📄 পাপ ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত
সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর ক্ষমতা, প্রভাব এবং কর্তৃত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাসের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। অধিকাংশ ধর্মতাত্ত্বিকের মতে-আল্লাহ তায়ালা সর্বাবস্থায় সর্বোত্তম ন্যায়বিচারক। কাজেই পাপিষ্ঠ ব্যক্তির যাবতীয় অপরাধের শাস্তি আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত। তাঁর দয়া ও ক্ষমা যথাস্থানে প্রযোজ্য, তবে নির্বিচারে মাফ করে দেওয়া আল্লাহর ইনসাফ ও মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এজন্য সকল অপরাধের জন্য তিনি উপযুক্ত শাস্তির বিধান রেখেছেন।
খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বলে থাকে-আল্লাহ নিজের সন্তানকে প্রাণদণ্ড দিয়েছেন মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ। যারা এরূপ বিশ্বাসের কথা ফেরি করে বেড়ায়, বস্তুত তারা বাইবেলের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে আল্লাহর দয়া, অনুকম্পা ও ক্ষমাশীলতাকে অস্বীকার করে থাকে। অন্যদিকে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মেও মহান আল্লাহকে একজন অত্যাচারী ও জালিম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।*. তারা সব সময় আল্লাহকে পর্যবসিত করে প্রতিশোধপরায়ণ, কঠোর শাস্তিদাতা ও নির্দয় সত্তারূপে। ফলে কোনো পাপে লিপ্ত হওয়ার পর তীব্র অনুশোচনার অনলে তারা অবিরাম দগ্ধ হতে থাকে, নিজের জন্য তৈরি করে নেয় এক অমোঘ চক্রব্যূহ। কেউ কেউ চিন্তা করে, মানুষ ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রকৃতিতে গড়া এক পুতুল মাত্র। ফলে জীবনের পরতে পরতে সে বারংবার জড়িয়ে পড়ে অন্যায়-অপরাধ ও পাপের বেড়াজালে। আবার পাপের প্রতিকার ও সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণের ব্যর্থতার দরুন সে ভাবে-ভগবান এই জনমে তাকে পাপের শাস্তি পুরোপুরি না দিলেও 'পর জনমে' শাস্তি হিসেবে কোনো কুৎসিত বা ইতর প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি করবেন। তাদের বিশ্বাসমতে-একজন ভালো মানুষের পক্ষেও তার পাপাচারের শাস্তি হিসেবে পুনর্জন্মে কুকুর হিসেবে পৃথিবীতে আসাটা খুবই সম্ভবপর ঘটনা।
অমৃতসরের কাছে বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ছাগল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। হঠাৎ ছাগলটি রশি ছিঁড়ে দেয় ভোঁদৌড়। ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ে এক হিন্দু মহাজনের বাড়িতে। কাকতালীয় ব্যাপার হলো-সেই মহাজনের পিতা কদিন আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। আর ধর্মীয় পণ্ডিতগণ ঘরের লোকদের বলেছিল-'আগামীকাল তোমাদের বাবা গরু, দুম্বা কিংবা খরগোশের আকৃতিতে পুনর্জন্ম লাভ করবে।' ছাগলটি ছুটতে থাকলে পেছন পেছন ঠাকুর ও ঋষি মশাইও পৌঁছে যায় তাদের দুয়ারে। কসাই বাবু ওটাকে বলি দেওয়ার জন্য টেনে বের করার চেষ্টা করতেই ঘরের লোকেরা হন্তদন্ত হয়ে হাজির। যেকোনোভাবেই তারা ছাগলটি নিজেদের ঘরে রাখতে মরিয়া। এটাই নাকি তাদের সম্মানিত পিতা! পরে ঘটনাটি হাজার টাকার মামলা পর্যন্ত গড়ায়, যদিও তৎকালে ছাগলটির প্রকৃত মূল্য ছিল মাত্র কুড়ি টাকা।
পাপের জন্য নিজেকে শাস্তি দেওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত আছে বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুদের মধ্যেও। তারা দিনের পর দিন অনাহারে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করে নিজের ও অপরের পাপ মোচনের আশায়। অনেকে তো আবার প্রায়শ্চিত্তের দরুন আত্মহত্যাই করে বসে। শেষতক কী দাঁড়ায় এতে? পাপ করলাম আমি, আর আজরাইল প্রাণ নিয়ে গেল ঋষির! খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের সাথে এটা বেশ খাপ খেয়ে যায়। এক্ষেত্রে কে কার ওস্তাদ বোঝা দায়। খোদ খ্রিষ্টান ধর্মে শাস্তি হিসেবে শূলে চড়িয়ে প্রাণদণ্ড নিষিদ্ধ; অথচ এটাই নাকি তাদের কাফফারার একমাত্র পথ!
