📄 দুঃস্বপ্ন
সাধারণত ছোটো বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঘুমের ঘোরে ভয়ানক কোনো স্বপ্ন দেখে আচমকা চিৎকার করে ওঠে কিংবা উচ্চৈঃস্বরে কান্না জুড়ে দেয়। তার চেহারায় তখন ভয়ের চিহ্ন ফুটে ওঠে। প্রচণ্ড আতঙ্কে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যায় শরীর। এটাকে বলা হয়-'Pavur Nocturnus'। এই ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠার পর সাধারণত বাচ্চারা টুকরো টুকরো অংশ ছাড়া প্রায় কিছুই মনে রাখতে পারে না। তিন থেকে সাত বছর বয়সি বাচ্চাদের শতকরা ৩%-এর মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। ১০%-এর ক্ষেত্রে এটি হাজির হয় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের বক্তব্য হলো, বাচ্চারা আদৌ দুঃস্বপ্ন দেখে না। মূলত বাহ্যিক কোনো কারণে চটজলদি তাদের ঘুম ভেঙে গেলে, এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটিই তাদের ওপর প্রভাব ফেলে ভয় ও আতঙ্করূপে।
দুঃস্বপ্ন সম্পর্কে ভাসাভাসা বিশ্লেষণের বিপরীতে ইসলাম স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব পেশ করেছে। ইসলামের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট; ভয়ানক স্বপ্নগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত হয়। ভালো ও মন্দ স্বপ্ন বিষয়ে আবু সাইদ (রা.) ও আবু কাতাদা (রা.) থেকে পৃথক পৃথক দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। নবিজি বলেন-
'ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আর মন্দ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। এই ধরনের স্বপ্ন কারও সামনে বর্ণনা করতে নেই। শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। এর ফলে ব্যক্তির কোনো ক্ষতি হবে না।' বুখারি
কেবল বাচ্চারা নয়, অনেক সময় বড়োরাও মাঝে মাঝে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কখনো কখনো তো দুঃস্বপ্নের আতঙ্ক তাকে দিনের পর দিন তাড়া করে বেড়ায়। এই স্বপ্নগুলো স্রেফ অবচেতন মনের ধারণা নয়; বরং এর সম্পর্ক রয়েছে বাস্তব জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সাথে। ইসলাম ব্যতীত বিজ্ঞান এর কোনো পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারে না। মন্দ স্বপ্ন থেকে বাঁচার জন্য সৎকর্মের পাশাপাশি ইসলাম আরও কিছু পদ্ধতি বাতলে দিয়েছে। দুঃস্বপ্ন দেখার পর (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) (লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ) পড়া নবিজি স্বীকৃত এমনই একটি উত্তম আমল। আল্লাহর কাছে এভাবে আশ্রয় চাওয়ার পর বামদিকে তিনি তিনবার থুতু নিক্ষেপ করে পাশ ফিরে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। নবি করিম বর্ণিত এই নির্দেশনা অনুসরণ করলে আল্লাহ অবশ্যই তাঁর বান্দাদের হেফাজত করবেন শয়তানের অনিষ্ট থেকে।
📄 ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা
কমপক্ষে এক শতাংশ বাচ্চাদের মধ্যে ঘুমের ঘোরে হাঁটাচলা সমস্যাটি পাওয়া যায়। সাধারণত এটা শুরু হয় ১১-১৪ বছর বয়সে। ঘুমন্ত ব্যক্তি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বিছানা থেকে উঠে পড়ে, পুরোপুরি চোখ খুলে পথের বিভিন্ন বাধা এড়িয়েই দিব্যি হাঁটতে থাকে জাগ্রত মানুষের মতো। যদিও আমরা গল্পে পড়ি, ঘুমের মাঝে হাঁটাচলা করা লোকজন উঁচু দালান থেকে নিচে পড়ে যায়। কখনো কখনো ওই অবস্থায় কাউকে খুন করে ফেলে। গল্পের সেসব কাহিনির সঙ্গে বাস্তবতার একবিন্দু সাদৃশ্য নেই। মস্তিষ্কের সক্রিয়তার প্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তখন মানুষ নিদ্রার গভীর স্তরে বিচরণ করতে থাকে, স্পন্দিত হতে থাকে তার চোখ। সচরাচর এই অবস্থায় স্বপ্ন দেখা যায় না। কাজেই ঘুমের ঘোরে হাঁটাচলাকে স্বপ্নের প্রভাব বলা একদমই সংগত নয়।
