📄 ফ্যাশনে রুচির বিকৃতি ও মানসিক অসুস্থতা
১৯৩৫ সালে জার্মানির ডাক্তার ম্যাকিংস হারশফিল্ড প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত রোগের খোঁজ পেলেন। তাঁর বিশ্লেষণী প্রবন্ধগুলোতে এটাকে তিনি নাম দিলেন 'ফ্যাশনের রুচিবিকৃতি'। এর স্পষ্ট লক্ষণ হলো, রোগী পুরুষ হলে বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করে নিজেকে মেয়েদের মতো করে উপস্থাপনের প্রতি প্রবল মোহ জাগবে তার। গোড়ার দিকে একাকী মেয়েলি প্রসাধনীতে সে নিজেকে সাজিয়ে আয়নায় পরখ করবে, এর মধ্য দিয়ে উপভোগ করবে এক অপরিমেয় তৃপ্তি। এরপর ক্রমাগত সে মেয়েলি মেকআপের পরিমাণ বাড়াতে থাকবে। সাজগোজের পর তাকে মনে হবে পুরোদস্তুর আবেদনময়ী এক তন্বী নারী। দিন দিন এরূপ চলনের ফলে তার পুলক অনুভূত হতে থাকবে। এরপর নীরবে-নিভৃতে এরূপ কাণ্ড সীমিত না রেখে একদিন স্বাচ্ছন্দ্যে হাজির হবে প্রকাশ্য লোকারণ্যে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই মেয়েলি আচরণ প্রতিভাত হয় আকার-ইঙ্গিতে। যেমন: মেয়েদের মতো লম্বা চুল কিংবা পায়ে নুপুর-ঘুঙুরের মতো অলংকার পেঁচিয়ে নেওয়া। অথচ একসময় বাবরি স্টাইলের লম্বা চুল ছিল গোত্রের সর্দারসুলভ আভিজাত্যের প্রতীক।
ম্যাকিংস হারশফিল্ড-এর প্রথম পর্যবেক্ষণ ও গবেষণালব্ধ অভিমত প্রকাশের পর ব্রিটেন ও আমেরিকার মনোবিদগণ অধিকতর গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, এটা স্রেফ বাজে অভ্যাস বা মন্দ প্রবণতাই নয়; বরং রীতিমতো একটি মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মন ও মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। ক্রমাগত সে তলিয়ে যেতে থাকে নিঃসঙ্গতা অলীক চিন্তার গহিন অন্ধকারে। এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে হীনম্মন্যতার অন্য একটি রূপ। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মেয়েলি পোশাকে সজ্জিত থাকাবস্থায় এ ধরনের পুরুষের মধ্যে শতগুণ আত্মবিশ্বাস পরিলক্ষিত হয়। কোনো পুরুষ মেয়েলি পরিচ্ছদে উপস্থাপিত হলে সাধারণত সে লজ্জিত ও বিব্রত হওয়ার কথা; অথচ এই লোকগুলো বারবার নিজেকে মেয়েলি পোশাকে উপস্থাপন করলেই প্রবল আত্মবিশ্বাস বোধ করে।
প্রথমে অনেকের ধারণা ছিল, শারীরিক অক্ষমতাসম্পন্ন কিছু লোক তাদের দুর্বলতার দরুন নিজেদের মহিলাদের মতো ভেবে সান্ত্বনার পথ বেছে নেয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এই ধরনের বিকৃত ফ্যাশনগত রুচির শিকার লোকদের ৬৬ শতাংশই বিবাহিত। সবচেয়ে কৌতুকপ্রদ ব্যাপার হলো, তাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরা আবার সংসারজীবনে সুখী।
একেবারে অক্ষরে অক্ষরে এই প্রবণতা মেয়েদের মধ্যেও দৃশ্যমান। সাধারণত মেয়েদের দেখা হয় শারীরিকভাবে দুর্বল, রোজগার ও কায়িক শ্রমে অপারগ বর্গ আকারে। এই অবস্থার বিপরীতে নিজেদের পুরুষালি অবয়বে অধিকতর নিরাপদ মনে করে তারা। অপারগতার দিকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। জীবিকা উপার্জনের বাধ্যবাধকতার কথা বাদ দিলেও কতিপয় মহিলা অকারণে এমন পুরুষালি পোশাক-পরিচ্ছদেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শুরুর দিকে পোশাকের হাতা কেটে কিংবা শার্টের আকারে গোলগলা জামা পরতে শুরু করে। প্যান্টের সঙ্গে পছন্দ করে পুরুষশোভন জামা আর স্লিম জুতা। একপর্যায়ে পুরুষালি কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গিতে দক্ষ হয়ে ওঠে সে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো-এদের অধিকাংশই নিজেকে দাবি করে 'রূপান্তরিত পুরুষ' বলে। মনস্তত্ত্বে একধরনের রোগের নাম 'সামগ্রিক আসক্তি'। এই ধরনের ফোবিয়ায় আক্রান্তদের কোনো বস্তু পছন্দ হলেই সেরেছে! যেখান থেকে যেভাবেই হোক, সেই জিনিস তাকে সংগ্রহ করতেই হবে। যেমন: পেনসিলের মতো হিল জুতার ব্যাপারে কোনো পুরুষের দুর্বলতা তৈরি হলে সে যে মেয়ের কাছেই তা দেখবে, তার সঙ্গে একটি সংযোগ ও সম্পর্ক অনুভব করবে। এজন্য মেয়েটির সুন্দরী হওয়া একেবারেই আবশ্যক নয়।
