূপান্তর খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কাউকে তার দেখা স্বপ্নের বিবরণ লিখতে বলা হলে অধিকাংশ বর্ণনা ১৫০ শব্দের বেশি এগোয় না, কিন্তু লেখাটি পড়ার পর তাকে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা হলে হু হু করে বাড়তে থাকে বর্ণনার কলেবর। এমনকী অনেক সময় দেখা গেছে, দ্বিতীয়বারের জিজ্ঞাসার জবাবে যে বিবরণ মিলেছে-তা প্রথমবারের তুলনায় তিনগুণ দীর্ঘ।

স্বপ্ন আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত অবচেতন প্রকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম। কাজেই এতে ক্ষোভ, ঘৃণা, অতিরঞ্জন-সবকিছুর মিশেল থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে এখানে যতটুকু আসল রূপ থাকবে, বেশিরভাগ সময় নাটকীয়তার পরিমাণ থাকবে তার চেয়ে বেশি। ধরুন, স্বপ্নে কেউ একটি স্টেডিয়ামে বসে বক্সিং লড়াই দেখছেন; কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখল, সে শুয়ে আছে বিছানা ছাড়া একটি শক্ত খাটে। এক্ষেত্রে বক্সিংটা তার মনের রাগ প্রকাশের প্রতীক। দর্শক হিসেবে একপক্ষের ভক্ত হয়ে সে তার বিজয় কামনা করে। নিজের পক্ষের বক্সার যত আঘাত পেতে থাকে, প্রতিটি আঘাত যেন অনুভূত হয় তার শরীর জুড়ে। মনে হয় সে নিজেই মার খাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলবেন, মূলত খাটের শক্ত পাটাতন তার শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি করেছে, সেই পীড়াকেই অবচেতনে সে প্রত্যক্ষ করেছে বক্সারের রূপকে।

ফ্রয়েডের এই ব্যাখ্যা আমরা কেবল সেসব স্বপ্নের ক্ষেত্রেই সঠিক বলে মানতে পারি, যেসব স্বপ্নের জন্য আমরা দায় চাপাই পেটের অসুখের ওপর অথবা যেসব স্বপ্ন মানুষ দেখে থাকে আধো, ঘুম আধো জাগরণে। এই ধরনেরই একটি স্বপ্ন একবার আল্লাহর রাসূল -এর সামনে পেশ করা হয়। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত-

'এক ব্যক্তি এসে আল্লাহর রাসূল -কে বললেন, সে স্বপ্নে দেখেছে-তার মাথা কেটে ফেলা হয়েছে আর মাথাটির পেছনে পেছনে সে দৌড়াচ্ছে। আল্লাহর রাসূল তাকে ধমক দিয়ে বললেন, এই ধরনের স্বপ্ন ভবিষ্যতে কাউকে বর্ণনা করতে আসবে না। এগুলো শয়তানের ভেলকিবাজি।' বুখারি ও মুসলিম

এই হাদিস শিক্ষা দেয়, মন্দ ও ভয়ানক স্বপ্ন কাউকে বলতে নেই। এরূপ স্বপ্ন দেখলে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে শয়তানের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করবে আর তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে নিজের বামদিকে, তাহলেই স্বপ্নের ক্ষতিকর যেকোনো পরিণতি থেকে আল্লাহ তাকে হেফাজত করবেন।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 কুরআন মাজিদ ও স্বপ্ন

📄 কুরআন মাজিদ ও স্বপ্ন


পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য কুরআন মাজিদ চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ গাইডলাইন।

কুরআন নাজিলের পর থেকে যুগ, সময় ও প্রজন্ম নির্বিশেষে তার নির্দেশনা যে সন্দেহাতীতভাবে প্রযোজ্য ও সঠিক-তা প্রমাণিত সত্য। স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআনের একাধিক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্নটি উপস্থাপন করা হয়েছে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনায়।
'আর যখন তিনি এতটুকু বেড়ে উঠেছেন যে, পিতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। ওই সময় কোনো একদিন পিতা তাঁকে বললেন-“হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, তোমাকে জবাই করছি। এ বিষয়ে ভেবে-চিন্তে তোমার মতামত জানাও।” তিনি বললেন-"হে আমার পিতা! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে হুকুম দিয়েছেন, আপনি ঠিক তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।"' সূরা সফফাত: ১০২

আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে পিতা-পুত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। ছেলেকে উপুড় করে মাটিতে শোয়ানো হলো। ঠিক এই সময় আমি ইবরাহিমকে ডাক দিলাম-"ব্যাস, থেমে যাও। আমি পুণ্যবানদের উত্তম বদলা দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে এটি আমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ছিল।" এরপর আমি তাঁর জায়গায় একটি বড়ো জন্তুকে রেখে দিলাম। আগামীর মানবজাতির জন্য এ হুকুমকে আমি একটি শিক্ষা হিসেবে বহাল রাখলাম। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই। কারণ, তিনি আমার অনুগত ও বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা সফফাত : ১১১

ইবরাহিম (আ.) নিজের ছেলেকে অল্প বয়সে আল্লাহর আদেশে জবাই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সন্তানকে উপুড় করে শোয়ালেন, যাতে সন্তানের চেহারা দেখে হৃদয়ে জেগে উঠা পিতৃস্নেহ কর্তব্যে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ঠিক এমন অবস্থায় আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ছুরি চালনা বন্ধ করার হুকুম দিয়ে সন্তানের স্থলে রেখে দিলেন একটি দুম্বা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতিফল হিসেবে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে যখন যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন। এমনকী বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন ইসহাক (আ.)-এর মতো এক নেককার সন্তান। আনুগত্যের এই দৃষ্টান্ত এরপর থেকে শাশ্বত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল। এরপর থেকে এই দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ইবরাহিমি আদর্শের অনুসরণে কুরবানি দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য কুরআন মাজিদ চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ গাইডলাইন।

কুরআন নাজিলের পর থেকে যুগ, সময় ও প্রজন্ম নির্বিশেষে তার নির্দেশনা যে সন্দেহাতীতভাবে প্রযোজ্য ও সঠিক-তা প্রমাণিত সত্য। স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআনের একাধিক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্নটি উপস্থাপন করা হয়েছে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনায়।

'আর যখন তিনি এতটুকু বেড়ে উঠেছেন যে, পিতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। ওই সময় কোনো একদিন পিতা তাঁকে বললেন-“হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, তোমাকে জবাই করছি। এ বিষয়ে ভেবে-চিন্তে তোমার মতামত জানাও।” তিনি বললেন-"হে আমার পিতা! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে হুকুম দিয়েছেন, আপনি ঠিক তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।"' সূরা সফফাত: ১০২

আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে পিতা-পুত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। ছেলেকে উপুড় করে মাটিতে শোয়ানো হলো। ঠিক এই সময় আমি ইবরাহিমকে ডাক দিলাম-"ব্যাস, থেমে যাও। আমি পুণ্যবানদের উত্তম বদলা দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে এটি আমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ছিল।" এরপর আমি তাঁর জায়গায় একটি বড়ো জন্তুকে রেখে দিলাম। আগামীর মানবজাতির জন্য এ হুকুমকে আমি একটি শিক্ষা হিসেবে বহাল রাখলাম। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই। কারণ, তিনি আমার অনুগত ও বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' সূরা সফফাত : ১১১

ইবরাহিম (আ.) নিজের ছেলেকে অল্প বয়সে আল্লাহর আদেশে জবাই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সন্তানকে উপুড় করে শোয়ালেন, যাতে সন্তানের চেহারা দেখে হৃদয়ে জেগে উঠা পিতৃস্নেহ কর্তব্যে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ঠিক এমন অবস্থায় আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে ছুরি চালনা বন্ধ করার হুকুম দিয়ে সন্তানের স্থলে রেখে দিলেন একটি দুম্বা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতিফল হিসেবে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে যখন যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন। এমনকী বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন ইসহাক (আ.)-এর মতো এক নেককার সন্তান। আনুগত্যের এই দৃষ্টান্ত এরপর থেকে শাশ্বত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল। এরপর থেকে এই দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ইবরাহিমি আদর্শের অনুসরণে কুরবানি দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন।

📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 ইউসুফ (আ.) ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা

📄 ইউসুফ (আ.) ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা


ইউসুফ (আ.)-এর প্রথম স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভাষ্য এরূপ- 'যখন ইউসুফ নিজের পিতা (ইয়াকুব)-কে বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি-১১টি তারকা, একটি সূর্য ও একটি চাঁদ আমাকে সিজদা করছে। তাঁর বাবা বললেন-প্রিয় বৎস! তুমি এই স্বপ্ন তোমার ভাইদের কখনো বলো না। হতে পারে, এটা শুনে তারা তোমার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার কোনো নীলনকশা করতে পারে। কারণ, শয়তান মানুষের পরিচিত শত্রু। এভাবে তোমার রব তোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, তাঁর করুণারাশি তোমার ও তোমার পিতার প্রতি পূর্ণ করবেন-যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের ওপর (পরিপূর্ণরূপে নিয়ামত প্রদান) করেছেন। কেননা, তিনি সর্বজ্ঞানী ও মহাপ্রজ্ঞাময়। বস্তুত, ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য শিক্ষার উপকরণ রয়েছে।' সূরা ইউসুফ: ৪-৭