এক ব্যক্তি গরমের দিনে সামান্য কাপড় জড়িয়ে শুয়েছিল। ঘুমের ঘোরে হাঁটার সমস্যা ছিল তার। ওইদিন সে ঘুমের ঘোরেই হাঁটতে হাঁটতে মহাসড়কের পাশে চলে আসে। ব্যস্ত সড়কে যানবাহন এড়িয়ে, যথাযথভাবে ট্রাফিক নিয়ম মেনে; এমনকী তিনি দেড় কিলোমিটার দূরের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যান। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে, হাঁটতে হাঁটতে স্থবির হয়ে এসেছে তার পা। এমতাবস্থায় আচমকা নিদ্রা টুটে গেলে অবাক হয়ে যান তিনি। আরে! এ কাণ্ড ঘটল কী করে! প্রথমে তিনি বিব্রত হলেন নিজের সংক্ষিপ্ত পোশাকের কারণে। জটিলতা বাড়ল- যখন দেখলেন পকেটে একটা পয়সাও নেই। এখন বাড়িতে পৌছবেন কীভাবে? অগত্যা এক রিকশাওয়ালাকে বাড়িতে পৌঁছেন তিনি।
📄 বিছানায় মূত্রত্যাগ
চিকিৎসাশাস্ত্রে বিছানায় প্রশ্রাব করা একটি রোগ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। এর জন্য স্বতন্ত্র চিকিৎসাও রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসার জন্য মস্তিষ্ক প্রশান্তিকারক ও রক্তসঞ্চালক ওষুধের সংমিশ্রণ ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতেও রয়েছে স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপত্র। সাধারণত বাচ্চারা ৪ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিছানায় প্রশ্রাব করে থাকে। মনোবিদদের বক্তব্য হলো-এসব শিশু মূলত অবচেতনের শিকার। বিছানায় প্রশ্রাব করার পরই কেবল তাদের চেতনাবোধ জাগ্রত হয়। অনেক বাচ্চাকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার পর প্রায়শই জবাব দেয়-তারা স্বপ্ন দেখতে পায় যে, যথারীতি বাথরুমে গিয়ে ধীরস্থিরভাবে প্রশ্রাব করছে; কিন্তু চোখ খোলার পর বুঝতে পারে, পুরো বিছানা ভিজিয়ে একাকার করে ফেলেছে সে।
যৌনঘনিষ্ঠ স্বপ্ন বা স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের স্বপ্ন মনোপ্রবৃত্তির দূষণ আর শয়তানের তৎপরতার প্রতিফলন। প্রথম কথা হলো, মনোবিজ্ঞানে এর কোনো যথাযথ সমাধান নেই। তারপরও যা আছে-তা কাউন্সিলিংয়ের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অনেক ধৈর্যশীল, নিয়মানুবর্তী ও শক্তপোক্ত মানুষের পক্ষেও তা পালন করা প্রায় অসম্ভব। অথচ মহানবি এ জাতীয় সমস্যার সমাধানে সহজ ও সুন্দর আমল বাতলে দিয়েছেন। চৌদ্দশো বছর পর এসেও আজ পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গে সেই ফর্মুলা অনুসরণ করা যায়। আলি (রা.) থেকে বর্ণিত- 'সূরা বাকারার শেষ তিনটি আয়াত পড়ে ঘুমালে নিদ্রিত ব্যক্তি সকল রকমের সমস্যা, অনিষ্ট ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকবে।'
বিখ্যাত হাদিসবিশারদ আবদুর রাজ্জাকসহ অন্য আলিমগণ বলেন- 'সূরা শামস, সূরা লাইল, সূরা ত্বিন ও সূরা ইখলাসের সঙ্গে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করার পর নিম্নোক্ত দুআটি পড়ে ঘুমালে কখনো উপরিউক্ত সমস্যাগুলো দেখা দেবে না।'
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ سَيِّي الْأَحْلَامِ ، أَسْتَجِيْرُ بِكَ مِنْ تَلَاعُبِ الشَّيْطَانِ فِي الْيَقْظَةِ وَالْمَنَامِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ رُؤْيًا صَالِحَةً صَادِقَةً نَّافِعَةً حَافِظَةً غَيْرَ مَنْسِيَّةِ اللَّهُمَّ أَرِنِي فِي مَنَامِي مَا أُحِبُّ-
‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দুঃস্বপ্ন থেকে আশ্রয় চাই। আশ্রয় চাই ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় শয়তানের ক্রীড়ানক হওয়া থেকে। তোমার কাছে সত্য, উত্তম, উপকারী এবং স্মরণীয় স্বপ্ন চাই-যা বিস্মৃত হব না কখনো। হে আল্লাহ! আমাকে এমন জিনিস স্বপ্নে দেখাও, যা আমি দেখতে পছন্দ করি।’
এই দুআগুলো পড়তে মিনিট দশেকের বেশি লাগে না। আমাদের পূর্ণ ঈমান আর অবিচল বিশ্বাস রয়েছে, আল্লাহর নামের বরকতে মানুষের নিদ্রা হবে নির্বিঘ্ন আর রাত কাটবে আরামে। কেউ ইসলামে বিশ্বাসী না হলেও তার জন্য এই মনস্তাত্ত্বিক সমাধানটি চমৎকার ফলাফল বয়ে আনতে পারে। কেননা, পুরো ১০ মিনিট পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে দুআগুলো মস্তিষ্কে জমে থাকা বিভিন্ন রকমের ইতঃস্তত ভাবনা অপসারণ করে নিয়ে আসবে প্রফুল্লতা। ফলে সারাদিনের যেসব ঘটনাবলি মগজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ব্যক্তিকে বিষণ্ণ করে রাখে, সেসব নিমিষেই দূরীভূত হবে। নিশ্চিত হবে প্রশান্তিময় গভীর নিদ্রা।