ফ্যাশনের বেলায় রুচির বিকৃতি আর বস্তুসামগ্রীর প্রতি আসক্তি-দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, ডোরাকাটা ও রং-বেরঙের উদ্ভট পোশাক পছন্দ ও পরিধান কেবল ফ্যাশনে বিকৃত রুচির সূচকই নয়; বরং নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ করার সচেতন কসরত। ভারতে একসময় কুস্তিগির পলোয়ানরা রেশমি কাপড়ে বেনারসির কাজ করা রুমাল গলায় বাঁধত। এরপর শুরু হয় ভুসকি ধরনের কাপড়ের মাফলার পরার রেওয়াজ। সম্প্রতি গান-বাজনা ও নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত লোকদের প্রায় সব ধরনের মেয়েলি পোশাক পরতে দেখা যাচ্ছে। জামদানি, ব্রেডকাট স্কার্ট তো হরদম গুরুত্বের সঙ্গেই পরা হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু পুরুষরা গলায় একধরনের চিকন সুতা' ঝুলিয়ে রাখে। ধনী শ্রেণির হিন্দুরা এর সঙ্গে ব্যবহার করে স্বর্ণের চেইন। আজকাল সর্বত্র প্রায় অধিকাংশ উঠতি তরুণের গলায়ও নানান কারুকার্যময় সোনার চেইন দেখা যায়। পুরুষদের জন্য এসব রেশমি কাপড়, গলায় সোনার চেইন ও ভিন্ন সংস্কৃতির অনুকরণপ্রবণতা হীনম্মন্যতার প্রতিফল ছাড়া অন্য কিছুই নয়।
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ডান হাতে রেশমি কাপড় ও বাম হাতে স্বর্ণ নিয়ে বলেছেন-'এই দুটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম।' একই প্রসঙ্গে সুনানে নাসায়িতে আবু মুসা (রা.)-এর বরাতে বর্ণনা পাওয়া যায়-'উম্মতে মুহাম্মাদির পুরুষদের ওপর স্বর্ণ ও রেশমি কাপড় পরিধান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।' কোনো কোনো বর্ণনায় এমনকী মেয়েদের জন্যও অধিক পরিমাণে স্বর্ণ ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষত, ফাতেমাতুজ জহুরা (রা.)-এর কাছে স্বর্ণের হার দেখে রাসূলের অসন্তোষের দ্বিতীয় কারণটি হয়তো এই অর্থনৈতিক তাৎপর্যের মধ্যে নিহিত। ইসলামি জীবনব্যবস্থার জন্য এমনটি মোটেই শোভনীয় নয় যে, জাতি ও রাষ্ট্রের সম্পদের একটি বড়ো অংশ এক জায়গায় অনুৎপাদনশীল অবস্থায় পুঞ্জীভূত হয়ে থাকবে। এ কারণেই ইসলাম অলংকারাদির ওপর জাকাতের বিধান আরোপ করেছে।
একদল জার্মান চিকিৎসক নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃতিগত মিল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সময়ের সাথে সাথে তাদের হরমোনের গঠনগত অবস্থার মধ্যে কিছু পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। ফলে তাদের দৈহিক কাঠামোতেও খানিকটা বদল ঘটে। এভাবে পুরুষের রক্তে মেয়েলি হরমোন বেড়ে যাওয়ার ফলে তার ভেতর জন্ম নিতে পারে নারীসুলভ অভিব্যক্তি। আর এটা নিশ্চিতভাবেই নারী-पुरुष উভয়ের জন্য একটি নেতিবাচক অবস্থা।
লক্ষ্ণৌ শহরে 'জান সাহেব' নামের একজন কবি বাস করতেন। কবিতায় 'তাখাললুস' রীতি অনুসরণ করতেন তিনি। এজন্য কবিতার আসরে প্রায়শই হাজির হতেন মেয়েলি পোশাক পরে। নারী সম্বন্ধীয় কবিতার জন্য বিস্তর পুরস্কারও পেতেন শ্রোতাদের কাছ থেকে। কবি ও শিল্পী হিসেবে তিনি মোটেও গণনার যোগ্য কেউ ছিলেন না; কিন্তু মেয়েলি অঙ্গভঙ্গি, আবেদনময়ী সুর-ছন্দ ও সুড়সুড়িমূলক হাবভাব দেখিয়েই মোহগ্রস্ত করে রেখেছিলেন বিপুল পরিমাণ দর্শক-শ্রোতা। এই কবিতার আসরে মাঝারি মানের আরও একজন পুরুষ কবি হাজির থাকলেও তার কোনো কবিতা পুরস্কারের নাগাল পেত না। মোদ্দাকথা, তার জীবন কোনো সুস্থ মানুষের জীবন ছিল না। মানসিক বিকৃতির একপর্যায়ে শেষমেশ সে পুরোপুরি পাগল হয়ে যায়।