আল্লাহ সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচারক এবং সর্বোত্তম ইনসাফকারী। ন্যায্যতার দাবি মোতাবেক তিনি প্রত্যেক পাপিষ্ঠকেই নির্ধারিত শাস্তি দেবেন। কেননা, একজন ন্যায়বিচারক কখনোই একজনের শাস্তি আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। অপরাধ ব্যতীত কাউকে শূল বিদ্ধ করে দেওয়া কী করে ইনসাফ হতে পারে? পাপ করব আমি আর প্রায়শ্চিত্ত করবেন ঈসা মসিহ-এমন অদ্ভুত প্রতিদান রাজা রঞ্জিত সিংহের শাসনে চললেও চলতে পারে; কিন্তু কোনোক্রমেই তা ন্যায়বিচার হতে পারে না। খ্রিষ্টবাদ, বৌদ্ধ ধর্ম ও হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে শান্তি ও প্রতিশোধের এই তত্ত্ব মানুষের অন্তরে অপরাধবোধ, আতঙ্ক আর সমূহ কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
'প্রত্যেক আদমসন্তান ভুলের শিকার হতে পারে। তবে পাপের পর যে তওবা করে এবং সুপথে প্রত্যাবর্তন করে, সে-ই তাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি।' ইবনে মাজাহ, তিরমিজি
মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই ভুলের উপাদানে গড়া। জীবন-সংসারের সবকিছু ছেড়ে কোনো বিজনভূমিতে নির্জনে বসে থাকলেও সে কোনো না কোনো পাপ করে বসতে পারে। এমতাবস্থায় যদি তাকে বলা হয়-'এই অপরাধের শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে,' তাহলে বেচারা জীবনভর অপরাধবোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে নানা রকম বিপদের শিকার হতে থাকবে। ইসলাম সেই ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিয়েছে, উন্মুক্ত রেখেছে তওবা ও মুক্তির অফুরান সুযোগ ও সম্ভাবনা।
জাহেলিয়াত ও বর্বরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত পৃথিবী সভ্যতার আলো খুঁজে পেয়েছিল মরুবেষ্টিত মদিনায়। এই আলো এসেছিল সারা জাহানের প্রতিপালক পরম প্রভুর পক্ষ থেকে; যিনি অসংখ্য পাপের বিপরীতেও ব্যক্ত করেছেন অকুণ্ঠ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি। তিনি শুধু দয়ালু ও মহানুভবই নন; বরং গাফফার, গফুর ও তাওয়াব তাঁর চিরন্তন গুণাবলি। তিনি সকলের চাইতে বেশি ক্ষমাশীল, সর্বাধিক তওবা মঞ্জুরকারী। তিনি এতটাই অপার করুণাময় ও উদার, পাপিষ্ঠ বান্দার অপরাধ আড়াল করতেও যিনি দ্বিধা করেন না। আর এই এই গুণের কারণেই তিনি 'সাত্তার'।
টিকাঃ
*. খ্রিষ্টানদের বিকৃত ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী-ঈসা (আ.) আল্লাহর পুত্র। তাদের আরেক বিভ্রান্ত 'আকিদা হলো, তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন-'ওরা তাঁকে হত্যাও করতে পারেনি, ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি; বরং তাদের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটানো হয়েছে মাত্র।' সূরা নিসা: ১৫৭- অনুবাদক
📄 ইসলাম ও অপরাধবোধ
নবি মানুষের মনোদৈহিক গঠনপ্রকৃতির প্রধান জায়গায়টি চিহ্নিত করে পরিষ্কারভাবে বলেছেন-'ভুল মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।' তবে এই উপলব্ধি তার থাকা উচিত যে, কোনো ভুল কাজ করলে সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে, প্রত্যাবর্তন করবে সত্য দ্বীনের দিকে। একজন মুমিনের জন্য এটাই যথেষ্ট। অপরপক্ষে ভ্রান্ত বিশ্বাসের শিকার কাফিরদের সামনে সত্য প্রকাশ করে বলা হয়েছে-
'হে আমাদের রব! আমাদের ভুলত্রুটির জন্য যেন পাকড়াও না করা হয়। আমাদের ওপর এমন দায়িত্বভার অর্পণ করবেন না, যেমনটি আমাদের পূর্ববর্তী জাতিগোষ্ঠীর ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। আর আমাদের ওপর এমন কোনো জিম্মাদারির বোঝাও যেন অর্পণ করা না হয়, যা বহনের সক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের ভুল ও অপরাধগুলো ক্ষমা করুন। আমাদের জন্য মার্জনা ঘোষণা করুন। আপনি তো আমাদের প্রতিপালক। আর অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের মোকাবিলায় আমাদের সাহায্য করুন।' সূরা বাকারা: ২৮৬