টিকাঃ
১৮. ডায়াজিপাম (Diazepam) একটি বিশেষ শ্রেণির ওষুধ, যা সচরাচর ঘুমের ওষুধ হিসেবে সুপরিচিত। এটি মূলত বেনজোডায়াজেপিন গোত্রের ওষুধ। 'ভ্যালিয়াম'-এই বাণিজ্যিক নামে এটি সর্বপ্রথম বাজারজাত করে ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হফম্যান লা রোশ। এ ওষুধটি সাধারণত দুশ্চিন্তা, অযাচিত আতঙ্ক, অনিদ্রা, স্ট্যাটাস এপিলেপ্টাস, মাংসপেশির সংকোচনজনিত অক্ষমতা (টিটেনাস সংক্রমণজনিত কারণ), রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, অ্যালকোহল ত্যাগ পরবর্তী জটিলতা, বেনজোডায়াজেপিন ত্যাগ পরবর্তী জটিলতা, অপিয়েট ত্যাগ পরবর্তী জটিলতা এবং মেনিয়ারস ডিজিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এটি কিছু কিছু মেডিকেল প্রসিডিউর (যেমন: এন্ডোসকপিতে) এবং উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তা কমাতে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সার্জিক্যাল প্রসিডিউরে এটি চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা অ্যানেসথেসিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়-যখন এটা থাকে না। উইকিপিডিয়া
১৯. লোরাজেপাম (Lorazepam) বেনজোডিয়াজাইনা নামে পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক ওষুধের একটি শ্রেণিতে পড়ে। লোরাজেপাম (Lorazepam) অ্যাটিভান-এর ট্রেড নামে বিক্রি করা হয়। এটি উদ্বেগ রোগীদের দেওয়া হয়। এটি ঘুমের ব্যাধিগুলোর জন্যও ব্যবহৃত হয়, হৃদ্রোগের, সার্জারি জন্য। এ ছাড়াও তীব্রতা করোনারি সিনড্রোম-এর উদ্ভাবনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি মৌখিকভাবে, পেশি বা শিরা द्वारा পরিচালিত করা যেতে পারে।
📄 ইস্তেখারা কী
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এটা প্রমাণিত, কেউ নিজের পছন্দমতো স্বপ্ন দেখতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে নবিজি নিজের পছন্দমতো স্বপ্ন দেখার ফর্মুলা প্রদান করেছেন। হাদিস বিশারদগণ এটাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘ইস্তেখারা’ নামে। এর নিয়ম হলো-এশার নামাজের পর দুই রাকাত نفل নামাজ পড়ে নির্দিষ্ট দুআগুলো পাঠ করতে হবে। এরপর কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে প্রার্থনা করতে হবে আল্লাহর কাছে। ইস্তেখারায় মূলত কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে রবের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়। এর ফলে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে মেহেরবানি করে স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দেন, কাজটি তার জন্য উপকারী হবে কি না। উপকারী না হলে আল্লাহ যে তাকে এটা শুধু জানিয়ে দেবেন, এমন নয়; বরং বান্দার মন থেকে বিষয়টির প্রতি আগ্রহও তুলে নেবেন তিনি।
এই পদ্ধতিতে দুআ করে আল্লাহর নির্দেশনা কামনা করার পর অবশ্যই স্বপ্নে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একদিনে না পেলে ধারাবাহিকভাবে তিন রাত এ আমল জারি রাখতে হয়। ৯৫ শতাংশ মানুষই সুস্পষ্ট ইশারা পেয়ে থাকে। যারা স্বপ্নে কিছু দেখেন না, তাদের দুআও বৃথা যায় না একেবারে; বরং আল্লাহ তাদের মনে বিষয়টির প্রতি অনীহা জাগিয়ে তোলেন অথবা মনকে ধাবিত করে দেন কোনো ইতিবাচক দিকে। শর্ত হলো, ইস্তেখারার বিষয়টি নিষিদ্ধ কাজ না হওয়া। যেমন: জুয়া, ব্যভিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তেখারা হারাম। কারণ, জুয়া কিংবা সকল প্রকার বাজির শর্তসাপেক্ষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাজেই জুয়াভিত্তিক রেস বা ঘোড়দৌড় প্রভৃতি খেলার বাজিতে ইস্তেখারা করে কোনো ফায়দা নেই।