মহানবি -এর প্রত্যেকটি অপছন্দ ও নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা ও মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতার একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকে। যদিও শুরুতে আমরা অনেকেই এটি সম্বন্ধে চূড়ান্ত উদাসীনতা প্রদর্শন করে চলি। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। কোনো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে আল্লাহর রাসূল পাত্রটি সাতবার ধুয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে কমপক্ষে একবার ধুয়ে নিতে বলা হয়েছে মাটি দ্বারা। এই নির্দেশনার সঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে বিবৃতি মিলিয়ে দেখুন-যেখানে অপর প্রাণী ছিঁড়ে-ফেড়ে খাওয়া মাংসাশী হিংস্র জন্তুর গোশত হারাম করা হয়েছে। কুরআনের এ বিধান থেকে একটি ইঙ্গিত অত্যন্ত সুস্পষ্ট, কুকুর ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর মুখে নিশ্চয়ই এমন কোনো বিষাক্ত জিনিস থাকে, যা মানুষের খাদ্যে মিশে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানবদেহ। সপ্তম শতকের পৃথিবীতে মানুষের পক্ষে এটা জানা ছিল অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির পর আজ আমরা প্রমাণ পেয়েছি, হিংস্র প্রাণীর লালায় বিষাক্ত জীবাণু রয়েছে।
ছেলেদের মধ্যে যারা স্বর্ণালংকার পরে, তাদের উদ্দেশ্য হলো-মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ। নিজেকে প্রদর্শনের এই ইচ্ছে কেবল পাপই নয়; বরং হীনম্মন্যতারও পরিচায়ক। আল্লাহর রাসূল এটি বারণ করায় আমরা এই ধারণায় উপনীত হতেই পারি যে, নিশ্চয়ই এর নেপথ্যে আরও অন্তর্নিহিত কারণ ও কল্যাণ রয়েছে। একদা ইবনে আবি মুলাইকা (রা.) আয়িশা (রা.)-এর কাছে সেসব মেয়ে সম্পর্কে জানতে চাইলেন, যারা পুরুষালি জুতো পরে। তিনি বলেন- 'আল্লাহর রাসূল সেসব মেয়েকে অভিসম্পাত করেছেন, যারা পুরুষের বেশভূষা ধারণ করে। ১০
রাসূল প্রদত্ত এই শিক্ষাসমূহের মধ্যেই রয়েছে মানুষের জন্য দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের উত্তম পথনির্দেশনা। মানসিক সুস্থতা প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লিখিত হয়েছে—
'আল্লাহর রাসূল সেসব পুরুষকে অভিসম্পাত দিয়েছেন, যারা মেয়েদের মতো বেশভূষা ধারণ করে। আর সেসব মেয়েদেরও অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষালি বেশ ধারণ করেন।' আবু দাউদ
ম্যাকিংস হেরাশফিল্ড-এর কাছে বিকৃত ফ্যাশন-রুচির অপকারিতা বোধগম্য হয়েছে বিংশ শতকে; অথচ মহানবি চৌদ্দশো বছর আগে এই ভীমরতির অনিষ্ট থেকে সমগ্র দুনিয়াকে সতর্ক করে গেছেন। এসব অপসংস্কৃতি রুখে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন সমস্ত সমাজে ছড়িয়ে পড়ার আগেই। পুরুষদের জন্য মেয়েলি ঢং আর মেয়েদের জন্য পুরুষালি বেশভূষা গ্রহণের অভ্যাস প্রাথমিক ধাপেই ঠেকিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নবিজি মানুষের ব্যক্তিত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন; সুরক্ষা দিয়েছেন লৈঙ্গিক বিকার ও নেতিবাচক মানসিকতার উপসর্গ থেকে। এবার আপনিই সিদ্ধান্ত নিন, প্রকৃত মনস্তত্ত্ববিদ কে ছিলেন!
টিকাঃ
৮. বাংলাদেশে সম্ভবত এটাকে পৈতাও বলা হয়।
*. তিরমিজি, আবু দাউদ
১০. আবু দাউদ