এই পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপকার্থক দুআ শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিশ্চিত করছেন-ত্রুটি-বিচ্যুতি মানুষের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য। ফলে তার দায়িত্ব আল্লাহর কাছে সর্বদা ইবাদত ও ক্ষমাপ্রার্থনায় রত থাকা, যেন কৃত অপরাধের জন্য পাকড়াও করা না হয় তাকে। কেবল এখানেই শেষ নয়; পুরো কুরআন মাজিদ এমন সব নির্দেশনায় ভরপুর, যার মাধ্যমে মানুষ সহজেই মুক্তি পেতে পারে যাবতীয় অপরাধবোধ থেকে। পবিত্র কুরআনে তওবা ও ক্ষমাবিষয়ক আয়াতের সংখ্যাই রয়েছে ৮৭টি। কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ করুন-
'যে ব্যক্তি নিজের জুলুমের পর অপরাধ থেকে তওবা করল, নিজেকে শুধরে নিল; আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেন।' সূরা মায়েদা: ৩৯
'যেই লোক গুনাহের পথ থেকে ফিরে এলো, মানুষ তার কাছ থেকে নিরাপদ হয়ে গেল এবং সে নিজে ভালো কাজে প্রবৃত্ত হলো, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; তার ওপর কোনো জুলুমও করা হবে না।' সূরা মারইয়াম: ৬০
অনুরূপ ঘোষণা বিবৃত হয়েছে সূরা ত্ব-হা, ফুরকান ও কুসাসে। এই বিষয়ে অন্যত্র পুনরাবৃত্তি হচ্ছে-
'যে ব্যক্তি অপকর্মের পর তওবা করল, নিজের আচরণকে সংশোধন করে নিল; তার এটা জানা থাকা চাই যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।' সূরা আলে ইমরান: ৮৯
তওবা কবুল হবে, কিন্তু...
'যারা ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গেল এবং ক্রমাগত বেশি কুফরিতে জড়িয়ে পড়ল, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন না।' সূরা আলে ইমরান : ৯০
'যখন তাদের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসে, মৃত্যু তার চোখের সামনে হাজির হয়, তখন সে তওবা করার চেষ্টা করে।' সূরা নিসা: ১৮
মুসা (আ.)-কে পিছু ধাওয়া করে নীলনদে ডুবে যাওয়ার সময় ফেরাউন উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠেছিল, 'আমি মুসা ও হারুনের প্রভুর প্রতি ঈমান আনলাম।' সেদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার ঈমান কোনো কাজে আসেনি। কেননা, তওবার অর্থই হলো-কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত চিত্তে আল্লাহর নিকট এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে, আমি অপরাধ করেছি এবং ভবিষ্যতে এমনটি আর কখনোই করব না। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আল্লাহর নবি ঘোষণা করেছেন-
'অন্তিম অবস্থায় মানুষের গলার ভেতর থেকে গড়গড় শব্দ বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তওবা কবুল করতে থাকবেন।' তিরমিজি, ইবনে মাজাহ
মহান আল্লাহ তায়ালা তওবার সময়কে এতটাই বিস্তৃত করে দিয়েছেন যে, জীবনের অন্তিম সময়ে সাকরাত তথা কণ্ঠনালি ও ফুসফুসে নিশ্বাসের স্পন্দন থাকাবস্থায়ও তিনি বান্দার তওবা কবুল করবেন। স্বাভাবিক অবস্থায় তওবার সুযোগ কতকাল উন্মুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বলেন-
'কিয়ামতের আগে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত তওবা কবুল হবে।' আবু দাউদ, আহমদ, দারেমি
এভাবে পাপ হতে সৃষ্ট অপরাধবোধ ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম মানুষকে সহজ-সরল পথ বাতলে দিয়েছে। সুতরাং অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনায় দগ্ধ না হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে মহান আল্লাহর দরবারে। কারণ, তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষমাশীল এবং তওবা মঞ্জুরকারী। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসূল আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টিকে নতুন জীবনের সঙ্গে উপমা দিতে গিয়ে বলেছেন-
