📘 সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস > 📄 হীনম্মন্যতা ও ইসলামের নির্দেশনা

📄 হীনম্মন্যতা ও ইসলামের নির্দেশনা


কুরআন সবার আগে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে, আকার-আকৃতি বিচারে প্রত্যেকেই সেরা। ইরশাদ হয়েছে-

'আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টির সবচাইতে সুন্দর আকৃতিতে বানিয়েছেন এবং আখেরে তোমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।' সূরা তাগাবুন: ৩

এই আয়াতে মানুষের শারীরিক পূর্ণতা, সক্ষমতা ও তার সৌন্দর্যের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অপর একটি আয়াতে বংশগত কৌলীন্য ও জাতপাতের শ্রেণিবিভাজন সম্পর্কে চমৎকার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলছেন-

'আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। আর বিন্যাস করেছি বর্ণ ও বংশগত ভিন্নতায়, যেন তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে অধিকতর পরহেজগার। আর এটা জেনে রেখ, আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বাধিক পরিজ্ঞাত ও সবচেয়ে বেশি অবহিত।' সূরা হুজুরাত : ১৩

সুতরাং মানুষকে গোত্র ও গোষ্ঠীতে আলাদা করার হাকিকত এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা যাতে সহজেই একে অপরকে চিনতে পারে, ডাকতে পারে পরিচিতের স্বরে। এর অর্থ কখনোই এমন নয় যে, এক গোত্রের লোকেরা অপর গোত্র অপেক্ষা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করবে।

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে- 'হে বিশ্বাসীগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে তাচ্ছিল্য না করে। কোনো নারী যেন অন্যকে নিজের চাইতে হীন ভেবে তাকে অপমান না করে। এ ছাড়াও অন্যের নামকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে উচ্চারণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ঈমান আনার পর এরূপ কাজ অত্যন্ত নিকৃষ্ট। যদি তোমরা এরূপ কাজ থেকে তওবা না করো, তবে জেনে রাখো-এর ফলে তোমরা জালিমদের তালিকাভুক্ত হবে।' সূরা হুজুরাত: ১১

ইসলামে মোটের ওপর অন্যকে নিকৃষ্ট ভাবার কোনোরূপ বৈধতা নেই। একইভাবে নিজেকেও অন্যের চাইতে নিকৃষ্ট ভাবার ব্যাপারে কোনো উৎসাহ ও অনুমতি মুসলিমদের দেওয়া হয়নি। আল্লাহর কাছে সৎকর্মপরায়ণ কুৎসিত মুসলমানটি সুদর্শন অসৎ মুসলমান ব্যক্তির চাইতে অধিকতর পছন্দনীয়। এই তাৎপর্যপূর্ণ মূলনীতিকে পৃথিবীর ইতিহাসে শীর্ষ ম্যাগনাকার্টা অর্থাৎ বিদায় হজের ভাষণে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-

'কোনো অনারবের ওপর আরবের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মানুষ কেবল তার কর্মগুণেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে। আর মনে রেখ, তোমাদের সকলেই আদমের সন্তান। আর তিনি ছিলেন মাটি দ্বারা তৈরি।' মারিফাতুস সাহাবা

আল্লাহর রাসূল এই নির্দেশনা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ দাসের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন আরবের শীর্ষ অভিজাত গোত্র বনু হাশিমের মেয়েদের; অথচ আরবের রক্তে প্রবল কৌলীন্যবোধ মিশে ছিল বহুকাল ধরে!

হীনম্মন্যতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিংসাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে; এমনকী হিংসুকদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে পবিত্র কুরআনে-

'আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যখন সে হিংসা করে।' সূরা ফালাক: ০৫

সম্পদের অহমিকায় যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে, যাদের মাটিতে পা পড়ে না ক্ষমতার দম্ভে, তাদের যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে ইসলাম। অর্থবিত্ত কিংবা ক্ষমতা হারানোর পর তাদের অবস্থার স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-

'যা পেয়েছ তার প্রভাবে অহংকার করো না। আর যা হারিয়েছ, তার জন্য আফসোস করো না। কারণ, আল্লাহ কোনো দাম্ভিক লোককে পছন্দ করেন না।' সূরা হাদিদ : ২৩

লক্ষ করুন, মানসিক কষ্ট দূর করার জন্য কুরআন মাজিদের ব্যবস্থাপত্র কতটা লক্ষ্যভেদী ও অব্যর্থ। যা চলে গেছে, তার জন্য আফসোস নয়; আবার যা অর্জিত হয়েছে, তার জন্য অহংকারও নয়। এই সংক্ষিপ্ত মূলনীতি মগজে স্থাপন করে নেওয়া গেলে পৃথিবীর কোনো বিপদই মানুষকে অস্থিরতায় কাবু করে ফেলতে পারবে না। নামের মতো নেহায়েত পরিচয়বাহী প্রতীকও যদি অহংবোধ অথবা হীনম্মন্যতার কারণ হয়ে ওঠে, সে ধরনের নামও ইসলাম অপছন্দ করেছে। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে-

'আল্লাহর রাসূল মন্দ নামগুলো পরিবর্তন করে দিতেন।' তিরমিজি

হাদিসে এই ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, অপছন্দনীয় নাম হওয়ার কারণে অনেকের নাম রাসূল এভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। বারা-এর নাম রেখেছেন জয়নব, আসিয়া নামটি বদলে দেওয়া হয়েছে জামিলায়।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবিজি ইরশাদ করেন-

'সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলমান, যার শারীরিক ও মৌখিক আচরণে কারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। আর প্রকৃত মুহাজির সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করে।' বুখারি ও মুসলিম

বিশ্বনবি মানুষের ব্যক্তিত্বকে মহিমান্বিত করেছেন। নৈতিক চরিত্র ও ভালো কাজের কারণে স্বীকৃতি দিয়েছেন মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রাইভেসির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছেন একে অপরের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি: এমনকী অনুমতি ব্যতিরেকে কারও চিঠি খুলে পড়া কিংবা কারও অনুপস্থিতিতে পরচর্চা বা গিবতের মতো বিষয়গুলোও নিষেধাজ্ঞাজ্ঞা থেকে বাদ যায়নি। এ ছাড়া বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে দাম্ভিকতা, আত্মতুষ্টিজনিত বৈষম্যকেও প্রশ্রয় দেননি তিনি। প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভুল স্বীকারের জন্য সাহস দিয়েছেন, তাগিদ দিয়েছেন নিজে শুধরে অপরকে সংশোধনে আন্তরিক হতে। তিনি ঘোষণা করেছেন-'মানুষ যদি অপর ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সক্রিয় থাকে, আল্লাহও তার প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখবেন।' অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রূষা, খোঁজখবর নেওয়া এবং মৃত মুসলমানের জানাজায় শরিক হওয়ার মধ্য দিয়ে সমতা ও ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। হৃদয়ের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শ জায়গা দেওয়ার পর কোনো মুসলমানই আর হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00