পিতা ইয়াকুব (আ.) নিজ পুত্রের এমন আশ্চর্য স্বপ্ন অনুধাবন করে বললেন- 'তোমার ১১ জন ভাই ও পিতা-মাতা সম্মানে তোমার সামনে সিজদায় অবনত হবেন। আল্লাহ তোমাকে দান করবেন গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও অদ্বিতীয় বিশারদের যোগ্যতা। অনুরূপভাবে তোমাকে তিনি অনুগ্রহ করবেন নবুয়তের মর্যাদা দিয়ে, যেমনটি করেছিলেন পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি।'

ইউসুফ (আ.)-এর সেই স্বপ্নটিও পূরণ হয় মিশরে অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই পিতা-মাতা ও ভাইদের কাছ থেকে তিনি লাভ করেছিলেন বিশেষ সম্মান। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি এতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন যে, পৃথিবীতে কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম স্বপ্ন দেখার পরই ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে ঝড়-তুফান শুরু হয়ে যায়। মিশরের অধিপতির স্ত্রী তাঁকে কারাগারে পাঠায় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে। তিনি নিজেও অনিরাপদ পরিবেশে থাকার চেয়ে অধিকতর পছন্দ করেছেন কারাবাসকে। আর কারাবাসের পুরো সময় তিনি ব্যয় করেছেন জেলের কয়েদিদের মাঝে সদুপদেশ ও কল্যাণের শিক্ষা প্রচারের মধ্য দিয়ে।

কারাগারে তাঁর সময়ে কয়েদি হিসেবে প্রবেশ করে দুই তরুণ। তাদের একজন বলল-'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মুনিবের জন্য ফলের রস নিংড়ে নিচ্ছি।' অপরজন বলল-'আমি দেখেছি, আমার মাথার ওপর রুটির বোঝা। আর তা থেকে পাখির দল ছোঁ মেরে একেকটি রুটি খাচ্ছে। মেহেরবানি করে আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যাটি বয়ান করুন। আপনাকে আমরা একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে দেখছি।' ইউসুফ (আ.) জবাবে বললেন-'তোমাদের জন্য খাবার হাজির হওয়ার পরপরই আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পারব। কারণ, আল্লাহ আমাকে স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন। আর যারা আল্লাহর ওপর ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে না, আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।'

এরপর তিনি কয়েদিদের ইসলামের পয়গাম শোনালেন। দ্বীনে হানিফের১২ বার্তা দিতে গিয়ে বললেন-
'হে আমার কারাবন্ধুদ্বয়! তোমাদের মধ্যে একজন অচিরেই তার মুনিবকে পানীয় পান করানোর সুযোগ পাবে। আর দ্বিতীয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। আর পাখিরা তার মস্তক ঠুকরে খাবে। তোমরা আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করলে, এর ব্যাখ্যা এরূপ।'

তাদের মধ্যে যে ব্যক্তির মুক্তি আসন্ন, ইউসুফ (আ.) তাকে বললেন-'তুমি চাকরিতে পুনর্বহাল হলে তোমার মুনিবকে আমার কথাও বলবে।' কিন্তু শয়তান তাকে বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তিনি আরও কয়েক বছর কারাবাস যাপন করেন।

একবার বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন-সাতটি মোটাতাজা গাভিকে অপরটি সাতটি শীর্ণকায় দুর্বল গাভি খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সুপুষ্ট সবুজ শস্য গোছাকে গিলে ফেলছে অপর সাতটি জীর্ণ ও শুষ্ক গোছা। অতঃপর তিনি বললেন-'হে আমার লোকেরা! আমাকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাও।' তারা বলল-'এটি অনর্থক স্বপ্ন, এর কোনো ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই।' এই কথা শুনে কারামুক্ত সেই রাজকর্মচারী বললেন-'আমাকে জেলের অভ্যন্তরে পাঠাতে সম্মত হলে আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানানোর ব্যবস্থা করতে পারি।' এরপর জেলে গিয়ে তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বললেন-'বন্ধু আমার! স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন। আপনি বর্ণনা করলে ব্যাখ্যাটি তাদের কাছে পৌঁছে দেবো।'