'এক ব্যক্তির খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে যাবতীয় দরকারি আসবাবপত্র পরিবহন করার একমাত্র উটটি বিজন মরুভূমিতে হারিয়ে গেল। তপ্ত মরুপ্রান্তরে উটটি খুঁজতে খুঁজতে সে ক্লান্ত ও অবসন্ন। এমন অবস্থায় অকস্মাৎ উটটি পেয়ে গেলে তার যেমন খুশির সীমা- পরিসীমা থাকে না, তওবার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তনকারী বান্দার প্রতিও মহান আল্লাহ তায়ালা ঠিক তেমনি সন্তুষ্ট হন। বান্দা তওবার কথাগুলো পেশ করতে গিয়ে উলট-পালটও করে ফেললেও আল্লাহ তায়ালা বলেন-“তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব। তুমি যে তওবা করতে গিয়ে ভুল করছ, আমি এতেও খুশি।” বস্তুত, আল্লাহ তায়ালা বান্দার লজ্জিত হওয়ার বিষয়টাকে কবুল করে তার জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিয়ে থাকেন।' মুসলিম
আভিধানিক অর্থে তওবা হলো, অতীতের কৃত পাপের জন্য লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়া। এ কারণেই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইসলাম কেবল তওবার পদ্ধতি বাতলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মুক্তি ও প্রশান্তির আশ্বাস দিয়েছে শঙ্কা ও অপরাধবোধের দুষ্টচক্র থেকে। প্রিয়নবি মুহাম্মাদ ঘোষণা করেন-
'গুনাহ থেকে তওবাকারীর অবস্থা সেই লোকের মতোই, যে কখনো গুনাহই করেনি।' ইবনে মাজাহ : ৪২৫০
আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বলেন-
'সেই লোকই বারবার পাপে লিপ্ত হয়, যে তওবা করে না।'
কারণ, তওবার পরে সেই পাপের পুনরাবৃত্তি মোটের ওপর সংগত নয়। প্রাক- ইসলামি যুগে ধর্মযাজকগণ নিজেই সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তওবা উসুল করতেন এবং নিজেরাই তা কবুল হওয়ার ফয়সালা দিতেন। এই ধরনের একটি কাহিনি স্বয়ং আল্লাহর নবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ শুনিয়েছেন। ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে আবু সাইদ খুদরি (রা.)-এর সূত্রে-
'এক ব্যক্তি ৯৯টি খুনের পর নিজের জঘন্য পাপাচারের কারণে অপরাধবোধ, লজ্জা আর অনুতাপে দগ্ধ হয়ে একজন ধর্মযাজকের কাছে গেল। লোকটির আকুতি ছিল, ধর্মগুরু যেন তার পাপ মার্জনার কোনো উপায় খুঁজে বের করেন। ওই ধর্মবিশেষজ্ঞ তার মুখের ওপর সাফ জানিয়ে দিলো-"না, তুমি ক্ষমার অযোগ্য, তোমার তওবার কোনো পথ খোলা নেই।” অতঃপর আশাহত হয়ে লোকটি যাজককেও হত্যা করে পূর্ণ করল। এরপর নানাজনের কাছে বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞেস করতে থাকল, কী উপায়ে সে তওবা করতে পারে। কেউ একজন তাকে জানাল, বহু দূরের এক গ্রামে ধর্মীয় বিষয়ে গভীর বুৎপত্তিসম্পন্ন একজন আলিম থাকেন। তিনি নিশ্চয়ই বিষয়টি সমাধান করতে পারবেন। ওই আলিমের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে পথিমধ্যে সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তার অন্তরে ছিল সম্মুখে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ফলে প্রাণবায়ু বের হওয়ার সময় শেষ কদমটি সামনের দিকে বাড়িয়েই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় তার রুহের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য একই সঙ্গে উপস্থিত হয় রহমত ও জাহান্নামের ফেরেশতারা। উভয় দলই দাবি করল-“এটা আমাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।” বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য তাঁরা সালিশ নির্ধারণ করল তৃতীয়পক্ষের একজনকে। তৃতীয়পক্ষ সিদ্ধান্ত দেয়, তার ছেড়ে আসা পথ আর গন্তব্যের পথ মেপে দেখা হোক। পরিমাপের পর দেখা গেল, প্রকৃতপক্ষে সে কম পথ অতিক্রম করেছিল আর উদ্দিষ্ট পথের দূরত্বই বাকি ছিল বেশি। তবে আল্লাহ তায়ালা গন্তব্যের দিকের দূরত্বকে সংকুচিত করে দিয়েছেন, যার ফলে তাকে জান্নাতের উপযুক্ত বলে ফয়সালা করা হয়েছে।' বুখারি ও মুসলিম
লক্ষ করলে বোঝা যায়, এই ব্যক্তির পাপের পর্বত নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য তার নিয়্যাতই যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পাপের বিষয়ে লজ্জা, অনুশোচনা ও ভবিষ্যতে পাপ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই তার জন্য বয়ে এনেছে আল্লাহ প্রদত্ত অনিঃশেষ কল্যাণ। ঠিক অনুরূপ একজন পাপিষ্ঠ নারীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন আল্লাহর রাসূল। একদিন নিজের জুতার সাহায্যে কূপ থেকে পানি তুলে একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পান করায় সে। জীবের প্রতি তার সদয় ও আন্তরিক আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে মহান আল্লাহ জীবনের তাবৎ পাপের শাস্তি থেকে তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
'নওয়াস বিন সামআন (রা.) একবার রাসূলের দরবারে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময়ে এক ব্যক্তি এসে নবিজির কাছে জানতে চাইলেন-"সওয়াব ও গুনাহের স্বরূপ কী?" আল্লাহর রাসূল বললেন-"সওয়াব হলো সচ্চরিত্র। আর গুনাহ হলো তা-ই, যা তুমি নিজের মনে লুকিয়ে রাখো এবং অন্য কাউকে জানাতে চাও না।' তিরমিজি
কুরআন মাজিদের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। মন্দ কাজের প্রতিফল হিসেবে সমপরিমাণ সাজা, আর ভালো কাজের বিনিময়ে মিলবে উত্তম প্রতিদান। অধিকন্তু, ইসলাম পাপীদের ক্ষমা প্রদর্শনেও মোটের ওপর কার্পণ্য করেনি। একনিবিষ্ট চিত্তে ও সংশোধনের নিয়্যাতে তওবা করলে অবশ্যই গুনাহগারদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
জাহেলি যুগের অসংখ্য কুপ্রথার জঞ্জাল থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে নবিজি গোটা জীবন ধরে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার সাধন করেছেন। ব্যক্তির জীবনকে নিরুপদ্রব, নির্ভার ও প্রাণচাঞ্চল্যে পরিপূর্ণ রাখার জন্য যেসব কৌশলপত্র তিনি প্রণয়ন করে গেছেন, আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের কল্পনাতেও তা উদয় হওয়া অসম্ভব। অপরাধবোধের চাপ হালকা করে দিতে মাঝে মাঝে এমন বার্তাও দিয়েছেন, যার শব্দগুলো সোজাসাপ্টা ধর্মতত্ত্ববিদগণ পর্যন্ত মেনে নিতে চান না। মোটাদাগে তিনি ঘোষণা করেছেন-'যে লোক আল্লাহকে একক জেনে ও মান্য করে আজীবন সেই বিশ্বাসের অনুকূলে দিনাতিপাত করবে, অবশ্যই সে জান্নাত পাবে।' অন্যত্র আরও বলেছেন-'যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে, অতঃপর মৃত্যুর আগে কালিমায়ে শাহাদাত ছিল তার শেষ কথা, সেই ব্যক্তির জীবনের সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।' পাশাপাশি সাহাবিদেরকে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করার সময় শিখিয়ে দিয়েছেন নির্দেশনামূলক নীতিমালা-
'তোমরা সহজ করো, জটিলতা তৈরি করো না। আর মানুষকে আশ্বস্ত করো, ভয় দেখাবে না।' বুখারি ও মুসলিম
সুতরাং একমাত্র সত্য দ্বীন হিসেবে ইসলামের ওপর মনে-প্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করার পর যারা এর নীতিমালাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে পাপাচার ও বিচ্যুতি থেকে, কোনোরূপ অপরাধবোধ তার জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারবে না। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাকে রক্ষা করবেন জীবনের যাবতীয় অর্থহীনতা আর শূন্যতাবোধ হতে।
টিকাঃ
*. মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের একেবারে অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে পুরো শরীর অসাড় ও নিস্তেজ হয়ে কেবল বুকটি উঠানামা করে এবং নিশ্বাস চালু থাকে, তারপর সেটাও থেমে যাওয়ার আগে গলার ভেতর থেকে গড়গড় আওয়াজ বের হয়। এই অবস্থাকে 'সাকরাতুল মাওত' বা মৃত্যুর ঝাঁকুনি বলা হয়। -অনুবাদক