তিনি ব্যাখ্যায় বললেন-

'তোমরা সাত বছর পর্যন্ত ফসল ফলাবে এবং রোজকার খাবারের অতিরিক্ত শস্য মজুদ রাখবে পরবর্তী সময়ের জন্য। কারণ, এরপর এমন সাতটি বছর আসবে, যখন খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করবে। আগের উৎপাদিত ফসলই হবে তখন একমাত্র সম্বল। এরপর পুরো এক বছর বন্ধ থাকবে বৃষ্টিপাত।' বাদশাহর প্রতিনিধি তাঁকে রাজদরবারে নিয়ে এলে তিনি বললেন-'আমার সেই বিষয়টির সুরাহা করা হোক, যে ঘটনায় মহিলারা নিজেদের হাত কেটেছিল। আর মেয়েদের কৌশল তো মারাত্মক কুটিল হয়ে থাকে।' সূরা ইউসুফ: ৪১-৫৬

বাদশাহ সংশ্লিষ্ট মহিলাদের কাছ থেকে বিষয়টির প্রকৃত রহস্য জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন-'ইউসুফকে ফুসলানোর ব্যাপারে তোমরা আসলে কী করেছিলে?' সকলেই সাক্ষ্য দিলো-'লোকটির মধ্যে আমরা কোনো মন্দ আচরণ দেখিনি।' মিশরের রানি বললেন-'সব সত্য যখন বেরিয়েই এসেছে, তবে আমিও আসল কথাটা বলি। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমিই তাঁকে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়েছিলাম-যাতে স্বামীর রোষানলে পড়ে না যাই। বস্তুত অপরাধ আমারই। আর নৈতিকতার সীমালঙ্ঘন থেকে সে পরিপূর্ণ মুক্ত।'

টিকাঃ
১২. পূর্ববর্তী সময়ে প্রেরিত রাসূলের অবিকৃত ধর্ম যা শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন মানবসমাজের জন্য নানীত ও ভারসাম্য পর্ণ। -অনুবাদর

ইউসুফ (আ.)-এর প্রথম স্বপ্ন সম্পর্কে কুরআন মাজিদের ভাষ্য এরূপ- 'যখন ইউসুফ নিজের পিতা (ইয়াকুব)-কে বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি-১১টি তারকা, একটি সূর্য ও একটি চাঁদ আমাকে সিজদা করছে। তাঁর বাবা বললেন-প্রিয় বৎস! তুমি এই স্বপ্ন তোমার ভাইদের কখনো বলো না। হতে পারে, এটা শুনে তারা তোমার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার কোনো নীলনকশা করতে পারে। কারণ, শয়তান মানুষের পরিচিত শত্রু। এভাবে তোমার রব তোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা, তাঁর করুণারাশি তোমার ও তোমার পিতার প্রতি পূর্ণ করবেন-যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের ওপর (পরিপূর্ণরূপে নিয়ামত প্রদান) করেছেন। কেননা, তিনি সর্বজ্ঞানী ও মহাপ্রজ্ঞাময়। বস্তুত, ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য শিক্ষার উপকরণ রয়েছে।' সূরা ইউসুফ: ৪-৭

পিতা ইয়াকুব (আ.) নিজ পুত্রের এমন আশ্চর্য স্বপ্ন অনুধাবন করে বললেন- 'তোমার ১১ জন ভাই ও পিতা-মাতা সম্মানে তোমার সামনে সিজদায় অবনত হবেন। আল্লাহ তোমাকে দান করবেন গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও অদ্বিতীয় বিশারদের যোগ্যতা। অনুরূপভাবে তোমাকে তিনি অনুগ্রহ করবেন নবুয়তের মর্যাদা দিয়ে, যেমনটি করেছিলেন পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি।'

ইউসুফ (আ.)-এর সেই স্বপ্নটিও পূরণ হয় মিশরে অর্থ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই পিতা-মাতা ও ভাইদের কাছ থেকে তিনি লাভ করেছিলেন বিশেষ সম্মান। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি এতটা ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন যে, পৃথিবীতে কেউ তাঁকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম স্বপ্ন দেখার পরই ইউসুফ (আ.)-এর জীবনে ঝড়-তুফান শুরু হয়ে যায়। মিশরের অধিপতির স্ত্রী তাঁকে কারাগারে পাঠায় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে। তিনি নিজেও অনিরাপদ পরিবেশে থাকার চেয়ে অধিকতর পছন্দ করেছেন কারাবাসকে। আর কারাবাসের পুরো সময় তিনি ব্যয় করেছেন জেলের কয়েদিদের মাঝে সদুপদেশ ও কল্যাণের শিক্ষা প্রচারের মধ্য দিয়ে।

কারাগারে তাঁর সময়ে কয়েদি হিসেবে প্রবেশ করে দুই তরুণ। তাদের একজন বলল-'আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মুনিবের জন্য ফলের রস নিংড়ে নিচ্ছি।' অপরজন বলল-'আমি দেখেছি, আমার মাথার ওপর রুটির বোঝা। আর তা থেকে পাখির দল ছোঁ মেরে একেকটি রুটি খাচ্ছে। মেহেরবানি করে আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যাটি বয়ান করুন। আপনাকে আমরা একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে দেখছি।' ইউসুফ (আ.) জবাবে বললেন-'তোমাদের জন্য খাবার হাজির হওয়ার পরপরই আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পারব। কারণ, আল্লাহ আমাকে স্বপ্ন ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন। আর যারা আল্লাহর ওপর ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে না, আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।'

এরপর তিনি কয়েদিদের ইসলামের পয়গাম শোনালেন। দ্বীনে হানিফের১২ বার্তা দিতে গিয়ে বললেন-
'হে আমার কারাবন্ধুদ্বয়! তোমাদের মধ্যে একজন অচিরেই তার মুনিবকে পানীয় পান করানোর সুযোগ পাবে। আর দ্বিতীয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। আর পাখিরা তার মস্তক ঠুকরে খাবে। তোমরা আমার কাছে যা জিজ্ঞেস করলে, এর ব্যাখ্যা এরূপ।'

তাদের মধ্যে যে ব্যক্তির মুক্তি আসন্ন, ইউসুফ (আ.) তাকে বললেন-'তুমি চাকরিতে পুনর্বহাল হলে তোমার মুনিবকে আমার কথাও বলবে।' কিন্তু শয়তান তাকে বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তিনি আরও কয়েক বছর কারাবাস যাপন করেন।

একবার বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন-সাতটি মোটাতাজা গাভিকে অপরটি সাতটি শীর্ণকায় দুর্বল গাভি খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সুপুষ্ট সবুজ শস্য গোছাকে গিলে ফেলছে অপর সাতটি জীর্ণ ও শুষ্ক গোছা। অতঃপর তিনি বললেন-'হে আমার লোকেরা! আমাকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাও।' তারা বলল-'এটি অনর্থক স্বপ্ন, এর কোনো ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই।' এই কথা শুনে কারামুক্ত সেই রাজকর্মচারী বললেন-'আমাকে জেলের অভ্যন্তরে পাঠাতে সম্মত হলে আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানানোর ব্যবস্থা করতে পারি।' এরপর জেলে গিয়ে তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বললেন-'বন্ধু আমার! স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন। আপনি বর্ণনা করলে ব্যাখ্যাটি তাদের কাছে পৌঁছে দেবো।'

তিনি ব্যাখ্যায় বললেন-
'তোমরা সাত বছর পর্যন্ত ফসল ফলাবে এবং রোজকার খাবারের অতিরিক্ত শস্য মজুদ রাখবে পরবর্তী সময়ের জন্য। কারণ, এরপর এমন সাতটি বছর আসবে, যখন খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করবে। আগের উৎপাদিত ফসলই হবে তখন একমাত্র সম্বল। এরপর পুরো এক বছর বন্ধ থাকবে বৃষ্টিপাত।' বাদশাহর প্রতিনিধি তাঁকে রাজদরবারে নিয়ে এলে তিনি বললেন-'আমার সেই বিষয়টির সুরাহা করা হোক, যে ঘটনায় মহিলারা নিজেদের হাত কেটেছিল। আর মেয়েদের কৌশল তো মারাত্মক কুটিল হয়ে থাকে।' সূরা ইউসুফ: ৪১-৫৬

বাদশাহ সংশ্লিষ্ট মহিলাদের কাছ থেকে বিষয়টির প্রকৃত রহস্য জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন-'ইউসুফকে ফুসলানোর ব্যাপারে তোমরা আসলে কী করেছিলে?' সকলেই সাক্ষ্য দিলো-'লোকটির মধ্যে আমরা কোনো মন্দ আচরণ দেখিনি।' মিশরের রানি বললেন-'সব সত্য যখন বেরিয়েই এসেছে, তবে আমিও আসল কথাটা বলি। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমিই তাঁকে প্ররোচিত করতে ব্যর্থ হয়ে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়েছিলাম-যাতে স্বামীর রোষানলে পড়ে না যাই। বস্তুত অপরাধ আমারই। আর নৈতিকতার সীমালঙ্ঘন থেকে সে পরিপূর্ণ মুক্ত।'

টিকাঃ
১২. পূর্ববর্তী সময়ে প্রেরিত রাসূলের অবিকৃত ধর্ম যা শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন মানবসমাজের জন্য নানীত ও ভারসাম্য পর্ণ। -অনুবাদর

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00